প্রতিবেদন

সরকারের নানামুখী উদ্যোগে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি সহজলভ্য হয়েছে ইলিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক : মাছের রাজা ইলিশ। বাংলাদেশের জাতীয় মাছও ইলিশ। যদি বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে সুস্বাদু মাছ কোনটি? সে প্রশ্নেরও সহজ জবাব ইলিশ। আর পদ্মার ইলিশ তো ইলিশের রাজা-রানী। কোনো তুলনাই হয় না যে ইলিশের। বাঙালির রসনা এবং আত্মপরিচয়ের অনুষঙ্গ যে ইলিশ মাছ তা এখন আন্তর্জাতিকভাবেও বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ইলিশ এখন শুধুই বাংলাদেশের।
পৃথিবীর মোট ইলিশের ৬৫ শতাংশ উৎপাদিত হয় বাংলাদেশে। প্রতিবেশী ভারতে উৎপাদিত হয় ১৫ এবং মিয়ানমারে ১০ শতাংশ। বাদবাকি ১০ শতাংশ ইলিশ মেলে আরব সাগরের তীরবর্তী বিভিন্ন দেশ এবং প্রশান্ত এবং আটলান্টিক মহাসাগর তীরবর্তী দেশগুলোতে। কিন্তু অন্য দেশের ইলিশের সঙ্গে বাংলাদেশের ইলিশের স্বাদের পার্থক্য আকাশ-পাতাল। কারণ বাংলাদেশের ইলিশ সংগৃহীত হয় পদ্মা-মেঘনা নদী থেকে। ভারত-মিয়ানমারের ইলিশ সংগৃহীত হয় সমুদ্র থেকে। দুনিয়ার সব দেশে ইলিশের উৎপাদন কমলেও একমাত্র বাংলাদেশে এ মাছের উৎপাদন বাড়ছে। এর কারণ পদ্মা-মেঘনার মোহনায় মাছের অভয়ারণ্য সৃষ্টি। সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় মেঘনা মোহনায় ও পদ্মা-মেঘনার মিলনস্থলের বিভিন্ন পয়েন্টের ১১টি স্থানকে অভায়রণ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে। যে স্থানকে অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়, সে স্থানে সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকে। ফলে ইলিশসহ সব মাছেরই প্রজননক্রিয়া সম্পন্ন করতে সুবিধা হয়। আর এরই ফলশ্রুতিতে দেশে মাছের উৎপাদন বাড়ছে।
বন্যার পরপরই এবার বঙ্গোপসাগরে ঝাঁকে ঝাঁকে ধরা পড়ছে ইলিশ। মেঘনা ও পদ্মা নদীতেও ইলিশ ধরা পড়ছে। রাজধানী ঢাকার পথেঘাটে অলিগলিতেও ইলিশের ছড়াছড়ি। ইলিশ, বড় ইলিশÑ এমন হাঁক শুনেই যেন ঘুম ভাঙে রাজধানীবাসীর। এমনকি বাজারে এখন অন্য মাছের চেয়ে ইলিশ বিক্রেতাকে ঘিরেই জমে উঠছে ক্রেতাদের ভিড়। কম দামে হাতের নাগালেই এবার ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। মানুষ ইলিশ কিনতে পারছে মনের মতো কিংবা চাহিদা ও সমতা অনুসারে। সেপ্টেম্বর মাসজুড়েই ইলিশময় এক সময় যেন চলছে বাংলার ঘরে ঘরে।
মৎস্য বিশেষজ্ঞরা জানান, বন্যার ঢলের সঙ্গে ঘোলাপানিতে ইলিশের বিচরণ বেড়ে যায়। তবে এর চেয়েও বড় বিষয় হচ্ছে এবার ইলিশ প্রজনন মৌসুমে সরকারের কঠোর পদপে ও জেলেদের সচেতনতার কারণে যেমন মা ইলিশ সুরা পেয়েছে, তেমনি জাটকা নিধনও আগের তুলনায় অনেক কম হয়েছে। ইলিশের এমন ছড়াছড়ি বলে দিচ্ছে এসবের সুফল মিলছে।
এবারের ইলিশ প্রজনন মৌসুম একটু দেরিতেই এসেছে। সরকার ১ অক্টোবর থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত নদী থেকে ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ করেছে। ইলিশ ধরার পাশাপাশি বিপণন, বাজারজাতকরণ ও রপ্তানিও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ওই সময়ে যেহেতু জেলেরা বেকার হয়ে পড়বে, তাই জেলেদের ভর্তুকি দেয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছে সরকার। জেলেদের ভর্তুকি দেয়ার কাজটি সরকার গত ৬ বছর ধরে করে আসছে। এর সুফল এখন ভালোভাবেই পাওয়া যাচ্ছে। প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষা পাওয়ায় প্রতি মৌসুমেই প্রচুর ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে পদ্মা-মেঘনায়। সরকারের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় জাটকা নিধন প্রতিহত করা হচ্ছে যথাযথভাবে। কোস্টগার্ড প্রতি বছর লাখ লাখ বর্গফুট কারেন্ট জাল পুড়িয়ে ফেলছে। ফলে বাজারে এখন চাপিলা মাছ পাওয়া যায় না বললেই চলে। তার বদলে যে ইলিশ প্রায় হারিয়েই যাচ্ছিল, তা এখন পাওয়া যাচ্ছে বেসুমার।
