প্রতিবেদন

দেশজুড়ে সিরিজ বোমা হামলার যুগপূর্তি : দ্রুত বিচার শেষ করার দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক : এক যুগেও দেশজুড়ে সিরিজ বোমা হামলার সব মামলার বিচার কাজ শেষ হয়নি। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশের ৬৩ জেলায় একযোগে সিরিজ বোমা হামলার ঘটনায় ১৬১টি মামলা দায়ের হয়। এই এক যুগে ১০২টি মামলার রায় ঘোষণা হয়েছে। ৫৯টি মামলা এখনো বিচারাধীন রয়েছে। তবে এগুলো কবে শেষ হবে সে ব্যাপারে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। বিচারাধীন এসব মামলা দ্রুত শেষ করার দাবি উঠেছে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্য থেকে। তারা বলছেন, ১২ বছর আগে সংঘটিত দেশজুড়ে সিরিজ বোমা হামলার মামলা পুরোপুরি সম্পন্ন না হলে জঙ্গি তৎপরতা সমূলে নির্মূল করা যাবে না। তাদের কথা হলো ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা এবং ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সংঘটিত সিরিজ বোমা হামলার বিচার এখনও সম্পন্ন না হওয়ায় জঙ্গিগোষ্ঠী হলি আর্টিজান ও শোলাকিয়া হামলায় উদ্বুদ্ধ হওয়ার সাহস পেয়েছে। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা, ১৭ আগস্টের সিরিজ বোমা হামলা, হলি আর্টিজান হামলা ও শোলাকিয়া হামলার মতো ঘটনা সেদিনই সমূলে উৎপাটিত হবে, যেদিন জঙ্গি ও জঙ্গিদের দোসরদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত মামলার যথাযোগ্য সাজা হবে।
২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সারাদেশের ৬৩টি জেলার (মুন্সীগঞ্জ বাদে) ৫ শ’র বেশি স্থানে সিরিজ বোমা হামলার মাধ্যমে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামা’য়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ-জেএমবি জঙ্গিরা প্রকাশ্যে তাদের অবস্থান জানান দেয়। ওই হামলায় দু’জন নিহত ও শতাধিক ব্যক্তি আহত হন। এরপর বিভিন্ন সময়ে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারপরও নামে-বেনামে বারবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠার চেষ্টা করছে বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা। বর্তমানে নতুন নামে, ভিন্ন পরিচয়ে আবারো সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু করেছে তারা।
গত বছরের ১ জুলাই দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জঙ্গি হামলা হয় গুলশানের হলি আর্টিজানে। এক সপ্তাহের মাথায় ৭ জুলাই কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় ঈদের জামাত চলাকালে প্রকাশ্যে জঙ্গিরা হামলা চালায়। এর আগে ২০০০ সালে দিনাজপুরের ফুলবাড়িতে বোমা হামলার মধ্যদিয়ে জেএমবি কার্যক্রম শুরু করে।
এদিকে সরকার জঙ্গিবিরোধী ব্যাপক কর্মকা- পরিচালনা করার পর এখনও জেএমবি’র কার্যক্রম যে একেবারে শেষ হয়ে গেছে তা নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা। তবে এখন এই সংগঠনটি নব্য জেএমবি নাম ধারণ করে বিচ্ছিন্নভাবে জঙ্গি হামলার চেষ্টা করছে। পুলিশ ও র‌্যাবের প থেকে দাবি করা হয়, এই মুহূর্তে জঙ্গিরা বিচ্ছিন্নভাবে হামলা চালানোর মতো সমতায় থাকলেও তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
র‌্যাব সূত্র জানায়, ২০০৫ সালে জেএমবির ওই ঘটনায় দেশের ৬৩ জেলায় ১৬১টি মামলা হয়। আসামি করা হয় ৬৬০ জনকে। এর মধ্যে ৪৫৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিচার কার্যক্রম শেষ হয়েছে ১০২টি মামলার। তার মধ্যে ১৫ জনের মৃত্যুদ-, ২৪৭ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা ও ১১৮ জনকে খালাস দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত আসামি রাসেল, আবদুল কাফি, এমএ সিদ্দিক বাবলু, রানা ওরফে আবদুস সাত্তার, মাসুম ওরফে আবদুর রউফ এবং রায়হান ওরফে উবায়েদ মামলার শুরু থেকেই পলাতক রয়েছে। এসব মামলায় পুলিশের হিসাবে ৫০ জন আসামি পলাতক রয়েছে। জামিনে রয়েছে ৩৫ জন।
