প্রতিবেদন

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের ল্য করে ‘জাতিগত নিধনযজ্ঞ’ চলছে : জাতিসংঘ

নিজস্ব প্রতিবেদক : মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের ল্য করে ‘জাতিগত নিধনযজ্ঞ’ চলছে বলে মন্তব্য করেছে জাতিসংঘ। গত ১১ সেপ্টেম্বর সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের ৩৬তম অধিবেশনে এ মন্তব্য করা হয়। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার জায়িদ রাদ আল হুসেইন তার ‘আরো অন্ধকার ও আরো বিপজ্জনক’ শীর্ষক বক্তব্যে বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে বলেন, মিয়ানমারে এখন যা চলছে তা জাতিগত নিধনযজ্ঞের যথার্থ উদাহরণ (টেক্সটবুক এক্সামপল)। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সেনা অভিযানে স্থানীয় মিলিশিয়ারাও অংশ নিয়েছে বলে তিনি জানান।
মিয়ানমারে চলা সহিংসতা প্রসঙ্গে হাইকমিশনার বলেন, গত বছর রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের মাত্রা দেখে আমি সতর্ক করেছিলাম, এটি একটি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যাপক পরিসরে বা ধারাবাহিক আক্রমণ। এসব ঘটনা আদালতে প্রমাণ করা গেলে সম্ভবত মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবেও তুলে ধরা যাবে। জায়িদ রাদ আল হুসেইন বলেন, মানবাধিকার তদন্ত দলকে ঢুকতে দিতে মিয়ানমার অস্বীকৃতি জানানোয় পরিস্থিতি পুরোপুরি মূল্যায়ন করা যায়নি। তবে সেখানকার পরিস্থিতিকে জাতিগতভাবে নির্মূলের ‘টেক্সটবুক এক্সামপল’ (আদর্শ বা যথার্থ উদাহরণ) বলেই মনে হচ্ছে।
এর আগে গত ৯ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুটেরেজ রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর চলা বর্বরতায় শঙ্কিত হয়ে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে নজিরবিহীন একটি চিঠি দেন।
মিয়ানমারের এ নৃশংসতা ‘জাতিগতভাবে নির্মূলের’ পর্যায়ে পড়ে কি না সাংবাদিকদের এ প্রশ্নে মহাসচিব গুটেরেজ উত্তর দেন, ‘এ রকম কিছুর ঝুঁকির আশঙ্কা আমরাও করছি। আমি আশা করব, সত্যিই এমন পরিস্থিতি হবে না।
তবে মিয়ানমার থেকে গণহত্যা ও জাতিগতভাবে নির্মূলের দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা যে পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়েছে তা জেনে বিশ্ববাসীও আঁতকে উঠেছে। মিয়ানমারে মানবাধিকার বিষয়ক জাতিসংঘের স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার (বিশেষ দূত) রাখাইনে ১ হাজারেরও বেশি মানুষ হত্যার শিকার হয়েছে বলে জানিয়েছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে গণহত্যা চলছে। তাছাড়া এ প্রসঙ্গে বিদেশি কূটনীতিকদের অনেকেই বলেছেন, রাখাইনে যা চলছে তা গণহত্যা ছাড়া আর কিছুই নয়। বেসরকারি বিভিন্ন সূত্র বলছে, গত ২৫ আগস্ট থেকে মিয়ানমারে জঙ্গি-সন্ত্রাসী দমনের নামে নিরাপত্তা বাহিনীর নেতৃত্বে রোহিঙ্গা নির্মূল ও নিধন অভিযানে ৩ থেকে ১০ হাজার রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। এদিকে আমস্টারডামভিত্তিক ইউরোপিয়ান রোহিঙ্গা কাউন্সিল বলেছে, ‘জাতিগতভাবে নির্মূল ও গণহত্যা নিয়ে বৈশ্বিক উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যেও মিয়ানমার হত্যাযজ্ঞ ও অগ্নিসংযোগ অব্যাহত রেখেছে।
এ প্রসঙ্গে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার জায়িদ রাদ আল হুসেইন আরো বলেন, ‘রাখাইনে আরেক দফা বর্বর নিরাপত্তা অভিযান চলছে। দৃশ্যত এবারের অভিযানের মাত্রা আগেরবারের থেকে অনেক বেশি। ইউএনএইচসিআরের (জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার) তথ্যানুযায়ী, তিন সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে ৩ লাখ ৭০ হাজারের বেশি মানুষ মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে ঢুকেছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের সীমান্ত উন্মুক্ত থাকায় নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশের এ ধারা এখনও অব্যাহত রয়েছে।
আপাতদৃষ্টিতে গত ২৫ আগস্ট ৩০টি পুলিশ চৌকিতে জঙ্গি হামলার প্রতিক্রিয়ায় চলমান এ অভিযান মাত্রাতিরিক্ত এবং সুস্পষ্টভাবে আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতির লঙ্ঘন।’ তিনি বলেন, নিরাপত্তা বাহিনী ও স্থানীয় মিলিশিয়াদের রোহিঙ্গা গ্রামগুলো জ্বালিয়ে দেয়া, পালানোর চেষ্টারত বেসামরিক নাগরিকদের ওপর গুলি এবং বিচারবহির্ভূত হত্যার সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ ও স্যাটেলাইট চিত্র আমরা পেয়েছি।
বাংলাদেশ প্রসঙ্গে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার বলেন, ‘রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য সীমান্ত খোলা রাখা অব্যাহত রাখতে আমি বাংলাদেশ সরকারকে উৎসাহী করছি। শরণার্থী জনগোষ্ঠীকে আরো ভালো সহায়তা দেয়ার কাজে বাংলাদেশ কর্তৃপকে সহযোগিতা করতে আমি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। আমার দপ্তরের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের গঠনমূলক সম্পৃক্ততার আমি প্রশংসা করি। দেশটিতে মানবাধিকার বিষয়ক অত্যন্ত গুরুতর ইস্যুগুলো মোকাবিলায় কর্তৃপরে সঙ্গে আমি আমার কাজ অব্যাহত রাখতে চাই।
জায়িদ রাদ আল হুসেইন আরো বলেন, বাংলাদেশ সীমান্ত বরাবর মিয়ানমার কর্তৃপ স্থলমাইন বসানো শুরু করার খবরে এবং সহিংসতা থেকে পালানো শরণার্থীদের ‘নাগরিকত্ব প্রমাণ’ করতে না পারলে তাদের মিয়ানমারে ফিরতে দেয়া হবে নাÑ এমন সরকারি বিবৃতিতে আমি হতভম্ব। তিনি বলেন, ১৯৬২ সাল থেকে মিয়ানমারের সরকারগুলো রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকারসহ তাদের রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার কেড়ে নিয়েছে। অং সান সু চির নিয়োগ দেয়া রাখাইন পরামর্শক কমিশন এ বিষয়টি স্বীকার করেছে। বিপুলসংখ্যক লোক যাতে আর মিয়ানমারে ফিরতে না পারে, সে জন্যই বিদ্বেষমূলকভাবে এটি করা হয়েছে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা নিজেরাই নিজেদের বাড়িঘরে আগুন দিচ্ছে ও নিজেদের গ্রাম ধ্বংস করছেÑ মিয়ানমার সরকারের এ ধরনের দাবি করা থেকে বিরত থাকা উচিত। বাস্তবতাকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমে মিয়ানমার সরকার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের অবস্থানেরই ব্যাপক তি করছে। অথচ কিছুদিন আগ পর্যন্ত এ সরকার আন্তর্জাতিক অঙ্গনের ব্যাপক শুভেচ্ছা পেয়েছে।
হাইকমিশনার মিয়ানমার সরকারকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ‘চলমান নিষ্ঠুর সামরিক অভিযান’ বন্ধ করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি রোহিঙ্গাদের প্রতি ব্যাপক বৈষম্য ও অধিকার লঙ্ঘনের জন্য মিয়ানমারের জবাবদিহি করা উচিত বলে উল্লেখ করেন। মিয়ানমারে জাতিসংঘের মানবাধিকার কর্মকর্তাদের অবাধ প্রবেশের সুযোগ দিতেও দেশটির কর্তৃপকে তিনি জোরালো আহ্বান জানান।
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার বলেন, ‘সন্ত্রাসীরা আমাদের ওপর হামলা চালাতেই পারে। কিন্তু সেই হামলাগুলোর বুদ্ধিবৃত্তিক ক্রীড়নকরা আড়ালে বসে দেখতে থাকে কিভাবে সরকারগুলো সন্ত্রাস দমনের নামে মানবাধিকারকে ছুড়ে ফেলে দেয়। বৈশ্বিক ক্রীড়নক হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করতে অনেক দেশ অন্যত্র মানবাধিকারের কথা বলে অথচ নিজেদের দেশে বা নিজেদের জনগোষ্ঠীর অধিকারকে প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করে।’ তিনি প্রশ্ন করেন, ‘এটি কি ভ-ামি নয়?’ তার মতে, মানবাধিকারের সংকটময় মুহূর্তে মানবাধিকার পরিষদ যদি ভূমিকা রাখতে না পারে তবে এ পরিষদের কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন উঠবে।