প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগদান শেষে দেশে ফিরে বিপুল গণসংবর্ধনায় সিক্ত হলেন শেখ হাসিনা

নিজস্ব প্রতিবেদক : জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭২তম অধিবেশনে যোগদান শেষে লন্ডন হয়ে দেশে ফেরার পর প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে বিমানবন্দর থেকে গণভবন পর্যন্ত রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে গণসংবর্ধনা দিয়েছে আওয়ামী লীগসহ সর্বস্তরের জনগণ। ৭ অক্টোবর সকাল থেকেই আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা এবং সর্বস্তরের মানুষ বিমানবন্দর থেকে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবন পর্যন্ত রাস্তার দু’পাশে ফুলের তোড়া, শান্তির সাদা পতাকা, বিভিন্ন রঙ-বেরঙের ব্যানার, ফ্যাস্টুন নিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে তাঁকে এই সংবর্ধনা জানান। সকাল ৯টা ২৫ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমানটি অবতরণ করে। এসময় বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানাতে মন্ত্রিবর্গ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, সংসদ সদস্য, তিন বাহিনীর প্রধানগণ, আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলীয় জোটের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং ঊর্ধ্বতন বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বিমানবন্দরেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সংবর্ধনা জানানোর আয়োজন করা হয়। সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের পর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী গাড়ি বহরটি গণভবনের উদ্দেশে রওনা দেয়। এসময় রাস্তার দু’পাশে দাঁড়ানো হাজার হাজার মানুষ স্লোগান দিয়ে তাকে অভিবাদন জানান। এ সময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হাত নেড়ে অভিবাদনের জবাব দেন।
রাস্তার দু’পাশে নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ বাদ্য ও মাইকে গান বাজিয়ে, স্লোগান দিয়ে শেখ হাসিনাকে অভিবাদন জানান। শেখ হাসিনাও পুরো রাস্তায় হাত নেড়ে অভিবাদন গ্রহণ করেন। এসময় মাইকে দেশাত্মবোধক গান বাজছিল। পথে পথে সংবর্ধনা নিতে নিতে সকাল ১০টা ৫৮ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী গণভবনে প্রবেশ করেন।
রোহিঙ্গাদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর মানবিক ভূমিকার জন্য ব্রিটিশ পত্রপত্রিকা তাঁকে ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ অর্থাৎ ‘মানবতার মা’ আখ্যায়িত করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিক খালিজ টাইমস রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মানবিক আবেদনের জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে তাঁকে প্রাচ্যের নতুন তারকা হিসেবে অভিহিত করেছে। এছাড়াও শেখ হাসিনা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭২তম অধিবেশনে রোহিঙ্গাদের রক্ষা ও তাদের নিরাপদে নিজ দেশে ফেরত নিতে জাতিসংঘে যে ৫ দফা প্রস্তাব পেশ করেছেন তা বিশ্ব নেতৃবৃন্দের কাছে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পায়। এসব কারণে আওয়ামী লীগ প্রধানমন্ত্রীকে সংবর্ধনা দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
এর আগে ৬ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লন্ডনে ব্যস্ত সময় পার করেন। ওই দিন তিনি যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় অন্যান্য দেশের আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। মতবিনিময়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ কখনো কোনো সমস্যা দেখে ভয় পায় না এবং নির্মমভাবে তাড়িয়ে দেয়া কয়েক লাখ মিয়ানমারের নাগরিকের এই স্রোত বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও এদেশ এগিয়ে যাবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে আমরা বাঙালি জাতি যুদ্ধ করে এদেশ স্বাধীন করি। ফলে কোনো সমস্যা দেখা দিলে আমরা কখনো ভয় পাই না। আমরা বরং এই সমস্যা মোকাবিলা করার মাধ্যমে আরো এগিয়ে যেতে চাই।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমারের একজন সিনিয়র প্রতিনিধির সাম্প্রতিক ঢাকা সফরের মাধ্যমে এ সংকট সমাধানে নেপিডোর সাথে আলোচনা শুরু হয়েছে। সমস্যার সমাধানও হবে। তিনি বলেন, আমরা ১৬ কোটি মানুষকে খাওয়াতে পারলে তাদের এই চরম দুঃসময়ে অতিরিক্ত ৫ থেকে ৭ লাখ লোককেও খাওয়াতে পারবো। এক্ষেত্রে ‘প্রয়োজন হলে আমরা দিনে একবেলা খাবো এবং অপর বেলার খাবার চরম বিপদে পড়া এসব লোককে দেবো। আমরা ধনী না হলেও আমাদের হৃদয় অনেক বড় এবং আমাদের অবস্থান মানবতার পক্ষে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে পালিয়ে আসা দুর্ভাগা রোহিঙ্গাদের কক্সবাজারের ভাসানচরে স্থানান্তর করা হবে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নিতে নিউইয়র্কে যাওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানাকে সঙ্গে নিয়ে কক্সবাজারে বিভিন্ন রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করেন এবং তিনি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে আসা নারী ও শিশুদের কাছ থেকে তাদের বিভিন্ন লোমহর্ষক অভিজ্ঞতার বর্ণনা শোনেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনপ্রশাসন, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনী, বিজিবি, পুলিশ এবং তাঁর দলের স্বেচ্ছাসেবকরা এসব লোকের ভোগান্তি দূর করতে কঠোর পরিশ্রম করছে। কোনো বৈদেশিক সাহায্যের অপেক্ষায় না থেকে আমরা সাধ্যানুযায়ী তাদের থাকা, খাওয়া ও ওষুধের ব্যবস্থা করেছি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশের জনগণের এ ধরনের বদান্যতা দেখে বিস্মিত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রধানমন্ত্রী ১৬ দিনের সরকারি সফর সমাপ্ত করে দেশে ফিরে আসার পথে লন্ডনের উদ্দেশে ২ অক্টোবর ওয়াশিংটন ত্যাগ করেন। শেখ হাসিনা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭২তম অধিবেশনে যোগ দিতে ১৭ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক পৌঁছান। জাতিসংঘের বার্ষিক এ অধিবেশনে অংশগ্রহণের পর ২২ সেপ্টেম্বর তিনি নিউইয়র্ক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসি’তে যান। ওয়াশিংটনে এক সপ্তাহ অবস্থানের পর প্রধানমন্ত্রীর লন্ডন হয়ে গত ২ অক্টোবর দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু ২৫ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটনের একটি হাসপাতালে প্রধানমন্ত্রীর গলব্লাডারে অস্ত্রোপচার হওয়ায় তাঁর দেশে ফেরার তারিখ পরিবর্তন করা হয়। অবশেষে ৭ অক্টোবর সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের মাটি স্পর্শ করেন।