কলাম

অনৈতিকতার করাল গ্রাস : উত্তরণ কোন পথে

ড. হাবিব খান : সমাজের সর্বত্র যেভাবে অবক্ষয় চলছে তাতে শুধু সাধারণ মানুষ নয়, হতাশ আর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে সমাজবিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানীসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মধ্যেও। অবক্ষয়ের যে বীভৎস রূপ প্রতিদিন প্রকাশ পাচ্ছে তাতে এ আতঙ্ক স্বাভাবিক। অপরাধীদের দৌরাত্ম্যে দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা। অনেক কিছু থেকেই গুটিয়ে আনতে হচ্ছে নিজেদের। কোথাও যেন আর আস্থা নেই, নিরাপত্তা নেই। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিনিয়ত আসছে ধর্ষণ আর খুনের বীভৎস খবর। ধর্ষক, খুনিরা প্রতিনিয়ত পাল্টাচ্ছে তাদের কৌশল ও ধরন। মধ্যযুগীয় এ বর্বরতা থেকে রেহাই পাচ্ছে না স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, গৃহবধূ, প্রতিবন্ধী নারী এমনকি শিশুও। কোমলমতি শিশুরা বর্বরদের সবচেয়ে বেশি টার্গেট হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে দেশের আনাচে কানাচে ঘটে যাওয়া একের পর এক পৈশাচিক ঘটনায় বারবার সামনে এসেছে মনুষ্যত্বের অধঃপতন আর পশুত্বের নানা চিত্র। এভাবে মানুষ আর মানবতার অধঃপতনের ঘটনায় একদিকে যেমন বিস্মিত অনেকে, অপরদিকে ছড়িয়ে পড়েছে মানুষের মধ্যে ভীতি, আতঙ্ক আর উদ্বেগ। কেউ কেউ পরিচিত জনের বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হচ্ছেন। অনেকে নিজ ঘরে আপনজনের প্রতারণার শিকার হয়ে পড়ছেন মর্মন্তুদ পরিস্থিতিতে। আবার কারও জন্য তৈরি হচ্ছে ফাঁদ। ধর্ষণের বিচার চাইতে গিয়ে অনেককে সহ্য করতে হচ্ছে শারীরিক নিপীড়ন। ফলে আত্মহননের পথেও যাচ্ছেন কেউ কেউ।
স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী এবং তরুণ-তরুণীদের সম্পর্কে যেসব ন্যক্কারজনক খবর প্রতিনিয়ত গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে তাতে যারপরনাই উদ্বিগ্ন ও আতঙ্কিত সব শ্রেণির অভিভাবক। গভীর রাতে গ্রামের মা-বাবাকে কেউ একজন ফোন করে জানাচ্ছেন তার মেয়ে বা ছেলে রাজধানীতে খুনের শিকার হয়েছে। মা-বাবা ছুটে এসে হত্যার কারণ সম্পর্কে এমন সব ঘটনা জানতে পারেন, কারো কাছে মুখ দেখানোর আর উপায় থাকছে না তাদের। এলাকার লোকজনের কাছে মেধাবী ভদ্র হিসেবে পরিচিত এসব তরুণ-তরুণীর অপরাধ জানাজানির পর বিস্ময়ের সৃষ্টি হয় সবার কাছে। একের পর এক সব চাঞ্চল্যকর ঘটনার সাক্ষী হচ্ছেন দেশবাসী। প্রাণপ্রিয় মেধাবী সন্তান পড়াশুনার আড়ালে ন্যক্কারজনক ঘটনায় জড়িয়ে পড়তে পারে তা কখনো চিন্তাও করতে পারেন না অনেক সহজসরল বাবা-মা। প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ সব কিছু যেন রাতারাতি বদলে দিচ্ছে। আধুনিকতার নামে মানুষের নীতি-নৈতিকতার অধঃপতনের মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলছে।
পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে যেভাবে অবক্ষয় আর বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে তাতে অভিভাবকদের অসতর্ক থাকার কোনো সুযোগ নেই। ছোট শিশুদের যেমন সারাক্ষণ দেখে রাখতে হয় তেমনি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়–য়াদেরও যেন আর এক মুহূর্ত চোখের আড়াল করা যাচ্ছে না। একটু অসতর্ক হলেই যেন মাথার ওপর বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো বিপদ হচ্ছে আজকাল।
