প্রতিবেদন

ভারতীয় গরুতে সয়লাব কোরবানির পশুর হাট : শঙ্কিত বিক্রেতা স্বস্তিতে ক্রেতা

নিজস্ব প্রতিবেদক : মাংস সংগ্রহ ও ধর্মীয় কারণে কোরবানির জন্য সারা বছর বাংলাদেশে যে পরিমাণ পশুর প্রয়োজন হয়, তার ৭৫ ভাগই ব্যবহৃত হয় ঈদুল আজহায়। ১০ জিলহজ ঈদুল আজহার এক দিনেই সারাদেশে কোরবানি হয় অন্তত ১ কোটি ২০ লাখ পশু। তাই ঈদুল আজহার দিকে লক্ষ্য থাকে দেশীয় খামারি, পশু আমদানিকারক ও সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের। পাশাপাশি পাশের দেশ ভারতের খামারি ও পশু রপ্তানিকারকরাও সারা বছর অপেক্ষা করে ঈদুল আজহার জন্য। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ প্রতি ঈদুল আজহার আগে পশু বিশেষ করে ভারতীয় গরু নিয়ে নানা ধূম্রজাল তৈরি করে। সে দেশের সরকারের তরফ থেকে কঠোর হুঁশিয়ারি দেয়া হয়, সীমান্ত পেরিয়ে একটি গরুও এপার থেকে ওপারে যাবে না। কিন্তু ঈদুল আজহার কয়েকদিন আগে থেকে দৃশ্যপট পাল্টাতে থাকে। দেশের পশুর হাট ভারতীয় গরুতে সয়লাব হয়ে যায়। এবারও তা-ই হয়েছে। ভারতীয় গরুর প্রাচুর্যে সরগরম বাংলাদেশের পশুর হাট। এ নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন খামারি ও দেশীয় বিক্রেতারা। সরবরাহ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হওয়ায় পশু আমদানিকারকদের কপালে ভাঁজ পড়েছে। তবে কাক্সিক্ষত দামে কোরবানির পশু পাওয়া যাবেÑ এই আশায় স্বস্তিতে আছেন কোরবানিদাতারা।
এ বছর ভারত থেকে গরু সরবরাহ গত বছরের তুলনায় বেশি বলে সংশ্লিষ্ট পশু ব্যবসায়ীরা জানান। পাশাপাশি দেশের বিস্তীর্ণ এলাকা বন্যাকবলিত হওয়ায় এক শ্রেণির ব্যবসায়ী কমদামে গরু সংগ্রহ করেছেন কোরবানির হাটে বিক্রি করার জন্য। অনেক খামারি আগে থেকেই পরিকল্পিতভাবে গরু মজুদ করে বছরব্যাপী যতœ করেছেন। সবমিলিয়ে এ বছর বাজারে গরুর কোনো সংকট থাকবে না বলে মনে করা হচ্ছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী ১ কোটি ১৫ লাখ গবাদি পশুর চাহিদা রয়েছে এবারের কোরবানি ঈদে। চাহিদার বিপরীতে সারাদেশে কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে ১ কোটি ১৫ লাখ ৫৭ হাজার পশু, যা দেশেই উৎপাদিত। ওই হিসাবে দেশে বর্তমানে চাহিদার তুলনায় ৫৭ হাজার গবাদি পশু বেশি আছে।
এছাড়া বন্যায় এ বছর ২৬টি জেলায় ৩২ লাখ মানুষ পানিবন্দি আছে। ঈদের সপ্তাহখানেক আগেও ৯৬টি উপজেলা বন্যাকবলিত। ফলে এসব অঞ্চলে কোরবানি দেয়ার সুযোগ কিছুটা কম থাকবে। ফলে এসব জেলায় গত বছরের
তুলনায় গবাদি পশুর চাহিদা কমবে। পাশাপাশি পশু খাদ্যের সংকট ও লালন-পালনের অসুবিধার কারণে এসব জেলার গবাদি পশু এরই মধ্যে বিভিন্ন মাধ্যমে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। ফলে ২৬টি জেলার চাহিদা কমার সঙ্গে গবাদি পশু চলে আসছে অন্য জেলাগুলোতে। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বন্যার কারণে এবার চাহিদা কিছুটা কমতেও পারে গবাদি পশুর। এর বাইরে ভারত থেকে অবাধে গরু আসছে, যা যোগ হয়ে গবাদি পশুর সংখ্যা বৃদ্ধি করছে। এসব কারণে এ বছর কোরবানির পশু অনেকটা পানির দামেই পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন কোরবানিদাতারা। এর বিপরীতে খামারি ও পশু বিক্রেতাদের শঙ্কা বাড়ছে। তারা বড় ধরনের লোকসানের আশঙ্কায় আছেন।