প্রতিবেদন

দিনাজপুর কুড়িগ্রাম গাইবান্ধা ও সারিয়াকান্দির বন্যা দুর্গতদের পাশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা : নতুন ফসল ঘরে না ওঠা পর্যন্ত ত্রাণ সহায়তা অব্যাহত রাখার আশ্বাস

নিজস্ব প্রতিবেদক : দিনাজপুর, কুড়িগ্রাম গাইবান্ধা ও বগুড়ার সারিয়াকান্দির বন্যা দুর্গতদের পাশে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সারাদেশের বন্যার্তদের উদ্দেশে নতুন ফসল ঘরে না ওঠা পর্যন্ত ত্রাণ সহায়তা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিয়েছেন। গত ১৩ আগস্ট সকালে দিনাজপুর জিলা স্কুল মাঠে এবং বিকেলে কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার পাঙ্গা হাইস্কুল মাঠে বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ অনুষ্ঠানে এই আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অপরদিকে, ২৬ আগস্ট সকালে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চত্বরে এবং বিকেলে বগুড়ার সারিয়াকান্দি হাইস্কুল মাঠে বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণসামগ্রী এবং ধানের চারা ও বীজ বিতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী।
দিনাজপুর, কুড়িগ্রাম গাইবান্ধা ও বগুড়ায় প্রধানমন্ত্রী বন্যার্তদের আশ্বাস দিয়েছেন এই বলে যে, বন্যায় যাদের ঘরবাড়ি তিগ্রস্ত হয়েছে তা মেরামত করে দেয়া হবে। নতুন ফসল ঘরে না ওঠা পর্যন্ত বন্যার্তদের সহায়তা দেয়া হবে। বানভাসি একজন মানুষও ঘরহারা থাকবে না। বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে বন্যার্তদের পুনর্বাসন করা হবে। তাদের ঘরবাড়ি তৈরি করে দেয়া হবে। বন্যায় যারা তিগ্রস্ত হয়েছেন সরকার সবসময় তাদের পাশে থাকবে।
২৬ আগস্ট গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, উত্তরাঞ্চলের বন্যাদুর্গত জনগণের পুনর্বাসনে তাঁর সরকার ১১৭ কোটি টাকার পুনর্বাসন প্রকল্প শুরু করেছে। এই কর্মসূচির আওতায় আগামী বোরো ফসল ঘরে তোলার আগ পর্যন্ত কৃষকরা নানা সুবিধা পাবেন। উত্তরবঙ্গের ৬ জেলার ৬ লাখ কৃষক আগামী ফসল তোলার আগ পর্যন্ত বোরো ফসলের ৫ কেজি করে বীজ, ২০ কেজি ডিএপি, ৫ কেজি করে এমওপি এবং প্রত্যেক কৃষককে ১ হাজার করে টাকা দেয়া হবে। একইসঙ্গে সরকার কৃষকদের সহযোগিতার জন্য ৫৮ কোটি ৭৭ লাখ টাকার একটি প্রণোদনা প্রকল্পও গ্রহণ করেছে। যাতে একজন কৃষক ১০ থেকে ২০ কেজি ডিএপি সার এবং ৫ কেজি থেকে ১৫ কেজি এমওপি সার পাবেন। কাজেই কৃষকদের আর সার এবং বীজ নিয়ে ভোগান্তি পোহাতে হবে না।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে কৃষকরা ধান ব্যতীত অন্য ফসল উৎপাদন করতে চান এমন স্বল্প সংখ্যক কৃষকের মাঝে বিভিন্ন জাতের বীজ, ডাল এবং ধান ও অন্যান্য শস্যের চারা দেয়া হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ধানের চারা এই আগস্ট মাসের ২৪ তারিখ থেকে দেয়া শুরু হবে এবং উত্তরবঙ্গের বন্যা দুর্গত এলাকায় তা বিতরণ করা হবে, যাতে পানি নেমে যাবার সাথে সাথেই কৃষকেরা চাষাবাদ শুরু করতে পারেন।
এর আগে ১৩ আগস্ট দিনাজপুর গোর-এ শহীদ ময়দানে বন্যার্তদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে বন্যা, দুর্যোগ থাকবে। সেই পরিস্থিতি মোকাবিলা করেই আমাদের বেঁচে থাকতে হবে। একটি মানুষও গৃহহীন থাকবে না এবং না খেয়ে মারা যাবে না। সবাইকে ঘর-বাড়ি নির্মাণ করে দেয়া হবে। আমরা সেই ব্যবস্থা নিয়েছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের ২১ জেলায় আকস্মিক বন্যায় ব্যাপক য়-তি হয়েছে। তিগ্রস্ত মানুষদের দুর্ভোগ লাঘবে আমরা ত্রাণ বিতরণের পাশাপাশি নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছি। বন্যাদুর্গত এলাকায় গৃহহারা মানুষকে গৃহ নির্মাণ করে দেয়া হবে। সে জন্য টিন দেয়া হবে। যে এলাকায় খাস জমি নেই সেখানে সরকার জমি কিনে গৃহ নির্মাণ করবে। তিগ্রস্ত শিা প্রতিষ্ঠান মেরামত ও নির্মাণে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বন্যা-পরবর্তী পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য েেত্র যেন কোনো ধরনের সমস্যা না হয় সে জন্য পর্যাপ্ত ওষুধ ও চিকিৎসা সেবা প্রদানের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তিগ্রস্ত রাস্তা-ঘাট, পুল-কালভার্ট নির্মাণে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কৃষি েেত্র য়তির পরিমাণ বেশি হওয়ায় মানুষ যেন কোনোভাবেই অভুক্ত না থাকে সে জন্য বিদেশ থেকে খাদ্যশস্য আমদানির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ১ কোটি দরিদ্র মানুষকে ১০ টাকা কেজিতে চাল দেয়া হবে। সরকার ৩ মাস পর্যন্ত বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে থেকে সার্বিক সহযোগিতা করবে।
পরে প্রধানমন্ত্রী দিনাজপুরের বিরল উপজেলার ফরক্কাবাদ ইউনিয়নের তেঘরা হাইস্কুল প্রাঙ্গণে বন্যাদুর্গতদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেন। দুটি ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রে ১০ হাজার বন্যাদুর্গত মানুষকে ত্রাণ দেয়া হয়। ত্রাণ বিতরণ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন জাতীয় সংসদের হুইপ স্থানীয় এমপি ইকবালুর রহিম ও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এমপি।
কুড়িগ্রামে ত্রাণ বিতরণকালে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী সেপ্টেম্বর মাস থেকে দেশের ৫০ লাখ মানুষকে ১০ টাকা কেজি দরে ৩০ কেজি করে তিন মাস চাল দেয়া হবে। দেশে যেন খাদ্য ঘাটতি না হয় সে জন্য চাল আমদানির ওপর ২৮ ভাগ ট্যাক্স কমিয়ে ২ ভাগ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ১৫ লাখ টন খাদ্য আমদানি করা হয়েছে। কাজেই কোনো সংকট নেই।
কুড়িগ্রাম জেলা শহর থেকে ১৭ কিমি দূরে লালমনিরহাট জেলা সংলগ্ন ছিনাই ইউনিয়নের পাঙ্গা হাইস্কুল মাঠে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ বিতরণ অনুষ্ঠান বিশাল জনসভায় পরিণত হয়। প্রধানমন্ত্রী ২১ জন বন্যার্ত নারী-পুরুষের হাতে সরাসরি ত্রাণসামগ্রী তুলে দেন। এরপর স্থানীয় প্রশাসন ৯৭৯ জন বন্যার্ত মানুষের মাঝে প্যাকেটের ত্রাণ বিতরণ করে। প্রতি প্যাকেটে ১০ কেজি চাল, ১ কেজি ডাল, ১ কেজি লবণ, ১ কেজি চিনি, ১ কেজি চিড়া, আধা কেজি মুড়ি, তেল ১ কেজি, এক ডজন করে দেয়াশলাই ও মোমবাতি ছিল।
বন্যায় কুড়িগ্রামের ব্যাপক য়তির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, টানা বৃষ্টিপাতের কারণে উত্তরাঞ্চলের বেশ কয়েকটি জেলায় বন্যা হয়েছে। আমি দিনাজপুরের বন্যাদুর্গত এলাকা দেখে এবং ত্রাণ বিতরণ করে এলাম। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিগ্রস্ত গ্রামীণ সড়ক, মহাসড়ক ও বাঁধের কাজ শুরু হবে। একই সঙ্গে আশ্রয় কেন্দ্র ও তিগ্রস্ত শিা প্রতিষ্ঠানের মেরামতের কাজ করা হবে। আপনারা যারা স্থানীয় তারা দেখে নেবেন কাজ যেন ঠিকমতো হয়। তিগ্রস্ত কৃষকদের ধানের চারা বিতরণ করা হবে। চারার ব্যবস্থা আমরা করে রেখেছি। সার, বীজ সব দেয়া হবে। দেশকে ভিুকমুক্ত করার কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ভিুক জাতি কখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। ভিুক জাতির কোনো সম্মান থাকে না। আমরা কারও কাছে মাথা নোয়াব না। হাত পাতবো না। কারণ বাঙালি বীরের জাতি।