সিঙ্গাপুরের প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন মুসলিম নারী হালিমাহ ইয়াকুব

| September 18, 2017

স্বদেশ খবর ডেস্ক : সিঙ্গাপুরের প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট হতে যাচ্ছেন মুসলিম নারী হালিমাহ ইয়াকুব। তিনি সিঙ্গাপুর পার্লামেন্টের সাবেক স্পিকার। তিনি শুধু প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট নন গত ৪৭ বছরের বেশি সময় পর তিনি মালয় সম্প্রদায় থেকেও প্রথমবারের মতো দেশের শীর্ষ পদে অধিষ্ঠিত হতে যাচ্ছেন।
সিঙ্গাপুরের ইলেকশন ডিপার্টমেন্ট (ইএলডি) জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতি পদে যেসব প্রার্থী অংশ নিয়েছিলেন তাদের মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক স্পিকার হালিমাহ ইয়াকুবই একমাত্র মনোনীত হয়েছেন।
আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা। তবে নির্বাচনে আর কোনো যোগ্য প্রার্থী নেই বলে হালিমাহ ইয়াকুবের (৬২) প্রেসিডেন্ট হওয়াটা এখন শুধু সময়ের ব্যাপার। নির্বাচনি প্রতিযোগিতায় একমাত্র হালিমাকেই যোগ্য বলে মনে করেছে প্রেসিডেন্সিয়াল ইলেকশনস কমিটি। তিনি ৩ বছরের বেশি সময় দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
১৯৫৪ সালের ২৩ আগস্ট কুইন স্ট্রিটে হালিমাহ ইয়াকুবের জন্ম। তিনি পরিবারের ৫ সন্তানের সবচেয়ে ছোট। ১৯৬২ সালে যখন তার বাবা মারা যান তখন তার বয়স ৮ বছর। তখন তাদের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। তার মা হকার লাইসেন্স নিয়ে রাস্তার পাশে একটি খাবারের স্টল দিয়েছিলেন। সেখানে হালিমাহ তার মাকে স্টলটি পরিষ্কার, বাসনপত্র ধৌতকরণ, টেবিল পরিষ্কার, কাস্টমারদের খাবার পরিবেশন প্রভৃতি কাজে সাহায্য করতেন।
১৯৬০ সালে হালিমাহ সিঙ্গাপুর চাইনিজ গার্লস স্কুলে ভর্তি হন। অল্প যে কজন মালয় শিক্ষার্থী সেখানে পড়ালেখা করতো তিনি ছিলেন তাদের একজন। ১৯৭০ সালে তিনি তানজং ক্যানটং গার্লস স্কুলে এবং পরে সিঙ্গাপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৭৮ সালে তিনি ন্যাশনাল ট্রেডস ইউনিয়ন কংগ্রেসে (এনটিইউসি) একজন আইন কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন। তিনি সেখানে ৩০ বছরের বেশি সময় কাজ করেন এবং শেষে ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল হন।
১৯৮০ সালে তিনি তার বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু ও ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আলহাবসিকে বিয়ে করেন। তাদের সংসারে ৫ ছেলেমেয়ে রয়েছে, যাদের বর্তমান বয়স ২৬ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। ২০০১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী গোহ চোক টংয়ের অনুরোধে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন হালিমাহ ইয়াকুব এবং তখন থেকে পরপর ৪টি সাধারণ নির্বাচনে তিনি জয়লাভ করেন। ২০১১ সালে তিনি সিঙ্গাপুরের সামাজিক উন্নয়ন, যুব ও খেলাধুলা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নিযুক্ত হন। ২০১৩ সালে তিনি দেশটির সংসদে প্রথম নারী স্পিকার নিযুক্ত হন। ২০১৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সাধারণ নির্বাচনের দিন তিনি তার মাকে হারান। নির্বাচনে জয়লাভ করলেও হালিমাহ যেহেতু তার মাকে খুব ভালোবাসতেন, তাই তিনি এ ঘটনাকে তার জীবনের সবচেয়ে দুঃখজনক মুহূর্ত বলে উল্লেখ করেন। ২০১৭ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তিনি সিঙ্গাপুরের প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট হিসেবে মনোনীত হয়েছেন। আর আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর হালিমাহ ইয়াকুব সিঙ্গাপুরের প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট হবেন।
