প্রতিবেদন

জাতীয় সংসদে সর্বসম্মত প্রস্তাব পাস : রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে জাতিসংঘসহ বিশ্ব নেতৃবৃন্দের প্রতি আহ্বান

নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী মিয়ানমারের রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফিরিয়ে নিয়ে নাগরিকত্ব অধিকার ও নিরাপদে বসবাসের ব্যবস্থা গ্রহণে সে দেশের সরকারের ওপর জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলের জোরালো কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের আহ্বান সংবলিত প্রস্তাব জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়েছে।
গত ১১ সেপ্টেম্বর সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা অভিন্ন কণ্ঠে রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কোফি আনান কমিশনের রিপোর্ট পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির আহ্বান জানিয়েছেন। মিয়ানমারকে বর্বর রাষ্ট্র আখ্যায়িত করে জাতিসংঘ শান্তি বাহিনীর মাধ্যমে দেশটিতে সেফ জোন তৈরি করে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা প্রদানের দাবি জানিয়ে তারা বলেন, মিয়ানমারে যা হচ্ছে তা সম্পূর্ণ গণহত্যার শামিল। তারা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে। তাই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিয়ে নাগরিকত্বের অধিকার দিয়ে নিরাপদে বসবাসের ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। এ বিষয়ে মিয়ানমার সরকারের ওপর জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলের জোরালো কূটনৈতিক চাপ প্রয়োজন। যাতে তাদের নাগরিকদের ফেরত নিতে মিয়ানমার সরকার বাধ্য হয়। আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুসলমান বলে জায়গা দেননি, মানুষ হিসেবে সম্পূর্ণ মানবিক কারণে দেশে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছেন। তাই এই ইস্যুতে বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে কার্যপ্রণালি বিধির ১৪৭ বিধির আওতায় সাধারণ প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি। প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নেন বিরোধী দলের নেতা রওশন এরশাদ, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী, সরকারি দলের শেখ ফজলুল করিম সেলিম, ড. মহিউদ্দীন খান আলমগীর, অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন খসরু, ড. হাছান মাহমুদ, মেজর জেনারেল (অব.) এটিএম আবদুল ওয়াহহাব, সাইমুন সারোয়ার কমল, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও বিমানমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, জাসদের মইন উদ্দীন খান বাদল, শিরীন আক্তার, তরিকত ফেডারেশনের নজিবুল বশর মাইজভা-ারী ও বিরোধী দল জাতীয় পার্টির ফখরুল ইমাম। সরকার ও বিরোধী দলের সরব অংশগ্রহণে দীর্ঘ আলোচনা শেষে স্পিকার প্রস্তাবটি ভোটে দিলে তা সংসদে কণ্ঠভোটে সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়।
আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা মানবিক কারণে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের সাময়িক আশ্রয় প্রদানের কথা তুলে ধরে বলেন, কে হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান তা আমরা দেখিনি, আমরা মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখি এবং মানবিক কারণেই মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সাময়িক আশ্রয় দিয়েছি। আমরা অমানুষ ও অমানবিক হতে পারি না বলেই সহিংসতার শিকার রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়েছি। তবে মিয়ানমার সরকার এ সমস্যার সৃষ্টি করেছে, সমাধানও তাদেরই করতে হবে। প্রয়োজনে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে আমরা তাদের সহযোগিতা করতে পারি। অবশ্যই বাংলাদেশে আসা তাদের প্রত্যেক নাগরিককে মিয়ানমার সরকারকে ফেরত নিতে হবে। প্রয়োজনে মিয়ানমারে সেফ জোন সৃষ্টি করে তাদের নিরাপদ বসবাস নিশ্চিত করতে হবে। মিয়ানমার সরকারকে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে, এদেশে আসা রোহিঙ্গারা তাদের দেশেরই নাগরিক।
জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের তদন্ত প্রতিবেদন ও সুপারিশ বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে শেখ হাসিনা আরও বলেন, দুর্ভোগের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা ইস্যুতে কেউ যেন রাজনীতি বা রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা না করে। আবার কেউ যেন রোহিঙ্গাদের নিয়ে নিজেদের ভাগ্য গড়া বা ব্যক্তিগত ফায়দা লোটার চেষ্টা না করে। সাহায্য বা সহযোগিতা না করে কেউ বড় বড় স্টেটমেন্ট দেবেন, সেটি হবে না। আমরা দেশের ১৬ কোটি মানুষের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছি। আর এই ৪-৫ লাখ লোকের মুখে খাবার তুলে দেয়ার মতাও আমাদের রয়েছে। সত্যিকার যারা এসেছে তাদের আইডেনটিটি থাকবে, ছবি থাকবে। সাময়িকভাবে তাদের আশ্রয় দেয়ার ব্যবস্থা নিয়েছি। এটা সাময়িক ব্যবস্থা। মিয়ানমারকে অবশ্যই তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে হবে। এই ইস্যুটি জাতিসংঘের আসন্ন সাধারণ অধিবেশনে জোরালোভাবে তুলে ধরার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী।
আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধী দলের নেতা রওশন এরশাদ বলেন, রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নিষ্ঠুর বর্বরতা সারা বিশ্বকে স্তম্ভিত করেছে। অবিলম্বে এই অমানবিক অত্যাচার বন্ধ করতে জোর কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে হবে। রোহিঙ্গাদের স্রোতে অনেক সন্ত্রাসী, অস্ত্র ও মাদক চলে আসতে পারে। এ বিষয়ে সরকারকে কঠোর নজরদারি করতে হবে। মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে রওশন এরশাদ বলেন, আমরা যুদ্ধ চাই না, শান্তি চাই। তবে আমরা কাউকে ভয় পাই না। শান্তির জন্য নোবেল পাওয়া নেত্রী অং সান সু চি কিভাবে এত অশান্তি সৃষ্টি করতে পারে? ভারত ও চীনকেও এ সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে।
শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেন, মিয়ানমার সেনাবাহিনী পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট নির্যাতন-হত্যার উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। স্বার্থান্বেষী এ অঞ্চলে শান্তি বিনষ্ট করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তাই আন্তর্জাতিক বিশ্বকে এ অঞ্চলে শান্তি নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, জাতিসংঘের মহাসচিব কফি আনান রিপোর্ট জমা দেয়ার পর থেকেই মিয়ানমারে এথনিক কিনজিং শুরু হয়। একাত্তরের মতোই মিয়ামনার থেকে স্রোতের মতো রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে আমরা এ ইস্যুতে আন্তর্জাতিক নেতৃবৃন্দের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সম হয়েছি। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ মিয়ানমারে গণহত্যার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। যিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তিনি কিভাবে এমন সহিংসতা চালান। জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে রোহিঙ্গারা যাতে নিজ দেশে ফেরত যেতে পারে সেই ব্যবস্থা করতে হবে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেন, এই অমানবিক ইস্যুর শান্তিপূর্ণ সমাধানে মিয়ানমারের সঙ্গে জোর কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহলের সঙ্গেও আলোচনা চলছে। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে বহুমুখী কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো হচ্ছে। জাতিসংঘের আসন্ন সাধারণ অধিবেশনেও এ ইস্যুটি জোরালোভাবে উপস্থাপন করা হবে।
প্রস্তাব উত্থাপন করে ডা. দীপু মনি বলেন, সম্প্রতি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর অব্যাহত নির্যাতন-নিপীড়ন চরম আকার ধারণ করায় লাখ লাখ রোহিঙ্গা ইতোমধ্যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আশ্রয় নিয়েছে। এই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিয়ে নাগরিকত্বের অধিকার দিয়ে নিরাপদে বসবাসের ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।