নানাভাবে ফাঁদে ফেলে তরুণীদের আটকে রেখে ঘটছে গণধর্ষণের ঘটনা। ছোট ছোট শিশুকে নানা লোভ দেখিয়ে যৌন নির্যাতন করছে তারই কোনো না কোনো স্বজন-পরিচিতজন। দীর্ঘ দিন ধরে ধর্ষণের ক্ষেত্রে যেটি ভয়াবহ রূপ লাভ করেছে, তাহলো ব্ল্যাকমেইলিং। ফেনীতে মা-মেয়েকে একসাথে ১৪ জনের ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। সিলেটে মাকে ধর্ষণ করে তা ভিডিও করে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়ার হুমকি দিয়ে বারবার ধর্ষণ করেছে এক যুবক। পরে একই ভয় দেখিয়ে তার কিশোরী মেয়েকেও বারবার ধর্ষণ করে সে। শরীয়তপুরের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ৫ ছাত্রী ধর্ষণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সাভারে কিন্ডারগার্টেন স্কুলের প্রধান শিক্ষককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৫ম শ্রেণির ৭ ছাত্রীকে ধর্ষণের দায়ে। ধর্ষণের শিকার ৮ বছরের মেয়ের বিচার না পেয়ে মেয়েকে নিয়ে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে জীবন দিলেন পিতা হজরত আলী। দেশজুড়ে আলোচিত এ ঘটনার রেশ না কাটতেই বনানীর রেইনট্রি হোটেলে বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া দুই ছাত্রীকে আটকে রেখে ধর্ষণ করা হয় এবং তা ভিডিও করার ঘটনায় দেশজুড়ে তোলপাড় চলে কিছুদিন। টাঙ্গাইলের সখীপুরের এক কলেজ ছাত্রীকে প্রায় ৭ মাস নির্জন বাড়িতে আটকে রেখে ধর্ষণের অভিযোগে যুবক বাদল মিয়াকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ওই ছাত্রীকে খাবারের সাথে নেশা জাতীয় দ্রব্য খাইয়ে এতদিন তাকে ধর্ষণ করে সে। রাজধানীর চকবাজারে এক তরুণীকে ধর্ষণ করে তার ফুফা শাহীন। এতে মেয়েটি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। রমনায় এক তরুণীকে দিনের পর দিন ধর্ষণ করে আসছিল তারই সৎ বাবা আরমান হোসেন। অপরাধীরা অনেক সময় রাজনৈতিক পরিচয়ও ব্যবহার করে। বগুড়ার শ্রমিক নেতা তুফান সরকার গত ১৭ জুলাই স্কুল উত্তীর্ণ এক ছাত্রীকে কলেজে ভর্তি করে দেয়ার লোভ দেখিয়ে দিনভর ধর্ষণ করে। ধর্ষিতার মা এ বিষয়ে বিচার চাইতে গেলে ধর্ষকের স্ত্রীসহ নিকট-আত্মীয়রা মা-মেয়ের মাথার চুল কেটে তাদের সীমাহীন নির্যাতন করে এলাকা থেকে বের করে দেয়। গত ১৭ আগস্ট বরগুনার বেতাগীতে স্বামীকে আটকে রেখে শ্রেণিকক্ষে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষিকাকে গণধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষিকা এবং তার স্বামী দু’জনই ওই স্কুলের সহকারী শিক্ষক। তারা ভারতের পূর্ব মেদেনীপুর জেলার নন্দী গ্রামের আদি বাসিন্দা। তবে সুখের বিষয় হলো অভিযুক্ত ৫ ধর্ষকের অন্যতম রবিউলকে তার বাবা পুলিশের হাতে তুলে দেন। এভাবে সব বাবা-মা যদি এগিয়ে আসেন তাহলে সমাজ-রাষ্ট্রে অপরাধ প্রবণতা ধীরে ধীরে কমে আসবে।
