ফিচার

ইয়াজিদি সম্প্রদায় কি শয়তানের উপাসক?

মেজর তারিকুল ইসলাম মজুমদার পিএসসি, জি (অব.) : সে দিনও পৃথিবীর লোকেরা ইয়াজিদি সম্প্রদায় সম্পর্কে কিছুই জানত না। এই সম্প্রদায় সম্পর্কে পৃথিবীর মানুষ সর্বপ্রথম জানতে পারে ২৪ জুলাই ২০১৭ সালে যখন এখলাস ইয়াজিদি নামের ১৭ বছরের একজন ইয়াজিদি মেয়ে বিবিসির নিউজ চ্যানেলে ভিক্টোরিয়া ডার্বিশ্যায়ার প্রোগ্রামে তার দুঃখের কথা বর্ণনা করে। সন্ত্রাসী সংগঠন আইএসের হাতে ৬ মাস বন্দি ছিল এখলাস।
ইরাকের উত্তর-পূর্বের শহর মসুল। এই মসুলেই হয়েছিল আইএসের গোড়াপত্তন। মসুলের পরেই কুর্দিস্তান। মসুল শহরের ১২০ কিলোমিটার পশ্চিমে সিনজার শহরটির অবস্থান। এই সিনজার শহরেই ইয়াজিদিদের বসবাস। ২ আগস্ট ২০১৪ সালের ঘটনা। তাদের ধর্মীয় উৎসবের এই দিনে আইএস সিনজার আক্রমণ করে। এখলাসের সঙ্গে আরও ১৫০ জন মেয়েকে আইএস ধরে নিয়ে যায়।
১৯৯৬ থেকে ১৯৯৭ সালের প্রায় ১৩ মাস আমি উত্তর ইরাক তথা কুর্দিস্তানে ছিলাম। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী এই মিশনে আমাদের প্রধান দায়িত্ব ছিল ‘তেলের বিনিময়ে খাদ্য’ কর্মসূচির আওতায় আগত সকল খাদ্য-দ্রব্য কুর্দিস্তানের ভেতর দিয়ে ইরাকের মসুল শহরে পৌঁছে দেয়া। সেই সুবাদে কুর্দিস্তানের প্রধান ৪টি শহর এরবিল, সোলেমানিয়া, দহুক ও জাকোতে আমাদের অবাধ বিচরণ ছিল।
দহুক শহরে আমাদের জাতিসংঘের অফিসটি ছিল শহরের উত্তরে সবচেয়ে বড় পর্বত ‘বেখের’-এর পাদদেশে। একদিন বিকেলে সহকর্মীদের না জানিয়েই বেখের পর্বতের একেবারে ঢালুতে অবস্থিত শহরের কেন্দ্রস্থলে চলে গেলাম। চারদিক দেখতে দেখতেই কখন যে সন্ধ্যা হয়ে গেল, তারপর রাত। অবশেষে পথ ভুলে যাওয়া, অগত্যা ট্যাক্সি ক্যাবের সাহায্য নিতে হলো।
ট্যাক্সিতে উঠতেই আমার পরিচয় জিজ্ঞাসা করলেন ড্রাইভার সাহেব। তারপর নিজের পরিচয় পর্বে বললেন ‘আমি একজন ইয়াজিদি’। সেই প্রথমবারের মতো ইয়াজিদিদের সম্পর্কে আমি জানলাম। আমার আগ্রহ বেড়ে গেল। আমাদের দোভাষীকে জিজ্ঞাসা করতেই তিনি একগাল রহস্যপূর্ণ হাসি দিলেন। একপর্যায়ে বললেন ‘তুমি জান না তারা শয়তানের উপাসক’?
কৌতূহল আরও বেড়ে গেল। ১৯৯৭ সালের জানুয়ারি মাসেই কৌতূহল মেটানোর সুযোগ এসে গেল। আমরা তখন কুর্দিস্তানের একেবারে উত্তরের শহর জাকোতে অবস্থান করছিলাম। জাকো শহরের দক্ষিণ-পূর্বে প্রায় ১১১ কিলোমিটার দূরে লালিশ গ্রামটি অবস্থিত। সেখানেই রয়েছে ইয়াজিদিদের তীর্থস্থান শেখ আদি ইবনে মুনাফিরের মাজার। এটাই ইয়াজিদিদের ‘মক্কা’। এখানে তারা প্রতি বছর ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে ১ অক্টোবর পর্যন্ত ৭ দিন হজ পালন করে থাকেন। এখানে আরও রয়েছে দুটি পবিত্র ঝরনা, যার নাম জমজম। আরও রয়েছে আরাফাত পর্বতমালা। মুসলমানদের সঙ্গে কী অর্পূব মিল।
শেখ আদি ইবনে মুনাফিরের মাজারে যেতেই আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন প্রধান পুরোহিত। আপাদমস্তক সাদা পোশাকে ঢাকা। বিশাল শ্মশ্রু ও গোঁফে ভরা মুখ। মাথায় পাগড়ি। দেখতে ঠিক পীরের মতো অবয়ব। প্রথম সাক্ষাতেই ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের প্রধান পুরোহিত আমাদের সাদর সম্ভাষণ জানালেন ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলে। আমার ড্যানিশ সহকর্মীরা কিছু না বলতে পারলেও আমি উত্তর দিলাম ‘ওয়া আলাইকুম আসসালাম’। পুরো ব্যাপারটি আমাকে বিভ্রান্তের বেড়াজালে আটকে দিল। তবে যে ওরা বলল তারা শয়তানের উপাসক? আমি শুধু নিজেকে প্রশ্ন করে যাচ্ছি, কে ওরা?
