কলাম

বন্যা-উত্তর পুনর্বাসন ও আমরা

ড. মো. হুমায়ুন কবীর : বাংলাদেশ একটি দুর্যোগপ্রবণ দেশ। আমরা বাঙালিরা সবসময়ই দুর্যোগে তিগ্রস্ত ও দুর্গতের পাশে দাঁড়াই। কারণ একটি অতিথিপরায়ণ জাতি হিসেবে দেশ-বিদেশে বাঙালির অনেক ঐতিহ্য ও নাম-ডাক রয়েছে। সে জন্য যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে সবসময়ই আমরা একে অপরের পাশে দাঁড়িয়েছি। যেমন দাঁড়াই ঘূর্ণিঝড়ে তিগ্রস্তদের পাশে তেমনি দাঁড়াই বন্যা, খরা, ভূমিধস, পাহাড়ধস ইত্যাদি নানা দৈব দুর্বিপাকের সময়ে। তেমনি দাঁড়িয়েছি সাম্প্রতিককালে হাওরাঞ্চলের আগাম বন্যায় ধান ও মাছের ব্যাপক য়তিকালে। আবার দাঁড়াচ্ছি দেশের উত্তরাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলে ভয়াবহ বন্যার্ত মানুষের পাশে। আবার কখনো কখনো দাঁড়াই শীতার্ত গৃহহীন ও ছিন্নমূল মানুষের পাশে। কিন্তু দেখা যায়, যেহেতু দুর্ঘটনা কিংবা দুর্যোগ কাউকে বলে-কয়ে আসে না, সে জন্য এসব দুর্যোগ তাৎণিক মোকাবিলার প্রস্তুতি আসলে কারও থাকে না। দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরই সবার বোধোদয় হতে দেখা যায়, যা একটি স্বাভাবিক ঘটনা। যেকোনো দুর্ঘটনার দায় সহজে আমরা সরকারকেই দিয়ে তৃপ্তি পাই এবং সেখানে নিজের দায়-দায়িত্ব অনেকটা এড়াতে চাই। কিন্তু আসলে বিষয়টি মোটেও তা নয়। যেকোনো বিষয়ে সরকারের দায় রয়েছে ঠিকই কিন্তু সবকিছু সরকারের একার পে ম্যানেজ করা কঠিন। সেখানেই প্রয়োজন সবার সম্মিলিত ও সমন্বিত প্রয়াস এবং উদ্যোগ। যেমন সাম্প্রতিককালে মার্চ-এপ্রিলে হাওরের আগাম বন্যা এবং আগস্ট মাসে দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে ঘটে যাওয়া আকস্মিক বন্যায় আক্রান্ত মানুষকে সরকার তো তার সাধ্যমতো সাহায্য-সহযোগিতা করার চেষ্টা করেছেই, সেই সঙ্গে দেশের প্রধানমন্ত্রীও তাদের সাহায্যার্থে সরকারের পাশাপাশি দেশের বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে তিনি নিজেও তার বিদেশ সফর বাতিল করে হাওর এলাকা, উত্তরাঞ্চলের দিনাজপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও বগুড়া জেলার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা সফর করে দুর্গতদের মাঝে ত্রাণ বণ্টন করেছেন।
তবে আশার কথা হলো, এসব দুর্যোগে আমাদের বাঙালিদের যার যার সাধ্যমতো সাহায্য-সহযোগিতার হাত সম্প্রসারিত করার একটি সহজাত প্রবণতা রয়েছে। এবারও মানুষের মাঝে এ ধরনের ইতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে এসব এখন আরও বেশি প্রচারিত ও প্রাণবন্ত। কোনো একস্থানে কেউ কিছু একটা করলে তা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে নিমেষেই। এবারের বন্যায়ও দুর্গত ও বানভাসি মানুষকে সহযোগিতা করার জন্য বিভিন্ন ব্যক্তি, সংগঠন, প্রতিষ্ঠানসমূহ তাদের সাধ্যমতো অর্থ ও ত্রাণসামগ্রী জোগাড় করে দুর্গতদের মাঝে বিতরণ করেছে।
জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের একটি গ্র“প পেজ ‘আমাদের কিশোরগঞ্জ’ এ দেখলাম কোনো একটি শিা প্রতিষ্ঠানের কিছু শিার্থী মিলে নিজেরা চাঁদা দিয়ে আটা-ময়দা কিনে নিজেরাই রুটি বানিয়ে জড়ো করছে সরাসরি দুর্গত মানুষের হাতে তুলে দেয়ার জন্য। একই পেজে আরেকটি পোস্ট থেকে জানা যায়, সুমাইয়া নামের এক ফুল বিক্রেতা তার একদিনের ফুল বিক্রির সমস্ত অর্থ বন্যার্তদের সাহায্যার্থে দান করে দিয়েছে যাতে সমাজের জন্য শিণীয় অনেক কিছু রয়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিকরা তাদের একদিনের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ বন্যার্তদের সাহায্য হিসেবে দান করেছেন, ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিকরাও একইভাবে সাহায্যে এগিয়ে এসেছেন। এক্ষেত্রে আরও এগিয়ে এসেছেন ময়মনসিংহের ত্রিশালস্থ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক এবং কর্মকর্তারা। তারা শুধু একদিনের বেতন দিয়েই দায় শেষ করেননি। তারা তা নিজ দায়িত্বে একটি পূর্বনির্ধারিত দুর্গত এলাকায় গিয়ে সরাসরি তাদের হাতে ত্রাণ পৌঁছে দেয়ার দায়িত্বও পালন করেছেন।
উল্লেখ্য, শীতকালে শীতার্ত মানুষের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণের জন্য সময় চলে গেলে তা আর সে বছর কাজে লাগে না। কিন্তু বন্যার্ত মানুষের দুর্ভোগ বন্যা চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শেষ হয়ে যায় না। বরং বন্যায় তাদের সবকিছু তিগ্রস্ত করে ফেলার পর তাদের থাকে দীর্ঘদিনের পুনর্বাসনের কাজ। তাদের তি পুষিয়ে নিতে কমপে ১-২ বছর সময় লেগে যায়। সে জন্য বন্যা চলমান অবস্থায় চাহিদা থাকে শুধু তাৎণিক ুধা নিবারণের জন্য তৈরি খাবার। কিন্তু দীর্ঘ তি যেমন বাড়িঘর ভেঙে যাওয়া, কৃষি ফসলের ব্যাপক য়তি, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগির তি, পুকুর ও জলাশয়ের মাছ, রাস্তাঘাট ভেঙে যোগাযোগ ও যাতায়াতের সমস্যা সৃষ্টি, নদী ভাঙনের মাধ্যমে বাড়ি-জমি বিনষ্ট হয়ে যাওয়া, হাতে নগদ কোনো টাকা-পয়সা না থাকা ইত্যাদি আরও অনেক কিছু। অথচ এসব তি পুষিয়ে নেয়ার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি, সমন্বিত ও সম্মিলিত পুনর্বাসন পরিকল্পনা প্রয়োজন। অনেক সময় দেখা যায়, সবাই আমরা ত্রাণ তৎপরতা চালাচ্ছি শুধু একই জায়গায় গিয়ে। কিন্তু একাধিক টিমে ভাগ হয়ে সব দুর্গত এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে হবে। কেউ যদি শুকনো খাবার দেই তবে অন্যরা কেউ নগদ টাকা কিংবা প্রযুক্তি দিয়ে সহায়তা করতে পারি। আবার কাউকে দিতে হবে খাবার পানি কিংবা ওষুধ ইত্যাদি। সংশ্লিষ্ট উপদ্রুত এলাকায় কৃষিঋণ কিংবা এনজিওর ঋণ মওকুফ অথবা তাদের কিস্তি একটা নির্দিষ্ট সময় দিয়ে বন্ধ রাখতে হবে। কৃষি ফসল রা কিংবা পুনর্বাসনের জন্য কৃষি বিভাগকে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও সহযোগিতা নিয়ে কৃষকের দ্বারে পৌঁছাতে হবে। ঠিক এমনিভাবে মৎস্য েেত্র কিংবা গবাদিপশু