প্রতিবেদন

প্রতারণার মাধ্যমে গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির ৩১ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি

নিজস্ব প্রতিবেদক : পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সাধারণ বীমা খাতের গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের বিরুদ্ধে প্রতারণার মাধ্যমে প্রায় ৩১ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। কোম্পানি এজেন্ট কমিশনের নাম করে এবং রি-ইন্স্যুরেন্সের কমিশনের ওপর ভ্যাটসহ পৃথকভাবে এ বিপুল পরিমাণ ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি। এছাড়াও প্রতিষ্ঠানটি এজেন্ট কমিশনের নাম করে ২০১৫ ও ২০১৬ সালে (পঞ্জিকা বর্ষে) এবং রি- ইন্স্যুরেন্সের কমিশনের ওপর ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে। সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আওতাধীন বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ)-এর মূল্য সংযোজন কর (মূসক) শাখার নিরীক্ষায় এ ফাঁকির তথ্য উঠে এসেছে। বিপুল পরিমাণ এ রাজস্ব পরিশোধে প্রতিষ্ঠানকে ১৫ দিনের সময় দিয়ে দাবিনামা (ডিমান্ড নোট) ও কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করা হয়েছে। অন্যথায় ব্যাংক হিসাব জব্দসহ আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
সূত্র জানায়, গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স এজেন্ট কমিশনের নাম করে ২০১৫ ও ২০১৬ সালে ১৩ কোটি ২৯ লাখ ২৪ হাজার ৩৭০ টাকা ৯৫ পয়সার উৎসে মূসক (ভ্যাট) ফাঁকি দিয়েছে। এলটিইউ গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স নামে বীমা কোম্পানির ২০১৫ ও ২০১৬ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন নিরীক্ষা করে। এতে দেখা যায় এ কোম্পানি তাদের নিয়োজিত এজেন্টকে বিপুল পরিমাণ কমিশন দিয়েছে।
গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদনে এজেন্ট কমিশনকে সেবা খাত উল্লেখ করে সেবা কোড দেখিয়েছে। বলেছে, এজেন্ট কমিশন সেবা কোডের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় তা মূসক অব্যাহতিপ্রাপ্ত। কিন্তু এনবিআরের এসআরও বা সাধারণ আদেশ ২৪/মূসক/২০১৩-এ বলা হয়েছে, ‘অন্যান্য বিবিধ সেবা’ শিরোনামে সেবা কোড ৯৯.২০ বলা হয়েছে, সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি সংস্থা (এনজিও), ব্যাংক, বীমা বা অন্য কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান, লিমিটেড কোম্পানি বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে উৎসে মূসক প্রযোজ্য। এজেন্ট কমিশন নামে সেবা কোড এনবিআরের এসআরও বা সাধারণ আদেশে উল্লেখ আছে। সেজন্য মূসক আইন ১৯৯১ অনুযায়ী এজেন্ট কমিশনের ওপর ১৫ শতাংশ উৎসে মূসক প্রযোজ্য।
সূত্র মতে, গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি থেকে এজেন্টরা ২০১৫ সালে ৪৪ কোটি ৩৩ লাখ ৬১ হাজার ৯৩২ টাকা এবং ২০১৬ সালে ৪৪ কোটি ২৮ লাখ ৫৪১ টাকা কমিশন নিয়েছে। এ কমিশন প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার উৎসে মূসক কর্তন করেনি। ২০১৫ সালে প্রদান করা এজেন্ট কমিশনের ওপর ১৫ শতাংশ হারে উৎসে মূসক ৬ কোটি ৬৫ লাখ ৪ হাজার ২৮৯ টাকা ৮০ পয়সা। ২০১৬ সালে ৬ কোটি ৬৪ লাখ ২০ হাজার ৮১ টাকা ১৫ পয়সা। দুই বছরে প্রতিষ্ঠানটি মোট ৮৮ কোটি ৬১ লাখ ৬২ হাজার ৪৭৩ টাকার এজেন্ট কমিশনের ওপর মোট ১৩ কোটি ২৯ লাখ ২৪ হাজার ৩৭০ টাকা ৯৫ পয়সার উৎসে মূসক ফাঁকি দিয়েছে বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
সূত্র জানায়, এ বীমা কোম্পানি দুই বছরে উৎসে মূসক পরিশোধ করেনি। মূসক আইন, ১৯৯১-এর ৬ ধারার উপধারা ৪ (ছ) অনুযায়ী মাসিক ২ শতাংশ সুদসহ এ উৎসে মূসক আদায়যোগ্য। ২ শতাংশ সুদ যোগ হলে প্রতিষ্ঠানটির এজেন্ট কমিশনের ওপর উৎসে মূসক ফাঁকির পরিমাণ অনেক বেড়ে যাবে।