ধর্ষণ ও হত্যার মতো বিচারকার্য সম্পাদন করতে যারা ভূমিকা রাখেন সেই পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে সহকর্মীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠলে দেশের নাগরিক হিসেবে আমরা চিন্তিত হই বৈকি। শাজাহানপুর থানার কনস্টেবল আরিফুলের বিরুদ্ধে তারই সহকর্মী এক নারী কনস্টেবল এই অভিযোগ করেন। অন্যদিকে পাবনায় ২ স্কুলছাত্রীকে গণধর্ষণের ভিডিও ইন্টারনেটে ছেড়ে দেয় অপরাধীরা। নীলফামারীতে মাকে বেঁধে রেখে মেয়েকে ধর্ষণের ঘটনায় এলাকায় চরম হতাশা বিরাজ করছে। চট্টগ্রামের পুর্ব বাকলিয়া সিটি করপোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রী রুমা আক্তার অপহরণ ও ধর্ষণের লজ্জা সইতে না পেরে ছাদ থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করে। ঈদে নতুন পোশাক দেয়ার লোভ দেখিয়ে নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার কুমারডাঙ্গায় চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্রীকে গত ২৮ আগস্ট রাহাত শেখ নামের এক প্রতিবেশী ধর্ষণ করে। ধর্ষণ কাজে সহায়তা করে সাব্বির শেখ নামের আরেক নরপিশাচ।
শুধু ধর্ষণই নয়, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক খুনের ঘটনা ঘটছে। মা-বাবার হাতে সন্তান, সন্তানের হাতে বাবা-মা, স্বামীর হাতে স্ত্রী, স্ত্রীর হাতে স্বামী, ভাইয়ের হাতে ভাই; এভাবেই প্রতিনিয়ত খুন হচ্ছে মানুষ। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রতিদিন গড়ে অন্তত ১২ জন মানুষ খুন হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে জান্নাতুল নামে ৯ মাসের এক কন্যা সন্তানের গায়ে পেট্রল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেয় তার বাবা জহিরুল ইসলাম। বাড্ডার বনশ্রীর এক বাড়ি থেকে লাইলি নামের এক গৃহকর্মীর লাশ উদ্ধার করা হয়। অভিযোগ রয়েছে বাড়ির মালিক মঈনুদ্দিন ধর্ষণের পর তাকে হত্যা করে। খুলনার পাইকগাছায় ঘুমন্ত অবস্থায় নির্মল অধিকারী নামে এক বৃদ্ধকে কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে তার পুত্র প্রহাদ অধিকারী। গত ১৩ আগস্ট চট্টগ্রামে এনায়েত বাজার এলাকার রানীর দিঘি থেকে সিমেন্ট দিয়ে ঢালাই করা ড্রাম থেকে অজ্ঞাত এক ব্যক্তির গলিত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। গত ২৫ আগস্ট ঢাকা আইডিয়াল ল’ কলেজের ছাত্রী জাকিয়া সুলতানা রূপাকে টাঙ্গাইলের মধুপুরে চলন্ত বাসে ড্রাইভারসহ ৫ জন গণধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করে। বগুড়া-ময়মনসিংহ সড়কে চলাচলকারী ‘নিরাপদ’ পরিবহনের বাসে এই অনিরাপদ ও ন্যক্কারজনক ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
গত ৩০ জুলাই পুলিশ সদর দপ্তরের ত্রৈমাসিক অপরাধ পর্যালোচনার তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে সারাদেশে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়েছে ১ হাজার ৯১৪টি। একটি বেসরকারি সংস্থার তথ্যানুযায়ী, গত বছর বাংলাদেশে ১ হাজার ৫০ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হন। এর মধ্যে ৩ শতাধিক শিশু। একই সময়ে হত্যার শিকার হয় ৪১৫টি শিশু। ২০১৫ সালে ৫২১ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, যাদের মধ্যে ৯৯ জন শিশু গণধর্ষণের শিকার হয়। এমনকি ৩০ জন শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় এবং ৪ জন শিশু ধর্ষণের অপমান সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করে। ২০১৪ সালে ৬৬৬ জন নারী ধর্ষণের শিকার হন। ২০১৩ সালে এ সংখ্যা ছিল ৪০১ জন। এসব পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায় যে, প্রতি বছরের অপরাধের পরিসংখ্যান ছাড়িয়ে যাচ্ছে আগের বছরের রেকর্ড।
