প্রতিবেদন

চাঁদপুর-৩ আসনে বিএনপির এমপি প্রার্থী ব্যবসায়ী সবুর খানের ভূমি দস্যুতার বিচারে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত এনামুল হক মিয়াজি

নিজস্ব প্রতিবেদক : চাঁদপুর-৩ (সদর-হাইমচর) আসনে বিএনপির এমপি প্রার্থী ব্যবসায়ী সবুর খানের ভূমি দস্যুতার বিচারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ চেয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত জনৈক এনামুল হক মিয়াজি। সশরীরে সাপ্তাহিক স্বদেশ খবর কার্যালয়ে এসে তিনি প্রয়োজনীয় দলিলপত্রাদি প্রদর্শন করে রাজধানীর সোবহানবাগস্থ প্রিন্স প্লাজা শপিং সেন্টারে তার মালিকানাধীন মাত্র ৩৬০ বর্গফুটের একটি দোকান সবুর খানের লোলুপ দৃষ্টি থেকে রক্ষার আকুল আবেদন জানান। এই দোকানটির মালিকানা ছেড়ে দেয়ার জন্য সবুর খানের লোকেরা তাকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে বলে তিনি জানান।
এনামুল হককে প্রিন্স প্লাজা থেকে উচ্ছেদ করার জন্য এর আগে সবুর খানের মালিকানাধীন ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির লোকজন তার দি বাংলাদেশ ফটোস্ট্যাট নামের দোকানটির সাইনবোর্ড ভেঙে দেয় এবং তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে তিনদিনের মধ্যে দোকান ছেড়ে দেয়ার হুমকি দেয়। নইলে অবৈধ স্থাপনা দেখিয়ে রাজউক দিয়ে উচ্ছেদ করানো হবে বলে শাসানো হয়। তাদের বেঁধে দেয়া সময়ে দোকান না ছাড়লে পরদিনই রাজউকের বুলডোজার এসে প্রিন্স প্লাজার সম্মুখে হাজির হয়। এ অবস্থায় এনামুল হক রাজউকের লোকজনকে মার্কেটের দোকান না ভাঙার জন্য মহামান্য হাইকোর্টের স্টে অর্ডার নং ১৭২৬/২০১৬ এবং দোকানের মালিকানা সংক্রান্ত দলিলপত্রাদি প্রদর্শন করেন। সব কিছু পর্যালোচনা করে এবং এনামুল হক মিয়াজির প্রদর্শিত কাগজপত্রের সত্যতা পেয়ে রাজউকের বুলডোজার দি বাংলাদেশ ফটোস্ট্যাটকে না ভেঙে চলে যায়।
রাজউক চলে যাওয়ার পরই এনামুল হকের ওপর নেমে আসে বিপর্যয়। সবুর খানের লোকেরা এই দফায় তাকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি আরোপিত রেখে তার দোকানটিতে তালা মেরে দেয়। সবুর খান ও তার লোকদের হয়রানি হাত থেকে বাঁচার জন্য সংশ্লিষ্ট শেরেবাংলা নগর থানায় গত ২২ আগস্ট জিডি নং ১৫৪৩ করেও কোনোরূপ প্রতিকার পাননি। এমনকি পরবর্তী সময়ে দোকানে তালা বন্ধ করে দেয়ার পর শেরেবাংলা নগর থানা রহস্যজনক কারণে সবুর খানের বিরুদ্ধে জিডি বা মামলা নিতে রাজি হয়নি।
এনামুল হক জানান, তার ও তার পরিবারের জীবনধারণের একমাত্র অবলম্বন এই ছোট্ট দোকানটি। শতকোটি টাকার মালিক সবুর খান দোকানটিতে তালা মেরে দেয়ায় এখন তিনি নিঃস্ব। আয়রোজগারহীন অবস্থায় পরিবার নিয়ে তিনি মানবেতর জীবনযাপন করছেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘এটা দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার। আমি মনে করি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার আবেদনটি জানাতে পারলে নিশ্চয়ই গরিবের ওপর ধনকুবের সবুর খানের এই অত্যাচারের প্রতিকার তিনি করবেন।’