জানা যায়, সেদিন রাজধানী ঢাকার ৩৩টি স্পটে বোমা হামলার ঘটনায় বিভিন্ন থানায় ১৮টি মামলা হয়। ঢাকা মহানগর এলাকায় বোমা হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলার বিচার প্রক্রিয়া শেষ হয়ে গেছে। ঢাকার বাইরের ৫৯টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। অনেক মামলায় সাীদের না পাওয়ার কারণে মামলা শেষ করতে সময় বেশি লেগে যাচ্ছে। আবার সাীরা ঠিকমতো না আসায় জঙ্গিদের শাস্তিও সঠিকভাবে হচ্ছে না। বেশিরভাগ সাীর ঠিকানাও পরির্বতন করা হয়েছে বলে পুলিশ দাবি করে আসছে। তারপরও জঙ্গিদের যাতে কঠোর সাজা হয় সে ব্যাপারে রাষ্ট্রপ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।
২০০৫ সালের সিরিজ বোমা হামলার পর জেএমবির শীর্ষ নেতা শায়খ আবদুর রহমান, সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই, আতাউর রহমান সানি, খালেদ সাইফুল্লাহ, আবদুল আউয়াল, হাফেজ মাহমুদসহ প্রায় সাড়ে ৭০০ জঙ্গি সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। ঝালকাঠিতে দুই বিচারক হত্যা মামলায় জেএমবি প্রধান শায়খ আবদুর রহমান ও সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাইসহ ৭ জনের ফাঁসির আদেশ দেয় আদালত। ২০০৭ সালের ২৯ মার্চ শায়খ আবদুর রহমান, সিদ্দিকুল ইসলাম, খালেদ সাইফুল্ল­­াহ, আতাউর রহমান সানি, আবদুল আউয়াল, ইফতেখার হাসান আল মামুনের মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়। গত বছরের ১৭ অক্টোবর এই মামলার ফাঁসির দ-প্রাপ্ত আসামি আসাদুল ইসলাম আরিফের ফাঁসি কার্যকর হয়। সিলেটে শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারে তৎকালীন ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলার ঘটনায় হরকাতুল জিহাদের আমির মুফতি আব্দুল হান্নান, শরীফ শাহেদুল আলম বিপুল ও দেলোয়ার হোসেন রিপনের ফাঁসি কার্যকর হয় এ বছরের ১৩ এপ্রিল।
বর্তমানে জেএমবি সংগঠনটি দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছে। ২০১০ সালের ২৫ জুন জেএমবি’র আমির মাওলানা সাইদুর রহমান গ্রেপ্তার হওয়ার পর আমির হন তাসনীম। ২০১৪ সালের ২৩ ফেব্র“য়ায়ি ত্রিশালে প্রিজন ভ্যান থেকে জেএমবি সালেহউদ্দিন ওরফে সালেহীন, বোমারু মিজান ও হাফেজ মাহমুদ ওরফে রাকিবকে ছিনতাই করে। এদের মধ্যে রাকিব পুলিশের বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। জেএমবি’র আমিরের দায়িত্ব পায় সালেহ উদ্দিন। ২০১৪ সালের ২ অক্টোবর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানের খাগড়াগড়ে বোমা বিস্ফোরণের সঙ্গে বাংলাদেশের জেএমবি’র সংশ্লিষ্টতার সূত্র পায় গোয়েন্দারা। ওই বিস্ফোরণের মূল হোতা ছিল সালেহ উদ্দিন। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, এ সংগঠনের কার্যক্রম একেবারে নির্মূল করা সম্ভব হয়নি। তারা খ–বিখ- অবস্থায় রয়েছে। তবে তাদের বড় ধরনের হামলার কোনো সমতা নেই।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, জঙ্গিদের বড় ধরনের হামলার সক্ষমতা নেইÑ এটা ভেবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আত্মতৃপ্তি পাওয়ার কিছু নেই। জঙ্গিরা যে দ্রুত নিজেদের গুছিয়ে নিতে পারে এবং সংঘবদ্ধ আক্রমণ চালাতে পারে তা অতীতে বহুবার দেখা গেছে। তাই জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রীর জিরো টলারেন্স নীতি সবসময়ই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বজায় রাখতে হবে। জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের বিষয়ে শৈথিল্য দেখালে তারা আবারও ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা, সিরিজ বোমা হামলা এবং হলি আর্টিজান ও শোলাকিয়ার মতো আত্মঘাতী হামলা চালাতে উদ্বুদ্ধ হতে পারে।