প্রতিবেদন

ছুটিতে প্রধান বিচারপতি : ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির দায়িত্বভার গ্রহণ

নিজস্ব প্রতিবেদক : প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা অসুস্থতাজনিত কারণে ২ অক্টোবর থেকে এক মাসের ছুটিতে গেছেন। অপরদিকে, সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারক বিচারপতি মোহাম্মদ আবদুল ওয়াহহাব মিঞা ৩ অক্টোবর ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন।
আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানিয়েছেন, প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা ক্যান্সারে আক্রান্ত। এ কারণে তিনি ছুটি নিয়েছেন। রাষ্ট্রপতিকে প্রধান বিচারপতি ছুটির বিষয়ে যে চিঠি দিয়েছেন ওই চিঠিতে এ কথা উল্লেখ আছে। সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে আইনমন্ত্রী সাংবাদিকদের এ কথা জানান।
আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ‘প্রধান বিচারপতি তার পত্রে লিখেছেন, তিনি ক্যান্সারসহ নানাবিধ রোগে আক্রান্ত। সেগুলো সম্পূর্ণ সারেনি। উনার বিশ্রাম প্রয়োজন। এ কারণে এক মাসের ছুটি নিয়েছেন।’ আনিসুল হক বলেন, ‘চাপের মুখে প্রধান বিচারপতি ছুটিতে গেছেনÑ এ ধরনের অভিযোগ অসত্য ও ভিত্তিহীন। এর কোনো প্রমাণ নেই।’ মন্ত্রী আরো বলেন, ‘বিচার বিভাগ স্বাধীন হওয়ার পর প্রধান বিচারপতি নিজের ছুটি নিজেই নেন। তিনি ছুটি নিয়ে রাষ্ট্রপতিকে জানিয়েছেন। এটি কারো অনুমোদনের প্রয়োজন নেই। তবে নিয়ম হলো প্রধান বিচারপতি যেহেতু ছুটিতে যাচ্ছেন সেহেতু সাংবিধানিক নিয়ম হলো আরেকজন প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেয়া। আর সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তিনি হবেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি। জ্যেষ্ঠ বিচারকদের মধ্য থেকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেয়া হয়ে থাকে। তাই রাষ্ট্রপতি ২ অক্টোবরই বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞাকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দিয়েছেন। এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনও জারি হয়েছে। ৩ অক্টোবর ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি দায়িত্ব নিয়েছেন।’
এক প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ‘বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা প্রধান বিচারপতির এক মাসের ছুটিকে ‘নজিরবিহীন’ বলে উল্লেখ করেছেন। ওনারা বলে দিলেন, ‘এটা নজিরবিহীন। এ রকম কথা যদি ওনারা বলে থাকেন এমন অবাস্তব কথার জবাব দিতে আমি এখানে বসিনি।’ আইনমন্ত্রী প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘মানুষ অসুস্থও হতে পারবে না?’ আইনমন্ত্রী বলেন, প্রধান বিচারপতির ছুটি নিয়ে বিভিন্ন জল্পনা হচ্ছে। কারো নাম উল্লেখ না করে আনিসুল হক বলেন, জল্পনা কেন? জল্পনার কারণ হচ্ছে ওনারা কিছু একটা ষড়যন্ত্র করার চেষ্টা করছিলেন। গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা নস্যাৎ করার চেষ্টা করছিলেন। সেই চেষ্টায় সফল হবেন না সে কারণে কান্নাকাটি করছেন কেউ কেউ।
আইনমন্ত্রী আরো বলেন, ‘প্রধান বিচারপতি আমাদের জানিয়েছেন, আমরা প্রধান বিচারপতিকে বিশ্বাস করি। প্রধান বিচারপতি আমাদের বলেছেন এবং লিখিতভাবে জানিয়েছেন তিনি অসুস্থ। এর ওপর আমরা কোনো প্রশ্ন করিনি। তিনি আমাদের যেভাবে বলেছেন ঠিক সেভাবেই সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র ব্যবস্থা নিয়েছে। এখন যেহেতু সুপ্রিমকোর্ট চালাতে হবে সে কারণে সংবিধানে যে প্রভিশন আছে, সেই প্রভিশন অনুযায়ী অ্যাকটিং চিফ জাস্টিস (ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি) নিয়োগ দেয়া হয়েছে।’
ছুটির আবেদনে প্রধান
বিচারপতি যা লিখেছেন
প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার ছুটিতে যাওয়া নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে অবশেষে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো তাঁর ছুটির আবেদনটি প্রকাশ করলেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। চাপের মুখে প্রধান বিচারপতিকে ছুটি নিতে বাধ্য করা হয়েছে বলে বিএনপির পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলার পর ৪ অক্টোবর আইনমন্ত্রী প্রধান বিচারপতি সিনহার আবেদনটি প্রকাশ করেন।
সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে আনিসুল হক রাষ্ট্রপতিকে লেখা প্রধান বিচারপতির ওই চিঠিটি প্রথমে পড়ে শোনান। পরে টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে ওই চিঠি তিনি তুলে ধরেন এবং গণমাধ্যম কর্মীদের চিঠির ছবি তোলার অনুমতি দেন। পরে আইন সচিব আবু সালেহ শেখ মো. জহিরুল হকের হাত থেকে সাংবাদিকরা প্রধান বিচারপতির ছুটির আবেদনের ছবি তুলে নেন। রাষ্ট্রপতি বরাবর প্রধান বিচারপতির আবেদন করা চিঠিতে লেখা হয়েছেÑ ‘অসুস্থতাজনিত কারণে ৩ অক্টোবর ২০১৭ খ্রি. হতে ১ নভেম্বর ২০১৭ খ্রি. তারিখ পর্যন্ত ৩০ দিনের ছুটির আবেদন।’ চিঠিতে আরও লেখা রয়েছে, ‘মহাত্মন, আপনার সদয় অবগতির জন্য জানাচ্ছি যে, আমি গত বেশ কিছুদিন যাবৎ নানাবিধ শারীরিক সমস্যায় ভুগছি। আমি ইতঃপূর্বে ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘ সময় চিকিৎসাধীন ছিলাম। বর্তমানে আমি বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছি। আমার শারীরিক সুস্থতার জন্য বিশ্রামের একান্ত প্রয়োজন। ফলে আমি আগামী ৩ অক্টোবর ২০১৭ খ্রি. হতে ১ নভেম্বর ২০১৭ খ্রি. তারিখ পর্যন্ত ৩০ দিনের ছুটি ভোগ করতে ইচ্ছুক।’
আরও লেখা হয়েছে, ‘এমতাবস্থায় আগামী ৩ অক্টোবর ২০১৭ খ্রি. হতে ১ নভেম্বর ২০১৭ খ্রি. তারিখ পর্যন্ত ৩০ (ত্রিশ) দিনের ছুটির বিষয়ে মহাত্মনের সানুগ্রহ অনুমোদন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিনীত অনুরোধ করছি।’ চিঠির নিচে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার স্বাক্ষর রয়েছে। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সাংবাদিকদের পুরো চিঠিটি পড়েও শোনান।
এ সময় আনিসুল হক বলেন, ‘প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বাসায় অসুস্থ আছেন। ৩ অক্টোবর উনাকে ডাক্তার দেখতে যান। ৪ অক্টোবরও ডাক্তার দেখতে যাওয়ার কথা আছে।’ প্রধান বিচারপতির ছুটি নিয়ে বিএনপির বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘তিনি অসুস্থ, এটা নিয়ে রাজনীতির কিছু নেই। আসুন আমরা সবাই মিলে বিচারপতি এস কে সিনহার সুস্থতার জন্য দোয়া করি। বিএনপির নেতৃবৃন্দকে বলব, আসেন দোয়া করি, উনি যেন সুস্থ হয়ে যান।’ আইনমন্ত্রী জানান, চিকিৎসকের সঙ্গে তার কথাবার্তা হচ্ছে। যখন দেখতে যাওয়ার মতো অবস্থা হবে, তখন তিনি বিচারপতি এস কে সিনহাকে দেখতে যাবেন। প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা কি গৃহবন্দি? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘নিশ্চয়ই না।’
দীর্ঘ অবকাশকালীন ছুটি শেষে ৩ অক্টোবর আপিল বিভাগে বসার কথা ছিল প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার। কিন্তু ২ অক্টোবর বিকেল ৩টার দিকে আকস্মিক এক মাসের ছুটি চেয়ে রাষ্ট্রপতি বরাবর চিঠি পাঠান প্রধান বিচারপতি। রাতেই সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিঞাকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি করে গেজেট প্রকাশ করে আইন মন্ত্রণালয়। ফলে ৩ অক্টোবর ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিঞার নেতৃত্বে দীর্ঘ অবকাশের পর আপিল বিভাগের কার্যক্রম শুরু হয়।
সুপ্রিমকোর্টের অবকাশ শুরুর আগে গত ২৪ আগস্ট শেষ অফিস করেন প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা। অবকাশের মধ্যেই গত ১০ সেপ্টেম্বর তিনি দুই সপ্তাহের জন্য বিদেশ সফরে গেলে তার অবর্তমানে আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারক হিসেবে বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিঞাকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব দেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। সুপ্রিমকোর্টের অবকাশের শেষ দিন ছিল ২ অক্টোবর, সেদিনই প্রধান বিচারপতির আরও এক মাসের ছুটিতে যাওয়ার খবর দেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।
পরে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘মহামান্য রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বাংলাদেশের মাননীয় প্রধান বিচারপতি জনাব সুরেন্দ্র কুমার সিনহার শারীরিক অসুস্থতাজনিত কারণে আগামী ৩ অক্টোবর হতে ১ নভেম্বর পর্যন্ত ৩০ দিন ছুটি মঞ্জুরের বিষয়ে সানুগ্রহ অনুমোদন প্রদান করেছেন এবং মাননীয় প্রধান বিচারপতি অসুস্থতাজনিত ছুটি ভোগকালীন সময়ে বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্ট আপিল বিভাগের কর্মে প্রবীণতম বিচারক মাননীয় বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞাকে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির কার্যভার পালনের দায়িত্বভার প্রদান করিয়াছেন।’
সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য হলে কিংবা তার অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে প্রধান বিচারপতি তার দায়িত্ব পালনে অসমর্থ বলে রাষ্ট্রপতির কাছে সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হলে ক্ষেত্রমত অন্য কোনো ব্যক্তি অনুরূপ পদে যোগদান না করা পর্যন্ত কিংবা প্রধান বিচারপতি স্বীয় কার্যভার পুনরায় গ্রহণ না করা পর্যন্ত আপিল বিভাগের অন্যান্য বিচারকের মধ্যে যিনি কর্মে প্রবীণতম, তিনি ওই কার্যভার পালন করবেন। উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পাওয়া বিচারপতি এস কে সিনহার চাকরির মেয়াদ রয়েছে আগামী ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত।