প্রতিবেদন

বিশ্ববিদ্যালয় হালচাল : কাণ্ডারিবিহীন অবস্থায় চলছে এশিয়ান ইউনিভার্সিটিসহ অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়

নিজস্ব প্রতিবেদক : শিক্ষা খাতে সরকারের অনেক অর্জন ও বিরাট সাফল্য রয়েছে। শিক্ষার মানোন্নয়নে সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তারপরও এ খাতে এখনও রয়ে গেছে অনেক সমস্যা। বিশেষ করে দেশে উচ্চশিক্ষার ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটলেও শত চেষ্টা করেও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সেক্টরে। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের শিক্ষার মান দিন দিন ভালো হলেও অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাই পরিচালিত হচ্ছে বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গিতে। এতে করে নিয়মনীতির কোনোরূপ তোয়াক্কা না করেই চলছে দেশের অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী দেশের প্রতিটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রপতি নিয়োজিত উপাচার্য, উপ-উপাচার্য এবং কোষাধ্যক্ষ থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অথচ মালিক পক্ষের এসব বিষয়ে আগ্রহ কম। কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে, যাদের মালিকপক্ষ বলতে উপাচার্যকেই বোঝায়। আবার অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকই হয়ে থাকেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি এমন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়; যার উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষÑ একজনই। ড. আবুল হাসান মুহাম্মদ সাদেক, যিনি এশিয়ান ইউনিভার্সিটির জন্মলগ্ন থেকে এখন পর্যন্ত ভিসি। রাষ্ট্রপতির কোনো অনুমোদন না থাকলেও তিনি নিজেকে বিশ্ববিদ্যালয়টির ভারপ্রাপ্ত ভিসি বলে দাবি করে আসছেন। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো এরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউজিসি, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির কার্যালয়সহ সরকারি কিছু জায়গায় ভারপ্রাপ্ত শব্দটি ব্যবহার করলেও অন্যান্য সকল জায়গায় ভারপ্রাপ্ত বাদ দিয়ে কেবল ভিসি বা উপাচার্য শব্দটি ব্যবহার করে থাকেন। ভারপ্রাপ্ত ভিসির পদটি আজীবন ধরে রাখার বিষয়ে এশিয়ান ইউনিভার্সিটির ভিসি ড. সাদেক বেশ গর্ব করেই বলেন, এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি তার কিছুই করতে পারবে না। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এ বিষয়ে অবশ্য এশিয়ান ইউনিভার্সিটিসহ বেশ কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে কঠোর বার্তা দিয়েছে। কিন্তু কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ই এসবের তোয়াক্কা করছে না।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের এ সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য নিয়োগের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তিন সদস্যবিশিষ্ট উপাচার্যের প্যানেল প্রস্তাব করেছে। আর দীর্ঘদিন ধরে উপাচার্য না থাকলেও ১৮ বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য নিয়োগে কোনো আগ্রহ দেখাচ্ছে না। উপ-উপাচার্যের ক্ষেত্রে এ সংখ্যা ৬৫। আর কোষাধ্যক্ষের ক্ষেত্রে এ সংখ্যা ৪৩। দেশে বর্তমানে ৯৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য যিনি প্রতিষ্ঠানটিরও প্রধান নির্বাহী। উচ্চশিক্ষা শেষে শিক্ষার্থীদের সনদে স্বাক্ষর করবেন রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগকৃত উপাচার্য। কিন্তু উপাচার্য না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উত্তীর্ণরা মূল সনদ নিতে পারছেন না। আবার কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাস্টি বোর্ড কর্তৃক নিয়োগকৃত অস্থায়ী উপাচার্য মূল সনদে স্বাক্ষর করছেন। এ কাজটি সবচেয়ে বেশি করছে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি। পাশাপাশি অভিযোগ রয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়টির ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য ড. সাদেক বিপুল উৎসাহে লেখাপড়ার নামে নানা কলাকৌশল অবলম্বন করে নির্বিঘেœ সার্টিফিকেট বাণিজ্য করে আসছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির জন্মলগ্ন সময় থেকেই। যদিও ভিসিবিহীন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইস্যুকৃত সার্টিফিকেটের আইনগত কোনো ভিত্তি নেই। এসব সনদধারীর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ইতোমধ্যে সতর্কও করে দিয়েছে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন-ইউজিসি।