ইলিশ বাঙালি সংস্কৃতির অপরিহার্য অংশ বলে বিবেচিত হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে। শ্বশুরবাড়িতে জামাই আদরের অনুষঙ্গ সরিষা ইলিশসহ ইলিশ দিয়ে তৈরি নানা পদের খাবার। দেশের কূটনীতিতেও ইলিশ জেঁকে বসেছে বেশ জোরেশোরে। প্রতিবেশী ভারতের কোনো রাজনৈতিক নেতার বাংলাদেশ সফরে খাবার টেবিলে অনিবার্য হয়ে ওঠে ইলিশের উপস্থিতি। ভারতীয় নেতাদের কাছে বাংলাদেশের রাষ্ট্র নেতাদের পাঠানো উপহারেও স্থান করে নেয় পদ্মার সুস্বাদু ইলিশ।
সেই ইলিশ এখন বাংলাদেশের বাজারে পাওয়া যাচ্ছে ৫০০ থেকে ৬০০ গ্রাম ওজনের ৪০০ টাকা কেজি দরে। ১ কেজি বা তার বেশি ওজনের ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা কেজি দরে। বছর পাঁচেক আগেও এই দরে ইলিশ পাওয়ার বিষয়টি কারো কল্পনায়ও ছিল না। এটা সম্ভব হয়েছে বর্তমান সরকার ইলিশের ঐতিহ্য ফেরানোর জন্য ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করার কারণে। তার মধ্যে জাটকা নিধন বন্ধ করা, প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ ধরা বন্ধ করা, ইলিশের রপ্তানি কিছুদিন বন্ধ রাখা, সাগর ও নদীর মোহনায় ইলিশের অভয়ারণ্য নির্ধারণ করা ইত্যাদি। দেখা গেছে, এসব ইতিবাচক কার্যক্রমের ফলেই গত কয়েক বছর ধরে সারাদেশে ইলিশের ছড়াছড়ি চলছে। মনে হচ্ছে যেন ইলিশের সেই সুদিন আবার ফিরে এসেছে। আগে কয়েক বছর যে পরিমাণ ও ওজনের একটি ইলিশ মাছের যে দাম ছিল তা এখন কোনো কোনো েেত্র অর্ধেকেরও কমে চলে এসেছে। তাছাড়া দেড়-দুই কেজির ওজনের পর্যন্ত ইলিশও এখন কিনতে পাওয়া যাচ্ছ, আগে যা ছিল স্বপ্নের মতো।
সকল শ্রেণি-পেশার মানুষই তাদের স্বাদ, সঙ্গতি ও সাধ্যের মধ্যে ইলিশ মাছ কিনে খেতে পারছেন। অথচ বিশেষ বিশেষ দিনে বিশেষত পহেলা বৈশাখ, কিংবা অন্য কোনো পূজা-পার্বণের সময় নিত্যপ্রয়োজনীয় উপকরণ হিসেবে এ ইলিশ মাছ সোনার চেয়ে বেশি দামি হয়ে যেত। পত্রিকান্তরে প্রতিনিয়ত খবরে প্রকাশ পাচ্ছে এখন ইলিশের এলাকা হিসেবে পরিচিত চাঁদপুর, বরিশাল, ফরিদপুর, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ইত্যাদি স্থানে বাড়িতে বাড়িতে ফেরি করে ইলিশ মাছ বিক্রি করছে সরাসরি জেলেরা। আর গত কয়েক বছর ধরে বেশি বেশি ইলিশ ধরতে পারায় তাদের মুখেও সারাণ হাসির ঝিলিক লেগে থাকছে। মৎস্য বিজ্ঞানীদের মতে, বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে যদি এসব নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায় তবে প্রতি বছরই ইলিশ মাছ এভাবেই সবার জন্য সহজলভ্য হবে। এতে বাংলাদেশের জাতীয় মাছ হিসেবে পরিচিত ইলিশের হারানো গৌরব ফিরতে খুব বেশি সময়ের প্রয়োজন হবে না। মাছ উৎপাদনে এমনিতেই আমরা বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক এগিয়ে রয়েছি। সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, বিশ্বে স্বাদু পানির মৎস্য উৎপাদনে আমরা চতুর্থ স্থান দখল করতে পেরেছি। তবে ইলিশ মাছ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে এখনও আবাদ করা সম্ভব হয়নি। অপরদিকে ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ, সেজন্য একে বাঁচিয়ে রাখতে হলে বর্তমান সরকারের গৃহীত প্রচলিত ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই।