প্রতিবেদন

রোহিঙ্গা নিধনের সাফাই গাইলেন শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অং সান সু চি

স্বদেশ খবর ডেস্ক : রাখাইন রাজ্যে ২৫ আগস্টের পর থেকে এখন পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের ওপর নির্বিচারে গণহত্যা চালাচ্ছে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে, বসতিগুলো পরিণত করেছে বিরানভূমিতে। প্রাণ বাঁচাতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা দেশ ছেড়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। বিশ্বসম্প্রদায় আশা করেছিল, শান্তিতে নোবেল পাওয়া নেত্রী মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি শেষ পর্যন্ত এই পৈশাচিকতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেবেন। নিপীড়িত মানুষের পে কথা বলবেন। কিন্তু সু চি তাদের হতাশ করেছেন। মাসখানেক ধরে রাখাইনজুড়ে নারকীয় তা-ব চললেও তিনি মুখ খোলেননি। এ নিয়ে বিশ্বজুড়ে চলছে তীব্র সমালোচনা। তার মধ্যেই ১৯ সেপ্টেম্বর জাতির উদ্দেশে ভাষণে সু চি যা বললেন তাতে হতাশা শুধু আরো কয়েক গুণ বাড়লই না, শান্তির দূত হয়ে অশান্তির আগুনে যেন ঘি ঢাললেন তিনি। এক কথায় রোহিঙ্গা নিধনের সাফাই গাইলেন শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অং সান সু চি।
বিশ্ববাসী তার ভাষণে সংকট সমাধানের কোনো পথ খুঁজে পায়নি; বরং সু চির দেয়া ৩০ মিনিটের ভাষণে মিথ্যার জলজ্যান্ত প্রমাণ পেয়েছেন তারা। রোহিঙ্গারা তাদের আবাসস্থল রাখাইন থেকে কেন বাংলাদেশে চলে যাচ্ছে, তাও এখনো জানেন না বলে বিদেশি কূটনীতিক ও সংবাদমাধ্যমে দেদার বলে গেছেন সু চি।
অথচ ১৮ সেপ্টেম্বরও বিদেশি সংস্থাগুলো মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়ি পোড়াতে দেখেছে স্বচ;ে তবুও সু চির দাবি, ৫ সেপ্টেম্বরের পর থেকে কোনো ‘কিয়ারেন্স অপারেশন’ হয়নি। যদিও জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনকে জাতিগত নির্মূল বলে উল্লেখ করেছে। সু চি’র ভাষণে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানের পথ খোঁজার বদলে সত্যকে আড়াল করে মিথ্যা তথ্য প্রচার করায় দেশটির ওপর আরো েেপছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। সু চি’র ভাষণের পর বাংলাদেশের বিশ্লেষকরাও বলছেন, সু চি সেনাবাহিনীর কর্মকা-ের তদন্ত করার কথা বলা তো দূরের কথা, উল্টো রোহিঙ্গাদের নিজস্ব জাতিগত পরিচয় উল্লেখ না করে ‘মুসলমান’ হিসেবে অভিহিত করার মধ্য দিয়ে দুষ্কৃতকারী সেনাবাহিনীকে খুশি রাখার চেষ্টা করেছেন।
গত ২৫ আগস্ট থেকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বর্বর হত্যাকা-ের শিকার হয়েছে নিরস্ত্র হাজারো রোহিঙ্গা। মায়ের কোল থেকে নবজাতক শিশুকে কেড়ে নিয়ে ছুড়ে দিয়েছে জ্বলন্ত আগুনে। স্বামী-সন্তানের সামনে স্ত্রী, মা-বাবার সামনে ধর্ষণের শিকার হয়েছে হাজারো মেয়ে। প্রাণ বাঁচাতে ৫ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা গত এক মাসে বাংলাদেশে ঢুকেছে। আসার পথে সীমান্তে মিয়ানমার কর্তৃক পোঁতা মাইন বিস্ফোরণে হতাহতের ঘটনাও ঘটছে অহরহ। নৌকা ডুবে মারা গেছে কয়েক শ নারী ও শিশু, যাদের লাশ ভাসতে দেখা গেছে নাফ নদীতে। মিয়ানমারের এই বর্বর হত্যাকা-ে বিশ্ব যখন সরব, তখন সু চি মুখে কুলুপ এঁটেছেন। সমালোচনার ভয়ে জাতিসংঘের ৭২তম অধিবেশনে যোগ না দিয়ে পার্লামেন্টে দেয়া ভাষণে মিথ্যার মালা গাঁথলেন, যে মালায় হাজার বছর ধরে রাখাইনে বাস করা রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধের আশ্বাস নেই, তাঁদের নাগরিক অধিকার দেয়ার প্রতিশ্রুতি নেই। হাজারো রোহিঙ্গাকে হত্যাকারী সেনাবাহিনী ও বৌদ্ধ উগ্রবাদীদের বিচারের আওতায় আনার কথা বলা নেই। রোহিঙ্গাদের রোহিঙ্গা হিসেবে পরিচয়ও তুলে ধরেননি সু চি, চিহ্নিত করেছেন মুসলমান হিসেবে। সু চি একবারই ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি উচ্চারণ করেছেন মিয়ানমারের দৃষ্টিতে একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর (আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি) নাম বলার প্রয়োজনে।
সু চি ইংরেজিতে বক্তব্য দিয়েছেন আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য। একদিকে বক্তব্যে আমাদের গণতন্ত্র এখন শিশু, তাকে বাঁচাওÑ এমন ভাব প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে সেনাবাহিনীকেও হাতে রাখতে চাইছেন। এটা তার দ্বিমুখী আচরণেরই বহিঃপ্রকাশ।
বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের ‘যাচাই’ করে যেকোনো সময় ফেরত নেয়ার প্রক্রিয়া শুরুর কথা বলেছেন সু চি। তবে সেই পরীায় বাংলাদেশে আসা নতুন পুরনো মিলে প্রায় ১০ লাখের রোহিঙ্গার মধ্যে কতজন উত্তীর্ণ হতে পারবে, বাংলাদেশি বিশ্লেষকসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে সু চি’র বক্তব্য সেই প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। তারা বলছেন, ভাষণে সু চি বলেছেন, ‘অর্ধেকেরও বেশি রোহিঙ্গা বৈষম্যহীনভাবে রাখাইনে শিা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো সুবিধা পাচ্ছে।’ তার এ বক্তব্যকে ‘সন্দেহজনক’ ও জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান কমিশনের সুপারিশের সঙ্গে ‘সাংঘর্ষিক’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তারা। আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে সু চি আনান কমিশনের সুপারিশসমূহ বাস্তবায়নের কথা বলেছেন। রাখাইনে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দেয়ার কথা বলেছেন।
সুচি বলেছেন, ‘আমি নিশ্চিত করতে পারি যে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়াদের যাচাই করে ফেরত আনার প্রক্রিয়া আমরা যেকোনো সময় শুরু করতে পারি। যারা উদ্বাস্তু হিসেবে চিহ্নিত হবে, তাদের সব ধরনের মানবিক সহায়তা, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়ে কোনো রকম সমস্যা ছাড়াই ফিরিয়ে আনা হবে।’ নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের সঙ্গে স্বারিত প্রত্যাবাসন চুক্তির আওতায় তাদের ফেরত নেয়া হবে বলে জানান তিনি। তবে তার এই বক্তব্যে ভরসা করতে পারছে না আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বাংলাদেশি বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, সু চি তার ভাষণে বলেননি যে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়াদের মধ্যে কতজন ওই যাচাই পরীায় উত্তীর্ণ হবে। যদিও তিনি ফেরত নেয়ার কথা বলেছেন, কিন্তু কে নিশ্চিত করবে যে তারা মিয়ানমারের নাগরিক?
সু চি তার বক্তব্যে বাংলাদেশের সঙ্গে প্রত্যাবাসন চুক্তির আওতায় যাচাই-বাছাই করে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার কথা বলেছেন। তবে ওই চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ একটি পয়েন্ট হলো শুধু যারা স্বেচ্ছায় মিয়ানমারে ফিরতে সম্মতি দেবে, তাদেরই ফেরত পাঠানো যাবে। এর আগে ফেরত পাঠানোর সময় দেখা গেছে অনেকেই পুনরায় নির্যাতনের ভয়ে মিয়ানমারে আর ফেরত যেতে চায় না। ফলে বাংলাদেশ সবাইকে ফেরত পাঠাতে পারেনি।
সু চি’র ভাষণের প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনৈক কর্মকর্তা স্বদেশ খবরকে বলেন, ‘মিয়ানমার থেকে কেন রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসছে, তা জানার জন্য সু চি’র উচিত বাংলাদেশে এসে রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবির ঘুরে তাদের কাছ থেকে জানতে চাওয়া।