রাজনীতি

রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তির উত্থান প্রচেষ্টা : টার্গেট জাতীয় নির্বাচন

নিজস্ব প্রতিবেদক : আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জমে উঠেছে ভোটের রাজনীতি। বরাবরের মতো এবারও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির বাইরে দেশে তৃতীয় কোনো রাজনৈতিক শক্তি তথা বিকল্প কোনো রাজনৈতিক প্ল্যাটফরম তৈরির চেষ্টা চলছে খুবই জোরেশোরে। আর এ কাজ চলছে কখনও দিনের আলোতে আবার কখনও রাতের আঁধারে অত্যন্ত গোপনে।
জানা যায়, সাবেক দুইজন আওয়ামী লীগ নেতা এবং সাবেক একজন বিএনপি নেতা মিলে চলমান রাজনীতির বাইরে একটি তৃতীয় রাজনৈতিক শক্তি সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছেন। এই তৃতীয় শক্তির অন্যতম রূপকার হচ্ছেন ড. কামাল হোসেন, মাহমুদুর রহমান মান্না এবং ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ফের নতুন রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তুলতে তৎপর এই তিন পরিচিত নেতা। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে নতুন জোট গঠনের প্রক্রিয়া অনেক দিন থেকেই চলছে। যদিও সাধারণ মানুষের প থেকে আশানুরূপ সাড়া পাননি উদ্যোক্তারা। তাছাড়া যেসব সমমনা দলকে নিয়ে জোট গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল নেতৃত্বের দ্বন্দ্বের কারণে যাত্রা পথেই তা হোঁচট খেয়েছে বারবার। দেখা দিয়েছে নতুন করে টানাপড়েন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, চলমান রাজনৈতিক প্রোপটে তৃতীয় ধারার শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি গঠনের কাজটি খুবই জটিল। তাছাড়া যেসব দলকে নিয়ে জোট গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে তাদের কারোরই সারাদেশে তৃণমূল পর্যায়ে রাজনৈতিক শক্তি ও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মী-সমর্থক নেই। এমনকি মাঠ পর্যায়ে রয়েছে পরিচিত নেতার অভাব। তাই সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করার মতো অবস্থান কোনো দলেরই নেই। নতুন জোটের নামে রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা চললেও তা সম্ভব নয় বলে মনে করেন তারা। তাছাড়া যে তিন নেতা তৃতীয় শক্তি সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছেন, রাজনৈতিক ক্যারিয়ার তাদের তেমন পরিষ্কার নয়। ড. কামাল হোসেন নৌকা মার্কায় একাধিকবার নির্বাচন করেও সংসদে প্রবেশ করতে পারেননি। মাহমুদুর রহমান সিলেট থেকে নৌকা মার্কা নিয়েও পাস করে আসতে পারেননি। মুন্সীগঞ্জ থেকে বদরুদ্দৌজা চৌধুরী পাস করে আসেন বটে, তবে তার জন্য তাকে ধানের শীষের ওপরই নির্ভর করতে হয়। ধানের শীষ ছাড়া ব্যক্তিগত ইমেজের ওপর নির্ভর করে তারও নির্বাচনে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।
বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার চেষ্টার অংশ হিসেবে ২০১২ সালের ২১ অক্টোবর এক মঞ্চে উঠে প্রথমবারের মতো জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছিলেন বি. চৌধুরী ও ড. কামাল হোসেন। সে সময় আ স ম রব, কাদের সিদ্দিকী ও মান্নাসহ প্রগতিশীল অনেকেই এতে সমর্থনও করেছিলেন। এরপর কাকরাইলের ঈশা খাঁ হোটেলে এক মতবিনিময় সভা ডেকে তৃতীয় ধারার পে সমমনা দল ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের একত্রিত করার আবারও চেষ্টা চালান ড. কামাল। ওই সময় ৫টি দল ছাড়াও সিপিবি-বাসদ, জাতীয় পার্টি ও সুশীল সমাজের বেশকিছু প্রতিনিধি সভায় যোগ দেন। তার আগে ২০০৮ সালের নির্বাচনের সময় যুক্তফ্রন্ট গড়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন বি. চৌধুরী ও ড. কামাল। তখনও তারা এ কাজে ব্যর্থ হন। ২০১৪ সালে নির্বাচনের আগে এরকম তৃতীয় শক্তি উত্থানের চেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হন ড. কামাল হোসেন। এখন নতুন করে আবারও ৫ দলের সমন্বয়ে নতুন ঐক্য গড়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন অতীতের ব্যর্থ এসব নেতা। এরই অংশ হিসেবে একাদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিকল্প রাজনৈতিক জোট’ বা ‘বৃহত্তর রাজনৈতিক শক্তির উত্থান’ ঘটাতে ‘জাতীয় ঐক্যের’ ডাক দিয়েছেন ড. কামাল হোসেন, এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও মাহমুদুর রহমান মান্না। গত ২৪ আগস্ট বিকল্পধারা সভাপতি বি. চৌধুরীর প্যাডে তার প্রেস সচিব জাহাঙ্গীর আলমের স্বারে গণমাধ্যমে পাঠানো যৌথ ঘোষণার কথা জানানো হয়। এর আগেও জাতীয় ঐক্যের কথা বলে রাজনীতিতে নানা কারণে বিতর্কিত ও সমালোচিত এই তিন নেতা হাত মিলিয়েছিলেন। যদিও তাদের সেই বন্ধুত্ব ছিল ণস্থায়ী।