খেলা

দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে বাংলাদেশ ক্রিকেটের পুরনো চেহারা

ক্রীড়া প্রতিবেদক : দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে বাংলাদেশ ক্রিকেটের পুরনো চেহারা দেখলো ক্রিকেট দর্শকরা। যে দল প্রথম ইনিংসে ৩২০ রান করতে পারে, সে দল ৯০ রানে অলআউট হয় কিভাবে? হ্যাঁ তাই হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৩৩৩ রানের বিশাল ব্যবধানে হেরেছেন টাইগাররা। ম্যাচ শেষে অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম বললেন, তিনি মনে করতে পারছেন না, শেষ কবে বাংলাদেশ একশ রানের নিচে অলআউট হয়েছে টেস্টে।
পচেফস্ট্রম টেস্টের শেষ ইনিংসে ৯০ রানে অলআউট হওয়ার পর হতাশ ও বিস্মিত হয়ে গেছেন দলের অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম। তিনি আর কোনো অজুহাত দাঁড় করানোর চেষ্টা করেননি। সোজা বলেছেন, এই পারফরম্যান্সের কোনো ব্যাখ্যা হয় না। নিজেদের পারফরম্যান্সের জন্য জাতির কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চেয়েছেন অধিনায়ক মুশফিক। নিজেদের ব্যাটিং নিয়ে বলতে গিয়ে মুশফিক বলেন, ‘আমাদের ব্যাটিংয়ের ব্যাখ্যার কথা যদি বলেন, অবশ্যই হতাশাজনক। সত্যি বলতে কি, অধিনায়ক হিসেবে আমি নিজেই ভুলে গেছি বাংলাদেশ শেষ কবে এমন ব্যাটিং করেছে। একশ রানের নিচে শেষ কবে অলআউট হয়েছি নিজেও মনে করতে পারছি না। খুবই খারাপ লাগছে।’
সেই ২০০৭ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে শেষবার ১০০ রানের নিচে অলআউট হয়েছিল বাংলাদেশ। খেলায় জয়-পরাজয় আছে। প্রতিপক্ষ ভালো খেললে পরাজয় মেনে নিতেও আপত্তি নেই মুশফিকের। কিন্তু এমন অসহায় আত্মসমর্পণ মেনে নিতে পারছেন না তিনি, ‘হারারও অনেক ধরন আছে। অবশ্যই ম্যাচ বাঁচানো খুব কঠিন হতো। কিন্তু অন্তত দুইটা সেশন খেলার মতো সামর্থ্য তো আমাদের আছে। সেদিক থেকে বলব, অধিনায়ক হিসেবে, ব্যাটসম্যান হিসেবে আমি খুব হতাশ। খুবই খারাপ লাগছে। এভাবে হারতে হবে কখনো ভাবিনি। এই হারের জন্য আমি জাতির কাছে ক্ষমা চাইছি।’
মুশফিককে অবশ্য এর আগেই জেরার মুখে পড়তে হয়েছে টসে জিতে ফিল্ডিং নেয়ার কারণে। ম্যাচশেষে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে মুশফিক বলছিলেন, সম্ভবত তার সিদ্ধান্তটা ভুল হয়েছে। কিন্তু তাতে এই কম রানে অলআউট হওয়া যৌক্তিক হয় না, ‘সম্ভবত ভুল হয়েছে। আমি জানতাম না যে, উইকেট এমন ফ্লাট হবে। তারপরও আমার ধারণা প্রথম ইনিংসে আমাদের ব্যাটসম্যানদের বড় ইনিংস খেলতে না পারাটাই আমাদের ভুগিয়েছে। আর দ্বিতীয় ইনিংসে ১০০ রানের নিচে অলআউট! এটা খুবই হতাশাজনক।’
তবে এখানেই হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিচ্ছেন না মুশফিক। যত দ্রুত সম্ভব এই পারফরম্যান্স ভুলে যেতে চান। তারপর আরও শক্তিশালী হয়ে দ্বিতীয় টেস্টে মাঠে নামার চেষ্টা করবেন বলে আশার কথা শোনালেন, ‘পরের টেস্ট ম্যাচে আমরা চেষ্টা করবো আরও ভালো পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামার। আমাদেরকে মানসিকভাবে আরও শক্তিশালী হতে হবে। আমার মনে হয়, এটাই আমাদের উন্নতি করার আসল জায়গা।’
পরের টেস্টেও মুশফিক প্রথম টেস্টের মতো ভুল করেন। টসে জিতেও তিনি প্রতিপক্ষ দক্ষিণ আফ্রিকাকে ব্যাট করতে দেন। সুযোগ পেয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা ব্লুমফন্টেইন টেস্টের প্রথম দিনেই তুলে ফেলে ৪৩৪ রান। মুশফিকের ভুলে তারা এ রান কোথায় নিয়ে যান, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
কলম্বো টেস্টে কিশোর মুশফিক দেখেছিলেন চোখের সামনে বাংলাদেশ দলকে ৬২ রানে অলআউট হয়ে যেতে। সেটা আজ থেকে দশ বছরেরও বেশি আগের ঘটনা। তারপর থেকে টেস্ট ক্রিকেটে, দুনিয়ায় অনেক কিছু বদলে গেছে। সেই শ্রীলঙ্কা বাঘ থেকে এখন মাটিতে নেমে এসেছে। সেই বাংলাদেশ এখন নিয়মিত জিততে শিখেছে। পাশাপাশি সেই বাংলাদেশও অনেক ম্যাচ হেরেছে। কিন্তু এই ১০ বছরে আর এই লজ্জার ঘটনা ঘটেনি। সেই ২০০৭ সালের পর আর কখনো ১০০ রানের নিচে অলআউট হয়নি বাংলাদেশ।
অবশেষে সেই লজ্জাটা ফিরে এলো পচেফস্ট্রমে। একটা সময় ১০০ রানের নিচে বাংলাদেশের অলআউট হওয়াটা ছিল নিয়মিত ঘটনা। অভিষেক টেস্টেই ভারতের বিপক্ষে দ্বিতীয় ইনিংসে ৯১ রানে অলআউট হয়ে এই তালিকাটা শুরু করেছিল বাংলাদেশ। সেই থেকে টানা চার বছর, প্রতি বছরই কমপক্ষে একবার এই ঘটনার শিকার হয়েছে টেস্ট ক্রিকেটের নবীন এই দলটি।
২০০১ সালে শ্রীলঙ্কা, ২০০২ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ বাংলাদেশকে অলআউট করে ৯০ ও ৮৭ রানে। ২০০৩ সালটা ছিল বাংলাদেশের জন্য কঠিন একটা বছর। এই বছর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ডারউইনে এবং পাকিস্তানের বিপক্ষে পেশোয়ারে ১০০ রানের নিচে অলআউট হওয়ার অভিজ্ঞতা হয় বাংলাদেশের। এরপর বাংলাদেশের টানা তিনটি এই তেতো অভিজ্ঞতা হয় শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে; কলম্বোতে। ২০০৫ সালে একবার এবং ২০০৭ সালে দুইবার এই অভিজ্ঞতা হয়েছে শ্রীলঙ্কাতে।
২০০৭ সালে পরপর দুই টেস্টে ৮৯ ও ৬২ রানে অলআউট হয় বাংলাদেশ। এর মধ্যে কলম্বোর ওই দ্বিতীয় টেস্টটাই ছিল সর্বশেষ ঘটনা। তারপর থেকে ক্যালেন্ডারের পাতায় পার হয়ে গেছে ১০টি বছর। আর টেস্টের হিসাবে বাংলাদেশ খেলে ফেলেছে ৫৫টি টেস্ট। কিন্তু এর মধ্যে আর এই লজ্জায় পুড়তে হয়নি বাংলাদেশকে। পাশাপাশি বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের ক্রিকেটাররা এসেছেন। বর্তমান এই দলে মুশফিকুর রহিম ছাড়া আর কারো প্রত্যক্ষ এই অভিজ্ঞতা নেই। অবশেষে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সেই অভিজ্ঞতাটাও হলো। নতুন এক লজ্জা পেলেন পুরো জাতি ও ক্রিকেটাররা। এমনকি দ্বিতীয় টেস্টে যে এ লজ্জা আরো বাড়বে তা প্রথম দিনেই স্পষ্ট হয়ে যায়।