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা স্বদেশ খবরকে বলেন, গত বছর কোরবানি হয়েছে ১ কোটি ৪ লাখ গবাদি পশু। প্রতি বছর গবাদি পশু কোরবানির সংখ্যা স্বাভাবিক নিয়মে বৃদ্ধি পায়। ওই হিসাবে গত বছরের তুলনায় ১১ লাখ গবাদি পশু বেশি ধরে কোরবানির ল্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এরপরও দেখা গেছে, ৫৭ হাজার গবাদি পশু খামারিদের হাতে বেশি মজুদ রয়েছে। ফলে গরুর বাজার স্বাভাবিক থাকবে এমনটি আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রবিউল আলম এ বিষয়ে স্বদেশ খবরকে বলেন, ভারত থেকে গরু এলে কম দামে গরু পাওয়া যাবেÑ এ ধুয়া তুলে বন্যার পানিতে ভাসিয়ে গরু আনা হচ্ছে। তবে বেশি পরিমাণ ভারতীয় গরু এলে দেশের খামারিরা তিগ্রস্ত হবে।
এদিকে কোরবানিকে সামনে রেখে ভারত থেকে বিভিন্নভাবে আসছে গরু। প্রতি বছরের মতো এবারও ব্যবসায়ীরা দেশে গরু নিয়ে আসছেন। সীমান্তে কিছু স্থানে কড়াকড়ি থাকলেও বেশ কয়েকটি করিডোর দিয়ে গত বছরের তুলনায় বেশি গরু আসছে। বিশেষ করে বন্যার পানিতে ভাসিয়ে ব্যবসায়ীরা এসব গরু দেশে আনছেন।
জানা গেছে, শিবগঞ্জ উপজেলার কানসাট গরুর করিডোরের অধীন সীমান্ত এলাকা দিয়ে ভারতীয় গরু আমদানি ব্যাপক হারে বেড়েছে। শিবগঞ্জ উপজেলার বিট বা খাটাল দিয়ে প্রতিদিন ৩-৪ হাজার গরু আমদানি করা হচ্ছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, গত বছরের জুলাই-আগস্ট মাসে যে পরিমাণ গরু এসেছিল তার চেয়ে চলতি বছরে জুলাই-আগস্টে অনেক বেশি গরু এসেছে। গত দু’মাসে প্রায় ৩০-৩৫ হাজার গরু এসেছে। তবে বৈধ পথের চেয়ে অবৈধ পথে আনা পশুর সংখ্যা আরও বেশি। কুমিল্লা জেলায় করিডোর না থাকলেও সীমান্তের অন্তত ৭১টি স্পট দিয়ে ভারতীয় গরু আনা হচ্ছে। এর মধ্যে সদরের সুবর্ণপুর, বিবির বাজার, সাহাপাড়া, নিশ্চিন্তপুর, তেলকুপি, গোলাবাড়ী, শাহপুর, অরণ্যপুর, নগরগ্রাম, কর্নেল বাজার উল্লেখযোগ্য। এ বিষয়ে কুমিল্লা ১০ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল খন্দকার গোলাম সারোয়ার স্বদেশ খবরকে জানান, অবৈধভাবে কেউ গরু প্রবেশ করালে তাদের গ্রেপ্তার করতে চেষ্টা চলছে। চোরাচালান প্রতিরোধে বিজিবির সদস্যদের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। কাস্টমস ও ভ্যাট অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত জুলাই মাসে ৬ হাজার ৪৫৮টি এবং আগস্টের ১৮ তারিখ পর্যন্ত ৫ হাজার ৪৩১টি গরু আমদানি হয়। নাভারন কাস্টমস করিডোরের দায়িত্বরত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বেনাপোল সীমান্তের চারটি পশুহাট পুটখালী, অগ্রভুলট, দৌলতপুর ও গোগা স্পট দিয়ে যে পশু আসে নাভারন করিডোরে এর রাজস্ব আদায় করা হয়। গড়ে প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০টি গরু আসছে। ঈদ সামনে রেখে এ সংখ্যা আরও বাড়ছে।
কোরবানির ঈদকে ঘিরে বৈধ পথে আমদানির চেয়ে অবৈধ পথে যে পশু আসছে, মূলত তা নিয়েই ক্রেতা ও বিক্রেতাদের মধ্যে স্বস্তি ও আশঙ্কা বিরাজ করছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবার কোরবানিদাতারা ভালো লাভবান হতে পারেন এবং খামারি ও বিক্রেতারা মাত্রাছাড়া লোকসানের মুখে পড়তে পারেন; যা পরবর্তী বছরে কোরবানির জন্য পশু পালনের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।