প্রতিবেদন

চলমান রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রোডম্যাপ ঘোষণা

নিজস্ব প্রতিবেদক : চলমান রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে একটি রোডম্যাপ ঘোষণা করেছেন। ১৯ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন (ওআইসি) কনট্যাক্ট গ্র“পের বৈঠকে শেখ হাসিনা এই ৬ দফা প্রস্তাব পেশ করেন।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭২তম অধিবেশনের ফাঁকে ওআইসি কনট্যাক্ট গ্র“পের বৈঠকে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা এই ‘জাতিগত নির্মূল’ অভিযানের অবসান দেখতে চাই। আমাদের মুসলমান ভাইদের এই দুর্দশার অবসান চাই। তিনি বলেন, এই সংকটের সূচনা হয়েছে মিয়ানমারে; তাই মিয়ানমারকেই এর সমাধান করতে হবে। একইসঙ্গে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় ওআইসিভুক্ত দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রোহিঙ্গাদের দুর্দশার চিত্র স্বচে দেখতে মুসলিম নেতাদের বাংলাদেশ সফরের আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আপনারা বাংলাদেশে এলে রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশার কথা শুনতে পারবেন। এই সংকট নিরসনে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর নির্যাতন বন্ধ করে তাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেয়া এবং তাদের জাতীয়তা নিয়ে রাষ্ট্রীয় অপপ্রচার বন্ধ করাসহ ৬টি প্রস্তাব মুসলিম দেশগুলোর নেতাদের সামনে তুলে ধরেন শেখ হাসিনা।
রোহিঙ্গা ইস্যুকেন্দ্রিক শেখ হাসিনার ৬টি প্রস্তাব
১. রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর সব ধরনের নিপীড়ন এই মুহূর্তে বন্ধ করতে হবে।
২. নিরপরাধ বেসামরিক জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য মিয়ানমারের ভেতরে নিরাপদ এলাকা (সেফ জোন) প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে, যেখানে তাদের সুরা দেয়া হবে।
৩. বলপ্রয়োগের ফলে বাস্তুচ্যুত সব রোহিঙ্গা যেন নিরাপদে এবং মর্যাদার সঙ্গে মিয়ানমারে তাদের বাড়িতে ফিরতে পারে, সেই ব্যবস্থা করতে হবে।
৪. রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে কফি আনান কমিশনের সুপারিশ অবিলম্বে নিঃশর্তভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
৫. রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে চিহ্নিত করার যে রাষ্ট্রীয় প্রপাগান্ডা মিয়ানমার চালাচ্ছে, তা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।
৬. রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে না ফেরা পর্যন্ত তাদের জরুরি মানবিক সহায়তা দেয়ার েেত্র বাংলাদেশকে সহযোগিতা করতে হবে ভ্রাতৃপ্রতিম মুসলিম দেশগুলোকে।
বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে গত ২৫ আগস্ট আড়াই ডজন পুলিশ পোস্ট ও একটি সেনা ক্যাম্পে হামলার পর দেশটির সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা মুসলমানদের গ্রামে গ্রামে নতুন করে অভিযানে নামে। বলাবাহুল্য অভিযানের নামে মিয়ানমার সেনাবাহিনী নিরীহ-নিরপরাধ রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ, শিশু ও বৃদ্ধদের ওপর নির্বিচারে হত্যা-নির্যাতন চালায়। এতে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা মুসলিম হতাহত হন এবং অনেকেই প্রাণ ভয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্মীবাহিনী কিভাবে গ্রামে ঢুকে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে মানুষ মারছে, ঘরের ভেতর আটকে রেখে কিভাবে পুড়িয়ে মারা হচ্ছে, লুটপাট চালিয়ে কিভাবে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে, সেই বিবরণ পাওয়া যাচ্ছে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের কথায়।
ওআইসি কনট্যাক্ট গ্র“পের বৈঠকে বিভিন্ন মুসলিম দেশের নেতাদের উপস্থিতিতে বক্তব্যের শুরুতেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘মিয়ানমারে আজ মুসলমান ভাই-বোনেরা জাতিগত নির্মূল অভিযানের মুখোমুখি হয়েছে। রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার কর্তৃপরে চালানো সামরিক অভিযান বিপর্যয়ের সৃষ্টি করেছে। এ ঘটনায় এবারই সবচেয়ে বেশি রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হয়ে দেশান্তরি হতে বাধ্য হয়েছে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, গত ২৫ আগস্ট থেকে নতুন করে ৫ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। এই শরণার্থীদের ৬০ শতাংশই শিশু। বাংলাদেশে আগে থেকেই আরো ৫ লাখ রোহিঙ্গার অবস্থান করছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এখন প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে।
ওআইসি নেতাদের উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, এটা এক অবর্ণনীয় মানবিক বিপর্যয়। আমি নিজে তাদের কাছে গেছি, তাদের মুখ থেকে, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের ভয়াবহ দুর্ভোগের বিবরণ শুনেছি। আমি বলব, আপনারা সবাই আসুন, এই শরণার্থীদের মুখ থেকে শুনে যান, মিয়ানমারে কী রকম নির্মমতা চলছে।’
কয়েক যুগ ধরে প্রায় ৫ লাখ রোহিঙ্গার ভার বহন করে আসা বাংলাদেশের এই দফায় আরও প্রায় ৫ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রবেশ করেছে।
ভূমিস্বল্পতা আর সম্পদের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বাংলাদেশ তাদের আশ্রয়, খাবার আর জরুরি সহায়তা দিয়ে আসছে বলে বৈঠকে জানান প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা বলেন, রোহিঙ্গারা ‘বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অবৈধ অভিবাসী’ বলে দাবি করছে মিয়ানমার কর্তৃপ। অথচ ঐতিহাসিক নথিপত্র বলছে, রোহিঙ্গারা রাখাইন রাজ্যে বসবাস করে আসছে শত শত বছর ধরে। মিয়ানমার সরকার মনে করে রোহিঙ্গা বলে কোনো জাতিসত্তা মিয়ানমারে কখনও ছিল না। যারা রোহিঙ্গা হিসেবে স্বীকৃতির দাবি করছে তারা বাঙালি সন্ত্রাসী।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘মিয়ানমার পরিকল্পিত ও সংগঠিত উপায়ে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বের করে দিচ্ছে। প্রথমত তারা নিবন্ধিত জাতিগোষ্ঠীর তালিকা থেকে রোহিঙ্গাদের বাদ দিয়েছে। তারপর ১৯৮২ সালের আইনে তাদের নাগরিকত্ব দিতে অস্বীকার করা হয়েছে। রোহিঙ্গাদের নিজ দেশেই আইডিপি ক্যাম্পে পাঠিয়েছে তারা।’
রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে ফেরত পাঠানোর জন্য বাংলাদেশ কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে গেলেও মিয়ানমার তাতে সাড়া দিচ্ছে না বলে মুসলিম দেশের নেতাদের জানান শেখ হাসিনা। আপনারা হয়ত মিডিয়ায় দেখেছেন, রোহিঙ্গারা যাতে তাদের নিজের দেশে ফিরতে না পারে সেজন্য সীমান্তজুড়ে ভূমি মাইন পুঁতে রাখছে মিয়ানমার। রোহিঙ্গা সমস্যা মোকাবিলায় ওআইসির সদস্যভুক্ত দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, এ বিষয়ে ওআইসির যেকোনো উদ্যোগে অংশ নিতে বাংলাদেশ প্রস্তুত রয়েছে। এই বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে ওআইসি মহাসচিব ড. ইউসুফ আল ওথাইমিনও রোহিঙ্গাদের পাশে থাকার কথা জানান।