প্রতিবেদন

নারায়ণগঞ্জের ৭ খুন মামলার রায়ে জনমনে স্বস্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক : ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংকরোডের ফতুল্লার লামাপাড়া থেকে সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন সরকারসহ ৭ জনকে অপহরণ করা হয়। তারপর তাদের ঠা-া মাথায় হত্যা করে লাশগুলো গুম করা হয়। তিনদিন পর ৩০ এপ্রিল শীতল্যা নদীতে তাদের ৬ জনের এবং পরদিন আরেকজনের লাশ পাওয়া যায়। হত্যা ও গুমের ঘটনা প্রকাশের পরই নৃশংসতায় শিউরে উঠেছিল সারাদেশের মানুষ।
চাঞ্চল্যকর ৭ খুনের এ মামলায় সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেন এবং র‌্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তা লে. কর্নেল (বরখাস্ত) তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর (বরখাস্ত) আরিফ হোসেন ও লে. কমান্ডার (বরখাস্ত) মাসুদ রানাসহ ১৫ আসামির মৃত্যুদ- বহাল রেখেছে হাইকোর্ট। নিম্ন আদালতের রায়ে যে ২৬ আসামিকে মৃত্যুদ- দেয়া হয়েছিল, তাদের মধ্যে ১১ জনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদ- দেয়া হয়েছে। অন্য ৯ আসামির নিম্ন আদালতের দেয়া বিভিন্ন মেয়াদের সাজা অপরিবর্তিত রয়েছে। আসামিদের করা আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের ওপর শুনানি শেষে ২২ আগস্ট এ রায় দেন বিচারপতি ভবানী প্রসাদ সিংহ ও বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ।
নিম্ন আদালতে রায় হওয়ার মাত্র ৭ মাসের মাথায় হাইকোর্টে আসামিদের আপিল নিষ্পত্তি হলো। এত বড় মামলার আপিল এত দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়ার নজির দেশে নেই। এই হত্যাকা-ের সঙ্গে রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সম্পৃক্ততা থাকায় অনেকেই ভেবেছিলেন, অন্য অনেক মামলার মতো এই মামলাটিও নিষ্পত্তি হতে বছরের পর বছর লেগে যাবে। কিন্তু সরকার প্রথম থেকেই এ মামলার বিষয়ে কঠোর অবস্থানে থাকায় হত্যাকা- সংঘটিত হওয়ার সাড়ে ৩ বছরের কম সময়ের মধ্যে নিম্ন ও উচ্চ আদালতে এই মামলার বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন হলো। সাধারণ মানুষ বলছেন, এই রায়ের ফলে সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা বেড়েছে। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ন্যায় বিচার প্রাপ্তির েেত্র এটা একটা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সাধারণত ফৌজদারি মামলায় আমাদের দেশে বিচার বিলম্বের নজির রয়েছে। সেেেত্র এই মামলা একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সরকার ও বিচার বিভাগের আন্তরিকতার কারণে এটি সম্ভব হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
রায়ের পর্যবেণে হাইকোর্ট বলেছে, র‌্যাব রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রাকারী একটি বিশেষ বাহিনী। তাদের দায়িত্ব হলো জনগণের জানমাল রা করা এবং নিরাপত্তা দেয়া। কিন্তু এ বাহিনীর কতিপয় উচ্ছৃঙ্খল সদস্য নৃশংস হত্যাকা-ে জড়িয়ে এ ধরনের জঘন্য অপরাধ সংঘটিত করেছে। ফলে তাদের বিচার হয়েছে। দেশের জনগণের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রায় এ বাহিনীর প্রতি মানুষের যথেষ্ট আস্থা রয়েছে। কিন্তু কতিপয় সদস্যের কারণে সামগ্রিকভাবে গোটা বাহিনীকে দায়ী করা যায় না। হাইকোর্ট রায়ের পর্যবেক্ষণে আরো বলেছে, কিছু উচ্ছৃঙ্খল র‌্যাব সদস্যের কারণে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন নামের একটি এলিট ফোর্সের গৌরবোজ্জ্বল অর্জন ম্লান হয়ে যেতে পারে না। তাদের সন্ত্রাসবিরোধী গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা ধূলিসাৎ হতে পারে না।
