খেলা

জঙ্গি হামলার ভয় উপেক্ষা করে অস্ট্রেলীয় ক্রিকেট দল এখন বাংলাদেশে

ক্রীড়া প্রতিবেদক : বাংলাদেশে কোনো ক্রিকেট ম্যাচকে ঘিরে কোনো রকম অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা কখনোই ঘটেনি। বাংলাদেশ সফরে এসে কোনো বিদেশি দলকে বিব্রতকর ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়নি। শুধু ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের গাড়ি বহরে একবার একটি ইটের টুকরো মারা হয়েছিল। যদিও ক্যারিবিয়ানরা বিষয়টিকে হালকাভাবে নিয়েছিল। হামলা তো দূরে থাক কোনো রকম অপ্রীতিকর ঘটনার সাথে বাংলাদেশের ক্রিকেটের পরিচয় নেই। তাহলে অস্ট্রেলীয় ক্রিকেট দলের বাংলাদেশ সফরে আসতে এত গড়িমসি কেন! নিরাপত্তার অজুহাতে দুই-দুইবার সফর বাতিল করে এবার অবশ্য অস্ট্রেলীয় ক্রিকেট দল বাংলাদেশ সফরে এসেছে। অনেকেই বলতে চাইছেন, নিরাপত্তার আশঙ্কা স্রেফ অজুহাত, বরং মাইকেল কার্ক, রায়ান হ্যারিস, ক্রিস রর্জাসের বিদায়ের পর দলটি নতুন করে সাজানো দল নিয়ে টাইগারদের মোকাবিলায় ভয় পাচ্ছে। অপরদিকে, মৌলবাদ, জঙ্গিবাদের সাথে তো বলতে গেলে গোটা বিশ্ব লড়াই করছে। তার মধ্যে একমাত্র বাংলাদেশ লড়াই করে সফলতা পেয়েছে। মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ যখনই মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে তখনই সেই মাথা কেটে দিতে শক্ত হাতে কাজ করেছে বাংলাদেশ। শীর্ষ জঙ্গি নেতাদের গ্রেপ্তার করে বাংলাদেশ বিচারের মুখোমুখি করেছে এবং সর্ব্বোচ্চ সাজা দিয়েছে। জঙ্গিবাদবিরোধী বাংলাদেশের এ লড়াই এখনও অব্যাহত আছে। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের কঠোর অবস্থান বিশ্বের অনেক দেশের কাছে আজ অনুকরণীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। হয়ত অস্ট্রেলিয়ার কাছেও। তাই অস্ট্রেলিয়া এবার বাংলাদেশ সফরে এসেছে। সফরে তারা বাংলাদেশের বিপক্ষে ২টি টেস্ট ম্যাচ খেলবে। কিন্তু এবারও বাংলাদেশ সফরে আসার আগে তারা নাটক কম করেনি। মূল দল সফরে আসার আগে তারা অগ্রবর্তী নিরাপত্তা দল পাঠিয়েছে। সেই নিরাপত্তা দল বাংলাদেশের গৃহীত নিরাপত্তা ব্যবস্থা সরেজমিন প্রত্যক্ষ করেছে। সবকিছু পর্যবেক্ষণ শেষে তারা দেশে ফিরে বাংলাদেশের গৃহীত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঠিক আছে বলে অস্ট্রেলীয় ক্রিকেট বোর্ডের কাছে রিপোর্ট পেশ করেছে। সেই ইতিবাচক রিপোর্ট পাওয়ার পরই অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশ সফরে এসেছে। এখন তারা আছে অনুশীলনে। হোটেলে অবস্থান এবং অনুশীলনে যাওয়া-আসার সময় তাদের জন্য যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে তা দেখলে নিশ্চয়ই হিংসায় জ্বলে-পুড়ে যাবেন খোদ অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীও। কারণ হলফ করে বলা যায়, অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরে এলেও বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনী তার জন্য এতটা তটস্থ থাকত না, যতটা না ঘাম ঝরাতে হচ্ছে অস্ট্রেলীয় ক্রিকেট দলের জন্য।
অস্ট্রেলীয় দলের অতীত কর্মকা-ের কারণে তাদের জন্য যে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে তা আগেই জানা ছিল। এমনই নিরাপত্তা ব্যবস্থা যে, নিñিদ্র নিরাপত্তায় চলছে অস্ট্রেলিয়া দলের অনুশীলন। যখন অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেটাররা মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের একাডেমি ভবনে অনুশীলন করেন তখন কাউকে সেখানে প্রবেশ করতে দেয়া হয় না। এমনকি সাংবাদিকদেরও নয়। কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যেই আছেন অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটাররা।
বাংলাদেশের বিপে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ খেলবে অস্ট্রেলিয়া। ২৭ আগস্ট মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে প্রথম টেস্ট ও ৪ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে হবে দ্বিতীয় টেস্ট। এ টেস্ট খেলতে ১৮ আগস্ট বাংলাদেশের মাটিতে পা রেখেছে অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটাররা। সেদিন থেকেই তাদের জন্য থাকছে নিñিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এই সিরিজটি ২০১৫ সালেই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সে সময় নিরাপত্তাহীনতার ইস্যুটি সামনে এনে বাংলাদেশে সিরিজ খেলতে আসেনি অস্ট্রেলীয় ক্রিকেট দল। এবার নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে সন্তুষ্ট হয়েই খেলতে এসেছে অসিরা।
তাদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তাও দেয়া হচ্ছে। নিরাপত্তা নিয়ে সন্তুষ্টিই প্রকাশ করেছেন অস্ট্রেলীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক স্টিভেন স্মিথ। নিরাপত্তা নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে অস্ট্রেলীয় নিরাপত্তা প্রতিনিধি দলও। আসলে স্মরণকালের সেরা নিরাপত্তা পাচ্ছে অস্ট্রেলিয়া দল। ১৮ আগস্ট অস্ট্রেলিয়া দল হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের পর সেখানে তাদের নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) ও সিভিল অ্যাভিয়েশন অথরিটি অব বাংলাদেশ (ক্যাব)।
এরপর বিমানবন্দর থেকে হোটেল পর্যন্ত ছিল তিন স্তরের নিরাপত্তা। হোটেলেও থাকছে তিন স্তরের নিরাপত্তা। হোটেলের ভেতরে, চত্বরে এবং বাইরের রাস্তায় ও ভবনের ছাদে ইউনিফর্ম ও সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চৌকস সদস্যরা নিয়োজিত আছেন। এছাড়াও হোটেলের অভ্যন্তরে আছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি ডেস্ক।
টিম হোটেল থেকে ভেন্যু পর্যন্ত স্টিভ স্মিথদের চলাচলের সময় নির্ধারিত রাস্তায় কোনো যানবাহন থাকে না। মানুষ চলাচলও বন্ধ থাকে। হোটেল থেকে ভেন্যুতে না পৌঁছানো পর্যন্ত এই আদেশ বলবৎ থাকে।
নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে ২০১৫ ও ২০১৬ সালে বাংলাদেশে আসেনি অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দল। এমনকি বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত যুব বিশ্বকাপেও তাদের অনূর্ধŸ-১৯ দলকে পাঠায়নি। এতে দুই দেশের বোর্ডের সম্পর্ক ব্রিবতকর পর্যায়ে চলে যায়! তবে বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া তার অবস্থান পরিবর্তন করে তাদের স্বার্থেই বাংলাদেশ সফরে এসেছে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড আশায় ছিল, একদিন অস্ট্রেলিয়াকে বাংলাদেশে খেলতে আসতেই হবে। হলোও তা-ই। দুইবার পিছিয়ে অবশেষে বাংলাদেশ সফরে এসেছে অস্ট্রেলিয়া। পুরনো সিরিজটি খেলতেই তারা বাংলাদেশে এসেছে। এ নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট বোর্ডের কথা হয়েছে। অসি ক্রিকেট বোর্ডের প থেকেই বিসিবির কাছে সফরের প্রস্তাব এসেছে। প্রস্তাবটি দিয়েছেন ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার প্রধান নির্বাহী জেমস সাদারল্যান্ড, যিনি এর আগে বাংলাদেশে আসতে দেননি অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটারদের! সম্প্রতি ট্যুর করার জন্য বিসিবির সঙ্গে যোগাযোগের ব্যাপারটি নিশ্চিত করে সাদারল্যান্ড বলেন, ‘আমরা বিসিবির সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলেছি। তারা জানে এবং বোঝে যে আমরা একটি ট্যুর করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। কেননা এর আগে সফর বাতিল করা হয়েছিল। আমরা বাংলাদেশে গিয়ে ক্রিকেট খেলতে চাই।’ মোট কথা হলো জেমস সাদারল্যান্ডের ইঙ্গিতে যেমন আগের সফর বাতিল হয়েছিল, এবার সেই সাদারল্যান্ডের আগ্রহেই বাংলাদেশ সফরে এলো অস্ট্রেলীয় ক্রিকেট দল।
তবে সে য-ই হোক, ভালোভাবেই বোঝা যায়, জঙ্গি হামলার ভয়ে তারা যে আগের সফর বাতিল করেছিল, এখন সে জঙ্গি হামলার ভয় উপেক্ষা করেই তারা বাংলাদেশে এলো। কিন্তু তারা কি আসলেই জঙ্গি হামলার ভয় উপেক্ষা করতে পেরেছে? যে কেউই বলবেন, না। কারণ তারা যদি ভয় উপেক্ষাই করতো, তাহলে এই বুলেটপ্রুফ নিরাপত্তা নিয়ে চলাফেরা করতো না। ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, তাদের এই নিরাপত্তার বাড়বাড়ন্ত অবস্থা তাদের স্বাভাবিক খেলার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে বাধ্য। আর তাতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের সিরিজ জয়ের সম্ভাবনা অনেকটাই উজ্জ্বল।