এনামুল হক মিয়াজির প্রদর্শিত কাগজপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ক্রয়কৃত দলিলমূলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন থেকে দেয় তার দোকানের হোল্ডিং নং ১১/এ-৪/২, ৪/২-এ দোকান নং বি/এস-০১। খাজনা পরিশোধের রসিদ নং (জবপবরঢ়ঃ ঘড়.) অ ২০৯৬। এনামুল হক নিয়মিত তার দোকানের নামে দেয়া ডিপিডিসির বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করেন। সেই বিদ্যুৎ বিলের রসিদ ও দোকানের নামে সিটি করপোরেশনের খাজনা পরিশোধের রিসিট তিনি প্রদর্শন করেন। সব কাগজপত্র ও সরেজমিন খোঁজখবর করে জানা যায়, প্রিন্স প্লাজা শপিং সেন্টারে অবস্থিত দি বাংলাদেশ ফটোস্ট্যাট নামের দোকানটির মালিকানা এনামুল হক মিয়াজির। প্রিন্স বাজারকে যখন ডেভেলপারের মাধ্যমে প্রিন্স প্লাজা শপিং সেন্টারে পরিণত করা হয়, তখন ভূমিসমেত ৩৬০ বর্গফুটের দোকানটির পজেশন কিনে নেন এনামুল হক মিয়াজি। পরবর্তীতে সবুর খানের মালিকানাধীন ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটি প্রিন্স প্লাজায় ভাড়ায় আসে। প্রিন্স প্লাজায় ভাড়ায় বিশ্ববিদ্যালয় চালাতে এসে সবুর খানের লোকজন প্রায় সব দোকান মালিককে হুমকি-ধমকি ও পেশিশক্তি প্রদর্শন করে দামে-বেদামে যার যার দোকান থেকে উচ্ছেদ করে দেয়। কিন্তু এনামুল হক মিয়াজির কাছে এসে ঠেকে যায়। দোকানটি এনামুল হকের কষ্টের টাকায় কেনা বলে এবং এটিই ঢাকা শহরে তার একমাত্র অবলম্বন বলে তিনি দোকানটি ছাড়তে রাজি নন। আর তাতেই তার ওপর নেমে আসে সবুর খানের হুমকি ও অত্যাচার।
স্থানীয় অনেকের মনেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, এত টাকা ও সম্পদের মালিক হয়ে সবুর খান মাত্র ৩৬০ বর্গফুটের একটি দোকানের জন্য মরিয়া হয়ে উঠলেন কেন? এ বিষয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা যায়, সবুর খানের ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার পর এখনো স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে পারেনি। প্রিন্স প্লাজা শপিং সেন্টারের মতো বিভিন্ন শপিং কমপ্লেক্স, মার্কেট ও বাণিজ্যিক ভবনে দোকানঘর ভাড়া নিয়ে চলছে তার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়টি। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) কর্তৃক বেঁধে দেয়া শর্তাবলির তোয়াক্কা না করে সবুর খান বিভিন্ন মার্কেটে মার্কেটে দোকান ভাড়া নিয়ে ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটি চালাচ্ছেন। অথচ ইউজিসির অন্যতম শর্ত হলো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শাখা থাকতে পারবে না, ভাড়া বাড়ি বা মার্কেটে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করা যাবে না এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অবশ্যই নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাসের মাধ্যমে পরিচালিত হতে হবে। ইউজিসির এসব শর্ত পূরণ করতে গিয়ে এখন প্রিন্স প্লাজা শপিং সেন্টারকে ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির স্থায়ী ক্যাম্পাসে পরিণত করতে চাচ্ছেন সবুর খান। আর এতে প্রিন্স প্লাজার যেসব ক্ষুদ্র দোকানদার তার বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন, তাদের ওপরই নেমে এসেছে দোকান থেকে উচ্ছেদসহ প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি।
সবুর খানের উত্থানের নেপথ্যে
রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় একটি কম্পিউটার কম্পোজের দোকান দিয়ে কর্মজীবন শুরু করা সবুর খান অসম্ভব দ্রুততায় টাকার কুমিরে পরিণত হন। জনশ্রুতি আছে, কম্পিউটার কম্পোজের দোকানদারি করার সময় তিনি সিঙ্গাপুর থেকে কম্পিউটারের পার্টস আমদানির কাজ শুরু করেন। একটি সিপিইউ’র (সেন্ট্রাল প্রসেসিং ইউনিট বা ক্যাচিং) মধ্যে একটি হার্ডডিস্ক আমদানি দেখিয়ে তিনি মূলত পুরো সিপিইউটিই হার্ডডিস্ক দিয়ে ভর্তি করে একটির জায়গায় ১৫-১৬টি হার্ডডিস্ক আনতে থাকেন। এতে তিনি ১টি হার্ডডিস্কের ট্যাক্স পরিশোধ করে বাকি ১৫ হার্ডডিস্কের ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে রাতারাতি বড়লোক বনে যান। আরো ধনী হওয়ার জন্য তিনি এক পর্যায়ে সোনা চোরাচালানে জড়িত হয়ে পড়েন। কত্থিত আছে, পরবর্তী সময়ে সবুর খান সিপিইউ’র ভেতরে করে হার্ডডিস্কের পরিবর্তে সোনার বার আনতে থাকেন। বিএনপির ’৯১-৯৬ শাসনামলে অন্য অনেকের মতো তিনিও কম্পিউটার পার্টসের নামে সোনা চোরাচালান করে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যান। জানা যায়, সেসময় তিনি তার এসব কাজে হাওয়া ভবনের প্রত্যক্ষ সহায়তা পেতেন, ওই ভবনে অবস্থানকারী শীর্ষস্থানীয়দের যথাযথ নজরানা দিয়েই। সে সময়ে শাসকদলের নেতৃত্বস্থানীয় অনেকের সাথেই সবুর খানের অনৈতিক লেনদেনের ভালো সম্পর্ক ছিল। আর এ সম্পর্কের সূত্র ধরেই ১৫ ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনে অন্তত ৩ কোটি টাকার বিনিময়ে তিনি চাঁদপুর-৩ আসন থেকে বিএনপি দলীয় মনোনয়ন পেয়ে যান। মনোনয়ন পেয়ে তিনি নির্বাচনি এলাকায় প্রচারণাও শুরু করে দেন। তিনি মনোনয়ন পাওয়ায় পুরো চাঁদপুর জেলায় এ নিয়ে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। সমালোচনা হতে থাকে এই বলে যে, একজন স্মাগলারকে টাকার বিনিময়ে বিএনপি থেকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। তীব্র সমালোচনা মুখে শেষ পর্যন্ত ২ দিন নির্বাচনি প্রচার চালানোর পর বিএনপি হাইকমান্ড সবুর খানকে বসিয়ে দিয়ে চাঁদপুর-৩ আসনে একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেন। পরবর্তীতে ২০০১-২০০৬ চারদলীয় জোট সরকারের সময়ে সবুর খান হাওয়া ভবনের আশীর্বাদে ব্যবসাবাণিজ্যে অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা পেতে থাকেন।
