প্রতিবেদন

দুর্নীতিবিরোধী জনমত গঠনে কার্যকর উদ্যোগ : দুদকের শুভেচ্ছা দূত হলেন বিশ্বসেরা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান

নিজস্ব প্রতিবেদক : দুর্নীতিবিরোধী জনমত গঠনে বেশকিছু কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ‘দুর্নীতি রুখবে-১০৬’ এমন স্লোগানে সাধারণ মানুষের অভিযোগ জানানোর জন্য ২৭ জুলাই থেকে হটলাইন কার্যক্রম শুরুর পর এবার দুর্নীতিবিরোধী জনমত গঠনের উদ্যোগ আরো কার্যকর করতে দুদকের শুভেচ্ছা দূত হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে বিশ্বসেরা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানকে। তিনি দুদকের সঙ্গে একত্রে কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন এবং একই সঙ্গে দুর্নীতি প্রতিরোধে কমিশনের অনুরোধে শুভেচ্ছা দূত হিসেবে কাজ করতেও সম্মত হয়েছেন। ১১ সেপ্টেম্বর রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে দুর্নীতি প্রতিরোধে বিভিন্ন ক্যাম্পেইনিং কৌশল নিয়ে আয়োজিত এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে সাকিব আল হাসান এ সম্মতি জ্ঞাপন করেন। সংস্থার চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদের বিশেষ আমন্ত্রণে তিনি সেখানে যান। এ সময় দুদকের প দুদক চেয়ারম্যান টেস্ট, টি-টুয়েন্টি ও ওয়ানডে ক্রিকেটে আইসিসি র‌্যাঙ্কিংয়ে শ্রেষ্ঠ ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানকে ক্রেস্ট এবং ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। মতবিনিময় সভায় কমিশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে দুর্নীতি প্রতিরোধে বিভিন্ন ক্যাম্পেইনিং কৌশল নিয়ে সাকিব আল হাসান তার অভিমত ব্যক্ত করেন।
দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেন, দুর্নীতি আমাদের দেশের মানুষের জন্য একটি লজ্জার বিষয়। এই লজ্জা থেকে মুক্তির জন্যই দুর্নীতি দমন কমিশন কাজ করছে। কমিশনের অন্যতম কাজ হচ্ছে মানুষকে দুর্নীতি প্রতিরোধের বিভিন্ন বার্তা পৌঁছে দেয়া। যাতে দুর্নীতি হওয়ার আগেই মানুষ সচেতন হয়। কমিশন চেষ্টা করছে দুর্নীতি হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধ করতে। গত বছর দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশ দুই ধাপ এগিয়েছে উল্লেখ করে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেন, এর অর্থ হচ্ছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কিছু ইতিবাচক কার্যক্রম হচ্ছে।
চেয়ারম্যান বলেন, এখন ঘুষ নিতে ঘুষখোর কর্মকর্তারা ভয় পাচ্ছেন। অনেক রাঘববোয়াল এখন দুদকের জালে। এ েেত্র কমিশন ব্যক্তির পদ-পদবি, সামাজিক মর্যাদা, রাজনৈতিক পরিচয় কোনো কিছু দেখছে না। কমিশন শুধু দেখছে অভিযোগের ব্যাপকতা ও গুরুত্ব। মূলত, আমরা বিশ্বের প্রতিটি মানুষকে জানাতে চাই, আমরা দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের নাগরিক নই। তিনি বলেন, আমরা জাতিগতভাবে আবেগপ্রবণ ও সহানুভূতিশীল। তাই আমরা বন্যা, ঘূর্ণিঝড় কিংবা অন্য যেকোনো দুর্যোগে যেমন মানুষের পাশে দাঁড়াই, তেমনি আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে বিজয় অর্জন করি।
ইকবাল মাহমুদ বলেন, ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে প্রতিটি আন্দোলনে দেশের তরুণ প্রজন্ম এগিয়ে এসেছে। দুর্নীতি প্রতিরোধেও তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে আসতে হবে। তাই কমিশন প্রতিটি কর্মসূচিতে তরুণদের সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করছে। আমরা দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধে একটি মিশন নিয়ে কাজ করছি।
সাকিব আল হাসানের উদ্দেশে ইকবাল মাহমুদ বলেন, আপনারা বিশেষ করে আপনি বাংলাদেশকে একটি বিশেষ মাত্রায় নিয়ে গেছেন। বিশ্বে বাংলাদেশকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এ জন্য আমরা গর্বিত। আপনি তরুণÑ দেশকে কিছু দেয়ার জন্য এখনই উত্তম সময়। আপনার কারণে যদি দেশের ১০ জন তরুণ সৎ জীবনযাপনে উদ্বুদ্ধ হয় সেটাও বিশাল প্রাপ্তি। দুদক চেয়ারম্যান বলেন, আপনি দেশের কোটি কোটি তরুণ-তরুণীর আইকন। তাই আপনাকে দুর্নীতি প্রতিরোধে কমিশনের শুভেচ্ছা দূত হিসেবে তরুণদের মাঝে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করছি। তিনি বলেন, কমিশনকে ভয় পাবে শুধু দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তিরা, সাধারণ মানুষ কমিশনকে ভয় পায় না, পাবেও না। তিনি বলেন, একটি গবেষণায় দেখা গেছে, একুশ শতকে বিশ্বের অর্থনীতির চালিকাশক্তির ১১ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ হবে অন্যতম। আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য উত্তম ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ করতে চাই। তিনি জানান, বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জার্মান উন্নয়ন সংস্থা জিআইজেড, ইউএনডিপিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা দুর্নীতি দমন কমিশনের সমতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে এবং অনেকে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করছে। আমরা সম্মিলিতভাবে দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধের চেষ্টা করছি।
অনুষ্ঠানে সাকিব আল হাসান দুদকের কার্যক্রমকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশকে দুর্নীতিমুক্ত রোল মডেল দেশ হিসেবে গড়তে আমি কাজ করতে চাই। তাই দুর্নীতি দমন কমিশনের যে কোনো কর্মসূচিতে আমি আসব। তিনি দুদক চেয়ারম্যানের বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, আমরাও চাই দুর্নীতিমুক্ত দেশ। আমরা যখন কোনো দেশের অভিবাসন দপ্তরে আমাদের পাসপোর্ট জমা দেব, তখন তারা যেন মনে করে, বাংলাদেশের মানুষ দুর্নীতিমুক্ত এবং বিশ্বের রোল মডেল। দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়তে দুদকের শুভেচ্ছা দূত হতেও আমি রাজি আছি। সমাজ থেকে দুর্নীতি দূর করতে তিনি সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুর্নীতিবিরোধী জনমত গঠনে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে হটলাইন কার্যক্রম শুরুর পর সাকিব আল হাসানকে শুভেচ্ছা দূত নিয়োগÑ দুদকের একটি সুচিন্তিত কর্মপরিকল্পনারই অংশ। হটলাইন কার্যক্রম চালিয়ে দুর্নীতিবিরোধী জনমত গঠনে দুদক সাধারণ মানুষের খুব কাছাকাছি গিয়েছে। দুদক সম্পর্কে মানুষের যে নেতিবাচক ধারণা ছিল, হটলাইন কার্যক্রমের ফলে তা অনেকটাই দূর হয়েছে। এখন বিশ্বসেরা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানকে শুভেচ্ছা দূত নিয়োগ করায় দুদক সম্পর্কে মানুষের নেতিবাচক ধারণা আরো দূর হয়ে যাবে।
এটা ঠিক যে, ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানকে সর্বস্তরের মানুষ তাদের আইকন হিসেবে দেখে। ক্রিকেটাররাও দুর্নীতির আশ্রয় নেয়। বাংলাদেশ ও বিশ্বের অন্যান্য দেশের কিছু ক্রিকেটারের বিরুদ্ধে আগে এমন অভিযোগও উঠেছে। কিন্তু সাকিব এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের ক্রিকেটারদের মধ্যে অন্যতম ধনী সাকিব আল হাসান। বলা হয় বাংলাদেশের অন্যতম ধনী ব্যক্তি সাকিব। বাংলাদেশের সবচেয়ে দামি গাড়িটির মালিকও তিনি। হেলিকপ্টারে চলাচল করেন তিনি। কিন্তু কোনো দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে নয়, একাগ্রচিত্তে মাঠের কাজটি মাঠে করে পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি যেমন বিশ্বসেরা অলরাউন্ডারে পরিণত হয়েছেন, তেমনি বাংলাদেশের অন্যতম ধনী ব্যক্তিতেও পরিণত হয়েছেন। কিন্তু ধনী হওয়ার জন্য সাকিব ট্যাক্স ফাঁকি দেননি। আশরাফুলের মতো দুর্নীতির চোরাবালিতে পা দেননি।
খেলোয়াড়ি জীবনের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত সাকিব যে তার দুর্নীতিমুক্ত ইমেজ গড়ে তুলেছেন, তাকেই কাজে লাগাতে চাচ্ছে দুদক। দুদক চাচ্ছে সাকিবের মতো পরিশ্রম করেই দেশের প্রতিটি মানুষ সম্পদশালী হয়ে উঠুক। আর এ জন্যই দুদকের শুভেচ্ছা দূত নিয়োগ করা হয়েছে বিশ্বসেরা এই ক্রিকেটারকে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, সাকিবকে শুভেচ্ছা দূত নিয়োগের ফলে দুদকের দুর্নীতিবিরোধী জনমত গঠনের কাজ আরো বেগবান হবে এবং বাংলাদেশ থেকে একদিন দুর্নীতি নির্মূল হবে।