মানি লন্ডারিংয়ের ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় বাংলাদেশের ২৮ ধাপ উন্নতি

| August 28, 2017

নিজস্ব প্রতিবেদক : বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানি লন্ডারিংয়ের ঝুঁকির মাত্রা নিরূপণ করে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। ওই তালিকায় বিশ্বের ১৪৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮২তম। চলতি বছরের তালিকায় ১ নম্বরে রয়েছে ইরান। গত বছর বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৫৪তম। ১ বছরে ২৮ ধাপ উন্নতি করেছে বাংলাদেশ। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘দ্য ব্যাসেল ইনস্টিটিউট অন গভর্ন্যান্স’ ওই তালিকা প্রকাশ করেছে।
সুইজারল্যান্ডের ওই প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে দেখা যায়, মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ ব্যবস্থায় ঘাটতি; স্বচ্ছতার ঘাটতি, উচ্চ পর্যায়ে দুর্নীতির ধারণা সূচক; আর্থিক মানদ- ও স্বচ্ছতা এবং দুর্বল রাজনৈতিক অধিকার ও আইনের শাসনসহ ১৪টি সূচকের ওপর ভিত্তি করে ওই তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। সূচকগুলোর ওপর ভিত্তি করে স্কোর দেয়া হয়েছে। যার স্কোর বেশি তার মানিলন্ডারিংয়ের ঝুঁকি তত বেশি। ওই স্কোর যাদের বেশি, তাদের স্থান তালিকায় ওপরের দিকে রাখা হয়েছে।
২০১২ সাল থেকে ‘ব্যাসেল অ্যান্টি মানিলন্ডারিং ইনডেক্স’ শিরোনামে তালিকাটি প্রকাশ করে আসছে দি ব্যাসেল ইনস্টিটিউট। ওই সূচক নিরূপণের েেত্র বিশ্বব্যাংক, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে কাজ করা বৈশ্বিক সংস্থা এফএটিএফ, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। ওই তালিকার তথ্যানুসারে, মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়নে বিশ্বের ৬৪টি দেশ বাংলাদেশের তুলনায় কম ঝুঁকিপূর্ণ। বাংলাদেশের চেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ দেশের সংখ্যা ৮১টি। বেশি ঝুঁকিপূর্ণ দেশ থেকে কম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ এই ক্রমানুসারে তালিকাটি প্রস্তুত করা হয়েছে। অর্থাৎ তালিকায় ১ নম্বর সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। আর তালিকার নিচের দেশ সবচেয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ। চলতি বছরের তালিকায় ১ নম্বরে রয়েছে ইরান। মানি লন্ডারিংয়ের ক্ষেত্রে ওই দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। তালিকায় ১৪৬ নম্বরে রয়েছে ফিনল্যান্ড। অর্থাৎ ওই দেশটি মানি লন্ডারিংয়ের ক্ষেত্রে প্রায় ঝুঁকিহীন একটি দেশ। এ পর্যন্ত ৬ বার ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫ বারই শীর্ষ ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে স্থান পেয়েছে ইরান। গত ২০১৩ সালে শীর্ষ ঝুঁকিপূর্ণ দেশ ছিল আফগানিস্তান।
ইরান ছাড়াও চলতি বছরে শীর্ষ ১০ ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় রয়েছে আফগানিস্তান, গিনি বিসাউ, তাজিকিস্তান, লাওস, মোজাম্বিক, মালি, উগান্ডা, কম্বোডিয়া ও তানজানিয়া। সবচেয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে ফিনল্যান্ড। পর্যায়ক্রমে অন্য দেশগুলো হচ্ছে লিথুয়ানিয়া, এস্তোনিয়া, বুলগেরিয়া, নিউজিল্যান্ড, স্লোভেনিয়া, ডেনমার্ক, ক্রোয়েসিয়া, সুইডেন ও ইসরাইল।
এছাড়া মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে ব্যাপক উন্নতি করা ১০টি দেশের তালিকাও প্রকাশ করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি উন্নতি করেছে সুদান। গত ২০১৬ সালে তাদের স্কোর ছিল ৭ দশমিক ৮৫। চলতি বছর তা কমে ৭ দশমিক ০২ শতাংশে নেমে এসেছে। উন্নতি করা দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৪র্থ। গত বছর বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৬ দশমিক ৪০। চলতি বছর তা কমে হয়েছে ৫ দশমিক ৭৯। দণি এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আফগানিস্তানের অবস্থান মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন ঝুঁকিতে দ্বিতীয়। এছাড়া মিয়ানমার ১৩, নেপাল ১৪, শ্রীলংকা ২৫, পকিস্তান ৪৬, বাংলাদেশ ৮২ এবং ভারত ৮৮ নম্বরে রয়েছে। ওই তালিকায় যুক্তরাষ্ট্র ১১৬ ও যুক্তরাজ্য ১১৮ নম্বরে রয়েছে।