উপাচার্য, উপ-উপাচার্য এবং কোষাধ্যক্ষ নিয়োগে কেন আগ্রহ কম সে বিষয়ে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, এসব পদে নিয়োগ দিতে যোগ্য প্রার্থী পাওয়া যাচ্ছে না। এছাড়া যোগ্য প্রার্থী পাওয়া গেলেও তাদের পেছনে প্রতি মাসে কমপক্ষে ৫ থেকে ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে হয়। অথচ তাদের দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের তেমন কোনো উপকার হয় না।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১০টি বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য নিয়োগের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তিন সদস্যবিশিষ্ট উপাচার্যের প্যানেল প্রস্তাব করেছে। এর মধ্যে সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটি চলতি বছরের ১৫ মে, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ২০১৬ সালের ১২ ডিসেম্বর, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল, ফেনী, রবীন্দ্র মৈত্রী ও স্টেট ইউনিভার্সিটি চলতি বছরের ১৩ জুলাই, রয়েল ইউনিভার্সিটি চলতি বছরের ১ জানুয়ারি, নটর ডেম বিশ্ববিদ্যালয় ১৫ মে, কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি গত বছরের ২৪ নভেম্বর উপাচার্য নিয়োগের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ের পাঠিয়েছে; যা প্রক্রিয়াধীন।
ইউজিসির তথ্যানুযায়ী, উপাচার্য না থাকলেও এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেই ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি (বিইউবিটি), গণ-বিশ্ববিদ্যালয়, ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, চুয়াডাঙ্গার ফার্স্ট ক্যাপিটাল ইউনিভার্সিটি, শরীয়তপুরের জেড এইচ সিকদার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, চাঁপাইনবাবগঞ্জের এক্সিম ব্যাংক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লার ব্রিটানিয়া ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সেস, গাজীপুরে অবস্থিত জার্মান ইউনিভার্সিটি, কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি, মানিকগঞ্জের এনপিআই ইউনিভার্সিটি, চট্টগ্রামের ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি এবং ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের।
এছাড়া এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশসহ ১০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে যাদের উপাচার্য, উপ-উপাচার্য এবং কোষাধ্যক্ষের সবগুলো পদই শূন্য দীর্ঘদিন যাবৎ। তাহলে এসব বিশ্ববিদ্যালয় কে চালাচ্ছেন, কে সনদে স্বাক্ষর করছেন এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে এশিয়ান ইউনিভার্সিটিকে নিয়ে। কারণ তিনি ঘোষণা দিয়েই একসঙ্গে তিনটি পদের দায়িত্ব পালন করছেন; যা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের সম্পূর্ণ লঙ্ঘন। ড. সাদেক সচরাচর বলে থাকেন তিনি এশিয়ান ইউনিভার্সিটির মালিক, ইউনিভার্সিটির পেছনে অনেক টাকা বিনিয়োগ করেছেন; সুতরাং তিনি ব্যবসা করবেন এবং তার ইচ্ছামতোই পরিচালিত হবে তার ইউনিভার্সিটিÑ এটাইতো স্বাভাবিক।
কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তারা এ সংক্রান্ত বিষয়ে স্বদেশ খবরকে জানিয়েছেন, ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাহী হিসেবে কাজ করছেন। এ কারণে এসব পদে তারা জনবল নিয়োগে আগ্রহী নন। আবার উপাচার্য নিয়োগ দিলেও বিধি অনুযায়ী তাদের ক্ষমতায়ন করা হয় না।
এ প্রসঙ্গে ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুল মান্নান স্বদেশ খবরকে বলেন, এসব গুরুত্বপূর্ণ পদ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় চলতে পারে না। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হয় এবং আইনেরও চরম ব্যত্যয় ঘটে।
ইউজিসির তথ্যানুযায়ী, ৬৫ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য নেই। তবে এর মধ্যে চারটি বিশ্ববিদ্যালয় উপ-উপাচার্য নিয়োগের জন্য প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি চলতি বছরের ১৮ এপ্রিল, ইস্ট ওয়েস্ট, ওয়ার্ল্ড এবং গ্রিন ইউনিভার্সিটি ১৩ জুলাই উপ-উপাচার্য নিয়োগের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছে।
প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিগুলোর ওপরে কারো যেন কোনো নিয়ন্ত্রণই নেই। ফ্রি স্টাইলে চলছে দেশের অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। বিপণিবিতানে সারি সারি দোকানের মাঝে কয়েকটি দোকানের স্পেস ভাড়া নিয়ে খুলে বসা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়, উপরের তলায় গার্মেন্টস, নিচের তলায়ও গার্মেন্টসÑ মাঝের তলায় খুলে বসা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়, বিল্ডিয়ের নিচে পেট্রোল পাম্প ওপরে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, আবাসিক এলাকায় প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি, বাণিজ্যিক এলাকায় প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি, শিল্প এলাকায় প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি, অলিতে-গলিতে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি। এসব প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির শাখা-প্রশাখার আবার অভাব নেই। উত্তরায় শাখা আছে, যাত্রাবাড়ীতেও আছে, মিরপুরে আছে আবার মিটফোর্ডেও আছে। ঢাকায় আছে, ঢাকার বাইরেও আছে। জেলা শহরে আছে, এমনকি উপজেলায়ও রয়েছে এসব ইউনিভার্সিটির শাখা। হাত বাড়ালেই ইউনিভার্সিটি, পা বাড়ালেই ফার্স্ট ক্লাস সার্টিফিকেট। পড়াশুনার দরকার নেই, লাইব্রেরির দরকার নেই, ল্যাবের দরকার নেই, খেলাধুলার দরকার নেই। ৩টি ক্লাসরুম, ১টি শিক্ষক রুম আর ১টি ভিসির রুমÑ ব্যস হয়ে গেল ভাড়া বাড়িতে ইউনিভার্সিটি। শিক্ষা বাণিজ্যের শুরু এভাবেই। তারপর ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ আঁতিপাঁতি করে খুঁজতে থাকে সরকারি খাস জমি। শিক্ষার নামে কোটি টাকার জমি লাখ টাকায় লিজ নিয়ে ব্যাংকঋণে গড়ে ওঠে সুউচ্চ ইমারত। ইউনিভার্সিটি পেয়ে যায় স্থায়ী ক্যাম্পাস। এখানে উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশে এ পর্যন্ত যতটি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির চাপে স্থায়ী ক্যাম্পাসে গিয়েছে, তাদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, অধিকাংশ ইউনিভার্সিটিই খাস জমি বা অর্পিত সম্পত্তি দখল বা নামমাত্র মূল্যে লিজ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলেছে। শিক্ষার নামে খাস জমি দখলের এই প্রতিযোগিতার কারণেই ব্যাঙের ছাতার মতো যেখানে-সেখানে, যে-সে গড়ে তুলছে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি। এসব প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি না করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে তোয়াক্কা, না করছে ইউজিসিকে। রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় গড়ে ওঠা এসব প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি তার স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য খাস জমি দখলে করছে পেশিশক্তির প্রয়োগ, ঘুষের বিনিময়ে প্রশাসনকে করছে কব্জা, উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসিকে দেখাচ্ছে বৃদ্ধাঙ্গুলি।
প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির এই অনাচার বাণিজ্যের বিরুদ্ধে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি কিছুই করতে পারছে না। এর মধ্যে ইউজিসি অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে মাঝে মাঝে কিছু পরামর্শ প্রদান করে, অবৈধ বা অননুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা প্রকাশ করে। অননুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিযান পরিচালনা করে, কারণ দর্শাও নোটিশ প্রেরণ করে, অননুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয়টি বন্ধ করে দেয়ার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করে ইউজিসি, সুপারিশ মোতাবেক শিক্ষা মন্ত্রণালয় ওই অননুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয়টি বন্ধও করে দেয়; কিন্তু অভিভাবকদের রক্তশোষণকারী এসব প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির কর্ণধাররা এতটাই ক্ষমতাশালী যে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ উপেক্ষা করার জন্য তারা সোজা চলে যায় উচ্চ আদালতে। সেখান থেকে নিয়ে আসে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশের ওপর স্থগিতাদেশ। তারপর আবার আগের মতোই চলতে থাকে সার্টিফিকেট বাণিজ্য। আদালতের এই স্থগিতাদেশের বিপক্ষে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির কিছুই করার থাকে না; অসহায় চেয়ে থাকা ছাড়া। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির নাকের ডগার ওপর দিয়েই চলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এসব তেলেসমাতি কর্মকা-। তাদের এই তেলেসমাতি কর্মকা-ে দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটি, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়সহ হাতে গোনা কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে রয়েছে নানা অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ। অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এবং মিলেনিয়াম ইউনিভার্সিটির ন্যায় অনেক বিশ্ববিদ্যালয় কালো তালিকাভুক্ত হওয়া থেকে রহস্যজনক কারণে বাদ পড়েছে। জানা যায়, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ ভিসি, প্রো-ভিসি ও ট্রেজারার পদে নিয়োগ দেয়ার ক্ষেত্রে বিধিমোতাবেক শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও রাষ্ট্রপতির অনুমোদন নেয়া হয়নি। ফলে অবৈধ ভিসি, প্রো-ভিসি ও ট্রেজারার কর্তৃক পরিচালিত হচ্ছে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ। বিশ্ববিদ্যালয়টির অফিসসূত্র এবং পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞাপন থেকে যানা যায় ড. সাদেক তার মালিকানাধীন বিশ্ববিদ্যালয়ের কনভোকেশন আগামী ১০ ডিসেম্বর ২০১৭ তারিখ আয়োজন করার ঘোষণা দিয়েছেন। এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে ভিসি প্রোভিসি ও ট্রেজারার ব্যতীত কনভোকেশন আয়োজনের আইনগত কোনো বৈধতা আছে কি না?
এদিকে এশিয়ান ইউনিভার্সিটির মতো অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অননুমোদিত ভিসি কর্তৃক ইস্যু হচ্ছে শিক্ষার্থীদের সনদপত্র; যা প্রকৃত অর্থে অবৈধ সনদ হিসেবে বিবেচিত হবে। অভিযোগ রয়েছে, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ ও মিলেনিয়াম ইউনিভার্সিটির পাশাপাশি অনেক নামিদামি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ও অবৈধ সনদ বাণিজ্য নামের ব্যবসার সাথে জড়িত। এ সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ইউজিসির শীর্ষ পর্যায়ের জনৈক কর্মকর্তা স্বদেশ খবরকে বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে কোনো তথ্য দেয়ার ক্ষমতা ইউজিসি চেয়ারম্যান ছাড়া অন্য কারো নেই। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ইউজিসি কর্তৃক কালো তালিকাভুক্ত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে আরো অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বাদ পড়াটা অস্বাভাবিক নয়। কারণ সরকার অনুমোদিত ৯১টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকা- যথাযথভাবে দেখভাল করার মতো দক্ষ জনবল বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের নেই। তাছাড়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনিয়ম-দুর্নীতি প্রতিরোধে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বরাবরে সুপারিশ করা ছাড়া ইউজিসির করণীয় তেমন কিছুই নেই। কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষমতা বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের নেই। অথচ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার দায়ভার পুরোপুরি দেয়া হয় ইউজিসিকে; যা কোনোভাবেই ইউজিসির প্রতি সুবিচার করা নয়। এক প্রশ্নের জবাবে ইউজিসির ওই শীর্ষ কর্মকর্তা আশাবাদী মনোভাব ব্যক্ত করে বলেন, বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিল আইন ২০১৬-এর খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়েছে। এ আইন অনুযায়ী কোনো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিলের সনদ ছাড়া এখন আর উচ্চশিক্ষার সনদ দিতে পারবে না। ফলে এ আইন পাস হলে উচ্চশিক্ষা প্রদানের নামে বাণিজ্য অনেকাংশে কমে যাবে।
তবে এ বিষয়ে দেশের অনেক শিক্ষাবিদ বলছেন, আসলে এক ধরনের জগাখিচুড়ি অবস্থা বিরাজ করছে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিগুলোতে। এই অবস্থার অবসান ঘটাতে না পারলে অচিরেই বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় বিপর্যয় নেমে আসবে। এই বিপর্যয়কর অবস্থা উতরানোর জন্য রাষ্ট্রের কর্ণধার, বিচার বিভাগ, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউজিসিÑ সবাইকে আন্তরিকতার সাথে এগিয়ে আসতে হবে। রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিক ক্ষমতাবলে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর। বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের চ্যান্সেলর হিসেবে রাষ্ট্রপতি প্রতিটি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিলে ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে সতর্ক হতো। শুধু রাষ্ট্রপতিই নন, বিচার বিভাগেরও এ বিষয়ে দায়িত্ব আছে। ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর যে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিগুলোর অনুমোদন বাতিল করেছে, তাদের সবাই আদালতের কাছ থেকে স্থগিতাদেশ নিয়ে আবারো তাদের অবৈধ কার্যক্রম সচল রাখতে সক্ষম হচ্ছে। দেদার চালিয়ে যেতে পারছে সার্টিফিকেট বাণিজ্য। অথচ আদালত যদি স্থগিতাদেশের মতো ক্লিয়ারেন্স না দিত, তাহলে ওইসব প্রতারক কর্তৃপক্ষের কোনো সাহসই হতো না নতুন করে প্রতারণা করার। তারা বাধ্য হয়েই শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির নির্দেশনা মেনে চলতো। তাই শিক্ষা সংশ্লিষ্ট অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অব্যবস্থাপনা ও নৈরাজ্য ঠেকাতে ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যথাযথ তদারকির পাশাপাশি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার দৃষ্টান্ত চালু করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সব সময়ই আন্তরিক। আন্তরিক বলেই প্রাক-প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই তাঁর সমান নজর আছে। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সব সময়, সব বিষয়ে সমান মনোযোগ দেয়া প্রধানমন্ত্রীর পক্ষেও সম্ভব হয় না। এজন্যই বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে বিভিন্ন দায়িত্ব দেয়া হয়। কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুর্বলতার কারণেই হোক, আর ইউজিসির নিস্পৃহতার কারণেই হোক বা আদালতের অসহযোগিতার কারণেই হোকÑ প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির শিক্ষা ব্যবস্থায় ভয়াবহ নৈরাজ্যকর অবস্থা বিরাজ করছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিগুলোতে চলা নৈরাজ্যের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে এখনই কঠোর হতে হবে। অন্য অনেক বিষয়ের মতো প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির বিষয়েও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ জরুরি। প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিগুলোর নৈরাজ্য, অসদুপায়, সার্টিফিকেট বিক্রির ন্যায় শিক্ষা বাণিজ্য এখনই রোধ করা না গেলে দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা এককথায় ভেঙেই পড়বে। এর প্রভাব এখনই সরকারি প্রশাসনে ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পড়েছে। এভাবে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির শিক্ষা ব্যবস্থা চলতে থাকলে অচিরেই শিক্ষা ব্যবস্থার মেরুদ-ই ভেঙে পড়বে। ফলে ভবিষ্যতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যোগ্য লোকের সংকট দেখা দেবে। এতে শিক্ষার পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থাও গতিশীলতা হারাবে। তাই এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগেই শিক্ষাবান্ধব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জরুরি হস্তক্ষেপ আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।