প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

মিয়ানমারের নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশে বিপর্যস্ত বাংলাদেশ : সংকট উত্তরণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর হস্তক্ষেপ চায় বাংলাদেশ


মেজবাহউদ্দিন সাকিল : মিয়ানমারের নির্যাতিত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের অনুপ্রবেশে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বাংলাদেশ। প্রায় তিন দশক ধরে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে যাচ্ছে বাংলাদেশ। কখনো এ চেষ্টার সুফলও মিলেছে। ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একটি চুক্তি সই হয়েছিল। সেই চুক্তিতে রোহিঙ্গাদের ‘মিয়ানমার সমাজের সদস্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। এর আওতায় রাখাইন রাজ্য থেকে নির্যাতনের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা ২ লাখ ৩৬ হাজার ৫৯৯ জন রোহিঙ্গা নাগরিককে ফেরতও নেয় মিয়ানমার সরকার। কিন্তু ২০০৫ সালে প্রক্রিয়াটি বন্ধ করে দেয় তারা। এরপর রাখাইন রাজ্যে কয়েক দফায় অস্থিরতা তৈরি করে নির্যাতন-হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া হয়। গত ২৫ আগস্ট নতুন মাত্রায় অভিযান শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশে ৫ লাখের মতো রোহিঙ্গা শরণার্থী ছিল। ২৫ আগস্ট থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আরো ৪ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। এমনকি মানবিক কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে সীমান্ত উন্মুক্ত থাকায় এখন প্রতিদিনই ১০ থেকে ২০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। তাই বছর শেষে সব মিলিয়ে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা হবে কমপক্ষে ১০ লাখ। জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর আশঙ্কা ব্যক্ত করে বলেছে, এভাবে রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে প্রবেশ করলে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় দেখা দেবে।
এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্পষ্ট করেই বলেছেন, সম্পূর্ণ মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশ মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নাগরিকদের আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু মিয়ারমার থেকে দলে দলে যেসব রোহিঙ্গা শরণার্থী আসছে, তাদেরকে মানবিক কারণে আশ্রয় দিলেও তারা মিয়ানমারেরই নাগরিক। মিয়ানমার সরকারকে তার নাগরিকদের অবশ্যই বাংলাদেশ থেকে ফেরত নিতে হবে।
এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রায় ৯ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে। এটা শরণার্থী আশ্রয়ের দিক থেকে বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। ২০১৫ ও ২০১৬ সালে সিরিয়ার শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়া নিয়ে উন্নত দেশগুলোতে রীতিমতো তর্কযুদ্ধ বেধে যায়। সিরীয় শরণার্থীরা ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপের যেসব দেশে আশ্রয়ের জন্য হাজির হয়েছিল, তাদের নিদারুণ দুর্দশা সারা বিশ্বই প্রত্যক্ষ করেছে। মাত্র ১০-২০ হাজার শরণার্থীকে আশ্রয় দেয়া না দেয়া নিয়ে ইউরোপের এক দেশ আরেক দেশকে দোষারোপ করতে থাকে। শরণার্থী সমস্যা নিয়ে রাত-দিন চলতে থাকে বিবৃতি-পাল্টা বিবৃতি, সভা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম কত কী? এত কিছুর ফলস্বরূপ, ইউরোপের কয়েকটি দেশে এখন কয়েক হাজার করে হয়ত শরণার্থী আছে, কিন্তু গোটা ইউরোপ ও আমেরিকা মিলেও লাখখানেক শরণার্থীকে আশ্রয় দিতে হয়নি। সে জায়গায় বাংলাদেশ একাই তার সীমাহীন সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত প্রায় ৯ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে। এর জন্য অবশ্য উন্নত বিশ্ব বাংলাদেশ সরকারের ভূয়সী প্রশংসা করেছে। কিন্তু প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, বাংলাদেশ আর কতদিন কত রোহিঙ্গা শরণার্থীকে এভাবে আশ্রয় দিতে সক্ষম হবে?
রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয়ের দিক দিয়ে বাংলাদেশ অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেও এই সমস্যাটি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের সাড়া আশাব্যঞ্জক নয় বলে জানিয়েছে খোদ জাতিসংঘ। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সরকারের অত্যাচার-নির্যাতনের নিন্দা করেছে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধে মিয়ানমার সরকারকে কোনো চাপ দেয়নি। অর্থনৈতিক বা সামরিক অবরোধ আরোপের মতো কোনো সিদ্ধান্তও নেয়া হয়নি। প্রায় ৯ লাখ রোহিঙ্গাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যে বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত উন্নত বিশ্বের কোনো রাষ্ট্র সহায়তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সুনির্দিষ্ট কোনো নিশ্চয়তা দেয়নি। রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশের একার সমস্যা নয়, এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যাÑ এই বলে অনেক দেশ বাংলাদেশকে সান্ত¡না দিয়ে মানবিক কারণে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়ার অনুরোধ জানায়। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারেরই নাগরিক এবং তাদেরকে অবশ্যই মিয়ানমার সরকার ফেরত নিতে বাধ্য বলে অনেক দেশই বলেছে। কিন্তু মিয়ানমার সরকার যেন রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে বাধ্য হয়, সে বিষয়ে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা কোনো দেশের তরফ থেকেই দেখা যাচ্ছে না। সমস্যার শুরু থেকেই সংকট উত্তরণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর হস্তক্ষেপ চেয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু এখন পর্যন্ত জাতিসংঘসহ জাতিসংঘের স্থায়ী ৫ সদস্য রাষ্ট্র এবং অন্যান্য উন্নত রাষ্ট্র মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এক্ষেত্রে বিচ্ছিন্নভাবে মিয়ানমার সরকারকে অনুরোধ করলেও মিয়ানমার সরকার তাতে কোনোরূপ কর্ণপাত করছে না।
মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর যা চলছে তা আসলে গণহত্যা। এর নীলনকশা প্রণয়ন করা হয় অনেক আগে থেকেই। ১৯৬২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারের সামরিক জান্তা জনতোষণের ল্েয ধর্মকে ব্যবহার করতে শুরু করে। তারা প্রচার করতে থাকে বৌদ্ধরাই মিয়ানমারের প্রকৃত নাগরিক। ১৯৭৪ সালে রোহিঙ্গাদের বিদেশি আখ্যা দেয়া হয়। ১৯৮২ সালে আইন করে তাদের নাগরিকত্বের অধিকার কেড়ে নেয়া হয়।
এ বছরের শুরুর দিকে ঢাকা সফরে এসেছিলেন মিয়ানমারের বিশেষ দূত। বাংলাদেশে আশ্রিত লাখ লাখ রোহিঙ্গার বিষয়ে উদ্বেগের কথা তাকে জানিয়েছিল সরকার। তিনি তাতে বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন এবং বলেছিলেন, আশ্রিতের সংখ্যা মাত্র ২ হাজার হতে পারে। আসলে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নাগরিক বলেই স্বীকার করে না মিয়ানমার। কার্যত তারা রোহিঙ্গাদের ওপর প্রতিশোধ নিচ্ছে। মিয়ানমারের সেনাপ্রধান মিন অং হাইংয়ের কথায়ই এর প্রমাণ রয়েছে। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করছেন তারা। প্রসঙ্গত, ওই সময় রাখাইন জনগোষ্ঠীসহ মিয়ানমারের অধিবাসীরা জাপানিদের প নিয়েছিল। রোহিঙ্গারা ছিল ব্রিটিশ তথা মিত্র বাহিনীর প।ে
বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে নিপীড়িত জনগোষ্ঠী হচ্ছে রোহিঙ্গা। তাদের ভোটাধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে, তাদের বসতি থেকে তাড়ানো হচ্ছে। ২০১২ সালে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে তাদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন-নিপীড়ন চালানো হয়। রোহিঙ্গাদের ওপর হামলার জন্য অন্যদেরও উদ্বুদ্ধ করা হয়। নির্বাচনে পরাজয় এড়াতে তখন সরকার এটি করেছিল। গত বছরের অক্টোবর মাসে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনী নতুন করে নির্যাতন-নিপীড়ন শুরু করে। গত ২৫ আগস্টের পর মিয়ানমার ১ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গাকে হত্যা করেছে বলে জাতিসংঘ আশঙ্কা ব্যক্ত করেছে।
রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশের পাশে থাকার কথা জানিয়েছে। তারা মিয়ানমারের ওপর চাপও প্রয়োগ করছে। মিয়ানমার চাপ অনুভব করছে বলেই রোহিঙ্গাদের আসার সংখ্যা কমছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী। কিন্তু এটা যথেষ্ট নয়। মিয়ানমারকে জাতি নিধনের বা প্রতিশোধ গ্রহণের নীলনকশা বাস্তবায়নের পথ থেকে সরাতে প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক মহলকে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে যাতে করে তাদের নিজেদের সৃষ্ট সমস্যার সমাধান করতে তারা বাধ্য হয়।