এদিকে তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থানের ব্যাপক উন্নতি হয়েছে উল্লেখ করে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশের মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ ব্যবস্থায় ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ ২৮টি দেশকে পেছনে ফেলে র‌্যাংকিংয়ের ৫৪ নম্বর ঝুঁকিপূর্ণ দেশ থেকে ৮২ নম্বরে জায়গা করে নিয়েছে। ওই সূচকে ২০১৭ সালে সবচেয়ে দ্রুত উন্নয়নকারী ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৪র্থ। বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, সূচকে বাংলাদেশের দ্রুত উন্নয়নের কারণ হিসেবে ২০১৬ সালে বাংলাদেশের মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপর এপিজি পরিচালিত মিউচ্যুয়াল ইভালুয়েশন রিপোর্টে ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক অঙ্গীকার, আন্তঃসংস্থার কাজের সমন্বয়, আর্থিক খাতে মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে বাংলাদেশ সরকারের পর্যাপ্ত লোকবল ও অর্থের সংস্থান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এপিজির মিউচ্যুয়াল ইভালুয়েশন রিপোর্ট মোতাবেক বাংলাদেশ এফএটিএফের ৪০টি সুপারিশের বিপরীতে ৬টিতে কমপ্লায়েন্ট, ২২টিতে বেশিরভাগ কমপ্লায়েন্ট এবং ১২টিতে আংশিক কমপ্লায়েন্ট রেটিং পেয়েছে। বাংলাদেশ এফএটিএফের ৪০টি সুপারিশের সবকটিই বাস্তবায়ন করেছে।
এদিকে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থপাচার হচ্ছে বলে বিদেশি বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের রিপোর্টে বলা হয়েছে। সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, ১ বছরে ওই দেশের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের অর্থ জমার পরিমাণ ১৯ শতাংশ বেড়ে ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা হয়েছে। গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্সের (জিএফআই) রিপোর্টে বলা হয় ২০০৫ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে ৬ লাখ কোটি টাকা হারিয়ে গেছে। এ অর্থের ৭০ শতাংশ গেছে আমদানি-রপ্তানির নামে বাংলাদেশের ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করে। এছাড়া মানি লন্ডারিং ও জঙ্গি এবং সন্ত্রাসের অর্থায়নে ১ বছরে ১ হাজার ৬৮৭টি সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পেয়েছে বলে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) বার্ষিক রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। আগের অর্থবছরে ১ হাজার ৯৪টি সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়। ১ বছরে সন্দেহজনক লেনদেন বাড়ে ৫৪ শতাংশ।
এদিকে মানি লন্ডারিং ঝুঁকি বেশি থাকায় বিদেশি কয়েকটি বড় ব্যাংক এ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক লেনদেনে ব্যবহৃত ১৮৮টি নস্ট্রো অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিয়েছে। এতে ৯টি ব্যাংক মারাত্মক তিগ্রস্ত হয়েছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি দায়িত্বশীল সূত্র স্বদেশ খবরকে জানিয়েছে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মানি লন্ডারিং ঝুঁকি কমে আশায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক আন্তর্জাতিক লেনদেনে ব্যবহৃত ১৮৮টি নস্ট্রো অ্যাকাউন্ট খুলে দেয়ার আশা করছে।

Category: অর্থনীতি

About admin: View author profile.

Comments are closed.