খেলা

১০১ টেস্টে বাংলাদেশ ১০ জয় পেল যেভাবে

ক্রীড়া প্রতিবেদক : যেকোনো বিশেষ উপলই ইদানীং বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের জন্য চাপের বদলে জ্বলে ওঠার জ্বালানি হিসেবে কাজ করছে। গত মার্চে যেমন নিজেদের শততম টেস্টে শ্রীলংকার বিপে প্রথম জয় ছিনিয়ে নেয় বাংলাদেশ। ঢাকা টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার বিপে ২৭ আগস্ট তারিখে ২০ রানের মহাকাব্যিক জয়ের পেছনেও অনুঘটক ছিল কিছু উপল। ক্যারিয়ারের ৫০তম টেস্টে কী দারুণভাবেই না জ্বলে উঠলেন ঐতিহাসিক জয়ের দুই নায়ক সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবাল। জাদুকরী পারফরম্যান্সে দু’জনই রাঙালেন নিজেদের ৫০তম টেস্ট। তামিম পেয়েছেন জোড়া ফিফটি। আর জয়ের আসল নায়ক সাকিব ব্যাট হাতে প্রথম ইনিংসে ৮৪ রানের ঝলমলে এক ইনিংস উপহার দেয়ার পর বোলিংয়ে দুই ইনিংসেই নিয়েছেন ৫টি করে উইকেট। অস্ট্রেলিয়ার বিপে পঞ্চম টেস্টে এসে মিলল প্রথম জয়। টেস্টে বাংলাদেশের কাছে পরাভূত হওয়া পঞ্চম দলও অস্ট্রেলিয়া। তাতেই আবার সাদা পোশাকে বাংলাদেশের জয়ের সংখ্যা স্পর্শ করল দুই অঙ্ক। ১০১ টেস্টে ১০ জয়।
টেস্টে টাইগারদের শিকারের তালিকায় এখনও নাম ওঠেনি ৪টি দলের। ভারত, পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড ও দণি আফ্রিকাকে হারাতে পারলেই টেস্টে সব দলের বিপে জয়ের বৃত্তপূরণ হয়ে যাবে বাংলাদেশের। এরই মধ্যে সাদা পোশাকে একে একে জিম্বাবুয়ে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ইংল্যান্ড, শ্রীলংকা ও অস্ট্রেলিয়াকে পরাভূত করতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ।
টেস্টের কঠিন পথে আলোর রেখা খুঁজে পেতে শুরুর দিনগুলোতে রীতিমতো সংগ্রাম করতে হয়েছে টাইগারদের। ২০০৫ সালে জিম্বাবুয়ের বিপে নিজেদের ৩৫তম টেস্টে এসে প্রথম জয় পেয়েছিল বাংলাদেশ। এখন পর্যন্ত ১০ জয়ের ৫টিই জিম্বাবুয়ের বিপ।ে টেস্ট আঙিনায় প্রথম ১৬ বছরে জিম্বাবুয়ে ছাড়া শুধু
খর্বশক্তির ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপে দুটি জয় ছিল। কিন্তু গত এক বছরে ইংল্যান্ড, শ্রীলংকা ও অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে টেস্টেও এখন সত্যিকারের বড় দল হয়ে ওঠার পথে বাংলাদেশ। যে ৪ দলের বিপে জয় এখনও অধরা রয়ে গেছে সেই ভারত, পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড ও দণি আফ্রিকার বিপে রয়েছে ড্রয়ের সুখস্মৃতি। স্বপ্নযাত্রায় এবার সেই ড্রগুলোকে জয়ে অনূদিত করে বৃত্তপূরণের অপো।
২৭ আগস্ট ২০১৭ টেস্টের চতুর্থ দিনেই শক্তিধর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২০ রানের অসাধারণ এক জয় পায় বাংলাদেশ। বাংলাদেশের ১৭ বছরের টেস্ট ইতিহাসে এই জয়টিকে সর্বোচ্চ সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানের অলরাউন্ড নৈপুণ্যেই ঢাকা টেস্টে অস্ট্রেলিয়াকে হারাতে সক্ষম হয় টাইগাররা। ওই ম্যাচে ১০ উইকেট ও ৮৯ রান করার সুবাদে ম্যান অব দ্য ম্যাচ নির্বাচিত হন সাকিব আল হাসান। দীর্ঘ ১১ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার বিপে টেস্ট খেলার সুযোগ পায় বাংলাদেশ। আর সুযোগটা ভালোই কাজে লাগিয়েছে টাইগাররা। ২০১৫ সালে এই টেস্ট খেলার কথা ছিল অস্ট্রেলিয়ার। কিন্তু নিরাপত্তা ইস্যুতে অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশে আসতে রাজি হয়নি। সেই সিরিজ হয় ২০১৭ সালে। ফলে ঢাকা টেস্ট শুরু হওয়ার আগে বাংলাদেশের প্রত্যেকটি খেলোয়াড় অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে খেলার জন্য ছিল রোমাঞ্চিত। এই রোমাঞ্চই অস্ট্রেলিয়ার বিপে জয় এনে দিয়ে ক্রিকেটে আরেকটি ইতিহাস গড়ে টাইগাররা। তাইজুল ইসলামের বল অফ স্ট্যাম্পে পড়ে বাঁক খেয়ে হ্যাজেলউডের প্যাডে আঘাত করলেই জোরালো আবেদন করেন মুশফিক, তাইজুল, সৌম্য, সাকিবরা। আঙুল তুলতে ভুল করেননি আম্পায়ার নাইজেল লং। আর মুহূর্তেই অস্ট্রেলিয়ার বিপে টেস্ট জয়ের উল্লাসে মেতে ওঠে পুরো বাংলাদেশ।
