প্রতিবেদন

রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত কূটনৈতিক উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক : মিয়ানমারের নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের সাময়িক আশ্রয় দেয়া এবং তাদের সাথে মানবিক আচরণ করার পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে বাংলাদেশ সরকার ব্যাপক কূটনৈতিক উদ্যোগও গ্রহণ করেছে। সংকট নিরসনে বাংলাদেশ প্রথমে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের সাময়িক আশ্রয় দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সম্পূর্ণ মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশ সরকার প্রায় ৪ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় ও আহারের ব্যাবস্থা করে। সেই সঙ্গে এই বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাকে তাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিতে সে দেশের সরকারের ওপর প্রবল চাপ অব্যাহত রাখে। সংকট নিরসনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে মিয়ানমারকে কড়া বার্তা দেয়া হয়। ঢাকায় নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দুই দফা ডেকে পাঠানো হয়। পাশাপাশি ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দুই দফা বৈঠকের পর রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এরই অংশ হিসেবে গত ১৩ সেপ্টেম্বর অন্তত ৪০টি দেশের রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিকরা উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। ৪০টি দেশের রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিকরা উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনের সময় স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের একার সমস্যা নয়, এটি বৈশ্বিক সমস্যা। বাংলাদেশ একা এই মানবিক সংকট মোকাবিলা করতে হিমশিম খাচ্ছে। যত দ্রুত সম্ভব রোহিঙ্গাদের তাদের দেশ মিয়ানমারে ফেরাতে সবাই বাংলাদেশের পাশে থাকবে। ভয়াবহ নির্যাতনের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা প্রায় ৪ লাখ রোহিঙ্গার অবস্থা দেখতে ১৩ সেপ্টেম্বর চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্রসহ ৪২ দেশ ও মিশনের ৬৩ জন কূটনীতিক কক্সবাজারের সীমান্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। তাদের সঙ্গে জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার আরো প্রায় ২৫ জন কর্মকর্তাও রোহিঙ্গাদের দুর্দশা সরাসরি দেখেন।
রোহিঙ্গাদের মুখে নিপীড়নের কথা শোনার পর কূটনীতিকদের অনেকেই বিচলিত হয়ে পড়েন। তারা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রশংসা করেন। রোহিঙ্গাদের দুর্দশা দেখার পর কূটনীতিকরা বলেন, মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের বিষয়ে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে তারা ভূমিকা রাখবেন। নিজ নিজ দেশকে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি আরো বিস্তারিত জানানোর প্রতিশ্রুতির কথাও তারা ব্যক্ত করেন।
বোয়িং বিমানযোগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ এম মাহমুদ আলীর নেতৃত্বে ৬৩ জনের বিদেশি প্রতিনিধি দলটি ঢাকা থেকে কক্সবাজার বিমানবন্দরে এসে পৌঁছানোর পর সেখান থেকে সড়ক পথে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে যায়। বিদেশি কূটনীতিকরা প্রথমে কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির পরিদর্শনে যান। তারা নিবন্ধিত অনুপ্রবেশকারীদের পুরনো এই ক্যাম্পটি ঘুরে দেখেন এবং কিছু রোহিঙ্গার সঙ্গে কথা বলেন। কুতুপালংয়ের পর তারা সদ্য নির্মিত বালুখালী রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির পরিদর্শন করেন। ওই সময় কখনো গুঁড়ি গুঁড়ি আবার কখনো হালকা বৃষ্টি হচ্ছিল।
কুতুপালং ও বালুখালী আশ্রয়শিবির পরিদর্শনের পর বিদেশি কূটনীতিকরা ঘুনধুম সীমান্ত এলাকায় যান। সেখানে গিয়ে এপার-ওপারের বিভিন্ন বিষয় পর্যবেণ করেন। এ সময়ও মিয়ানমারের বিভিন্ন গ্রাম জ্বলছিল, যা তারা স্বচে দেখেন। কিভাবে রোহিঙ্গারা নির্যাতিত হয়ে এ দেশে আসছে এবং নির্যাতনের বিভিন্ন চিহ্ন তারা দেখতে পান। সড়ক পথে কক্সবাজার থেকে উখিয়া ও সীমান্ত এলাকা ঘুনধুম পরিদর্শনকালে তারা সড়ক ও আশপাশের এলাকায় অবস্থানকারী হাজার হাজার রোহিঙ্গার মানবেতরভাবে অবস্থানের দৃশ্য দেখে বিচলিত হয়ে পড়েন।
পরিদর্শন শেষে এক প্রশ্নের জবাবে চীনা রাষ্ট্রদূত বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে চীন। ব্রিটিশ হাইকমিশনার বলেন, এই মানবিক বিপর্যয়ে বাংলাদেশের পাশে থাকবে যুক্তরাজ্য। কূটনীতিকদের সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ এম মাহমুদ আলী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমসহ প্রশাসনের পদস্থ কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
ক্যাম্প পরিদর্শনকালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম সাংবাদিকদের বলেন, রোহিঙ্গাদের সঙ্গে মিয়ানমার সরকারের বিবাদ চলছে। এটা সেই দেশের সমস্যা। মিয়ানমারের সমস্যা এখন বাংলাদেশে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেয়াই সংকটের একমাত্র সমাধান। এ জন্য বিদেশি কূটনীতিকরা সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।
৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন এবং পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলা শেষে বিদেশি কূটনীতিকদের কয়েকজন সাংবাদিকদের জানান, মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের জীবন অনিশ্চিত ও অমানবিক। বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীদের ফিরিয়ে নিতে নিজ নিজ দেশে আলোচনা করা হবে। এ সময় তাঁরা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া এবং রোহিঙ্গাদের জন্য মানবতার হাত বাড়িয়ে দেয়ায় বাংলাদেশ সরকারকে ধন্যবাদ জানান।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে গত ২৪ আগস্ট রাতে নিরাপত্তা বাহিনীর ৩০টি চৌকিতে জঙ্গিগোষ্ঠী ‘আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) কথিত সন্ত্রাসী হামলার পর সেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে কয়েক হাজার রোহিঙ্গা হতাহত ও প্রায় ৪ লাখ রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হয়। প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় এসব রোহিঙ্গা। বাংলাদেশসহ বেশ কিছু দেশ এরই মধ্যে মিয়ানমারের ওই অভিযানকে সুস্পষ্ট গণহত্যা হিসেবে অভিহিত করেছে। জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) বলেছে, মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে ৬০ শতাংশই শিশু। বাংলাদেশে অবস্থানরত অন্তত ২ লাখ রোহিঙ্গা শিশুর জীবন ঝুঁকিতে আছে। তাদের বাঁচাতে জরুরি সহযোগিতা প্রয়োজন। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার জায়িদ রাদ আল হুসেইন দাবি করেছেন, মিয়ানমার রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধন চালাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে উদ্বেগ জানিয়েছে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, চীন ও রাশিয়া এবং ইউরোপের ২৮টি দেশের জোট ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মুসলিম দেশগুলোর জোট ওআইসিসহ সারা বিশ্ব। রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ১৩ সেপ্টেম্বর জরুরি বৈঠকে বসে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের গণহত্যায় নিন্দা জানিয়েছে। মিয়ানমারে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের সময় অতিরিক্ত মাত্রায় সংঘাত-সহিংসতা হয়েছে উল্লেখ করে এখনই তা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ।
বিশ্বজুড়ে এসব তৎপরতার পেছনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করায় রোহিঙ্গা নিধনের অমানবিক দিকটি বিশ্বজুড়েই ফুটে উঠেছে। রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে সারা বিশ্বই বাংলাদেশের পাশে থাকবে বলে নিশ্চয়তা দিয়েছে; যা বাংলাদেশের কূটনৈতিক সফলতার প্রথম ধাপ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধরনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে অচিরেই ফেরত পাঠানো সম্ভব হবে।