চতুর্থবারের মতো জার্মান চ্যান্সেলর হতে যাচ্ছেন অ্যাঞ্জেলা মার্কেল

| September 25, 2017

নিজস্ব প্রতিবেদক : চতুর্থবারের মতো জয়লাভের ল্েয নির্বাচনি প্রচারাভিযান শুরু করেছেন জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেল। ২০০৫ সালে মতায় আসার পর থেকে ক্রমাগত সাফল্যের শিখরে আরোহণকারী মার্কেল এবারও তার দল মধ্যপন্থি ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নকে (সিডিইউ) জয়ের বন্দরে পৌঁছাতে চাচ্ছেন। তবে মার্টিন শুলজের নেতৃত্বাধীন প্রধান বিরোধী দল বাম ঝোঁকসম্পন্ন মধ্যপন্থি সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এসডিপি) প হতে এবার শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলার অঙ্গীকার করা হয়েছে। এর বাইরে কট্টর বিদ্বেষবাদী অলটারনেটিভ ফর ডয়েসল্যান্ড (এএফডি) ও পরিবেশবাদী গ্রিন পার্টি নিজ নিজ অবস্থান থেকে মার্কেলের দলকে পরাজিত করার চেষ্টা শুরু করেছে। গত ১৩ আগস্ট থেকে শুরু হয়েছে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনি প্রচারাভিযান। আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর জার্মানিতে নির্বাচন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সেই নির্বাচনে চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেল ও তার দল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নের যে বিজয় ঘটবে তা প্রায় নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। তারা বলেন, নির্বাচনি দৃশ্যপট দেখে অন্তত তাই মনে হচ্ছে। আর পর্যবেক্ষক মহলের ধারণা সঠিক হলে এটা হবে মার্কেলের চতুর্থ মেয়াদের জন্য মতায় থাকা। ভক্তদের কাছে মার্কেল হলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভøাদিমির পুতিনের যোগ্য সমক। তিনি এমন ঔদার্যের অধিকারী যিনি সিরীয় শরণার্থীদের জন্য জার্মানির দুয়ার উন্মুক্ত করে দিয়েছেন; যেমনটি মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশের দুয়ার খুলে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে জার্মানির বিরোধী দলের নেতাদের কাছে মার্কেল একজন খলনায়ক। অভিবাসন প্রশ্নে তার অবিবেচনাপ্রসূত পদপে জার্মানিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে বলে তারা মনে করেন। স্বয়ং ট্রাম্পও একবার মন্তব্য করেছিলেন যে, অ্যাঞ্জেলা মার্কেলের কৃচ্ছ্রতা নীতির কারণে দণি ইউরোপের সর্বনাশ ঘটছে। তবে তার ভক্ত ও সমর্থকদের ধারণা অ্যাঞ্জেলা মার্কেল একজন অতি মানবী। তার নেতৃত্বে জার্মানির অগ্রগতি হয়েছে শুধু নয়, বিশ্ব রাজনৈতিক অঙ্গনে দেশটির ভাবমূর্তি ও অবস্থানও সুদৃঢ় হয়েছে। অনেকে তাকে পাশ্চাত্যের উদারপন্থিদের শেষ দুর্গ বলে আখ্যায়িত করে থাকেন। তিনি ইউরোপে রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান শক্তির ভারসাম্য রা করছেন। জার্মানিতে এসে ঢোকা অসংখ্য সিরীয় শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে তাদের জীবনধারণের ব্যবস্থা করছেন।
মার্কেলকে কখনো কখনো ইউরোপের ডি ফ্যাক্টো নেতা বা ভাগ্যনির্ধারণকারী আখ্যা দেয়া হয়। ইউরোপের বাজারগুলোকে অর্থ ঢেলে সয়লাব করে দেয়ার প্রতিনিয়ত চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে তিনি জার্মান স্টাইলের যে ব্যয় সঙ্কোচ ব্যবস্থা ও সংস্কার চাপিয়ে দিয়েছেন তাতে দণি ইউরোপে তার বন্ধু তেমন জোটেনি বটে তবে অন্য সবার কাছে তিনি এই সংকট মোকাবিলায় দৃঢ় ভূমিকার জন্য প্রশংসিত হয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আসন্ন নির্বাচনে তার বিজয় যে অনিবার্য তার একটা কারণ ২০০৫ সালে তিনি জার্মানির কা-ারি হিসেবে হাল ধরার পর থেকে দেশটি সমৃদ্ধি অর্জন করেছে। বেকারত্ব ১১ দশমিক ২ শতাংশ থেকে ৩ দশমিক ৮ শতাংশে হ্রাস পেয়েছে। মজুরি বাড়ছে। ভোক্তাদের আস্থা উঁচুতে আছে। শ্রমবাজার সংস্কারে অটল থেকেছেন মার্কেল। দেশকে তিনি এক স্থিতিশীল ও আদর্শ বিযুক্ত রাজনৈতিক নেতৃত্ব জুগিয়েছেন। জার্মান সমাজ আরও বেশি উন্মুক্ত হয়েছে।
ইউরো সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা থেকে আসা উদ্বাস্তুর ঢল মার্কেল যেভাবে সামাল দিয়েছেন তাতে তিনি নিজেকে ইউরোপের অপরিহার্য অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে প্রমাণ করেছেন। রাশিয়ার বিরুদ্ধে অবরোধ ও প্যারিস জলবায়ু চুক্তি সংক্রান্ত শীর্ষ বৈঠকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। আন্তর্জাতিক বোঝাও জার্মানি নিজের কাঁধে নিয়েছে। আফগানিস্তান, মালি ও লিথুয়ানিয়ায়ও যে পরিসরে সৈন্য পাঠিয়েছে এক দশক আগে তা কল্পনাও করা যেত না। ন্যাটোর প্রতিরা ব্যয় মেটাতে জিডিপির ২ শতাংশ বরাদ্দের টার্গেটের প্রতি তার অঙ্গীকার থেকে বোঝা যায় জার্মানির প্রবৃদ্ধি কিভাবে ঘটে চলেছে। জার্মানি এখনও এমন কিছু জিনিস তৈরি করছে, যা উদীয়মানদের মধ্যে পরাক্রান্ত দেশ চীনও তৈরি করতে পারেনি এবং সেগুলো জার্মানি থেকে আমদানি করতে হয় তাদের। জার্মানি এখন প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের স্বর্ণযুগের মধ্য দিয়ে চলেছে।
এসব অর্জন সত্ত্বেও মার্কেলের অনেক কাজ এখনও অসমাপ্তই রয়ে গেছে। দেশকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করার সুযোগ তিনি পেয়েছিলেন। কিন্তু সে সুযোগ তিনি হেলায় হারিয়েছেন বলে সমালোচকরা মনে করেন। অবকাঠামো উন্নয়নে তিনি খুব সামান্যই বিনিয়োগ করেছেন। ২০১২ সাল থেকে জার্মান অবকাঠামোর নিট মূল্য হ্রাস পেয়েছে। দেশটির ব্যাংকগুলোর স্পিড বিশ্বে ১২তম স্থান থেকে নেমে এসেছে ২৯তম স্থানে। ইন্টারনেটভিত্তিক পণ্যের ও ইলেকট্রনিক পণ্যের নতুন শিল্পগুলো অনুন্নত। জার্মানির মহাশক্তিধর অটোমোবাইল শিল্প এখনও ডিজেলনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। মার্কেল পিছিয়ে পড়ে থাকা জার্মানদের জন্য তেমন কিছুই করতে পারেননি। সমাজে অসাম্য বাড়ছে এবং তেমনি বাড়ছে ফুড ব্যাংকের ব্যবহার। জ্বালানির প্রচলিত উৎস বাদ দিয়ে নবায়নযোগ্য এনার্জির ব্যবহার এত বেশি মন্থর ও ব্যয়বহুল হয়েছে যে জার্মানিতে কয়লার ব্যবহার ও তার পরিণতিতে কার্বন নির্গমন বাড়ছে। হঠাৎ করে দেশের পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দেয়ায় পরিস্থিতি আরো কঠিন রূপ নিয়েছে।
২০০৮ সাল থেকে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক মন্দার এই বছরগুলোতে ইউরোপ একের পর এক সরকার পতন প্রত্য করেছে। মন্দার দৌরাত্ম্য অর্থনীতিকে ছেদ করে রাজনৈতিক অঙ্গনে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। প্রচারের পরিবর্তে প্ররোচনা, সঠিক তথ্যের পরিবর্তে অনুমান নির্ভরতা, মেলবন্ধনের পরিবর্তে বিদ্বেষবাদের রাজনীতি ইউরোপকে ছেয়ে ফেলেছে। এেেত্র জাজ্বল্যমান ব্যতিক্রম অ্যাঞ্জেলা মার্কেল। তিনি জার্মানিতে মন্দার আঘাত পড়তে দেননি, আবার মন্দা উদ্ভূত বিদ্বেষবাদের রাজনীতির কাছেও মাথা নত করেননি।
ইউরোপের অন্য দেশগুলোর মতো জার্মানিতেও অনেক দিন ধরে অভিবাসী শরণার্থী কিংবা সন্ত্রাসবাদ নিয়ে বিদ্বেষবাদীরা মাঠ গরম করার চেষ্টা চালাচ্ছে। এএফডি-এর মতো মাত্র কয়েক বছর পূর্বে গঠিত দলটি এসব সম্বল করে জার্মানির বিভিন্ন আঞ্চলিক নির্বাচনে চমক দেখিয়েছে। আসন্ন নির্বাচনে ৫ শতাংশ ভোট পেলেই দলটি আইনসভাতে প্রবেশ করবে। একবার আইনসভাতে প্রবেশ করলে এএফডি যে অভিবাসী-শরণার্থী ইস্যু নিয়ে নতুন করে ঘৃণার রাজনীতিতে নামবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
তারপরও এবারের নির্বাচনে যে অ্যাঞ্জেলা মার্কেল জিতে যাবেন তাতে কোনো সন্দেহ দেখছেন না নির্বাচন জরিপকারীরা। তবে নির্বাচনি পর্যবেক্ষকদের অভিমত, এবারের নির্বাচনে অ্যাঞ্জেলা মার্কেলকে কোয়ালিশন করতে হবে এবং সেটা সম্ভবত মধ্য বাম সোশ্যাল ডেমোক্রেটদের অথবা এফডিপির সঙ্গে কিংবা উভয়ের সঙ্গে হতে পারে।

Category: আন্তর্জাতিক

About admin: View author profile.

Comments are closed.