জাতিসংঘে রোহিঙ্গা ইস্যু
তুলে ধরবেন শেখ হাসিনা
জাতিসংঘের চলতি ৭২তম সাধারণ পরিষদ অধিবেশনে রোহিঙ্গা সমস্যার মূল কারণগুলো তুলে ধরে এর আশু সমাধানে বাংলাদেশের প্রস্তাবসমূহ জাতিসংঘে জোরালোভাবে তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২১ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ৭২তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি তুলে ধরবেন। আর এ উপলক্ষে ১৬ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের উদ্দেশে শেখ হাসিনা ঢাকা ত্যাগ করেন।
এ উপলক্ষে ১৩ সেপ্টেম্বর আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী সাংবাদিকদের বলেন, এবারের জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এবারের সম্মেলন এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন লাখ লাখ নিরীহ রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রাণ ভয়ে মিয়ানমার সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখনকার পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুতর। আর এ সংকটাপন্ন মুহূর্তে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে রোহিঙ্গা সমস্যার মূল কারণসমূহ তুলে ধরে তা সমাধানে বাংলাদেশের প্রস্তাবসমূহ সুস্পষ্টভাবে পেশ করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর ভাষণে রাখাইন রাজ্যের জন্য কফি আনান কমিশনের সুপারিশগুলো অবিলম্বে বাস্তবায়নের জোর দাবি জানাবেন। রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের পরিচালিত জাতিগত নিধন অভিযানকে মানবতা ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন উল্লেখ করে বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে এক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানাবেন তিনি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া সকল রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে মিয়ানমার সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর চাপ প্রদানের জন্য আহ্বান জানানো হবে।
রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের
প্রতি ভারতের সমর্থন
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থানের প্রতি তার সরকারের পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ১৪ সেপ্টেম্বর রাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনে কথা বলেন এবং তাকে এ কথা জানান। সুষমা স্বরাজ বলেন, ভারতীয় সরকার বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফেরত নেয়ার পাশাপাশি রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর চলা নির্যাতন বন্ধের জন্য মিয়ানমার সরকারের ওপর দ্বিপাকি ও বহুপাকি চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যা কেবল বাংলাদেশের কোন ইস্যু নয় বরং এই সমস্যা এ অঞ্চল ছাড়িয়ে একটা আন্তর্জাতিক রূপ লাভ করেছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ কেবলমাত্র মানবিক বিবেচনায় রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে। মিয়ানমারকে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, রোহিঙ্গারা তাদের নাগরিক।
শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর সরকার রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে অস্থায়ী ব্যবস্থা করার জন্য জমি বরাদ্দ দিয়েছে। কিন্তু তাদের দীর্ঘ মেয়াদে অবস্থান বাংলাদেশের জন্য অবশ্যই বড় ধরনের সমস্যার সৃষ্টি করবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রশাসনের সঙ্গে তার দলের নেতাকর্মীরাও রোহিঙ্গাদের জন্য খাদ্য, আশ্রয় ও স্বাস্থ্যসেবা দিতে দিন-রাত কাজ করছে। এ সময় ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রীংলা গণভবনে উপস্থিত ছিলেন। হর্ষবর্ধন শ্রীংলা রোহিঙ্গাদের জন্য পাঠানো ভারতীয় ত্রাণসামগ্রীর প্রথম চালানের কথা প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন।
সংঘাত বন্ধ করতে মিয়ানমারকে
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের আহ্বান