অপরদিকে; গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির বিরুদ্ধে ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল (পঞ্জিকা বর্ষ) পর্যন্ত ৪ বছরে রি-ইন্স্যুরেন্স (পুনঃবীমা) কমিশনের ওপর ১৭ কোটি ৫৯ লাখ ৬৩ হাজার ৪৩৩ টাকা ৫৫ পয়সার মূসক ফাঁকি দেয়ার অভিযোগ উঠেছে।
কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদন নিরীক্ষা করে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি রি-ইন্স্যুরেন্সের ওপর প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ কমিশন পেয়ে থাকে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি ৪ বছর কমিশনের ওপর কোনো মূসক প্রদান করেনি। মূল্য সংযোজন কর আইন, ১৯৯১-এর ধারা ২ (ভ) এবং ধারা ৫-এর উপধারা (৪) অনুযায়ী সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে মূসক ধার্য করা হবে সর্বমোট প্রাপ্তির ওপর। রি-ইন্স্যুরেন্স থেকে প্রাপ্ত কমিশন মূসক আইনের ১৪ ধারা অনুযায়ী অব্যাহতিপ্রাপ্ত নয়। সেজন্য রি-ইন্স্যুরেন্সের ওপর কমিশনের ১৫ শতাংশ মূসক (ভ্যাট) প্রযোজ্য।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা যায়, গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত রি-ইন্স্যুরেন্সের ওপর কমিশন হিসেবে ১১৭ কোটি ৩০ লাখ ৮৯ হাজার ৫৫৭ টাকা পেয়েছে। ১৫ শতাংশ হারে এ রি-ইন্স্যুরেন্স কমিশনের ওপর মূসক ১৭ কোটি ৫৯ লাখ ৬৩ হাজার ৪৩৩ টাকা ৫৫ পয়সা। যা প্রতিষ্ঠানটি ৪ বছরে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা না দিয়ে ফাঁকি দিয়েছে। এর মধ্যে ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠানটি রি-ইন্স্যুরেন্সের ওপর প্রাপ্ত কমিশন ১৮ কোটি ৪২ লাখ ৯৭ হাজার ৮৯০ টাকা। যার ওপর প্রযোজ্য ও অপরিশোধিত মূসক ২ কোটি ৭৬ লাখ ৪৪ হাজার ৬৮৩ টাকা ৫০ পয়সা। ২০১৪ সালে রি-ইন্স্যুরেন্সের ওপর প্রাপ্ত কমিশন ১৯ কোটি ৭৩ লাখ ৮৭ হাজার ৫৭৮ টাকা। যার ওপর প্রযোজ্য মূসক ও অপরিশোধিত মূসক ২ কোটি ৯৬ লাখ ৮ হাজার ১৩৬ টাকা ৭০ পয়সা। ২০১৫ সালে রি-ইন্স্যুরেন্সের ওপর প্রাপ্ত কমিশন ৩৩ কোটি ৯৩ লাখ ৮০ হাজার ১৮১ টাকা। যার ওপর প্রযোজ্য ও অপরিশোধিত মূসক ৫ কোটি ৯ লাখ ৭ হাজার ২৭ টাকা ১৫ পয়সা। ২০১৬ সালে রি-ইন্স্যুরেন্সের ওপর প্রাপ্ত কমিশন ৪৫ কোটি ২০ লাখ ২৩ হাজার ৯০৮ টাকা। যার ওপর প্রযোজ্য ও অপরিশোধিত মূসক ৬ কোটি ৭৮ লাখ ৩ হাজার ৫৮৬ টাকা ২০ পয়সা। কোম্পানিটি ৪ বছরে মূসক পরিশোধ করেনি। সেক্ষেত্রে উৎসে মূসক ও মূসক হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির মোট ফাঁকির পরিমাণ (১৩,২৯,২৪,৩৭০.৯৫ + ১৭,৫৯,৬৩,৪৩৩.৫৫) বা ৩০ কোটি ৮৮ লাখ ৪৭ হাজার ৮০৪ টাকা ৫০ পয়সা। ফাঁকিকৃত রাজস্ব পরিশোধে ২৫ সেপ্টেম্বর গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালকে ১৫ দিনের সময় দিয়ে দাবিনামা (ডিমান্ড নোট) ও কারণ দর্শানোর পৃথক নোটিশ জারি করেছে এলটিইউ। ১৫ দিনের মধ্যে রাজস্ব পরিশোধ ও নোটিশের জবাব না দিলে ব্যাংক হিসাব জব্দসহ গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে এনবিআর সূত্র জানিয়েছে।
এ বিষয়ে গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের কোম্পানি সেক্রেটারি সৈয়দ নুর উদ্দিন আহমেদ স্বদেশ খবরকে বলেন, এজেন্ট কমিশনের ওপর যে ভ্যাট এনবিআর দাবি করছে এর ওপর আদালতের স্থগিতাদেশ (স্টে অর্ডার) রয়েছে। তিনি বলেন, এজেন্ট কমিশনের ওপর এনবিআর ভ্যাট দাবি করায় আমরা বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন থেকে গিয়ে কয়েকবার কথা বলেছি। পরে আমরা আদালতে গেলে আদালত এজেন্ট কমিশনের ভ্যাট আদায়ে ৬ মাসের স্থগিতাদেশ দিয়েছে।
রি-ইন্স্যুরেন্সের ওপর ভ্যাট সম্পর্কে তিনি বলেন, রি-ইন্স্যুরেন্সের ওপর ভ্যাট এরকম কিছু এখনো আমরা পাইনি। যখন আমরা একটি প্রিমিয়াম নেই তার ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট তো আমরা দিয়েই দেই। আবার এটা যখন বাইরে আমরা রি-ইন্স্যুরেন্স করি সেখানে আবার ভ্যাট এলে ডাবল ভ্যাট হয়ে যাচ্ছে না? এর কোনো যৌক্তিকতা নেই। আমি তো পাচ্ছি একবার, আমাকে কেন দুইবার ভ্যাট চার্জ করা হবে? ভ্যাটই তো পাই না, কোনো রুলই তো নেই, ফাঁকি দিব কিভাবে?