প্রতিবেদন

ব্লু-ইকোনমি জোরদার করতে সরকারের নানামুখী উদ্যোগ


তারেক জোয়ারদার : স্বাধীনতার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার দণি এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে মাত্র ৩ বছরের মাথায় ১৯৭৪ সালে টেরিটরিয়াল ওয়াটার্স অ্যান্ড মেরিটাইম জোন্স অ্যাক্ট পাস করে। এছাড়া ভারত ও মিয়ানমারের সাথে সমুদ্রসীমা নির্ধারণে আলোচনাও ১৯৭৪ সালে শুরু করা হয়। এই আইনটি অনেক আশা জাগালেও পরবর্তী সরকারের নীতিনির্ধারক মহলের উদাসীনতার কারণে বাংলাদেশ তার সমুদ্রসীমা ও সমুদ্রতলদেশে অবস্থিত নানা সম্পদের ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে ব্যর্থ হয়। এ কারণে দণি এশীয় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ প্রথম দেশ হিসেবে এরকম একটি যুগান্তকারী আইন প্রণয়ন করলেও বাস্তবে এর তেমন কোনো প্রতিফলন ঘটাতে পারেনি। মূলত ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর মর্মান্তিক হত্যা ও পটপরিবর্তনের পর এই উদ্যোগ থেমে যায়। ১৯৭৫-পরবর্তী সরকারগুলো সাগরে এবং সাগরের সম্পদে বাংলাদেশের জনগণ ও রাষ্ট্রের স্বার্থে যথাযথ পদপে নিতে ব্যর্থ হয়। সমুদ্রের সংবিধান হিসেবে অভিহিত ১৯৮২ সালের ইউনাইটেড ন্যাশনস কনভেনশন অন দ্য ল অব দ্য সি’র আবির্ভাব বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। বাংলাদেশের সমুদ্রতলদেশ নানা রকম প্রাকৃতিক, খনিজ ও মৎস্য সম্পদে সমৃদ্ধ। আর এই কনভেনশন নিঃসন্দেহে বাংলাদেশকে সুযোগ করে দিয়েছে এসব সম্পদের ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠা ও ব্যবহারের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য। ২০০১ সালে এই আওয়ামী লীগ সরকারই জাতিসংঘ সমুদ্র আইন কনভেনশন অনুসমর্থন করে। ২০০৯ সালে বর্তমান সরকারই ওই আইনের অধীনে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা চূড়ান্তভাবে নির্ধারণের জন্য ভারত ও মিয়ানমারের বিপে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করার সাহসী পদপে গ্রহণ করে।
বর্তমান সরকারের কার্যকরী পদেেপর ফলে প্রতিবেশী দেশ ভারত এবং মিয়ানমারের মধ্যে সমুদ্র বিরোধ নিষ্পত্তির পর বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের মোট সমুদ্র এলাকার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার ৪১৩ বর্গকিলোমিটার। বাংলাদেশের উপকূলীয় সমুদ্রসীমা ৭১২ কিলোমিটার, টেরিটরিয়াল সমুদ্রসীমা ১২ নটিক্যাল মাইল এবং এক্সকুসিভ ইকোনমিক সমুদ্রসীমা (ইইজেড) ২০০ নটিক্যাল মাইল। এই সমুদ্র বিজয়ের ফলে বাংলাদেশের সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতি তথা ব্লু ইকোনমির অপার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। গভীর সমুদ্রে বাংলাদেশের সীমানা নির্ধারণের পর এখন সমুদ্রসম্পদ আহরণের জন্য মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কারণ বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রসীমায় শুধু বিশাল মৎস্য ভা-ার নয়, রয়েছে অফুরন্ত প্রাকৃতিক ও খনিজসম্পদ। বর্তমান বিশ্বে সমুদ্রসম্পদ আহরণের জন্য প্রতিটি দেশ সমুদ্রসীমায় সম্পদের জরিপ, গবেষণা, অনুসন্ধান ও সম্পদ আহরণে ব্যাপক তৎপরতা চালাচ্ছে।
প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচনও করে চলেছে বিভিন্ন দেশ। বাংলাদেশও তার বিশাল সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে চাইছে। বাংলাদেশের মতো একটি উপকূলীয় দেশের জন্য সমুদ্র পরিবহন ও বন্দর সহযোগিতা বৃদ্ধি, মৎস্য আহরণ, মৎস্য রপ্তানি, পর্যটন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সামুদ্রিক খনিজসম্পদ আহরণ, কৃত্রিম দ্বীপ নির্মাণ; সর্বোপরি জীব, রসায়ন, পদার্থ, ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান ও সমুদ্রবিজ্ঞান প্রভৃতি েেত্র উন্নয়নের নতুন দ্বার উন্মোচিত হওয়ার প্রভূত সম্ভাবনা আছে। এ কারণেই সমুদ্রের মৎস্য সম্পদ আহরণ ও তেল-গ্যাস উত্তোলন ছাড়াও নানামুখী উদ্যোগ নিতে কাজ করছে সরকার। সেই ল্েয সরকার এখন মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য কার্যক্রম শুরু করেছে। বঙ্গোপসাগরের তলদেশে কী ধরনের সম্পদ রয়েছে তা এখনও অজানা বাংলাদেশের। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার জন্য এর বিস্তারিত জানা অত্যন্ত জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, বঙ্গোপসাগরের নিচে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি তেল অথবা গ্যাস মজুদ রয়েছে, যা আগামী দিনের জ্বালানি-রাজনীতি ও অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এ কারণে এই অঞ্চলটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করছেন, এশিয়ার অন্যতম জ্বালানি শক্তি হিসেবে বাংলাদেশ অবস্থান করছে। পরবর্তী প্রাকৃতিক গ্যাসের সুপার পাওয়ার হবে দেশটি। আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে মিয়ানমার ও ভারতের সাথে বিরোধপূর্ণ সমুদ্র এলাকায় বাংলাদেশের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই সমুদ্রসীমায় রয়েছে প্রাকৃতিক জ্বালানি সম্পদের অভাবনীয় সম্ভাবনা। সানফ্রান্সিসকো বে এরিয়ার গবেষক ও জার্নালিস্ট জ্যাক ডেচ তাঁর এক কলামে লেখেনÑ এই মুহূর্তে বঙ্গোপসাগরে ২০০ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফুট গ্যাস মজুদের একটি হিসাব কষা হচ্ছে, যা দণি এশিয়ার মধ্যে সর্ববৃহৎ জ্বালানির উৎস হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শুধু গ্যাসই নয়, বঙ্গোপসাগরে ভারী খনিজের সন্ধান পাওয়া গেছে। ভারী খনিজের (হেভি মিনারেল) মধ্যে রয়েছেÑ ইলমেনাইট, টাইটেনিয়াম অক্সাইড, রুটাইল, জিরকন, গার্নেট, ম্যাগনেটাইট, মোনাজাইট, কোবাল্টসহ অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ। এসব মূল্যবান সম্পদ সঠিক উপায়ে উত্তোলন করতে পারলে হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। কক্সবাজার, ইনানী, টেকনাফ, মহেশখালী, নিঝুম দ্বীপ, কুয়াকাটাসহ দেশের সাগর পাড়ের অঞ্চলগুলোতে এই ভারী খনিজ বা কালো সোনা মজুদ আছে। আনুমানিক হিসাবে বাংলাদেশের এই কোস্টাল অঞ্চলে প্রায় ১৬০ হাজার টন জিরকন, ৭০ হাজার টন রুটাইল, ১০ হাজার ২৬ টন ইলমেনাইট, ২২৫ হাজার টন গার্নেট, ১৭ হাজার টন মোনাজাইট ও প্রায় ৮১ হাজার টন ম্যাগনেটাইট মজুদ আছে।
মৎস্য সম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বঙ্গোপসাগর এলাকায় প্রতি বছর ৮০০ মিলিয়ন মেট্রিক টন মাছ ধরা পড়ছে। এর মধ্যে মাত্র দশমিক ৭০ মিলিয়ন মেট্রিক টন মাছ আমাদের দেশের জেলেরা ধরে থাকেন। উন্নত ধরনের জাহাজ ও প্রযুক্তির অভাবে বঙ্গোপসাগরের বিশাল মৎস্য সম্পদের ১ শতাংশও বাংলাদেশের জেলেরা ধরতে পারছে না। মাছ ধরার জন্য নির্মিত বড় জাহাজ (ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিশিং ট্রলার) না থাকায় ২০০ নটিক্যাল মাইলের ভেতর ও বাইরের গভীর সমুদ্রের মৎস্য সম্পদ থেকে কোনো আয় করতে পারছে না বাংলাদেশ।
তাছাড়া আমাদের মালিকানাধীন সমুদ্র এলাকা হতে অন্য কোনো দেশ যাতে মৎস্য আহরণ না করতে পারে সেই ব্যবস্থা করতে হবে। একই সাথে আধুনিক ফিশিং ট্রলার সরবরাহ করার পাশাপাশি জেলেদের প্রশিণ দিয়ে তাদের মৎস্য আহরণ মতা প্রত্যাশিত মাত্রায় বৃদ্ধি করতে হবে। এটি করা গেলে এই খাত থেকেও বাংলাদেশ বহুগুণ বেশি আয় করতে পারবে। দেশের দীর্ঘ উপকূলীয় অঞ্চল বিশেষত চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের উপকূলীয় অঞ্চল জাহাজ শিল্পের জন্য কাজে লাগাতে পারলে জাতীয় অর্থনীতিতে তা আরও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। তাছাড়া সমুদ্রের লোনা পানিকে আটকে সূর্যের তাপ ব্যবহার করে প্রতি বছর প্রায় ১৫ লাখ মেট্রিক টন লবণ উৎপাদন করে দেশের চাহিদা মেটানো হচ্ছে। লবণ চাষে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে লবণ বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব। বাংলাদেশের দুটি সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম ও মংলা দিয়ে প্রতি বছর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রায় ২ হাজার ৬০০ জাহাজের মাধ্যমে ২৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের আমদানি-রপ্তানিতে জাহাজ ভাড়া হিসাবে ব্যয় হয় ৬ বিলিয়ন ডলার। এসব জাহাজের প্রায় সবই বিদেশি মালিকানাধীন। ভবিষ্যতে বাংলাদেশি জাহাজের সংখ্যা বাড়ানো গেলে এই খাতে বড় ধরনের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলে আরও একাধিক সমুদ্রবন্দর ও গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপনের সুযোগ রয়েছে। তাই বর্তমান সরকার এ বিষয়ে অত্যন্ত কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বঙ্গোপসাগরের অপার সম্ভাবনা ও সম্পদ চিহ্নিতকরণ, পরিমাণ নির্ধারণ ও জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে যথাযথভাবে ব্যবহারসহ বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, আবহাওয়ার পরিবর্তন ও দূষণ ইত্যাদি বিষয়ে গবেষণার জন্য সরকার ইতোমধ্যেই কক্সবাজার জেলার রামুতে বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী চিন্তার ফসল হিসেবে পর্যটন শিল্প বিকাশের ল্েয এখানে আন্তর্জাতিক মানের একটি মেরিন অ্যাকুরিয়াম প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও হাতে নেয়া হয়েছে। দেশি-বিদেশি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাথে পর্যায়ক্রমে সহযোগিতা ও গবেষণা পরিচালনার মাধ্যমে এেেত্র যেমন আমাদের নিজস্ব দ জনবল তৈরি হবে, তেমনি দণি এশীয় সমুদ্র-অর্থনীতির উল্লেখযোগ্য অংশ আমরা আমাদের দেশীয় অর্থনীতির অংশ করতে পারব। বঙ্গোপসাগর শুধু আমাদের নীলিমার হাতছানি নয়, এ আমাদের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির অবারিত দণি দুয়ার।
আসলে মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর সামুদ্রিক সম্পদ আহরণের সম্ভাবনাকে বেশ বড় করে দেখা হয়েছিল। এরই অংশ হিসেবে ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে সমুদ্র থেকে মৎস্য সম্পদ আহরণের ল্েয ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো উন্নয়নে বিভিন্ন দাতা দেশ ও সংস্থার কাছে অর্থ সহায়তা চেয়ে আসছে সরকার। আর এ বিষয়ে প্রস্তাবিত একটি প্রকল্পে ২০ কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা সহায়তা দিতে সম্মত হয়েছে বহুজাতিক সহায়তা সংস্থা বিশ্বব্যাংক। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি বছরের শেষের দিকে এ প্রকল্পের সহায়তা প্রস্তাব সংস্থার বোর্ড সভায় উঠবে। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে সমুদ্রে মাছ আহরণ বাড়বে। ফলে শক্তিশালী হবে ব্লু ইকোনমি।
এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংক বলছে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে মাছ আহরণে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে চতুর্থ। আর মাছ চাষে অবস্থান পঞ্চম স্থানে। অভ্যন্তরীণ আহরণ ও চাষের মাধ্যমে মাছ উৎপাদনে এ দেশ সামনের সারিতে থাকলেও পিছিয়ে আছে উপকূলীয় ও সামুদ্রিক মৎস্য আহরণে। দেশের মোট মাছ উৎপাদনের মাত্র সাড়ে ১৮ শতাংশ আসছে উপকূল ও সমুদ্র থেকে। শৃঙ্খলার অভাব, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আর দ জনশক্তির অভাবে বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও উপকূল ও সমুদ্র থেকে পর্যাপ্ত মাছ আসছে না। এ অবস্থায় সমুদ্র থেকে মাছ বিশেষ করে টুনা মাছ আহরণ বাড়াতে প্রকল্পটি হাতে নেয়া হচ্ছে।
সূত্র জানায়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় প্রকল্পটির প্রস্তাবনা পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপনের জন্য প্রস্তাবটি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। একনেকের অনুমোদন পেলে ৫ বছরে টেকসই উপকূলীয় ও সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে মৎস্য অধিদপ্তর।
মূলত উপকূলীয় ও সামুদ্রিক মৎস্য আহরণের পরিমাণ বাড়ানোর ল্য সামনে রেখে প্রকল্পটি হাতে নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাছাড়া দারিদ্র্য বিমোচন এবং পরিবেশের ভারসাম্যও প্রকল্পটির অন্যতম উদ্দেশ্য। প্রকল্পটির মাধ্যমে উপকূলীয় ও সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ ব্যবস্থাপনার উন্নতি করা হবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। মৎস্য চাষ ও মৎস্য আহরণে নিয়োজিত জনশক্তির জীবনমান উন্নয়নে প্রকল্পটিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে বলে জানা যায়। সুশাসন ও টেকসই মৎস্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে প্রকল্পটির আওতায় ৭ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় করা হবে। এ অর্থ ব্যয় করে সরকারি-বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সমতা বাড়ানো হবে। ফলে বাস্তবায়ন, পর্যবেণ, নিয়ন্ত্রণ ও উদ্ধারের সমতা বাড়বে। এ অর্থ ব্যয় করে সরকারি ব্যবস্থাপনার পূর্ণাঙ্গ সংস্কার করা হবে। ২০০৮ সালে প্রণীত মৎস্য নীতির সংস্কার করা হবে এ প্রকল্পের আওতায়। উপকূলীয় মৎস্য ব্যবস্থাপনায় মৎস্য অধিদপ্তরের সমতা বাড়ানো হবে প্রকল্পের মাধ্যমে। তাছাড়া মৎস্য খাতে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, সততা প্রতিষ্ঠা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করায়ও গুরুত্ব দেয়া হবে।
প্রকল্পটির আওতায় মৎস্য আহরণে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর মতায়ন, জীবনযাত্রার মানের উন্নতি ও কাক্সিক্ষত পুষ্টি নিশ্চিত করতে ৫ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার ব্যয় করা হবে। এ প্রকল্পের আওতায় মাছ আহরণে নিয়োজিত জনশক্তির দতা বাড়ানো হবে। তাছাড়া অবকাঠামো উন্নয়ন ও উপকূলীয় জলবায়ু রায়ও অর্থ বরাদ্দ থাকবে। শৃঙ্খলা রায় মৎস্য আহরণে নিয়োজিত জনশক্তিকে পরিচয়পত্র দেয়া হবে প্রকল্পের আওতায়। মাছ আহরণে নিয়ন্ত্রণ আনতে এসব পরিচয়পত্রের বিপরীতে দেয়া হবে খাদ্য সহায়তা।
টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে প্রকল্পটির আওতায় আরও ৬ কোটি ৫০ লাখ ডলার ব্যয় করা হবে। আহরণ করা মাছের মান ধরে রাখার পাশাপাশি সহায়ক শিল্পের মাধ্যমে নতুন করে মূল্য সংযোজনের উদ্যোগ নেয়া হবে এর আওতায়। তাছাড়া ব্লু ইকোনমির উন্নতির মাধ্যমে সামুদ্রিক মাছ রপ্তানিতেও বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হবে।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রতি বছর প্রায় ৩৬০ কোটি ডলার মূল্যমানের মাছ আহরণ করা হয়ে থাকে। এর প্রায় সাড়ে ৫২ শতাংশ আসে মাছ চাষের মাধ্যমে। নদী-নালা ও অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত জলাশয় থেকে আসে ২৯ শতাংশ। অবশিষ্ট ১৯ শতাংশ মাছ আহরণ করা হয় উপকূল ও সমুদ্র থেকে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে প্রায় ৩০ লাখ মেট্রিক টন মাছ আহরণ করা হয়। আর সামুদ্রিক উৎস থেকে আহরণ করা হয় মাত্র ৬ লাখ মেট্রিক টন মাছ। এর বাজার মূল্য প্রায় সাড়ে ৫১ কোটি ডলার। সামুদ্রিক মাছের ৪০ শতাংশ অবদান ইলিশের। আর আহরণ করা মাছের প্রায় ৮ শতাংশ চিংড়ি।
বাংলাদেশের খাদ্য ব্যবস্থাপনায় মৎস্য খাত বড় ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রাণিজ আমিষের প্রায় ৬০ শতাংশ আসছে মাছ থেকে। খাদ্য হিসেবে মাছের ব্যবহারে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর অন্যতম। মৎস্য খাত সংশ্লিষ্ট পেশায় দেশের প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ মানুষ নিয়োজিত আছে। এর মধ্যে সামুদ্রিক মাছ আহরণে নিয়োজিত আছে ৫০ লাখ মানুষ। এরপরও পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ এবং সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে অধিক মাত্রায় পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করলে সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।