মিয়ানমারে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের সময় অতিরিক্ত মাত্রায় সংঘাত-সহিংসতা হয়েছে উল্লেখ করে এখনই তা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ। ১৩ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে জরুরি রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে পরিষদের সভাপতি ইথিওপিয়ার তেকেদা আলেমু এক বিবৃতিতে এ কথা জানান। বিবৃতিতে ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি ব্যবহার না করে বেসামরিক জনগণ ও ‘শরণার্থী’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।
বৈঠক প্রসঙ্গে জাতিসংঘে সুইডেনের রাষ্ট্রদূত কার্ল স্কু বলেন, ‘নিরাপত্তা পরিষদ মিয়ানমার বিষয়ে একসুরে কথা বলেছে। তারা গভীর উদ্বেগ জানিয়ে সহিংসতা বন্ধ, মানবিক সহযোগিতার সুযোগ নিশ্চিতকরণ এবং শরণার্থী সংকট নিরসনের আহ্বান জানিয়েছে।’
নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতি বলেন, পরিষদের সদস্যরা গত ২৫ আগস্ট মিয়ানমারে সন্ত্রাসী হামলার বিষয়টি আমলে নিয়েছে এবং যে সহিংসতার পরিপ্রেেিত অন্তত ৩ লাখ ৭০ হাজার লোকের বাস্তুচ্যুতি হয়েছে তার নিন্দা জানিয়েছে। তিনি বলেন, নিরাপত্তা পরিষদ অনতিবিলম্বে সহিংসতা বন্ধ, উত্তেজনা প্রশমন, আইনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, বেসামরিক লোকজনের সুরা নিশ্চিত এবং আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও শরণার্থী সমস্যা সমাধান করার আহ্বান জানিয়েছে। রোহিঙ্গাদের প্রতি বাংলাদেশের সহায়তা দেয়ার প্রচেষ্টা এবং জাতিসংঘ ও অন্য সংস্থাগুলোর তৎপরতাকেও নিরাপত্তা পরিষদ স্বাগত জানিয়েছে।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ বলেছে, মিয়ানমার ত্রাণকর্মীদের রাখাইনে ঢুকতে দেয়ার অঙ্গীকার করেছে। বিবৃতিতে মিয়ানমারকে সেই অঙ্গীকার রা ও ত্রাণকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। তারা এ েেত্র সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আলাপ-আলোচনা করাকেও উৎসাহিত করেছে।
নিরাপত্তা পরিষদ রাখাইন পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুটেরেজের প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানিয়েছে। একই সঙ্গে পরিষদ রাখাইন রাজ্য সমস্যার স্থায়ী সমাধানে কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের গুরুত্বকে স্বীকার করেছে। ওই সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে মিয়ানমার সরকার যে কমিটি গঠন করেছে তাকেও স্বাগত জানিয়েছে নিরাপত্তা পরিষদ।
সাংবাদিকরা জানতে চেয়েছিলেন, নিরাপত্তা পরিষদ মিয়ানমারকে রাখাইনে সামরিক অভিযান থামাতে বলেছে কি না। জবাবে পরিষদের সভাপতি বলেছেন, পরিষদের সদস্যরা যে বিবৃতিটি দিতে রাজি হয়েছেন সেটিই তিনি পড়েছেন।
এদিকে বৈঠকের আগে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুটেরেজ সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের জাতিগত নিধনযজ্ঞ চালানোর অভিযোগ এনেছেন। তিনি মিয়ানমার কর্তৃপকে রাখাইনে সামরিক বাহিনীর কর্মকা- থামাতে এবং আইনের শাসন সমুন্নত রাখতে জোরালো আহ্বান জানান।
রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের
প্রশংসা করে ইইউ পার্লামেন্টে প্রস্তাব
ইউরোপীয় পার্লামেন্ট মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা জনস্রোত সামলানোর েেত্র বাংলাদেশের মানবিক পদপের প্রশংসা করে ১৪ সেপ্টেম্বর একটি প্রস্তাব গ্রহণ করেছে এবং ইইউভুক্ত দেশগুলোর প্রতি মিয়ানমারের ওপর অবরোধ আরোপের বিষয় বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে। ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত ইইউ পার্লামেন্ট অধিবেশনের প্রস্তাবে বলা হয়, ইউরোপীয় পার্লামেন্ট এই মানবিক বিপর্যয়ের মুখে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর সুরা সুগমে বাংলাদেশের প্রচেষ্টার স্বীকৃতি দিচ্ছে। ইউরোপীয় পার্লামেন্ট প্রতিবেশী অন্যান্য দেশের প্রতি রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার কারণে পালিয়ে আসা সকল রোহিঙ্গা শরণার্থীকে ঢুকতে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তারা এসব শরণার্থীর জন্য আর্থিক ও বস্তুগত সহযোগিতা বৃদ্ধি করতে (ইউরোপীয়) কমিশন ও ইইউভুক্ত দেশগুলোর প্রতিও আহ্বান জানিয়েছে।
একই সাথে প্রস্তাবে এটাও বলা হয় যে, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোকে এটি পরিষ্কার করতে হবে যে আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন অব্যাহত থাকলে তারা ব্যক্তিবর্গ ও প্রতিষ্ঠানসমূহের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক অবরোধ আরোপের বিষয় বিবেচনা করতে প্রস্তুত রয়েছে।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট জঁ-কদ জাঙ্কার মিয়ানমারের এই মানবিক সংকটকে ‘মর্মান্তিক বিপর্যয়’ অভিহিত করে এর কঠোর নিন্দা জানিয়েছেন। এছাড়া ইউরোপীয় পার্লামেন্ট অবিলম্বে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধের দাবি জানিয়েছে।