সিঙ্গাপুর একটি ুদ্র ও ব্যাপকভাবে নগরায়িত দ্বীপরাষ্ট্র। এটি দণি-পূর্ব এশিয়াতে মালয় উপদ্বীপের দণিতম প্রান্তে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মাঝখানে অবস্থিত। সিঙ্গাপুরের স্থলভূমির মোট আয়তন মাত্র ৬৯৯ বর্গকিলোমিটার। এর তটরেখার দৈর্ঘ্য ১৯৩ কিলোমিটার। এটি মালয়েশিয়া থেকে জোহর প্রণালি এবং ইন্দোনেশিয়া থেকে সিঙ্গাপুর প্রণালি দ্বারা বিচ্ছিন্ন। সিঙ্গাপুরের মূল ভূখ-টি একটি হীরকাকৃতি দ্বীপ, তবে এর প্রশাসনিক সীমানার ভেতরে আরও বেশ কিছু ুদ্র ুদ্র দ্বীপ অবস্থিত। সিঙ্গাপুর দ্বীপের বেশিরভাগ এলাকা সমুদ্র সমতল থেকে ১৫ মিটারের চেয়ে বেশি উঁচুতে অবস্থিত নয়। সিঙ্গাপুরে কোনো প্রাকৃতিক হ্রদ নেই। সুপেয় পানি সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য দেশটিকে কৃত্রিম জলাধারের ওপরই নির্ভর করতে হয়।
১৯৬৫ সালে স্বাধীনতা লাভের পূর্বে সিঙ্গাপুর ব্রিটিশদের অধীনে একটি ক্রাউন কলোনি ছিল। এই দ্বীপটি পূর্ব এশিয়াতে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর প্রধান ঘাঁটি ছিল। ব্রিটিশ নৌবাহিনীর প্রধান ঘাঁটি থাকার কারণে সিঙ্গাপুরকে তখন জিবরালটার অব দ্য ইস্ট বলা হতো। সুয়েজ খাল চালুর পর ইউরোপ এবং এশিয়ার মধ্যে সমুদ্র বাণিজ্য বৃদ্ধি পায়, ঠিক তখনই সিঙ্গাপুরকে বিশ্বের প্রধান সমুদ্রবন্দর হিসেবে ব্যবহার করা শুরু হয়। পর্যটন সিঙ্গাপুরের অন্যতম প্রধান শিল্প এবং দেশটির অর্থনীতিতে ব্যাপক অবদান রাখে। প্রতি বছর কয়েক মিলিয়ন পর্যটক সিঙ্গাপুর ভ্রমণ করে।
১৯৬৫ সালে অর্থাৎ স্বাধীনতা লাভের বছরে ওই দেশের মাথাপিছু আয় ছিল ৫১৬ মার্কিন ডলার। স্বাধীনতার পরে ইউরোপ থেকে বিনিয়োগ আসার মাধ্যমে সিঙ্গাপুরের অর্থনীতি ধীরে ধীরে শক্তিশালী হওয়া শুরু করে। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে সিঙ্গাপুর উন্নত রাষ্ট্রের মর্যাদা লাভ করে।
সিঙ্গাপুরের জনসংখ্যা প্রায় ৫ মিলিয়ন। দেশটির সংস্কৃতি পশ্চিমা ঘরানার হলেও এখানে গোঁড়া হিন্দুবাদ, গোঁড়া খ্রিস্টানবাদ, গোঁড়া ইসলামবাদ (মালয় সংস্কৃতি) এবং গোঁড়া বৌদ্ধবাদ (চাইনিজ সংস্কৃতি) আছে। সিঙ্গাপুরের প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট হালিমাহ ইয়াকুব মালয় সম্প্রদায়ের একজন মুসলিম হলেও তাকে দেশটির মানুষ উদার ধর্মবিশ্বাসে বিশ্বাসী বলেই জানে।
সিঙ্গাপুরের রাজনীতি একটি সংসদীয় প্রজাতন্ত্রের কাঠামোয় সংগঠিত হয়। সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী হলেন সরকারের প্রধান। আর প্রেসিডেন্ট রাষ্ট্রপ্রধান। দেশটিতে মূলত একটি রাজনৈতিক দলের প্রভাব বেশি। দেশের নির্বাহী মতা সরকারের হাতে ন্যস্ত। আইন প্রণয়নের মতা সরকার ও আইনসভার দায়িত্বে পড়ে। বিচার বিভাগ নির্বাহী ও আইন প্রণয়ন বিভাগ থেকে স্বাধীন। আইনসভার সদস্যরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন। সিঙ্গাপুরে রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রধান হলেও তার ভূমিকা মূলত আলংকারিক। তবে ইদানীং রাষ্ট্রপতির মতার পরিসর কিছুটা বাড়ানো হয়েছে। রাষ্ট্রপতি পদের এই বাড়তি ক্ষমতা প্রথমবারের মতো পেতে যাচ্ছেন হালিমাহ ইয়াকুব।
১৯৫৯ সালের নির্বাচন থেকে সিঙ্গাপুরের রাজনীতিকে পিপলস অ্যাকশন পার্টি নামের রাজনৈতিক দল নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে। একাধিক বিরোধী দল বিদ্যমান থাকলেও মতায় তাদের প্রতিনিধিত্ব নেই বললেই চলে। তাই অনেক বিদেশি পর্যবেক সিঙ্গাপুরকে কার্যত একটি এক-দলীয় শাসন ব্যবস্থার দেশ হিসেবে গণ্য করে। তবে সিঙ্গাপুরের সরকার সবসময়েই একটি স্বচ্ছ, দুর্নীতিমুক্ত সরকার হিসেবে বহির্বিশ্বে পরিচিত। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের মতে, সিঙ্গাপুর বহুদিন ধরেই এশিয়ার সবচেয়ে দুর্নীতিমুক্ত দেশ। আর ২৩ সেপ্টেম্বর সেই দুর্নীতিমুক্ত দেশটির প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট হতে যাচ্ছেন হালিমাহ ইয়াকুব।

Category: আন্তর্জাতিক

About admin: View author profile.

Comments are closed.