কলাম

রোহিঙ্গা সংকট : প্রয়োজন একটি টেকসই সমাধান

অধ্যাপক ড. রাশিদ আশকারী : মানব ইতিহাসের পাতা ভরে আছে গণনির্যাতন এবং গণহত্যার নানান লোমহর্ষক কাহিনি দিয়ে। কিন্তু সাম্প্রতিককালে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নির্যাতন যেন বর্বরতা ও নিষ্ঠুরতার মাত্রা বিচারে অতীতের সকল নির্যাতনকে ম্লান করে দিতে চায় অন্তত এই বিবেচনায় যে সভ্যতাগর্বী মানবজাতির অধিকার চৈতন্যের এই অগ্রসর লগ্নেও একেবারে প্রকাশ্য দিবালোকে ঘটছে সংখ্যালঘু একটি সম্প্রদায়ের ওপর একই দেশের সরকার ও তার প্রশ্রয়পুষ্ট সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের দ্বারা চরম মানবতাবিরোধী অপরাধ। স্যাটেলাইট ইমেজের কল্যাণে স্বচে দেখা যাচ্ছে এবং প্রাণ নিয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের কাছে স্বকর্ণে শোনা যাচ্ছে ২৪ আগস্ট ২০১৭-এর পর তথাকথিত আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির হামলার প্রতিক্রিয়ায় শুরু হওয়া বর্মী সেনা অভিযানে নিহত ও নির্যাতিত নিরীহ-নিরপরাধ রোহিঙ্গা মুসলমান নর-নারীর করুণ কাহিনি। পুরো আরাকান রাজ্যের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে লাশের গন্ধে আর নির্যাতিত মানুষের আর্তনাদে। নাফ নদীর পানি রঞ্জিত হয়ে উঠেছে রোহিঙ্গাদের রক্তে। ভূমধ্যসাগরের তীরে ভাসমান সিরীয় উদ্বাস্তু শিশু আয়লান কুর্দির লাশের মতো অসংখ্য রোহিঙ্গা শিশুর লাশ ভাসতে দেখা গেছে নাফ নদীতে। এ অমানবিক নির্যাতনের হাত থেকে প্রাণে বাঁচাতে প্রায় ৪ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশে। মানবতার এই চরম বিপর্যয় অন্তত এই মুহূর্তে একেবারেই অবাঞ্ছিত ও অপ্রত্যাশিত। চরম নিন্দনীয় ও তীব্র প্রতিবাদযোগ্য।
প্রতিবাদের ঝড়ও উঠেছে। রক্তাক্ত কিংবা আগুনে ঝলসানো লাশ দেখে, শিশুর ভাসমান মৃতদেহ দেখে, প্রাণভয়ে বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে ছুটন্ত কান্ত-পীড়িত মানুষের মিছিল দেখে, সন্তানের কাঁধে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের নিঃসাড় দেহভার দেখে, শিশু সন্তান কাঁধে নিয়ে নাফ নদীতে সন্তরণশীল মাকে দেখে প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠেছে পৃথিবী। জাতিসংঘ রোহিঙ্গাদের ‘বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত জনগোষ্ঠী’ হিসেবে অভিহিত করেছে এবং সহিংসতা তদন্তে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন তদন্ত দল গঠন করেছে। যুক্তরাষ্ট্রও মিয়ানমারকে হুঁশিয়ার করে কড়া বার্তা পাঠিয়েছে। অবিলম্বে সহিংসতা বন্ধ করে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে কার্যকর পদপে গ্রহণ করতে বলেছে এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের তদন্ত দলকে মিয়ানমারে যেতে দিতে এবং আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে বলেছে। মার্কিন কংগ্রেসের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান মিয়ানমারের ডি ফ্যাক্টো শাসক অং সান সু চিকে পত্র দিয়ে সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন। কানাডা আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে এবং রোহিঙ্গাদের সাহায্যার্থে ২০ মিলিয়ন ড্যানিশ ক্রোনার দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। মালয়েশিয়া রোহিঙ্গাদের আশ্রয় প্রদানের আশ্বাস দিয়েছে। এইচআরডব্লিউ (হিউম্যান রাইটস ওয়াচ) রোহিঙ্গা নির্যাতনকে এথনিক কিনজিং বা জাতিগত নিধন হিসেবে অভিহিত করে তা প্রতিরোধে বিশ্ববিবেককে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে। এমনকি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বৌদ্ধ কমিউনিটির মানুষেরাও বর্মী বৌদ্ধদের এই সহিংসতার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছে।
