রাজনীতি

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকেন্দ্রিক ইসি সংলাপের হালচাল

নিজস্ব প্রতিবেদক : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন গত জুনে নির্বাচনি রোডম্যাপ প্রণয়ন করেছে। কিছু রুটিন সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও সেই রোডম্যাপ অনুযায়ী সংস্থাটি ইতোমধ্যে তাদের নির্ধারিত কার্যক্রম শুরু করেছে। নির্বাচনি রোডম্যাপের অন্যতম অনুষঙ্গ ছিল স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে ইসির সংলাপ। সেই সংলাপ পুরোদমে চালিয়ে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন। এরই মধ্যে সুশীল সমাজ এবং গণমাধ্যম প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সংলাপ শেষ করেছে ইসি। ৩১ জুলাই সুশীল সমাজের সঙ্গে এবং ১৬ ও ১৭ আগস্ট গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংলাপে বসে ইসি। এরপরই শুরু হয় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ। এরই অংশ হিসেবে ঈদুল আজহার আগে ২টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ শেষ করে ইসি। ঈদের বিরতি দিয়ে ১০ সেপ্টেম্বর থেকে আবারো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ শুরু করেছে ইসি। এই কার্যক্রম এখনও চলমান আছে। জানা গেছে, আগামী ১২ অক্টোবর বিএনপির সঙ্গে এবং ১৬ অক্টোবর আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংলাপে বসবে ইসি। এবার নিবন্ধন তালিকার শেষ থেকে সংলাপে ডাকা শুরু হয়েছে ৪০টি রাজনৈতিক দলকে। প্রতিটি দলের ১০ জন নেতাকে সংলাপে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। প্রতিদিন দুইটি দলকে নির্বাচনি এ সংলাপে ডাকা হচ্ছে। প্রথম দিন ২৪ আগস্ট সংলাপের ডাক পেয়েছে বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট (বিএনএফ) এবং বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট। কারণ এই দুটি দলই ইসিতে সর্বশেষ নিবন্ধিত হয়েছিল।
ঈদুল আজহার বিরতির পর নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সঙ্গে ১১ সেপ্টেম্বর দুটি রাজনৈতিক দলের সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। সকালে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও বিকেলে ইসলামি ঐক্যজোটের সঙ্গে সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। ১৪ সেপ্টেম্বর সকালে কল্যাণ পার্টি ও বিকেলে ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের সঙ্গে সংলাপে বসে নির্বাচন কমিশন। ১৭ সেপ্টেম্বর সকালে ঐক্যবদ্ধ নাগরিক আন্দোলন ও বিকেলে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির সঙ্গে ইসির সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। ১৮ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (বাংলাদেশ ন্যাপ) ও প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দল (পিডিপি), ২০ সেপ্টেম্বর গণফ্রন্ট ও গণফোরাম এবং ২১ সেপ্টেম্বর জামিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ ও ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে বলে ইসি সূত্রে জানা যায়। আগামী ২ অক্টোবর সকালে বাংলাদেশ মুসলিম লীগ এবং বিকেলে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন; ৪ অক্টোবর সকালে বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন এবং বিকেলে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি; ৫ অক্টোবর সকালে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ এবং বিকেলে জাকের পার্টি; ৮ অক্টোবর সকালে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি এবং বিকেলে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ; ৯ অক্টোবর সকালে জাতীয় পার্টি এবং বিকেলে বিকল্পধারা বাংলাদেশ; ১১ অক্টোবর সকালে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি এবং বিকেলে বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, ১২ অক্টোবর সকালে গণতন্ত্রী পার্টি এবং বিকেলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি; ১৫ অক্টোবর: সকালে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি এবং বিকেলে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ; ১৬ অক্টোবর সকালে বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল (এমএল) এবং বিকেলে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ; ১৭ অক্টোবর সকালে জাতীয় পার্টি-জেপি এবং বিকেলে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপির সঙ্গে সংলাপে বসার পরিকল্পনা করেছে ইসি। এছাড়া ২৩ অক্টোবর পর্যবেক; ২৫ অক্টোবর নারী নেত্রী এবং ৩০ অক্টোবর নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সংলাপে বসার পরিকল্পনা করেছে নির্বাচন কমিশন।
সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম প্রতিনিধি দলের পর রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ইসির সংলাপকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে সাধারণ মানুষ। মানুষের মধ্যে এ নিয়ে উৎসাহ-উদ্দীপনার কমতি নেই। পাশাপাশি কিছু রুটিন সমালোচনা সত্ত্বেও ইসির নির্বাচনি সংলাপ কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকে ভোটের মাঠে সরগরম হয়ে উঠেছে দেশের রাজনীতি। সব দলের নেতাকর্মীদের বাইরে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে গেছে নির্বাচনি আলোচনা। গ্রাম-মফস্বলের টি-স্টলে চায়ের কাপে ঝড় উঠছে। বর্তমান ইসি আগের ইসিদের মতোই পুরনো পথে হাঁটবে বলে কেউ কেউ মত দিচ্ছেন। আবার অনেকেই ইসির রোডম্যাপ প্রণয়ন-পরবর্তী কার্যক্রম দেখে এই ইসির পক্ষেই একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব বলে মত দিচ্ছেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অনেক আগে থেকেই সংলাপের মতো কাজ শুরু করে দেয়াতে ইসির প্রতি মানুষের আস্থা ক্রমেই বাড়ছে। সাধারণ মানুষ মনে করছেন, বর্তমান ইসি একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ইসি সূত্রে জানা যায়, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের পর অক্টোবরে নির্বাচন বিশেষজ্ঞ, সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার, নির্বাচন কমিশনার ও নারী নেতৃত্বের সঙ্গে সংলাপ শেষে সবার কাছ থেকে যেসব সুপারিশ আসবে তা সমন্বয় করে কমিশনে উপস্থাপন করা হবে। পরবর্তীকালে আইনকানুনের কোনো সংশোধন প্রয়োজন হলে প্রস্তাবনা তৈরি করে সরকারের কাছে পাঠানো হবে।
নির্বাচন বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আন্তর্জাতিক মহলে দৃশ্যমান করতে এবং তাদের আস্থা অর্জনের জন্যই বর্তমান ইসি এ ধরনের কর্মকা- চালাচ্ছে। সংলাপের এজেন্ডায় নির্বাচনি রোডম্যাপ বাস্তবায়ন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ-১৯৭২ (আরপিও) সংশোধনী এনে যুগোপযোগী করা এবং সীমানা পুনর্নির্ধারণ সংক্রান্ত অধ্যাদেশ সংশোধন বিষয়ে অংশীজনদের মতামত নেয়া হচ্ছে। উল্লেখ্য, সংবিধান অনুযায়ী ২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারির আগের ৯০ দিনের মধ্যে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবরের পর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় গণনা শুরু হলেও প্রকৃত প্রস্তাবে সময় গণনা শুরু হয়ে গেছে ২০১৭ সালের শুরু থেকেই। কারণ চলতি বছরের শুরু থেকেই প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে কথা বলা এবং ভোট চাওয়া শুরু করে দেয়। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা যেমন সরাসরি নৌকার পক্ষে ভোট চান, তেমনি বিএনপি চেয়ারপারসনও ধানের শীষের পক্ষে ইতোমধ্যে ভোট চান। এসবের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য রোডম্যাপ প্রণয়ন করে গত জুনে। এর ফলস্বরূপ গত ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহায় ভোটের মাঠ বেশ গরম হয়ে ওঠে। তবে শুধু যে রাজনৈতিক দলগুলোর তৎপরতার কারণেই ভোটের মাঠ সরগরম হয়ে উঠেছে এমন নয়। মানুষের মধ্যে নির্বাচনি আবহ সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে নতুন সিইসি প্রায় ২ বছর আগে থেকেই তৎপরতা শুরু করেছেন। এমতাবস্থায় অনেকেই মনে করছেন, এখন থেকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া পর্যন্ত ভোটারদের উৎসাহ-উদ্দীপনা অব্যাহত থাকবে এবং ইসির ব্যবস্থাপনায় সবার অংশগ্রহণে একটি সুন্দর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।