সারাদেশে শিক্ষক কর্তৃক একের পর এক ছাত্রীদের যৌন হয়রানির ঘটনায় উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে অভিভাবকদের মধ্যে। তবে পরিবারের প্রশ্রয়ে সন্তান কিভাবে নষ্ট হয় তার নজির ধর্ষক সাফাত। বাবা আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার হোসেন সেলিম ছেলেকে দৈনিক ২ লাখ টাকা দিতেন হাত খরচ হিসেবে। মা-বাবার লাই পেয়ে সন্তান কিভাবে নষ্ট হয় তার আরেকটি জ্বলন্ত উদাহরণ ঐশী। পুলিশ কর্মকর্তা বাবা তাকে মাসে ১ লাখ টাকা দিতেন হাত খরচ বাবদ। এ টাকা দিয়ে ঐশী কী করতো? এখানে আরেকটি প্রশ্ন এসে যায়, পুলিশ কর্মকর্তা বাবার মাসিক আয় কতো হতে পারে যে শুধু হাত খরচ হিসেবে সন্তানকে মাসে এতো টাকা দেয়ার সামর্থ্য রাখেন? নতুন মডেলের মোটরসাইকেল কিনে না দেয়ায় ফরিদপুরে ছেলে মুগ্ধ বাবাকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করে। দেশে স্কুল পড়–য়া শিক্ষার্থীরা এখন স্কুলে একে অপরকে পশ্চিমা কায়দায় প্রেম নিবেদন করছে। হোটেল আর নিষিদ্ধ পল্লীতে মিলছে বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া শিক্ষার্থীর লাশ। বিয়ে ছাড়াই এক সাথে বসবাস করতে গিয়ে হত্যার শিকার হয়েছে মেডিকেল পড়–য়া ছাত্রী।
দ্রুত গতিতে বেড়েই চলছে এ ধরনের সামাজিক অবক্ষয়। অনৈতিকতার চর্চা, নৈরাজ্য, আর পশুত্বে ছেয়ে গেছে সর্বত্র। স্কুল, কোচিং, প্রাইভেট, ঘন ঘন পরীক্ষা, প্রশ্ন ফাঁসসহ নানা বিড়ম্বনার পাশাপাশি অভিভাবকদের গ্রাস করছে সামাজিক অবক্ষয়ের দুর্ভাবনা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও ছড়িয়ে পড়েছে মাদকের সর্বগ্রাসী ছোবল। প্রযুক্তির সহজলভ্যতার কারণে ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়েছে পর্নোগ্রাফি। পর্নোগ্রাফির বিস্তারে নৈতিকতার বাঁধন শিথিল হয়ে যাচ্ছে দ্রুত। মোবাইল এখন পরিণত হয়েছে মিনি কম্পিউটারে। আর মোবাইলের সাথে ইন্টারনেট সংযোগের কারণে হয়েছে অপরাধের পোয়াবারো। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতী এমনকি বয়স্করা পর্যন্ত হারিয়ে যাচ্ছেন ইন্টারনেট দুনিয়ার নিষিদ্ধ গলিতে। আর এ থেকে সমাজে ছড়িয়ে পড়ছে নানা মাত্রিক অপরাধ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে জর্ডানের পোশাক কারখানায় কর্মরত বিধবা এক নারীর সাথে পরিচয় হয় ময়মনসিংহ জেলাস্থ ঈশ্বরগঞ্জের যুবক জুয়েল মিয়ার। জুয়েল মিয়া ওই নারীকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে নিজ গ্রামে নিয়ে সবান্ধব ধর্ষণ করে। এ নিয়ে গত ১১ আগস্ট ঈশ্বরগঞ্জ থানায় ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন নির্যাতিতা নারী।
আধুনিক প্রযুক্তির অন্যতম হাতিয়ার কম্পিউটার ব্যবহারকারীর ৮০ শতাংশ ও মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর ৮৫ শতাংশ পর্নোগ্রাফি দেখছে। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের একটি সংস্থা কর্তৃক ১৪ থেকে ২৪ বছরের তরুণ-তরুণীদের মধ্যে চালানো এক বিশেষ জরিপে দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে মারাত্মক আকারে ছড়িয়ে পড়েছে অশালীনতা, নিসঙ্গতা আর হতাশার উপকরণ।
