কলাম

পাকিস্তানের দৃষ্টান্ত বাংলাদেশে গ্রহণযোগ্য নয়

অধ্যাপক ড. মিল্টন বিশ্বাস : ২০ আগস্ট (২০১৭) পাকিস্তানের সুপ্রিমকোর্ট সেদেশের প্রধানমন্ত্রীকে অযোগ্য ঘোষণা করলেও সেখানে কোনো আলোচনা-সমালোচনা হয়নি বলে মন্তব্য করেন প্রধান বিচারপরতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। তিনি বলেন, ‘আমরা বিচার বিভাগ ধৈর্য ধরছি, যথেষ্ট ধৈর্য ধরছি।’ পরের দিন ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রধান বিচারপতির ওই কথার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, উনি পাকিস্তানের আদালতের উদাহরণ দিচ্ছেন। পাকিস্তানের আদালতের উদাহরণ উল্লেখ করে হুমকি দিয়ে কোনো লাভ নেই। কারণ আমরা ইয়াহিয়া, আইয়ুব খান, জিয়াউর রহমান, এরশাদের মতা দেখেছি। ভয় দেখিয়ে কোনো লাভ নেই। পাকিস্তানের আদালতের সঙ্গে তুলনা দেয়ার বিচার আমি দেশবাসীর কাছে দিলাম।’
প্রধানমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন। কারণ পাকিস্তানের বিচার বিভাগ পরিচালিত হয় সেনাবাহিনী দ্বারা। সেদেশের গণতন্ত্রও পরিচালিত হয় সেনাবাহিনীর মাধ্যমে। পাকিস্তানের সেনাশাসিত গণতন্ত্রের চেয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের স্বরূপ একেবারেই আলাদা। বাংলাদেশের গণতন্ত্র সেনানিয়ন্ত্রিত নয়। জনগণের প্রতিনিধিদের দ্বারা আমাদের রাষ্ট্র পরিচালিত হয়। এখানে বিচার বিভাগ স্বাধীন।
১ আগস্ট ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের পূর্ণাঙ্গ রায় আপিল বিভাগ থেকে প্রকাশ করা হয়। গত ৩ জুলাই বিচারপতি অপসারণের মতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে দিতে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধন বাতিল করে দেয়া হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন ৭ বিচারপতির আপিল বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন। তবে হাইকোর্টের রায়ের কিছু পর্যবেণ ‘এক্সপাঞ্জ’ করে রাষ্ট্রপরে আপিল ‘সর্বসম্মতভাবে’ খারিজ করার রায় ঘোষণা করেন প্রধান বিচারপতি। অর্থাৎ সংসদের কাছে বিচারপতিদের অপসারণের মতা এখন থেকে বেআইনি ও বাতিল হয়েছে।
২.
উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বিচারপতিদের অপসারণের মতা আইনপ্রণেতাদের হাতে ফিরিয়ে দিতে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধন বিল পাস হলে এই সংশোধনী বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ওই বছরের ৫ নভেম্বর হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করা হয়। পরবর্তীতে ২০১৬ সালের ১০ মার্চ চূড়ান্ত শুনানি শেষে ৫ মে মামলার রায় দেন হাইকোর্ট। ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে গত ৮ মে ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেয়া রায়ের বিরুদ্ধে আপিল শুনানি শুরু হয়। আদালতে শুনানির সময়ে অভিমতদাতা ১০ অ্যামিক্যাস কিউরির মধ্যে ৯ জন সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর বিপে তাদের অভিমত দেন।
যদিও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আইনসভার কাছে সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতিদের অপসারণের মতা রয়েছে। দেশের সংবিধানের শুরুতে এই বিধান ছিল। অন্য দিকে কমনওয়েলথভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর ৬৩ শতাংশের অ্যাডহক ট্রাইব্যুনাল বা ডিসিপ্লিনারি কাউন্সিলরের মাধ্যমে বিচারপতি অপসারণের বিধান রয়েছে। আদালত রায়ে আরও বলেছেন, ‘বাংলাদেশের সংবিধানে ৭০ অনুচ্ছেদের ফলে দলের বিরুদ্ধে সংসদ সদস্যরা ভোট দিতে পারেন না। তারা দলের হাইকমান্ডের কাছে জিম্মি। নিজস্ব কোনো সিদ্ধান্ত দেয়ার মতা তাদের নেই। ৭০ অনুচ্ছেদ রাখার ফলে সংসদ সদস্যদের সবসময় দলের অনুগত থাকতে হয়। বিচারপতি অপসারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও তারা দলের বাইরে যেতে পারেন না। যদিও উন্নত অনেক দেশে সাংসদদের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত দেয়ার মতা আছে।’ ষোড়শ সংশোধনীর উপজীব্য বিষয় ছিল, সংসদ কর্তৃক বিচার বিভাগীয় সদস্যগণের অসদাচারণ নিয়ন্ত্রণে অভিশংসনের মতা প্রয়োগ। রায়ে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের আলোকে বিচারপতিদের অভিশংসনের মতা সাংসদদের হাতে থাকা বিচার বিভাগ মোটেও প্রত্যাশিত বলে মনে করে না।
ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেয়া রায়ের পর প্রধান বিচারপতির বিভিন্ন মন্তব্য এবং সরকার ও বিএনপি নেতাদের নানা মতামতে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে রাজনৈতিক অঙ্গন। বিএনপি একে জনগণের বিজয় হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বিএনপি নেতা রিজভী বলেছেন, ‘বর্তমান জাতীয় সংসদের যে কম্পোজিশন তাতে উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অপসারণ করার মতা জাতীয় সংসদের ওপর ন্যস্ত থাকলে সেখানে চরম দলীয় কর্তৃত্বের প্রতিফলন ঘটত এবং নিরপেতা ও ন্যায় বিচার ুণœ হতো। বিচারপতিদের নানাভাবে প্রভাবিত করতে তারা (সরকার) চাপ প্রয়োগের সুযোগ পেত।’ সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে হাইকোর্টের রায় আপিল বিভাগে বহাল থাকায় বিএনপি ভীষণ আনন্দিত হলেও আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতা এ রায়কে রাজনৈতিক রায় বলে অভিযোগ করেছেন। সরকার দলীয় কয়েকজন মন্ত্রী মনে করেন, বাহাত্তরের সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ পুনঃস্থাপন সংবিধানের পরিপন্থি হতে পারে না। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ নিয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া না জানিয়ে সংসদে আলোচনার পরামর্শ দেন।
বিএনপির মায়াকান্না স্মরণ করিয়ে দেয় বিচার বিভাগ সম্পর্কে তাদের নানা অপতৎপরতার কথা। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনায় বিচারপতি জয়নুল আবেদীন বিএনপির ফরমায়েশ অনুযায়ী তদন্ত প্রতিবেদন লিখতে গিয়ে গ্রেনেড হামলার জন্য পার্শ্ববর্তী দেশকে জড়িয়ে যে উদ্ভট তদন্ত প্রতিবেদন লিখেছিলেন এবং প্রতিদান হিসেবে আপিল বিভাগে পদোন্নতি পেয়েছিলেন, তা উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের স্বাধীনতা ও নৈতিকতায় ভয়ঙ্কর তের সৃষ্টি করেছিল। কিছুদিন আগে আপিল বিভাগের ওই একই বিচারপতিরা সর্বসম্মতিক্রমে মওদুদ আহমদের দখল করা বাড়ি ছাড়ার বিষয়ে রায় দেয়ার পর বিএনপি উচ্চ আদালতের প্রতি যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে, তাও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রতি হুমকি।
তবে রায় নিয়ে সরকার দলীয় নেতাদের মতামত ও সমালোচনা আদালত ও নির্বাহী বিভাগ কিংবা আইন বিভাগকে মুখোমুখি দাঁড় করানো হচ্ছে, যা একেবারে অনুচিত। কারণ দণি এশিয়াসহ পৃথিবীর অনেক দেশে বিচারপতি অপসারণের মতা সংসদের হাতে আছে। তাহলে ওই সব দেশের বিচার বিভাগ কি পরাধীন? সংসদের হাতে বিচারক অপসারণের মতা থাকলেই বিচার বিভাগ স্বয়ংক্রিয়ভাবেই স্বাধীনতা হারায় না, আর সংসদ ব্যতীত অন্য কোনো কর্তৃপরে কাছে বিচারক অপসারণের মতা থাকলেই বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত হয় না। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অনেক শর্তের ওপর নির্ভরশীল। উদাহরণস্বরূপ বিচারকদের নিয়োগ পদ্ধতি, বিচারকদের দতা, সততা, বিচার বিভাগের আর্থিক স্বাধীনতা, সরকারের অন্যান্য অঙ্গের সহযোগিতা, মতার ভারসাম্য ইত্যাদি। অর্থাৎ, ষোড়শ সংশোধনী বাতিল হওয়ার পর সরকারের অন্যান্য বিভাগ যদি সহযোগিতা না করে, তাহলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা দূরে থাক, বিচার বিভাগ নিজেই তো অকার্যকর হয়ে পড়বে।
৩.
সংবাদপত্রে প্রকাশিত অধ্যাপক জাকির হোসেনের একটি লেখার বিশ্লেষণ থেকে আমরা যা জানতে পেরেছি তা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। তাঁর মতে, ষোড়শ সংশোধনী মূলত যে দুটি কারণে বাতিল করা হয়েছে তা হলো, এটি সংবিধানের মৌলিক স্তম্ভ বিচার বিভাগের স্বাধীনতা তথা সংবিধান পরিপন্থি। আর দ্বিতীয় কারণ হলো সংবিধানে ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে দলের সংসদ সদস্যরা হাইকমান্ডের কাছে জিম্মি। নিজস্ব কোনো সিদ্ধান্ত দেয়ার মতা তাদের নেই। দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সংসদ সদস্যরা ভোট দিতে পারেন না। বিচারপতি অপসারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও তারা দলের বাইরে যেতে পারবেন না। এই সংশোধনী থাকলে সংসদ সদস্যদের করুণাপ্রার্থী হয়ে থাকতে হবে বিচারপতিদের। একটি আইনের কথা, আরেকটি আশঙ্কার। উচ্চ আদালত মানবতাবিরোধী মামলা, মওদুদ আহমদের বাড়ির মামলাসহ অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ মামলার রায় দিয়েছেন। বিচারপতিরা কি ষোড়শ সংশোধনীর ভয়ে ভিন্ন রায় দিয়েছেন? সঠিক রায় দেয়া সম্ভব হয়েছে তাতে ষোড়শ সংশোধনী কোনো বাধা হয়নি। বিচারপতিদের সংসদ সদস্যদের করুণাপ্রার্থী হয়ে থাকতে হবে এ আশঙ্কা একেবারেই অমূলক।
ষোড়শ সংশোধনীর ৯৬ (২) অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘প্রমাণিত অসদাচরণ বা অসামর্থ্যরে কারণে সংসদের মোট সদস্য সংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার দ্বারা সমর্থিত সংসদের প্রস্তাবক্রমে প্রদত্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ ব্যতীত কোনো বিচারককে অপসারণ করা যাবে না। আর ৯৬ (৩) অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী কোনো বিচারকের অসদাচরণ বা অসামর্থ্য সম্পর্কে তদন্ত ও প্রমাণের পদ্ধতি সংসদ আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। সহজ অর্থ হলো কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ উঠলে তা তদন্ত কমিটি তদন্ত করবে। তদন্তে অসদাচরণ প্রমাণিত হলে তা সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার দ্বারা সমর্থিত হতে হবে। এরপর পাসকৃত প্রস্তাব রাষ্ট্রপতির আদেশ দ্বারা অনুমোদিত হতে হবে, তবেই বিচারপতি অপসারিত হবেন। সংসদের অপসারণের বিরুদ্ধে তিন স্তরের রাকবচ রয়েছে, যা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল দ্বারা অপসারণের েেত্র নেই। তদন্তে প্রমাণিত না হলে তা সংসদের কাছেই যাবে না।
সংসদ কর্তৃক অপসারণের েেত্র যেমন সীমাবদ্ধতা আছে, তেমনি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলও সীমাবদ্ধতামুক্ত নয়। যেহেতু রাষ্ট্রপতির আদেশ ব্যতীত সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল তদন্ত করতে পারে না, কাজেই এখানে বড় রাজনীতির সুযোগ রয়েছে। অতীতে একাধিকবার সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনের মতো পরিস্থিতি হলেও রাষ্ট্রপতি আদেশ না দেয়ায় অভিশংসন উদ্যোগ নেয়া যায়নি। বর্তমান বিধানে বিচারপতির তদন্ত শুধু বিচারপতি দ্বারাই করার বিধান আছে, যা নৈতিকভাবে সমর্থনযোগ্য নয়। তাছাড়া সংসদের হাতে অপসারণ মতা থাকলে যদি সংবিধানের মৌল স্তম্ভ বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পরিপন্থি হয়, তাহলে মৌল স্তম্ভের ধারণা যে ভারতে সৃষ্টি ও বিকশিত হয়েছে সে ভারতে কিভাবে এ মতা সংসদের কাছে আছে? আর যে রাজনীতির প্রতি বিচারকদের আশঙ্কা, অনাস্থা আর অবিশ্বাস, সে রাজনীতি দ্বারাই তো বিচারকরা নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে আসছেন।
৪.
আধুনিক সাংবিধানিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা, সমঝোতা, জবাবদিহি ও মতার ভারসাম্যের নীতির বণ্টন ও পরিচালনা একীভূত। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এই ধারণার মূল ভিত্তি হলো রাষ্ট্রের এক অঙ্গ অপর অঙ্গ থেকে স্বাধীন ও হস্তপেমুক্ত হয়ে যার যার দায়িত্ব পালন করবে। আমাদের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা পাকিস্তান থেকে আলাদা। বাংলাদেশটা পাকিস্তান নয় তাই পাকিস্তানের উদাহরণ বাংলাদেশে চলবে না। প্রধান বিচারপতির দেয়া ওই মন্তব্য তাই প্রত্যাহারের দাবি উঠেছে। আগেই বলেছি, পাকিস্তানের রাজনীতি এবং বিচার বিভাগ সেনাবাহিনীর নির্দেশে চলে। বাংলাদেশ পাকিস্তানের মতো আইএসআই দ্বারা পরিচালিত না। পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছে প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আর বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়েছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পরিচালিত সশস্ত্র মুক্তি সংগ্রামের মাধ্যমে। এ জন্য পাকিস্তানের দৃষ্টান্ত কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
লেখক : অধ্যাপক এবং পরিচালক
জনসংযোগ, তথ্য ও প্রকাশনা দপ্তর
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়