বা পোলট্রির জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাকে সর্বাগ্রে এগিয়ে আসতে হবে। বন্যাজনিত বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যার জন্য মেডিকেল টিমকে দীর্ঘদিন স্বেচ্ছাশ্রম দিতে হবে। প্রয়োজনীয় ওষুধপত্রাদি বিনামূল্যে সরবরাহ করতে হবে। প্রতি বছর ছোট-বড় বন্যার কথা মাথায় রেখে সবাইকেই প্রাথমিক একটি প্রস্তুতি রাখতে হবে। বন্যার জন্য রাস্তাঘাট যত দ্রুত সম্ভব স্বল্পতম সময়ের মধ্যেই সংস্কার করতে হবে।
এমনিতে প্রতি বছর ছোট বড় যে বন্যা বিভিন্ন স্থানে হয়ে থাকে, তার বাইরে আরও কোনো বড় বন্যার আশঙ্কা আছে কি না তার পূর্বাভাস আগেই দিয়ে দিতে হবে যাতে সবাই সাধ্যমতো প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারে। আর যেটা হয়, যে বন্যা হলে পরে মানুষের মধ্যে ত্রাণ বিতরণের তৎপরতা শুরু হয়। তা না করে প্রতি বছরই নির্ধারিত একটি সময়ে বিত্তবানদের প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দান করে দিতে পারে। তাহলে বন্যাসহ যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে সরাসরি তা বিতরণ করতে পারে। অন্যদিকে যারা বন্যার্তদের সহযোগিতা করবেন তারা যদি সরকারি প্রশাসনের সহযোগিতা গ্রহণ করেন, তাহলে একদিকে যেমন নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে অন্যদিকে কাজটি সমন্বিতভাবে সম্পন্ন করা সহজ হবে। সেভাবেই আমাদের দুর্গতদের পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন। এবারের বন্যার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছু প্রকৃষ্ট কাজের উদাহরণের কথা আমি আগেই উল্লেখ করেছি। তারপরও ফেসবুকের আরেকটি পোস্টে দেখলাম উত্তরাঞ্চলের একটি জেলার একজন ডিসি জমিতে নেমে কৃষকের সঙ্গে ধানের চারা রোপণ করছেন। সাধারণত কৃষি কাজের জন্য কৃষি বিভাগ সরাসরি কাজ করছে, যা তাদের গুরু দায়িত্বেরই একটি অংশ। কিন্তু ডিসি সাহেব সেখানে এভাবে না নামলেও কেউ তাকে দোষারোপ করতে পারতেন না। কারণ দেশের অন্যান্য আরও ৬৩টি জেলার ডিসি সাহেবরা সেই এলাকার কৃষকের ধানের জমিতে চারা লাগানোর জন্য নামছেন না বলে তাদের কেউ দোষ দিচ্ছেন না। কিন্তু তিনি যে একটি উদাহরণ সৃষ্টি করলেন তা তো সবাইকেই স্বেচ্ছাশ্রমে উদ্বুদ্ধ করবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমাদের আসলে এমন অনুকরণীয় ও অনুসরণীয় উদাহরণই সবার সৃষ্টি করা প্রয়োজন। তাহলেই সবার মধ্যে সমন্বয়হীনতা কিছুটা থাকলেও তা সহজেই কেটে যাবে।
সবাই যদি যার যার সাধ্যমতো খোলা মনে বন্যাক্রান্ত মানুষের পাশে দাঁড়াই তবে মানবতা কেঁদে মরবে না। সেই বিখ্যাত গান, ‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য, একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না ও বন্ধু’ এর সার্থকতা প্রমাণিত হবে।
লেখক : কৃষিবিদ ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার
কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়