বিএনপির সাথে সম্পর্কের ধারাবাহিকতার কারণে চাঁদপুর-৩ আসনে এবারও বিএনপির মনোনয়ন পাচ্ছেন সবুর খান। জানা গেছে, সাবেক এমপি জি এম ফজলুল হক, সাবেক এমপি ও জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এস এ সুলতান টিটু, জেলা বিএনপির সভাপতি শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক, নির্বাহী কমিটির সদস্য শফিকুর রহমান ভূঁইয়া ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সহ-সভাপতি মাহবুবুর রহমান শাহীন-কে ডিঙিয়ে সবুর খানের মনোনয়ন পাওয়া অনেকটাই নিশ্চিত। এর কারণ চাঁদপুর জেলা বিএনপিসহ কেন্দ্রীয় বিএনপির অন্যতম ডোনার এখন সবুর খান।
কিন্তু সমস্যা হলো গত ৯ বছর ধরে গোপনে মাসভিত্তিতে বিএনপিকে ডোনেট করে সবুর খান এনামুল হক মিয়াজীর মতো সাধারণ লোকজনের কাছে নিজেকে ক্ষমতাসীন দলের লোক বলে পরিচয় দেন। এই পরিচয় পোক্ত করার জন্য তিনি তার মালিকানাধীন ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটিকে ব্যবহার করেন। ইউনিভার্সিটির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সরকারের মন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন দলের এমপিদের নিমন্ত্রণ করে নিয়ে এসে তাদের পাশে বসে ছবি তুলে তিনি যে ক্ষমতাসীন দলের লোক সে বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত করতে চান।
ক্ষমতাসীন দলের চাঁদপুরের এক নেতার মতে, তিনি চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগের একজন সাধারণ সদস্যও নন। অথচ তাকে প্রায়ই তার ইউনিভার্সিটির অনুষ্ঠানে মন্ত্রী-এমপিদের সঙ্গে দেখা যায়। চাঁদপুর আওয়ামী লীগের বেশিরভাগ নেতাকর্মী ও সমর্থকই মনে করেন, সবুর খান একজন হাইব্রিড আওয়ামী লীগার।
তবে সে যা-ই হোক, সবসময়ই ক্ষমতাসীন দলের নাম ভাঙিয়ে সুবিধা নেয়া সবুর খানের বিপুল অবৈধ সম্পদের খোঁজে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। জানা গেছে, দুদক সম্প্রতি নাগরিকদের সরাসরি অভিযোগ জানানোর জন্য যে হটলাইন খুলেছে তাতে সবুর খানের বিরুদ্ধে শতাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে। যদিও অনেক অভিযোগ দুদকের তদন্তের আওতায় পড়ে না (যেমন এনামুল হক মিয়াজীর মালিকানাধীন দোকান দখলের অভিযোগ), তবুও অন্যান্য গুরুতর অনেক অভিযোগ বিবেচনায় নিয়ে দুদক সবুর খানের অবৈধ সম্পদ খোঁজার কাজে শিগগিরই নামবে বলে জানা গেছে।
তবে সবুর খানের ভূমি দস্যুতার বলি এনামুল হক মিয়াজী স্বদেশ খবরকে বলেন, সবুর খান আওয়ামী লীগ করেন না বিএনপি করেন, তিনি চোরাচালানি না ব্যবসায়ী, দুদক তার বিষয়ে তদন্ত করবে কি নাÑ তা আমার দেখে লাভ নেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার বিনীত আবেদন, সবুর খানের করালগ্রাস থেকে আমার দোকানটি ফিরিয়ে দিন। সবুর খানের অনেক আছে; কিন্তু আমার ও আমার পরিবারের একমাত্র অবলম্বন দি বাংলাদেশ ফটোস্ট্যাট নামের দোকানটিই। এই দোকানটি হারালে আমার সর্বস্ব হারিয়ে যাবে। তাই সবুর খানের ভূমি দস্যুতার হাত থেকে বাঁচতে এনামুল হক মিয়াজী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ চেয়েছেন।
তবে উত্থাপিত অভিযোগ সম্পর্কে সবুর খানের বক্তব্য জানার জন্য স্বদেশ খবর-এর পক্ষ থেকে একাধিকবার চেষ্টা করেও এ বিষয়ে তার সাক্ষাৎ অথবা মতামত পাওয়া যায়নি।