এই সংকটের কারণে প্রায় ৯ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এ সংকটের কারণে মিয়ানমার সরকার বিশেষ করে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চির ওপর আন্তর্জাতিক চাপ আরো জোরদার হয়েছে। এক প্রশ্নোত্তর অধিবেশনে জঁ-কদ জাঙ্কার বলেন, মিয়ানমারে যা ঘটছে তা প্রকৃতপইে এক মর্মান্তিক মানবিক বিপর্যয়। কারণ সেখানে আবারো জাতিগত গোষ্ঠীগুলোকে নির্মূলের চেষ্টা চলছে। ফ্রান্সের স্ট্রসবার্গে ইউরো-এমপিদের এক বৈঠকে মিয়ানমারে সকল সহিংসতা ও ধর্মীয় বিদ্বেষের সরাসরি নিন্দা জানাতে একটি প্রস্তাব পাস করা হয়েছে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ এবং তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া দ্রুত বন্ধে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রস্তাবে মিয়ানমারের সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতি জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছে।
জাতিসংঘ কর্মকর্তারা ধারণা করছেন যে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সহিংসতায় প্রায় ৪ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশে পালিয়ে গেছে। এদিকে ঢাকার প থেকে বলা হয়েছে, গত ২৫ আগস্ট থেকে সর্বশেষ রোহিঙ্গা জনস্রোত আসা শুরু হওয়ার আগেই বাংলাদেশের আশ্রয়ে আরো ৫ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী রয়েছে। এ সহিংসতার কারণে উভয় সীমান্তে মানবিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে।
রোহিঙ্গা শরণার্থীর ৬০ শতাংশই শিশু
জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) জানিয়েছে, মিয়ানমারে সর্বশেষ সহিংসতা শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত আনুমানিক ৪ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এদের প্রায় প্রায় ৬০ শতাংশই শিশু। আগে থেকে আশ্রয় নেয়া শরণার্থী শিবিরগুলোতে নতুন করে আসা এই বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার স্থান সংকুলান না হওয়ায় তারা যেখানেই জায়গা পাচ্ছে সেখানেই আশ্রয় নিচ্ছে।
ইউনিসেফের এক বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া হাজার হাজার রোহিঙ্গা শিশুর জন্য জরুরি ভিত্তিতে বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন, ওষুধপত্র ও চিকিৎসা সামগ্রীবাহী ট্রাকগুলো কক্সবাজারের দিকে আসছে। আগামী দিনগুলোতে আরো ত্রাণসামগ্রী আসবে।
বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউনিসেফ প্রতিনিধি এডওয়ার্ড বিগবেডার বলেন, শরণার্থীদের জন্য বিশেষত জরুরি ভিত্তিতে আশ্রয়, খাবার ও বিশুদ্ধ পানিসহ সবকিছুরই প্রয়োজন রয়েছে। শিশুরা সেখানে পানিবাহিত রোগের ব্যাপক ঝুঁকিতে রয়েছে। এই মুহূর্তে চরম ঝুঁকিপূর্ণ এই শিশুদের রা করাই হবে আমাদের প্রধান কাজ।
শেষ কথা
রোহিঙ্গা প্রশ্নে শেষ কথা বলতে যেন কিছুই নেই। বিশ্ব নেতৃবৃন্দের অনুরোধ উপেক্ষা করার মাধ্যমে সারা বিশ্বের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে মিয়ানমার সরকার নিজ দেশের নাগরিকদের ওপরই অত্যাচারের স্টিম রোলার চালাচ্ছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন এই নিধনযজ্ঞকে বলছে এথনিক কিনজিং বা জাতিগত নির্মূল। এক-দুইদিনের জন্য নয় প্রায় একযুগ ধরে বাংলাদেশ ৫ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। এ বছরের ২৫ আগস্টের পর থেকে এখন পর্যন্ত আরো ৪ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে, যাদের প্রত্যেকেই এথনিক কিনজিংয়ের শিকার। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া হলেও বাংলাদেশ ধনী রাষ্ট্র নয়। রোহিঙ্গাদের বিষয়ে বাংলাদেশ যে মানবিকতা দেখিয়েছে, বিশ্ব নেতৃবৃন্দের উচিত রোহিঙ্গাদের বিষয়ে সে মানবিকতা প্রদর্শন করা। কথার ফুলঝুরি দিয়ে নয়, কার্যকর পন্থা অবলম্বন করে এই সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশের পাশে থাকা এখন মানবতাবাদী সব দেশের জন্য অপরিহার্য। মিয়ানমার সরকার যাতে রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ দেশে ফেরত নেয়, সে দাবি এখন বাংলাদেশ সরকারের। সরকারের এই ন্যায্য দাবির প্রতি বাংলাদেশের জনগণ সারা বিশ্বের সমর্থন ও কার্যকর সহায়তা আশা করছে।