বিকৃতির প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক। বিকৃতির ধরনও অবাক করার মতো। ইদানীং ছেলে শিশুকে শিক্ষক কর্তৃক নির্যাতনের খবর প্রায়শই খবরের শিরোনাম হচ্ছে। শুধু পাশবিক নির্যাতনই নয়, নির্যাতনের পর হত্যাও করা হচ্ছে। গত জানুয়ারি মাসে মুক্তাগাছায় এক মাদ্রাসা পড়–য়া শিশুকে বলাৎকারের পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। একইভাবে চট্টগ্রামের সেগুনবাগান তালিমুল কুরআন মাদ্রাসা থেকে এক শিশু ছাত্রের লাশ উদ্ধার করা হয়। ছেলে শিশু বলাৎকারের বদনাম থেকে মাদ্রাসা ও গৃহশিক্ষকরা কেন যেন বেরিয়ে আসতে পারছেন না।
সমাজে ছড়িয়ে পড়া নানা মাত্রিক অপরাধ ও বিকৃতির পেছনে এক শ্রেণির মানুষের হঠাৎ করে বিশাল বিত্তবৈভবের মালিক বনে যাওয়ার যোগসূত্র রয়েছে বলে মনে করেন অনেক সমাজবিজ্ঞানী। চোখের সামনে বিত্তহীন লোকজন হঠাৎ করে কোটিপতি বনে যাচ্ছে নানাভাবে। লুটপাট, ঘুষ, দুর্নীতি, চুরি, দখল, ক্ষমতার জোর, প্রতারণা, চাঁদাবাজি, মজুতদারি সিন্ডিকেট, ভেজাল কারবার, মাদক ও নারীকেন্দ্রিক জমজমাট নিষিদ্ধ ব্যবসাসহ নানাভাবে সমাজের একটি শ্রেণি রাতারাতি অগাধ সম্পত্তির মালিক হয়ে যাচ্ছে। ফলে দ্রুত বাড়ছে বৈষম্য। ধন-সম্পদ অর্জনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা সম্পদশালী এবং সম্পদহীন উভয় গোষ্ঠীকেই অপরাধে জড়িয়ে ফেলছে। বিনোদন জগতের বাসিন্দারা সমাজের বিত্তবানদের কদর্য জীবনে যোগ করেছেন মনোরঞ্জনের নতুন মাত্রা। অনেকে মডেলিং ও অভিনয়ের পাশাপাশি সমানভাবে চালিয়ে যাচ্ছে নানা মহলে মনোরঞ্জনের কাজ। শোবিজ নয় এটাই অনেকের আয়ের বড় উৎস বলে শোনা যায়। তবে এখানেই শেষ নয়, এসব অভিনেত্রীর এক সময় আশ্রয় হয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে। আবার তিন্নির মতো কেউ কেউ খুনের শিকার হন, কেউ হতাশায় পড়ে আত্মহননের পথ বেছে নেন। রাজধানীর কদমতলীতে এক উপস্থাপিকা ও মডেলকে ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত অভিনেতা ও মডেল সরিফুল ইসলাম নান্টুকে গ্রেপ্তারের দাবি করছেন ভুক্তভোগীর স্বজনরা।
সমাজের এ অবস্থা থেকে উত্তরণ কোন পথে? কিংবা পথগুলো কী অথবা আমরাই কি এর পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছি? গত ৭ আগস্ট রাজধানীর সেগুনবাগিচাস্থ বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কিশোরগঞ্জের ভৈরব থানার চন্ডিবের গ্রামের মো. ফরিদ মিয়া অভিযোগ করেন, প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আহ্বানে মাদক বিক্রি ছেড়ে দিয়ে তিনি চরম বিপাকে পড়েছেন। বলেন, পুলিশ তাকে মাদক ব্যবসা করতে জোর করে বাধ্য করছে। মাদক ব্যবসা করুক বা না-করুক তাকে প্রতি মাসে থানায় ৫০ হাজার টাকা দিতে হবে বলে সংশ্লিষ্ট থানার ওসি জানিয়ে দিয়েছেন। অভিযোগটির সত্যতা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ থাকলেও চিন্তা ও গবেষণা করার মতো প্রচুর উপাদান এতে বিদ্যমান।
নিবন্ধের শেষ পর্যায়ে বলতে চাচ্ছি, সমাজে দিলদার হোসেনের মতো বাবা যেমন আছেন যাদের লাই পেয়ে সন্তান বিপথগামী হচ্ছে, তেমনি আবার বরগুনার বেতাগীর ধর্ষক রবিউলের বাবার মতো লোকও আছেন যারা অপরাধ ও অপরাধীর বিরুদ্ধে সজাগ। রবিউলের বাবাকে ধন্যবাদ জানিয়ে পুনরায় বলছি, ধর্মীয় মূল্যবোধের পুনর্জাগরণের পথ খুলে দেয়ার এখনই সময়।