দ-প্রাপ্ত আসামিদের সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করার সুযোগ আছে। গত ১৬ জানুয়ারি ২৬ আসামিকে মৃত্যুদ- এবং অন্য ৯ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- দিয়ে রায় ঘোষণা করেছিলেন নারায়ণগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেন।
৩ বছর আগে নারায়ণগঞ্জে সিটি করপোরেশনের তখনকার কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী চন্দন সরকারসহ ৭ জনকে অপহরণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করে লাশ শীতল্যায় ডুবিয়ে দেয়ার ঘটনা পুরো দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল।
২০১৬ সালের ১৬ জানুয়ারি চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকা-ের দায়ে বিচারিক আদালত ২৬ জনকে মৃত্যুদ- দিয়েছিলো। এর বিরুদ্ধে আসামিদের আপিল ও ডেথ রেফারেন্স অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করে হাইকোর্ট। হাইকোর্টের রায়ে যাদের মৃত্যুদ- বহাল রাখা হয়েছে তারা হলেন তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর (অব) মো. আরিফ হোসেন, লে. কমান্ডার (বরখাস্ত) মাসুদ রানা, কাউন্সিলর নূর হোসেন, ল্যান্স নায়েক মো. বেলাল হোসেন, হাবিলদার মো. এমদাদুল হক, আরওজি-১ মো. আরিফ হোসেন, ল্যান্স নায়েক মো. হীরা মিয়া, সেপাই আবু তৈয়ব, কনস্টেবল মো. শিহাবউদ্দিন, এসআই পূর্ণেন্দুবালা, সৈনিক (বরখাস্ত) মো. আব্দুল আলিম, সৈনিক (বরখাস্ত) মহিউদ্দিন মুন্সী (পলাতক), সৈনিক (বরখাস্ত) আল-আমিন শরীফ (পলাতক) ও সৈনিক (বরখাস্ত) মো. তাজুল ইসলাম (পলাতক)।
রায়ে বলা হয়, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আসামিরা যে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন তাতে উঠে এসেছে, হত্যাকা-টি ছিল সুপরিকল্পিত ও ষড়যন্ত্রমূলক। এছাড়া হত্যা সংঘটনে আর্থিক লেনদেন হয়েছে কাউন্সিলর নূর হোসেনের সঙ্গে। নূর হোসেনই হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী।
রায়ে মৃত্যুদ- হ্রাস করে যাবজ্জীবন কারাদ- দেয়া ১১ জনের সাজা হ্রাসের েেত্র হাইকোর্টের পর্যবেণে বলা হয়েছে, অপরাধের ধরন বিবেচনায় নিয়ে তাদের মৃত্যুদ- দেয়া হলে সেটা হবে কঠোর শাস্তি। তাই তাদের যাবজ্জীবন কারাদ- দেয়াই হচ্ছে যুক্তিযুক্ত।
এই রায়ের বিরুদ্ধে মৃত্যুদ- প্রাপ্তদের মধ্যে ২১ জন হাইকোর্টে আপিল করেন। একইসঙ্গে মৃত্যুদ-ের রায় অনুমোদনের জন্য নথি ডেথ রেফারেন্স আকারে হাইকোর্টে আসে। এরপরই প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা ডেথ রেফারেন্স ও আপিল দ্রুত শুনানির জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পেপারবুক প্রস্তুতের জন্য হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখাকে নির্দেশ দেন।
দীর্ঘ ৩৩ কার্যদিবস ব্যাপী শুনানি শেষে গত ২৬ জুলাই হাইকোর্ট রায় ঘোষণার জন্য ১৩ আগস্ট দিন ধার্য করে। কিন্তু রায় প্রস্তুত না হওয়ায় ২২ আগস্ট নতুন দিন ধার্য করে আদালত। সে অনুযায়ী ২২ আগস্ট রায় ঘোষণা করেন বিচারপতি ভবানী প্রসাদ সিংহ। তাকে সহযোগিতা করেন বেঞ্চের কনিষ্ঠ বিচারক বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম।