যে কারণে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ বাড়ছে

| September 25, 2017

নিজস্ব প্রতিবেদক : দিন দিন দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে আমানতের সুদ হার কমছে। সুদহার এতটাই কমেছে যে, মূল্যস্ফীতির হারের চেয়েও আমানতের সুদহার নিচে নেমে গেছে। এতে ব্যাংকে টাকা রাখলে এক বছরে টাকার ক্রয়মূল্য যতটুকু কমছে ততটুকু সুদও পাচ্ছেন না বিনিয়োগকারী। সঞ্চয়পত্রের সুদও কমানোর কথা উঠেছে। ফলে সঞ্চয়কারীরা এখন ভালো মুনাফা পাওয়ার জন্য পুঁজিবাজারসহ বিকল্প বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকছেন। তবে বিকল্প নিরাপদ বিনিয়োগের ক্ষেত্র খুব বেশি না থাকার কারণে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ ক্রমেই বাড়ছে। এতে গত এক বছর ধরে পুঁজিবাজারের সূচক দ্রুত গতিতে বাড়ছে। বাড়ছে লেনদেনের পরিমাণও। দেশে লাভজনক সঞ্চয়ের সুযোগ কমে আসায় অনেকে গত কয়েক মাস ধরে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছেন। নতুন এ বিনিয়োগের বড় অংশই যাচ্ছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারে। এতে এ খাতের কোম্পানিগুলোতে শেয়ারের দাম ব্যাপক হারে বেড়েছে। গত চার মাসে তালিকাভুক্ত ৩০টি ব্যাংকের শেয়ারের দাম ২৩ থেকে ১৮৪ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এ সময়ে পুঁজিবাজারের লেনদেনেও দেখা যাচ্ছে ব্যাংকিং খাতের প্রাধান্য।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী দেখা যায়, জুলাই শেষে ব্যাংকিং সেক্টরে আমানতের গড় সুদহার দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৮৯ শতাংশ। যা বছরের শুরুতে অর্থাৎ জানুয়ারি মাসে ছিল ৫ দশমিক ১৩ শতাংশ। আর গত বছরের জানুয়ারি মাসে ছিল ৬ দশমিক ২১ শতাংশ। প্রায় ২ বছর ধরে প্রতি মাসেই আমানতের সুদহার ধীরে ধীরে কমছে। এতে হতাশ হচ্ছেন সঞ্চয়কারীরা।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য সূত্রে দেখা যায়, ২০১৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর ডিএসই’র সার্বিক মূল্য সূচক ছিল ৪ হাজার ৫৯৪ পয়েন্ট, যা বর্তমানে ৬ হাজার ২৪০ পয়েন্ট। অর্থাৎ ১ বছরের ব্যবধানে ডিএসই’র সার্বিক মূল্য সূচক বেড়েছে ১ হাজার ৬৪৬ পয়েন্ট বা প্রায় ৩৬ শতাংশ। গত বছর ৭ সেপ্টেম্বর ডিএসইতে লেনদেন হয়েছিল ৪৯৮ কোটি টাকা, যা চলতি বছরের ২০ সেপ্টেম্বর এসে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ লেনদেনও হচ্ছে দ্বিগুণের বেশি।
গত ৪ মাসে বাজারে সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে রূপালী ব্যাংকের শেয়ারের। এ কোম্পানিটির শেয়ারের দাম বেড়েছে ১৮৪ শতাংশ। এছাড়া মার্কেন্টাইল ব্যাংকের শেয়ারের দাম প্রায় ৯১ শতাংশ বেড়েছে। প্রিমিয়ার ব্যাংকের শেয়ারের দাম বেড়েছে ৭৮ শতাংশ। এক্সিম ব্যাংকের শেয়ারের দাম বেড়েছে ৭৪ শতাংশ। আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারের দাম বেড়েছে প্রায় ৬৯ শতাংশ। সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারের দাম বেড়েছে ৬৫ শতাংশ। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারের দাম বেড়েছে ৬২ শতাংশ। সিটি ব্যাংক ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের শেয়ারের দাম বেড়েছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত। এছাড়া ব্যাংক এশিয়ার শেয়ারের দাম বেড়েছে ৫৭ শতাংশ, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ৫৭ শতাংশ, ট্রাস্ট ব্যাংকের ৫৭ শতাংশ, উত্তরা ব্যাংকের ৫৬ শতাংশ, ইস্টার্ন ব্যাংকের ৫৩ শতাংশ, এনসিসি ব্যাংকের ৫৩ শতাংশ এবং ন্যাশনাল ব্যাংকের শেয়ারের দাম বেড়েছে ৫০ শতাংশ। ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের শেয়ারের দাম বেড়েছে ৪৬ শতাংশ, প্রাইম ব্যাংকের ৪৫ শতাংশ, ডা”-বাংলা ব্যাংকের ৪৩ শতাংশ, যমুনা ব্যাংকের ৪২ শতাংশ এবং পূবালী ব্যাংকের শেয়ারের দাম বেড়েছে ৪১ শতাংশ। এর বাইরে এবি ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক এবং সাউথ ইস্ট ব্যাংকের শেয়ারের দাম বেড়েছে ২৩ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ শামসুল আলম এ বিষয়ে স্বদেশ খবরকে বলেন, বর্তমানে ব্যাংকে আমানতের সুদহার খুবই কম। ফলে যারা ব্যাংকে টাকা রেখে নির্দিষ্ট আয় দিয়ে চলতেন তারা তাদের বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আনছেন। অনেকে কিছুটা ভালো মুনাফা পাওয়ার জন্য শেয়ার কিনছেন অথবা কেউ কেউ বেশি লাভের আশায় অন্য কোথাও বিনিয়োগ করে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। ইদানীং শেয়ারবাজারের সব বিনিয়োগকারীরই আগ্রহ ব্যাংক খাতের দিকে। তবে ভালো কোম্পানির সাথে সাথে দুর্বল কোম্পানির শেয়ারের দামও সমানভাবে বাড়ছে। বিনিয়োগকারীরা বাছ-বিচার না করেই শেয়ার কিনছেন। এভাবে ভালো-খারাপ সব কোম্পানির শেয়ারের দাম সমানভাবে বেড়ে যাওয়া পুঁজিবাজারের জন্য টেকসই বলে মনে হচ্ছে না।
ব্যাংকের শেয়ারের দাম বৃদ্ধি প্রসঙ্গে ব্যাংকসংশ্লিষ্ট অনেক অর্থনীতিবিদ বলেন, এটা ঠিক যে, বাজারে কিছু ব্যাংকের শেয়ারের দাম আয়ের তুলনায় অবমূল্যায়িত ছিল। তাছাড়া খাত হিসেবেও ব্যাংকিং খাতের পিই রেশিও (দাম-আয় অনুপাত) কম ছিল। তাই ব্যাংকের শেয়ারের দাম কিছুটা বাড়া যৌক্তিক ছিল। কিন্তু সব ব্যাংকের পরিস্থিতি এক রকম নয়। কিছু ব্যাংকের শেয়ারের দাম তুলনামূলকভাবে অনেক বেড়ে গেছে। এর কারণ হলো যারা নতুনভাবে বিনিয়োগ করতে এসেছেন তাদের মধ্যে কম দামে শেয়ার কেনার প্রবণতা রয়েছে। আর বাজারে সবচেয়ে কম দামে ছিল দুর্বল মৌলভিত্তির ব্যাংকের শেয়ার। ফলে এ ব্যাংকগুলোর শেয়ারের দাম অনেক বেড়ে গেছে। তাছাড়া বাজারে যে ব্যাংকগুলোর শেয়ার কম রয়েছে সেসব ব্যাংকের শেয়ারের দামও বেশি বেড়ে গেছে।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে যখনই নতুন বিনিয়োগকারীদের আগমন ঘটে তখনই ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারে ঊর্ধ্বগতি দেখা দেয়। এর কারণ হলো ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থা তুলনামূলকভাবে বেশি। ফলে তারা বাজারে এসেই এসব কোম্পানির শেয়ার ক্রয় করেন। ডিএসই’র তথ্যানুযায়ী দেখা গেছে, গেল আগস্ট মাসে ব্যাংকের শেয়ারে লেনদেন হয়েছে ৫ হাজার ৬০ কোটি টাকা। যা জুলাই মাসে ছিল ৩ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা। এ হিসেবে আগস্ট মাসে লেনদেন বেড়েছে প্রায় ৫৫ শতাংশ। তাছাড়া বর্তমানে বাজারে লেনদেনের প্রায় অর্ধেকই হচ্ছে ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্ট শেয়ারে। সর্বশেষ গত ২১ সেপ্টেম্বর ডিএসইতে ব্যাংকিং খাতের শেয়ারে লেনদেন হয়েছে ৭৪২ কোটি টাকা। যা ডিএসই’র মোট লেনদেনের প্রায় ৫২ শতাংশ। এদিকে আগস্ট শেষে ব্যাংকিং খাতের পিই রেশিও দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ১১, যা জুলাই মাসে ছিল ৯ দশমিক ৫৮।
মার্চেন্ট ব্যাংকাররা বলছেন, বাজারের জন্য ইতিবাচক দিক হলো পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকছেন। এতে বাজার গতিশীল হয়ে উঠেছে। তবে শুধু একটি খাতে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকলে তা বাজারের জন্য চিন্তার কারণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ এ খাতটিতে দর সংশোধন হলে বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়তে পারেন। তাই বিনিয়োগকারীদের উচিত একটি নির্দিষ্ট খাতে সীমাবদ্ধ না থেকে বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করা।

Category: অর্থনীতি

About admin: View author profile.

Comments are closed.