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঐক্যের ডাক দেয়ার পর তাদের নিজেদের মধ্যে কোনো সমন্বয় দেখা যাচ্ছে না। গত ১০ সেপ্টেম্বর একটি মানববন্ধন করা হলেও এ নিয়ে শরিক নেতাদের অনেক অভিযোগ রয়েছে। তাছাড়া তৃতীয় ধারার এই ঐক্য প্রক্রিয়ায় অন্য কোনো দলও যুক্ত হতে আগ্রহ প্রকাশ করেনি। তাদের যৌথ ঘোষণায় দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে হতাশা প্রকাশ করে বলা হয়, ‘এই পরিস্থিতিতে জনগণের মতায়ন নিশ্চিত করার ল্েয জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি অহিংস বিকল্প রাজনৈতিক ধারা গড়ে তোলা সময়ের দাবি।’ যৌথ ঘোষণায় একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বলা হয়, দেশকে যারা ভালোবাসেন, যারা দেশের মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বে বিশ্বাসী, তাদের একটি প্রগতিশীল, পাহাড় ও সমতলের মানুষসহ সকল সম্প্রদায়ের পূর্ণ অধিকার সম্পন্ন একটি বাংলাদেশ গড়ার ল্েয ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। যৌথ ঘোষণায় তারা আরও বলেন, ‘আগামী সংসদ নির্বাচনে সকল রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তির অংশগ্রহণ এবং অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপে নির্বাচন সুনিশ্চিত করার ল্েয গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন, নির্বাচনি আইন ও নির্বাচন ব্যবস্থার দাবিতে এবং দারিদ্র্যমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত এবং সন্ত্রাসমুক্ত একটি সুখী ও সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশ গড়ার ল্েয সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি ছাত্র সমাজ, শিতি ও সুধীজন, আইনজ্ঞ, চিকিৎসক, শিক, মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারবর্গ, ব্যবসায়ী, শ্রমিক, কৃষক, সাবেক সরকারিÑবেসরকারি কর্মকর্তাÑকর্মচারী ও অন্যান্য পেশাজীবী মানুষের সমন্বয়ে বৃহত্তম একটি রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটাতে হবে।
কিন্তু বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তির উত্থান সুদূরপরাহত বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি তৃতীয় শক্তির ঊত্থান ঘটাতে হলে সেই শক্তির যে রাজনৈতিক পরিপক্বতা দরকার তা ড. কামাল হোসেন, বদরুদ্দৌজা চৌধুরী ও মাহমুদুর রহমান মান্নার মধ্যে নেই। তাদের মধ্যে সুখী-সমৃদ্ধিশালী দেশ গড়ার মানসিকতার চেয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার মোহই বেশি। এই তিন নেতার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো তাদের কোনো নিজস্ব নির্বাচনি আসন নেই। ব্যক্তিগত ক্যারিশমা দিয়ে নির্বাচনে পাস করে আসার যোগ্যতাও তাদের নেই। পাশাপাশি এই তিন নেতা আর যেসব নেতাকে নিয়ে তৃতীয় শক্তি গড়তে চাচ্ছেন, তাদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারও খুব একটা স্বচ্ছ নয়। রাজনীতির মাঠে আ স ম আবদুর রব, কাদের সিদ্দিকীর অবস্থা ড. কামাল হোসেন, বদরুদ্দৌজা চৌধুরী ও মাহমুদুর রহমান মান্নার চেয়েও নড়বড়ে। সেক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ভোটের রাজনীতিতে এই রাজনৈতিক তৃতীয় শক্তি আসলে কিছুই করতে পারবে না। আওয়ামী লীগ-বিএনপির অনুকম্পায়ই তাদের রাজনীতি করতে হবে এবং যেকোনো সংসদ নির্বাচনের আগে নিজেদের দাম বাড়ানোর জন্য বারবারই তৃতীয় শক্তি তৈরির নিষ্ফল চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।