অতীতে ঐতিহাসিক ট্রাইগ্রিস নদীর তীরবর্তী একটি বিশাল এলাকা গড়ে উঠেছিল যাকে এক কথায় বলা হতো ‘মেসোপটেমিয়া’। এই মেসোপটেমিয়া অঞ্চলেই প্রায় ৪ হাজার বছর পূর্বে হালের ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের ব্যুৎপত্তি। এটা এমন একটা সময় যখন পারস্য উপকূলে জরথুষ্ট্র ধর্মের প্রচলন হয়েছিল। ইয়াজিদিরা এই ধর্মেরই একটি প্রশাখা।
এখানে দেখার মতো বিষয় হলো ইয়াজিদিরা এক আল্লাহকেই বিশ্বাস করে। তারা মনে করে আল্লাহ এই পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। আর পৃথিবী পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছেন ৭ জন ফেরেশতাকে। তাঁরা হলেনÑ ১. মেলেক তাঊস (আজরাইল), ২. জিবরাইল, ৩. মিকাইল, ৪. রাফাইল (ইসরাফিল), ৫. দাদরাইল, ৬. আজরাফিল এবং ৭. শামকিল (শেমাইল)। আর এদের সর্দার হলেন ‘মেলেক তাঊস’।
সম্মানিত পাঠক হয়ত ভাবছেন কি অপূর্ব মিল ইসলাম ধর্মের সঙ্গে। কিন্তু আসল কথা হলো ইয়াজিদিরা বলেন, আল্লাহ প্রথমেই নিজের রোশনাই থেকে মেলেক তাঊস ফেরেশতাকে সৃষ্টি করেছেন। তারপর সৃষ্টি করেছেন অন্য ৬ জন ফেরেশতাকে। সৃষ্টি করার পর আল্লাহতায়ালা মেলেক তাঊসকে অন্য কাউকে সেজদা না করার জন্য হুকুম দেন। তারপর আল্লাহ অন্যান্য ফেরেশতাদের সৃষ্টি করেন। দুনিয়া থেকে মাটি এনে আদমকে সৃষ্টি করেন। আদমকে জীবন দান করেন। আল্লাহ তখন সকল ফেরেশতাকে হুকুম করেন আদমকে সেজদা করতে। মেলেক তাঊস ব্যতীত সকল ফেরেশতাই সেজদা করল। জবাবে মেলেক তাঊস বললেন ‘আমি তোমার রোশনাই থেকে সৃষ্ট, আর আদম মাটি থেকে সৃষ্ট। তাকে আমি সেজদা করব কিভাবে?’ আর তখন মহান রাব্বুল আলামিন মেলেক তাঊসের খুব প্রশংসা করেন, সকল ফেরেশতাদের সর্দার বানিয়ে দেন এবং পৃথিবীতে তাকে প্রতিনিধি হিসেবে প্রেরণ করেন। অথচ পবিত্র কুরআনে তার বিপরীত কথাই লেখা রয়েছে সুরা আল-বাকারাহ’র ৩৪নং আয়াতে।
এখানেই মুসলমানদের সঙ্গে ইয়াজিদিদের পার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে। মুসলমানদের মতে, ইয়াজিদিদের তথাকথিত শ্রেষ্ঠতম ফেরেশতা ‘মেলেক তাঊস’ আসলে ‘ইবলিস’। তা-ই তাদেরকে ‘শয়তানের পূজারি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে মুসলমান ও অন্যান্য একেশ্বরবাদীরা।
ইয়াজিদি নামকরণ নিয়ে রয়েছে নানা মত। পশ্চিমা শিক্ষাবিদদের মধ্যে অনেকে মনে করেন এই নামটি উমাইয়া খলিফা মুয়াবিয়ার পুত্র ইয়াজিদের নাম থেকে এসেছে। ইয়াজিদিদের লালিশে রয়েছে তাদের বিশ্বাসের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব শেখ আদি ইবনে মুনাফিরের মাজার। কে এই শেখ মুনাফির? তিনি হলেন উমাইয়া খলিফা মারওয়ান ইবনে আল-হাকামের বংশধর। তিনি ১০৭০ সালে লেবাননের বেকা উপত্যকায় জন্মগ্রহণ করেন। ইয়াজিদিরা শেখ আদিকে মেলেক তাঊসের অবতার হিসেবে মনে করেন। শেখ আদি প্রাথমিক পর্যায়ে বাগদাদে অনেকদিন বসবাস করেন। পরবর্তীতে লালিশে গিয়ে ইয়াজিদিদের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।
বর্তমানে ইয়াজিদিদের রয়েছে বিশাল এক সম্প্রদায়। বর্তমানে জনসংখ্যা প্রায় ১২ লাখের মতো। তন্মধ্যে ইরাকের কুর্দিস্তানে রয়েছে ৬ লাখ ৫০ হাজার, জার্মানিতে ১ লাখ ২০ হাজার, সিরিয়াতে ৭০ হাজার, রাশিয়াতে ৬০ হাজার, আর্মেনিয়াতে ৩৫ হাজার, জর্জিয়াতে ৩০ হাজার আর সুদূর সুইডেনে আছে ৭ হাজার ইয়াজিদি। প্রতি বছর লালিশে ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে ১ অক্টোবর পর্যন্ত ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের বিশাল হজ পালিত হয়। একজন ট্যুরিস্ট হিসেবে আপনিও সেখানে গিয়ে দেখে আসতে পারেন।
লেখক : উপপরিচালক (অর্থ ও প্রশাসন)
আর্মি ইনস্টিটিউট অব
বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন
জালালাবাদ সেনানিবাস, সিলেট