মিয়ানমারে সহিংসতা বন্ধে এবং রোহিঙ্গা নির্যাতনের প্রতিবাদে, বিশেষ করে উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাদের আশ্রয় প্রদানে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বাংলাদেশ। এমনিতেই বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম প্রধান জনবহুল দেশ। তারপরও এখানে দীর্ঘকাল থেকে প্রায় ৫ লাখের অধিক মুসলিম রোহিঙ্গা বাস করে আসছে; যা এদেশের আর্থিক ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারপরও একটি প্রতিবেশী দেশের একটি অঙ্গরাজ্যের বাসিন্দাদের চরমতম অস্তিত্ব সংকটে সাহায্যের হাত গুটিয়ে নিস্পৃহ থাকাকে সমীচীন মনে করেননি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রক্ত ও রাজনীতির সুযোগ্য উত্তরাধিকার বর্তমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধু যেমন প্যালেস্টাইনের নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, আন্তর্জাতিক শত্র“তার ঝুঁকি বাড়িয়ে ফিলিস্তিনিদের সাহায্যের হাত বাড়িয়েছিলেন, তাঁর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনাও তেমনি অনেক ঝুঁকি অগ্রাহ্য করে বিপন্ন মানবতার পাশে দাঁড়িয়েছেন। সশরীরে ছুটে গেছেন প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাদের পাশে, চরম মমতায় তাদের মাথায় বুলিয়ে দিয়েছেন ভরসার হাত। দুর্দশাগ্রস্ত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নিজ দেশের অভ্যন্তরে আশ্রয় দিয়ে খাদ্য ও চিকিৎসাসহ সকল মানবিক সহায়তা অব্যাহত রেখেছেন।
রোহিঙ্গা ইস্যুতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ তাৎণিক মানবিক এবং স্থায়ী কূটনৈতিক পদপে গ্রহণ করেছে। মুমূর্ষু মানুষের প্রাণ বাঁচাতে আগের ৫ লাখসহ সাময়িকভাবে আরো প্রায় ৪ লাখ অর্থাৎ মোট প্রায় ৯ লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে আশ্রয় দিলেও স্থায়ীভাবে তাদের স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের বিষয়টিও বর্তমান সরকারের বিবেচনায় রয়েছে। চলমান রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে সুস্পষ্ট প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। প্রস্তাবে মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের জন্য একটি সেফ জোন স্থাপনসহ আনান কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। রোহিঙ্গাদের ওপর অব্যাহত নির্যাতন-নিপীড়ন বন্ধ, তাদেরকে তাদের নিজ বাসভূমি থেকে বিতাড়ন করে বাংলাদেশে পুশ ইন করা থেকে বিরত থাকা এবং মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিয়ে নাগরিকত্বের অধিকার দিয়ে নিরাপদে বসবাসের ব্যবস্থা গ্রহণে মিয়ানমার সরকারের ওপর জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলের জোরালো কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানানো হয়েছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের এই অরাজনৈতিক ও মানবিক ব্যবস্থা গ্রহণ বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে। অক্সফোর্ড নেটওয়ার্ক অব পিস স্টাডিজের দুজন খ্যাতিমান শিাবিদ ড. লিজ কারমাইকেল এবং ডি. অ্যান্ড্রু গোসলার এই শরণার্থী সংকট মোকাবিলায় মানবিক ও সাহসী পদেেপর জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘মানবিক বিশ্বের প্রধান নেতা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পিস স্টাডিজ বিভাগের তিনজন অধ্যাপক যৌথভাবে তাকে বিশ্বশান্তির দূত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডেভিড হেম্পটন মনে করেন রোহিঙ্গা ইস্যুতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ বিশ্বশান্তি প্রক্রিয়ায় নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী সত্যিই একটি হতভাগ্য জনগোষ্ঠী। পৃথিবীর আরো অনেক দেশেই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী আছে। যেমন বাংলাদেশে নতুন-পুরনো মিলে প্রায় ৯ লাখ, পাকিস্তানে ৩ লাখ ৫০ হাজার, সৌদি আরবে ২ লাখ, মালয়েশিয়ায় ১ লাখ ৫০ হাজার, ভারতে ৪০ হাজার, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১০ হাজার, থাইল্যান্ডে ৫ হাজার, ইন্দোনেশিয়ায় ১ হাজার। কিন্তু মিয়ানমারের ১০ লাখ রোহিঙ্গার মতো নির্যাতিত রোহিঙ্গা কিংবা নির্যাতিত মানুষ বর্তমানে এই গ্রহের বুকে কোথাও নেই। রোহিঙ্গারা নিজ বাসভূমে পরবাসী। ঐতিহাসিকভাবে হাজার বছর ধরে আরাকান বা রাখাইনের অধিবাসী হওয়া সত্ত্বেও তারা সবসময় নির্যাতিত হয়ে এসেছে। রাখাইনে দীর্ঘকাল ধরে দুটি সম্প্রদায় মগ ও রোহিঙ্গা বসবাস করে আসছে। মগ দস্যুরা তখন থেকেই রোহিঙ্গাদের নিপীড়ন করত। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মগেরা নৈরাজ্য-অরাজকতা করত বলেই ‘মগের মুল্লুক’ কথাটি বাংলা ভাষায় স্থান পেয়েছে। ১০৪৪ সালে বৌদ্ধ বর্মী রাজা আনাও হতা মগ অধ্যুষিত বার্মা থেকে রোহিঙ্গাদের দেিণ বিতাড়িত করে রোহিঙ্গা নির্যাতনের সূচনা করেন। ১৪৩০ থেকে ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত আরাকান স্বাধীন রাজ্য থাকলেও ১৭৮৪ সালে বার্মার তৎকালীন রাজা বোদাওফায়া আরাকান দখলের পর নতুন আঙ্গিকে রোহিঙ্গা নির্যাতন শুরু হয়। এক সময়ে ব্রিটিশদের দখলে চলে যায় পুরো ভারতীয় উপমহাদেশ। ১৯৪৮ সালে ৪ জানুয়ারি মিয়ানমার স্বাধীনতা অর্জন করে। সে সময়ে প্রচলিত গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় পার্লামেন্টেও রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিত্ব ছিল এবং অনেক রোহিঙ্গা উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার দায়িত্বও পালন করতেন। কিন্তু ১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রমতা দখল করলে রোহিঙ্গা নির্যাতনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। ১৯৭০ সালে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয় বার্মিজ কর্তৃপ। আরো কঠোর হয় রোহিঙ্গা নির্যাতনের মাত্রা। ১৯৮২ সালে নাগরিক আইন কার্যকর করলেও রোহিঙ্গাদের মেনে নেয়া হয়নি। তখন থেকে আজ পর্যন্ত নির্যাতন চলমান আছেÑ হয়ত তাতে কেবল মাত্রাগত তারতম্য রয়েছে। নির্যাতন সইতে না পেরে ঘর ছেড়েছে প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গা। যারা বিভিন্ন অনুকূল দেশে ঠাঁই নিয়েছে। রোহিঙ্গা সমস্যার একটি টেকসই সমাধান, জাতীয়, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক স্বার্থেই সময়ের এক অপরিহার্য দাবি হয়ে উঠেছে। এক সময়ের যাযাবর ইহুদিরা স্থায়ী আবাস পেয়েছে। ফিলিস্তিনিদেরও আবাসভূমি রয়েছে কিন্তু দুর্ভাগা রোহিঙ্গাদের কোনো স্থায়ী আবাসভূমি নেই। রোহিঙ্গা হিসেবে জন্ম নেয়া মানেই ভাসমান শ্যাওলার নিয়তি মেনে নেয়া। কিন্তু আর কতকাল রোহিঙ্গাদের এই যাযাবর জীবন বয়ে বেড়াতে হবে। বাংলাদেশই-বা আর কতদিন এই বাড়তি বোঝা তার সীমিত সাধ্য নিয়ে বয়ে বেড়াবে? বাংলাদেশ এই সংকটের একটা স্থায়ী সমাধান চায়। সঙ্গত কারণেই এদেশে অবস্থানরত সব রোহিঙ্গাকে নিজ বাসভূমিতে ফিরিয়ে দিতে চায়। আর এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক মহলের কার্যকর সহযোগিতা চায় বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানিসহ ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং জাতিসংঘ এই সংকট সমাধানে জোরালোভাবে বাংলাদেশকে সমর্থন দিয়েছে। এছাড়া ওআইসিভুক্ত মুসলিম দেশগুলোও এ ব্যাপারে সমব্যথী। কিন্তু এ ধরনের একটি বৃহৎ এবং পুরনো সংকটের টেকসই সমাধানের জন্য রাশিয়া, চীন ও ভারতের জোরালো সমর্থন বাংলাদেশের জন্য জরুরি বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। এছাড়া জাপানের সমর্থনও প্রয়োজন। আসন্ন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে রোহিঙ্গা ইস্যু বিশেষ গুরুত্ব পেতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা যায়। সেখানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশেষ ভূমিকা রাখবেন। বস্তুত, স্বার্থান্বেষী মহল ছাড়া মানবিক ও বিবেকী সবাই রোহিঙ্গা সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধান চায়।
জননী জন্মভূমি স্বর্গাদপি গরিয়সী। মাতৃভূমি স্বর্গের মতো। মাতৃভূমি থেকে বিচ্যুত হওয়া মানে স্বর্গচ্যুত হওয়া। রোহিঙ্গারা মাতৃভূমিতে পুনর্বাসিত হোক, নিজ বাসভূমে তাদের পরবাস দশার অবসান ঘটুকÑ এই প্রত্যাশা শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সব মানুষের।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক