যুক্তরাষ্ট্র-উত্তর কোরিয়া উত্তেজনা : সমাধান কোন পথে

| October 9, 2017

নিজস্ব প্রতিবেদক : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, উত্তর কোরিয়ার হুমকি এমনভাবে মোকাবিলা করা হবে যা বিশ্ব এর আগে কখনো দেখেনি। এর বিপরীতে উত্তর কোরিয়ার হুমকি, তারা প্রশান্ত মহাসাগরে মার্কিন দ্বীপ গুয়ামে হামলা চালাবে, যেখানে প্রায় ১ লাখ ৬৩ হাজার মানুষ বসবাস করে।
এদিকে উত্তর কোরিয়াকে পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ করতে আলোচনাই একমাত্র উপায় বলে মন্তব্য করেছেন জ্যেষ্ঠ মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড মার্কি। দক্ষিণ কোরিয়া সফরকালে এক সংবাদ সম্মেলনে সহিংস অবস্থান থেকে কোরীয় উপত্যকায় কোনো সমাধান সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যকার সামরিক মহড়া কোরীয় সংকটকে আরো উসকে দেবে বলে সতর্ক করেছে চীন। একইভাবে দু’দেশের যৌথ সামরিক মহড়ায় পরমাণু যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে বলে হুঁশিয়ার করেছে পিয়ংইয়ং।
দক্ষিণ কোরিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় গোয়াং শহরের ‘ইন্টারন্যাশনাল এক্সিবিশন অ্যান্ড কনভেনশন সেন্টারে’ অনুষ্ঠিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ সামরিক মহড়া। উত্তর কোরিয়ার পরমাণু কর্মসূচির বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে চলছে এবারের মহড়া। যেখানে প্রদর্শন করা হয় সন্ত্রাসী ও রাসায়নিক হামলা মোকাবিলার নানা কৌশল।
এসব কিছুই এমন এক সময়ে ঘটছে যখন উত্তর কোরিয়া এক প্রকার পারমাণবিক বোমা তৈরিতে সফল হয়েছে, যা আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রে সংযোজন করা যাবে। ফলে পুরো বিষয়টি উদ্বিগ্ন করে তুলেছে যুক্তরাষ্ট্র আর তার মিত্রদের। তারা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন পুরোদস্তুর যুদ্ধ বেধে যাওয়ার আশঙ্কা নিয়ে এবং কতটা বিপদ তাদের সামনে অপেক্ষা করছে তা নিয়ে। তবে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ নিয়ে এখনই ততটা আতঙ্কিত হওয়ার দরকার নেই। তারা কিছু যুক্তিও তুলে ধরেছেন।
১. কোনো পক্ষই যুদ্ধ চাইছে না। কারণ কোরিয়া উপদ্বীপে একটি যুদ্ধ কারো জন্যই কোনো সুবিধা বয়ে আনবে না। উত্তর কোরিয়ায় ক্ষমতাসীনদের প্রধান লক্ষ্যই হচ্ছে ক্ষমতায় টিকে থাকা। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি যুদ্ধ বেধে গেলে ক্ষমতার আসন নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে।
তবে অনেক আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র আর উত্তর কোরিয়ার মধ্যে যুদ্ধ হলে তা আরো বড় আকারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে তা উত্তর কোরিয়ার জন্য হবে আত্মঘাতী। আবার ঠিক এই কারণেই তড়িঘড়ি পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক হতে চাইছে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উন। কারণ আর যাই হোক, তিনি লিবিয়ার গাদ্দাফি বা ইরাকের সাদ্দাম হোসেনের ভাগ্য বরণ করতে চান না। আবার যুক্তরাষ্ট্রও সহজে উত্তর কোরিয়ায় হামলা চালাবে না। কারণ তাহলে তা যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দক্ষিণ কোরিয়া বা জাপানের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। যুদ্ধে অনেক প্রাণহানি ঘটবে, বিশেষ করে সাধারণ আমেরিকান আর সৈনিকদের। সর্বোপরি, ওয়াশিংটন এমন কোনো ঝুঁকিতে যেতে চায় না, যার ফলে আমেরিকান ভূখ-ে কোনো পারমাণবিক হামলা হতে পারে।
২. মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উত্তর কোরিয়াকে যেভাবে হুমকি দিয়েছেন, সেটা একজন প্রেসিডেন্টের জন্য ব্যতিক্রম। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, যুক্তরাষ্ট্র পুরোদমে যুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে। মার্কিন একজন জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, উত্তেজক কথাবার্তা বাড়ছে মানে এই নয় যে, আমাদের অবস্থানও বদলাচ্ছে। সবচেয়ে বড় ব্যাপার, দুই দফা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার পর, জাতিসংঘের মাধ্যমে অবরোধ আরোপের সেই পুরনো পথেই হেঁটেছে যুক্তরাষ্ট্র। এখনো যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকরা আশা করছেন, রাশিয়া আর চীনের সহায়তায় উত্তর কোরিয়াকে আলোচনার টেবিলে আনা যাবে। যদিও কোনো কোনো বিশ্লেষকের মতে, এরকম উত্তেজক পরিস্থিতিতে কোনো ভুল বোঝাবুঝি থেকেও একটি যুদ্ধ বেধে যেতে পারে।
৩. যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পিজে ক্রাউলে বলেছেন, ১৯৯৪ সালের দিকে যুক্তরাষ্ট্র একবার উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সশস্ত্র যুদ্ধের কাছাকাছি চলে এসেছিল। তখন পারমাণবিক কমপ্লেক্সে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষককে প্রবেশে বাধা দিয়েছিল দেশটি। তবে কূটনীতি দিয়েই তা সমাধান করা হয়েছে। এরপর অনেকবার যুক্তরাষ্ট্র, জাপান আর দক্ষিণ কোরিয়ায় হামলার হুমকি দিয়েছে উত্তর কোরিয়া। কিন্তু সেগুলো কখনো বাস্তব হয়নি। আর এখন ডোনাল্ড ট্রাম্প যেভাবে পাল্টা হামলার হুমকি দিচ্ছেন, তাও একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের আচরণের পক্ষে যুক্তিসঙ্গত নয়।
এটাই যা একটু আশঙ্কার যে, তিনি হঠাৎ করে কোনো কা- না ঘটিয়ে বসেন। তবে তার এ ধরনের কোনো কাজে নিশ্চয়ই তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন যে বাধা দেবেন, তা বেশিরভাগ আমেরিকানই বিশ্বাস করেন। আর তাই ট্রাম্পের এরকম ব্যতিক্রমী আচরণের কারণে করো উদ্বিগ্ন হওয়ার দরকার নেই বলেই মনে করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। আর তাই হয়ত যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দক্ষিণ কোরিয়াও আগাম একটি যুদ্ধের আশঙ্কায় খুব একটা উদ্বিগ্ন নয়। দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, এখনো পরিস্থিতি সংকট সময়ে পড়েনি। আশা করা হচ্ছে শান্তিপূর্ণভাবেই বিষয়টির সমাধান হবে।
৪. উত্তর কোরিয়ার সবচেয়ে বড় মিত্র প্রতিবেশী চীন। অনেক কিছুর জন্যই দেশটি চীনের ওপর নির্ভরশীল। তাই বড় কোনো যুদ্ধে জড়াতে হলে চীনের মনোভাব বিবেচনা করতে হবে উত্তর কোরিয়াকে।
ইউনিভার্সিটি অফ মালয়েশিয়ার চীন বিষয়ক বিভাগের একজন ফেলো এবং চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়া বিষয়ক গবেষক ড. মাহমুদ আলী এ বিষয়ে বলেন, যদিও সোভিয়েত ইউনিয়ন উত্তর কোরিয়া প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেছে কিন্তু চীনের অর্থনৈতিক ও সামরিক সাহায্য সহায়তাতেই উত্তর কোরিয়া এতদিন ধরে টিকে রয়েছে। বতর্মান বাণিজ্যের ৯০ শতাংশই হয় চীনের সঙ্গে। তিনি আরো বলেন, চীন ঐতিহাসিকভাবে উত্তর কোরিয়াকে বাঁচিয়ে রেখেছে। চীন চায় না উত্তর কোরিয়া ধ্বংস হয়ে যাক। তাহলে এমন একটি সংযুক্ত, অবিভক্ত কোরিয়া সৃষ্টি হবে, যার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্যরা একেবারে চীনের সীমানায় চলে আসবে। আবার উত্তর কোরিয়া যুদ্ধবিধ্বস্ত হলে কোটি কোটি মানুষ এসে চীনে আশ্রয় নেবে। তখন একটি সামাজিক, অর্থনৈতিক বিপর্যয় তৈরি হবে। চীন সেটি চায় না বলে স্থিতিশীলতা তাদের কাম্য। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্ববাসীর জন্য এটাই হচ্ছে আশাবাদের বিষয়। তাই তারা বলছেন, যুদ্ধ নয়, আলোচনার মাধ্যমেই উত্তর কোরিয়া-যুক্তরাষ্ট্র বিষয়ক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান হবে।

Category: আন্তর্জাতিক

About admin: View author profile.

Comments are closed.