মিরপুরে প্রথম টেস্টে জয়ের আশা নিয়ে মাঠে নেমেছিল বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া দু’দলই। তবে শেষ হাসি হেসেছে বাংলাদেশই। টস জিতে আগে ব্যাট করতে নেমে বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে করেছিল ২৬০ রান। জবাবে প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া ব্যাট করতে নেমে ২১৭ রানে অলআউট হলে বাংলাদেশ লিড পায় ৪৩ রানের। দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে বাংলাদেশ ২২১ রান করে অস্ট্রেলিয়ার সামনে টার্গেট দেয় ২৬৫ রানের। জয়ের টার্গেটে ব্যাট করতে নেমে অস্ট্রেলিয়া ২৪৪ রানে অলআউট হলে বাংলাদেশ জয় পায় ২০ রানে।
ঢাকা টেস্টে জয়ের জন্য অস্ট্রেলিয়ার দরকার ছিল ৮ উইকেটে ১৫৬ রান। আর বাংলাদেশের দরকার ছিল ৮ উইকেট। হাতে ছিল দুই দিন। আগের দিনে ২ উইকেটে ১০৯ রান নিয়ে খেলতে নামা অস্ট্রেলিয়ার ডেভিড ওয়ার্নার-স্মিথ জুটি ব্যাটিংয়ে থাকায় কিছুটা এগিয়ে ছিল সফরকারী দল অস্ট্রেলিয়া। তবে বাংলাদেশের সামনে একটাই সুযোগ ছিল বোলিংয়ে দারুণ কিছু করার। আর শেষ পর্যন্ত সেটাই করতে পেরেছেন বাংলাদেশের স্পিনাররা। বিশেষ করে সাকিব আল হাসান একাই ধসিয়ে দিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপ। ফলে টাইগারদের কাছে হার মানতে হয়েছে অস্ট্রেলিয়াকে। অথচ ২ উইকেটে ১৫৮ রান তুলে ম্যাচ জয়ের পথ অনেকাংশেই পরিষ্কার করেছিল অস্ট্রেলিয়া। এমন সময় বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ ব্রেক-থ্র“ এনে দেন বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। ওয়ার্নারকে লেগ বিফোর ফাঁদে ফেলেন সাকিব। রিভিউ নিয়েও নিজেকে রা করতে পারেননি ওয়ার্নার। ওয়ার্নারকে ফেরানোর পরই অস্ট্রেলিয়াকে চেপে ধরার সাহস পেয়ে যান সাকিব। আর স্মিথকেও বিদায় করেন সাকিব। সাকিবের পর আরেক বাঁ-হাতি স্পিনার তাইজুল ইসলামও কম যাননি। পিটার হ্যান্ডসকম্বকে আউট করেন তাইজুল। হ্যান্ডসকম্বের বিদায়ের পর আবার সাকিবের আক্রমণ। এবার অস্ট্রেলিয়ার ষষ্ঠ উইকেট তুলে নেন সাকিব। মধ্যাহ্ন বিরতির আগে জয় থেকে ৩ উইকেট দূরে থাকলেও অস্ট্রেলিয়ার শেষ ভরসা হিসেবে উইকেটে টিকে ছিলেন গ্লেন ম্যাক্সওয়েল। কিন্তু মধ্যাহ্ন বিরতির পর প্রথম ডেলিভারিতেই ম্যাক্সওয়েল বাধা দূর করে ফেলেন বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব। মূলত সাকিব তাইজুল মিরাজের বোলিং তোপেই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঐতিহাসিক এক জয় তুলে নিতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ।
টেস্টে বাংলাদেশের ১০ জয়

প্রতিপ ব্যবধান ভেন্যু ম্যাচ শুরুর তারিখ
জিম্বাবুয়ে ২২৬ রান চট্টগ্রাম ৬ জানুয়ারি ২০০৫
ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৯৫ রান কিংসটন ৯ জুলাই ২০০৯
ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৪ উইকেট সেন্ট জর্জেস ১৭ জুলাই ২০০৯
জিম্বাবুয়ে ১৪৩ রান হারারে ২৫ এপ্রিল ২০১৩
জিম্বাবুয়ে ৩ উইকেট ঢাকা ২৫ অক্টোবর ২০১৪
জিম্বাবুয়ে ১৬২ রান খুলনা ৩ নভেম্বর ২০১৪
জিম্বাবুয়ে ১৮৬ রান চট্টগ্রাম ১২ নভেম্বর ২০১৪
ইংল্যান্ড ১০৮ রান ঢাকা ২৮ অক্টোবর ২০১৬
শ্রীলংকা ৪ উইকেট কলম্বো ১৫ মার্চ ২০১৭
অস্ট্রেলিয়া ২০ রান ঢাকা ২৭ আগস্ট ২০১৭