প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

দ্রুত এগিয়ে চলছে পদ্মাসেতুর নির্মাণ কাজ : সেতুর পিলারে প্রথম স্প্যান বসানো সম্পন্ন : দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে স্বপ্নের পদ্মাসেতু এখন দৃশ্যমান বাস্তবতা

মেহেদী হাসান : ৩০ সেপ্টেম্বর পদ্মাসেতুর প্রথম স্প্যান বা সুপার স্ট্রাকচার খুঁটি বা পিয়ারের ওপর স্থাপন করার মধ্য দিয়ে দেশি-বিদেশি নানামুখী ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে স্বপ্নের পদ্মাসেতু দৃশ্যমান বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে। পদ্মাসেতুর দৃশ্যমান হয়ে ওঠার খবরে উচ্ছ্বসিত হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যুক্তরাষ্ট্রের রিটজ কার্লটন হোটেলে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে শেখ হাসিনা বলেন, ‘প্রমাণ করেছিÑ আমরাও পারি।’ এ সময় আবেগতাড়িত হয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বাঙালি জাতি যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি। আমরা যা চাই তা-ই করতে পারি, যদি আমরা সৎ ও সংকল্পবদ্ধ থাকি।’ গলব্লাডারে অপারেশনের পর চিকিৎসকরা প্রধানমন্ত্রীকে সম্পূর্ণ বিশ্রাম নেয়ার পরামর্শ দিলেও তা উপেক্ষা করেই শেখ হাসিনা দলীয় নেতাকর্মীদের সাথে নির্ধারিত সাক্ষাতে মিলিত হন এবং পদ্মাসেতুর প্রথম স্প্যান বসানোর কাজ সম্পন্ন হওয়ায় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন।
শেখ হাসিনা দুর্নীতির অভিযোগ তুলে পদ্মাসেতু প্রকল্প থেকে বিশ্বব্যাংকের মুখ ফিরিয়ে নেয়ার পর নিজেদের অর্থায়নেই তা করে দেখানোর সাহসী সিদ্ধান্ত নেয়াকে স্মরণ করে বলেন, ‘এটা ছিল একটা বড় চ্যালেঞ্জ, বাংলাদেশের জন্য বড় সিদ্ধান্ত। নিজেদের অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা আমাদের ভাবমূর্তির সঙ্গেও জড়িত।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘পদ্মার মতো একটি খরস্রোতা নদীতে এমন বড়মাপের সেতু নির্মাণ কাজে হাত দিয়ে বিশ্বের বুকে উদাহরণ সৃষ্টি করেছি।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা যে জনগণের জন্য রাজনীতি করি, জনগণের জন্য কাজ করি এবং আমরা পারিÑ তা প্রমাণ করেছি।’ তিনি স্বপ্নের এই পদ্মাসেতু প্রকল্প বাস্তবায়নে অকুণ্ঠ সহযোগিতার জন্য দেশি-বিদেশি সব বাংলাদেশির প্রতি অভিনন্দন জানান।
দেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো স্বপ্নের পদ্মাসেতুর ওপর ৩০ সেপ্টেম্বর শরীয়তপুরের জাজিরা পয়েন্টে প্রথম স্প্যান বসানোর ফলে এটি এখন দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। প্রায় ৩ হাজার ২০০ টন ওজনের প্রথম স্প্যান সেতুর ৩৭ ও ৩৮ নম্বর পিলারের ওপর ওই দিন স্থাপন করা হয়। ১৫০ মিটার দীর্ঘ এই স্প্যানটি স্থাপনের মধ্য দিয়ে স্বপ্নের পদ্মাসেতু নির্মাণ কাজ আরেক ধাপ এগিয়ে গেল। এই মাহেন্দ্রক্ষণটিতে উপস্থিত ছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এ প্রসঙ্গে ওবায়দুল কাদের উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, পদ্মাসেতুর প্রথম স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে আকাশে কালো মেঘ কেটে দৃশমান হয়েছে পদ্মাসেতু। সকল বাধা উপেক্ষা করে সেতুর কাজ এগিয়ে চলেছে। যথাসময়েই সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ করার চেষ্টা চলছে। এ পর্যন্ত পুরো সেতুর কাজ সাড়ে ৪৭ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে। এখন পর্যায়ক্রমে অন্য স্প্যানগুলোও স্থাপন করা হবে। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরে শিগগিরই এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন। সেতুর কাজ যাতে এক মুহূর্তের জন্য বন্ধ না থাকে সেই জন্য তার নির্দেশে অনানুষ্ঠানিকভাবে সেতুর স্প্যান উঠানো হয়েছে।
এদিকে স্বপ্নের পদ্মাসেতু দৃশ্যমান হওয়ার পর প্রকল্পস্থলে এক আনন্দঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। পদ্মাসেতুর সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা আনন্দে উদ্বেল হন। এই দৃশ্য দেখার জন্য হাজার হাজার মানুষ পদ্মাসেতু এলাকায় এসে জড়ো হন। অনেকে পদ্মা নদীতেও নেমে পড়েন নৌকা নিয়ে। তবে সেনাবাহিনীর কঠোর নিরাপত্তার কারণে কেউ সেতুর মূল এলাকায় প্রবেশ করতে পারেননি। দূর থেকেই সবাই স্বপ্নের পদ্মাসেতুর একটি অংশকে দৃশ্যমান দেখে আবেগতাড়িত হন। পদ্মাসেতুর সুপার স্ট্রাকচারবাহী তিয়ান ই হাউ জাহাজের ৩ হাজার ৬০০ টন ক্ষমতার ক্রেনের সঙ্গে তখনও স্প্যানটি বাঁধা ছিল। স্প্যানটি পিয়ারের ওপর বসিয়ে দেয়ার পর ক্রেনটি ধীরে ধীরে সরে যাওয়ার সময় হাজার হাজার উপস্থিত জনতা আনন্দে হাততালি দিয়ে ওঠেন।
এর আগে প্রায় ৬ কিলোমিটার দূরের মাওয়ার কুমারভোগ কন্সট্রাকশন ইয়ার্ডের ওয়ার্কশপ থেকে স্প্যানটি রওনা হয়। ২৯ সেপ্টেম্বর বেলা ২টায় জাহাজটি স্প্যান নিয়ে হাজির হয় ৩৭ ও ৩৮ নম্বর পিয়ারের মাঝামাঝি। এরপর দুই পিয়ারের এক মিটার ওপরে ঝুলিয়ে রাখা হয় স্প্যান। ৩০ সেপ্টেম্বর এটির স্থাপন শুরু হয়।
সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা জানান, প্রথম স্প্যানটি স্থাপনের পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে অন্যান্য স্প্যানও উঠানো শুরু হবে। ৩৭ থেকে ৪২ নম্বর পর্যন্ত ৬টি পিয়ার এখন স্প্যান স্থাপনের জন্য প্রস্তুত। প্রথমে শুরু হবে ৩৯ ও ৪০ নম্বর পিয়ারের ওপর স্প্যান উঠানোর কাজ। ৩৮ নম্বর পিয়ারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এই দুই পিয়ার ধরে আরও দুটি স্প্যান বসবে। এভাবেই সবকটি স্প্যান বসানো সম্পন্ন হবে। স্প্যানের মাঝ বরাবর নিচের লেনে চলবে ট্রেন। ওপরে কংক্রিটের চার লেনের সড়কে চলবে গাড়ি। স্প্যানের ওপরে রাস্তা এবং নিচে ট্রেন লাইন স্থাপন করা হবে।
২০১৫ সালের ডিসেম্বরে পদ্মাসেতুর মূল অবকাঠামো নির্মাণ কাজ শুরু হয়। এ পর্যন্ত প্রকল্পের প্রায় সাড়ে ৪৭ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। সেতুতে মোট ৪২টি পিয়ার থাকবে। এর মধ্যে ৪০টি পিয়ার নির্মাণ করা হবে নদীতে। দুটি নদীর তীরে। নদীতে নির্মাণ করা প্রতিটি পিয়ারে ছয়টি করে পাইলিং করা হয়েছে, যার দৈর্ঘ্য গড়ে প্রায় ১২৭ মিটার পর্যন্ত। একটি পিয়ার থেকে আরেকটির দূরত্ব ১৫০ মিটার। ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এ সেতুতে দুটি পিয়ারের ওপর বসবে ৪১টি স্প্যান। এছাড়া দুই পাড়ের সংযোগ সেতুসহ সেতুটি ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ। পদ্মাসেতু নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে পদ্মাসেতুর নির্মাণ কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা জানান, নদীতে মূল সেতুর মোট ২৪০টি পাইলের মধ্যে ৭৫টি পাইল বসেছে। এছাড়াও দুই পাড়ের দুটি ট্রান্সজিশন পিয়ারের ৩২টির মধ্যে ১৬টি স্থাপন হয়েছে। অর্থাৎ জাজিরা প্রান্তে ৪২ নম্বর পিয়ারের ট্রান্সজিশন পিয়ারের ১৬টি পাইল বসে গেছে। এখন বাকি মাওয়া প্রান্তের ১ নম্বর ট্রান্সজিশন পিয়ারের ১৬টি পাইল। এটির কাজ এখনও শুরু হয়নি। ডিজাইন চূড়ান্ত হচ্ছে। এছাড়া জাজিরা প্রান্তে সংযোগ সেতুর ১৮৬টি পাইল বসেছে। এখানে আর মাত্র ৭টি পাইল বাকি সংযোগ সেতুর (ভায়াডাক্ট) জন্য। আর মাওয়ায় এ পর্যন্ত সংযোগ সেতুর ১৭২টির মধ্যে ৭টি পাইল বসেছে।
পদ্মাসেতু এখন দৃশ্যমান হচ্ছে ধূসর রঙে। তাই ধূসর রঙের ৭-এ নম্বর স্প্যানটি বসার অল্প সময় পরই বসবে পরেরটি। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ৭-বি নম্বর স্প্যানটির ফিটিং সম্পন্ন রয়েছে। এটিও শিগগিরই রঙ করা শুরু হবে। কারণ অক্টোবরের শেষ দিকে এ স্প্যানটি বসবে ৩৮ ও ৩৯ পিয়ারের ওপরে। ইতোমধ্যেই ৩৯ নম্বর পিয়ারের কাজও দ্রুত এগিয়ে চলেছে। শিগগিরই শেষ হবে এর কাজ।
পদ্মাসেতুর দায়িত্বশীল প্রকৌশলীরা জানান, দুটি হ্যামার এখন হরদম পাইল বসাচ্ছে। জাজিরা ও মাওয়া উভয় প্রান্তে পাইল বসেছে। নভেম্বরের শেষদিকে আরেকটি হ্যামার জার্মানি থেকে আসছে মাওয়ায়। এই হ্যামারটি ডিসেম্বরের প্রথম দিকেই পাইল স্থাপনের কাজে যোগ দিবে।
পদ্মাসেতুর ৪২টি খুঁটিতে প্রয়োজন হবে ৪১টি স্প্যান। প্রথম স্প্যানটি (৭-এ) স্থাপন হলেও মাওয়ার কুমারভোগে আরও ৯টি স্প্যান রয়েছে। এর মধ্যে ফিটিং হয়েছে ৭টি। এছাড়া আরও ১২টি স্প্যান চীনে তৈরি রয়েছে। এগুলো পর্যায়ক্রমে মাওয়ায় আনা হবে। এছাড়া বাকি আরও ১৯টি স্প্যানও চীনে তৈরির প্রক্রিয়া চলছে।
শরীয়তপুরের জাজিরা পাড়ে ২টি পিয়ারের ওপর পদ্মাসেতুর প্রথম স্প্যান বসানোর খবরে বাপ-দাদার ভিটে মাটি হারানো পদ্মা পাড়ের লোকজনসহ শরীয়তপুরে বইছে আনন্দের বন্যা। পদ্মাসেতুর ২টি পিয়ারে প্রথম সুপার স্ট্রাকচার (স্প্যান) বসানো হবে এমন খবরে ৩০ সেপ্টেম্বর ভোর থেকেই জাজিরার নাওডোবা এলাকায় পদ্মা পাড়ে লোকজনের ভিড় জমে। কিভাবে বসানো হবে, কারা এবং কেমনভাবে এটা বসাবে এ নিয়ে পদ্মা পাড়ে উপস্থিত সাধারণ লোকজনের মধ্যে ছিল নানা কৌতূহল।
সেতুটির ৩৭ ও ৩৮নং পিলারের ওপর স্প্যানটি স্থাপনের পর এখন দেখা যাচ্ছে পদ্মাসেতুর কাঠামো। ধূসর রঙের পদ্মাসেতুর এই স্প্যানটি ১৫০ মিটার দৈর্ঘ্যরে এবং এটি নদীর পানি থেকে ৫০ ফুট উচ্চতায় রয়েছে। স্প্যানটি স্থাপনের কাজে ৩ হাজার ৬০০ টনের ক্ষমতার স্ট্রাকচারবাহী তিয়ান ই হাউ ক্রেনটি ব্যবহার করা হয়। খুঁটির ওপর বসানো স্টিলের তৈরি স্প্যানটির ওজন প্রায় ৩ হাজার ২০০ টন। পদ্মাসেতুতে ৪২টি খুঁটির ওপর মোট এ রকম ৪১টি স্প্যান বসানো হবে। এই স্প্যানটি স্থাপনের মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান হয়েছে পদ্মাসেতু। এখন সেতুর ১৫০ মিটার আকৃতি দৃশ্যমান হয়েছে। পুরো কাজ শেষ হলে এমন আকৃতি দেখা যাবে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার।
পদ্মাসেতুর এই প্রথম স্প্যানটি স্থাপনের পর সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, ওপারে যখন ঘন কুয়াশা, বিশ^ব্যাংক যখন পদ্মাসেতু ছেড়ে চলে যায়, সেদিন একটা অনিশ্চয়তার অন্ধকার ছিল, হতাশার মেঘ ছিল, অনেকে ভেবেছিলেন এই কুয়াশা কাটানো যাবে না। অনেকেই হয়ত ভেবেছিলেন পদ্মাসেতু আর হবে না। কিন্তু সেদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা অসীম সাহসে মশাল হাতে নিয়েছিলেন। মহান আল্লাহর কাছে শোকরিয়া প্রকাশ করে ওবায়দুল কাদের বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একক নেতৃত্বের সোনালি ফসল আজকের এই দৃশ্যমান পদ্মাসেতু। পদ্মাসেতু এখন আর কোনো রঙিন স্বপ্ন নয়। পদ্মাসেতু এখন দৃশ্যমান বাস্তবতা। পদ্মাসেতুর কাজের অগ্রগতি ৪৭ ভাগ সম্পন্ন হয়েছে উল্লেখ করে ওবায়দুল কাদের বলেন, স্প্যান যখন একটা বসে গেছে, আরও ৪০টি স্প্যান কয়েকদিন পরপর বসবে। যথাসময়ে আমরা পদ্মাসেতুর নির্মাণ কাজ শেষ করব।
জানা গেছে, ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মাসেতুর মোট ৪২টি পিয়ারের ওপর ৪১টি স্প্যান বসানো হবে। প্রত্যেক পিয়ারে ৬টি করে পাইল সাজানো। স্প্যানের ভেতরে থাকছে রেলপথ ও ওপরে সড়ক পথ। দ্বিতল পদ্মা বহুমুখী সেতুর পুরোটা হবে স্টিল আর কংক্রিট স্ট্রাকচারে। সেতুর ওপরের তলায় থাকবে চার লেনের মহাসড়ক, নিচ দিয়ে যাবে রেললাইন। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে নির্মাণ কাজ শেষ করে সেতুটি যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করছে সরকার।