প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বাংলাদেশ : সারাদেশে নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হলো শারদীয় দুর্গোৎসব

নিজস্ব প্রতিবেদক : সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করে বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা এ বছর সারা বাংলাদেশেই নির্বিঘেœ পালিত হয়েছে। আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে মহালয়া উৎসবের সঙ্গে সঙ্গে বাঙালি দুর্গাপূজা আয়োজনের জন্য মেতে উঠেছিল। মহাষষ্ঠী পূজার মধ্য দিয়ে প্রতিটি পূজাম-পেই শঙ্খধ্বনি বেজে ওঠে। আবালবৃদ্ধবনিতা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই পূজাম-পে আগ্রহভরে পূজা দেখতে হাজির হন। দুর্গাপূজাকে আরেক নামে বলা হয় সার্বজনীন দুর্গোৎসব। কেবল বাংলাদেশে বা ভারতে নয়, সারা পৃথিবীর বাঙালি হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা দুর্গাপূজা উৎসবকে তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের প্রধান উৎসব হিসেবে পালন করে থাকে। শারদীয় দুর্গাপূজা আনন্দ-মিলনেরও উৎসব। আর এই উৎসবে সব ধর্মের, সব বর্ণের মানুষের সমাগম ঘটে; তারা পরস্পর আবদ্ধ হন সম্প্রীতির মেলবন্ধনে।
৩০ সেপ্টেম্বর বাবার বাড়ি থেকে আনন্দময়ী দেবী দুর্গা ফিরে গেছেন কৈলাসের দেবালয়ে। বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দুর্গোৎসব। শেষ হয়েছে বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠানের শারদীয় উৎসব। ১০ দিন আগে মহালয়ার পুণ্য তিথিতে দেবীদুর্গা মর্ত্যে আবাহনের মাধ্যমে যে উৎসবের সূচনা হয়েছিল, ৩০ সেপ্টেম্বর সকালে বিজয়া দশমীতে বিহিত পূজা আর দর্পণ বিসর্জনে দুর্গাপূজার শাস্ত্রীয় সমাপ্তি ঘটে। আর বিকেলে কড়া নিরাপত্তায় সম্পন্ন হয় প্রতিমা বিসর্জনের আনুষ্ঠানিকতা। এবার প্রতিটি পূজাম-প ছাড়াও প্রতিমা বিসর্জন পর্যন্ত বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা প্রদান করেছিল পুলিশ-র‌্যাবসহ সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বরাবরের মতো এবারও বেশ সতর্ক ও সক্রিয় ছিল গোয়েন্দা সংস্থাসমূহ। এবার পবিত্র আসুরার সঙ্গে বিজয়া দশমীর আনুষ্ঠানিকতা খানিকটা মিলে যাওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দিকে বাড়তি নজর ছিল সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, মানুষের মনের আসুরিক প্রবৃত্তি যেমন কাম, ক্রোধ, হিংসা, লালসা বিসর্জন দেয়াই মূলত বিজয়া দশমীর মূল তাৎপর্য। এসব প্রবৃত্তিকে বিসর্জন দিয়ে একে অন্যের সঙ্গে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠাই এ আয়োজনের উদ্দেশ্য।
সনাতন বিশ্বাস ও বিশুদ্ধ পঞ্জিকা অনুসারে জগতের মঙ্গল কামনায় দেবী দুর্গা এবার মর্ত্যলোকে (পৃথিবী) নৌকায় চড়ে আসায় দেশে অতি বৃষ্টি ও শস্য বৃদ্ধি হবে। আর ঘোটকে (ঘোড়া) চড়ে স্বর্গালোকে গমন করায় রোগ, ব্যাধি বাড়বে ও ফসল নষ্ট হবে। তবে ভক্তদের বিশ্বাস, ফল যাই হোক মা মঙ্গলময়ী, আনন্দময়ী। তিনি জগতের কল্যাণ করেন। তিনি সন্তানের কল্যাণই করবেন।
ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী; দেবী দুর্গা যে ক’দিন পিতৃগৃহে ছিলেন, ঢোলের বাদ্য সে ক’দিন ভক্তদের মনে ভক্তি আর আনন্দ মূর্ছনা দুই-ই জাগিয়েছে। দশমীর দিন সকালে সকল ম-পে দশমী পূজা সমাপন ও দর্পণ বিসর্জন দেয়া হয়। শাস্ত্রীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেও বিসর্জনের আগে রাজধানীর ম-পে ম-পে দুপুর পর্যন্ত চলে আবির খেলা আর আনন্দ উৎসব।
রাজধানী ঢাকার রমনা কালীমন্দির, সিদ্ধেশ্বরী মন্দির, স্বামীবাগ লোকনাথ ব্রহ্মচারী আশ্রম, ধানমন্ডি কলাবাগান মাঠ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল, বাংলাবাজার পূজা কমিটি, নর্থব্রুক হল রোড, প্রতিদ্বন্দ্বী পূজাম-প, তাঁতীবাজার পূজা কমিটি, শঙ্ঘমিত্র শাঁখারীবাজার, পাণিটোলা, বরদেশ্বরী কালীমাতা মন্দির ও শ্মশান কমিটি, হাজারীবাগ সুইপার কলোনি, মিরপুর কেন্দ্রীয় মন্দির, আজিমপুর সার্বজনীন পূজাম-প বনানী পূজাম-প, গৌতম মন্দির, ভোলাগিরি আশ্রমসহ বিভিন্ন পূজাম-পে পুষ্পাঞ্জলি, প্রসাদ বিতরণ, সন্ধ্যা আরতিসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে বিশেষ বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাণীতে রাষ্ট্রপতি আশা প্রকাশ করেন, শারদীয় দুর্গোৎসব সত্য-সুন্দরের আলোয় ভাস্বর হয়ে, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার মধ্যে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যরে বন্ধনকে আরও সুসংহত করবে। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার, আমরা সবাই একসাথে উৎসব পালন করব।’
পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও ডিআইজিপি মহসীন এবারের দুর্গোৎসব সম্পর্কে স্বদেশ খবরকে বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুকেন্দ্রিক অস্থিরতার পাশাপাশি সরকারকে আরও বেকায়দায় ফেলতে বিজয়া দশমীর অনুষ্ঠানের দিনে দেশে কেউ যাতে বড় ধরনের নাশকতা না ঘটাতে পারে সে জন্য সর্বোচ্চ সতর্কতায় ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। রোহিঙ্গা ইস্যুকে সামনে রেখে নাশকতা চালানোর নেপথ্যে কাজ করার সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করছিল দেশি-বিদেশি বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন। সে জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পূজাম-প এলাকায় গড়ে তোলা হয় কড়া নিরাপত্তাবলয়। বসানো হয় শত শত সিসি ক্যামেরা। বসানো হয় ওয়াচ টাওয়ার। আর্চওয়ে, মেটাল ডিটেক্টর। মোতায়েন করা হয় পর্যাপ্ত পুলিশ, র‌্যাব ও গোয়েন্দা সদস্যদের।
প্রতিমা বিসর্জনের উদ্দেশে রাজধানীর ঢাকেশ্বরী মন্দির মেলাঙ্গন থেকে বিজয়ার কেন্দ্রীয় শোভাযাত্রা বের হয়। দুপুরে পূজা উদযাপন পরিষদ এবং মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির যৌথ উদ্যোগে বের হয় বর্ণাঢ্য এই বিজয়া শোভাযাত্রা। বিজয়া শোভাযাত্রা ও প্রতিমা বিসর্জনে অংশ নিতে দুপুর গড়িয়ে যেতেই ভক্তরা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার পূজাম-প থেকে ট্রাকে করে প্রতিমা নিয়ে সমবেত হতে শুরু করেন ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির প্রাঙ্গণে। ঢাকার বিভিন্ন স্থানের পূজাম-প থেকে আসা প্রতিমা নিয়ে ট্রাকগুলো সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে যায় রাস্তায়। প্রতিটি ট্রাকে দুর্গার পাশাপাশি লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশের প্রতিমাও ছিল। সেই সঙ্গে উৎফুল্ল ছিল বিভিন্ন বয়সী হিন্দু নারী-পুরুষ। তারা নেচে-গেয়ে শোভাযাত্রাকে আরও বর্ণিল করে তোলে। সেখান থেকে সম্মিলিত বাদ্য-বাজনা, মন্ত্রোচ্চারণ ও পূজা-অর্চনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় শোভাযাত্রা। অধিকাংশ ম-পের প্রতিমা বিসর্জন দেয়া হলেও ঢাকেশ্বরী মন্দিরের প্রতিমাটি রেখে দেয়া হয়। কিন্তু পূজার কাজে ব্যবহৃত দেবীর ফুল, বেলপাতা ও ঘট বিসর্জন দেয়া হয়।
যাত্রাপথে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা এড়াতে পুলিশ সংশ্লিষ্ট সড়কগুলোতে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে রাখে। বিপুলসংখ্যক পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব সদস্যরাও মাঠে সক্রিয় ছিলেন। এ সময় বুড়িগঙ্গার দুই তীরে হাজারও ভক্ত ও দর্শনার্থী প্রতিমা বিসর্জন দেখতে ভিড় করেন। অনেকে প্রতিমা বিসর্জনের সময় নৌকায় করে নদীতে আনন্দ করে। এজন্য ওয়াইজঘাট এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়।
প্রথা অনুযায়ী প্রতিমা বিসর্জনের পর সেখান থেকে জল এনে (শান্তিজল) মঙ্গলঘটে নিয়ে তা আবার হৃদয়ে ধারণ করা হয়। আগামী বছর আবার এ শান্তিজল হৃদয় থেকে ঘটে, ঘট থেকে প্রতিমায় রেখে পূজা করা হবে। রামকৃষ্ণ মিশনে সন্ধ্যা আরতির পর মিশনের পুকুরে প্রতিমা বিসর্জন দেয়া হয়। এরপর ভক্তরা শান্তিজল গ্রহণ ও মিষ্টিমুখ করেন।
ঢাকায় ঢাকেশ্বরী মন্দিরে সার্বজনীন পূজা কমিটির আয়োজনে দুর্গাপূজা শ্রীরামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের দুর্গাপূজা ম-প ছাড়াও ঢাকার কলাবাগান ও বনানীর পূজাম-পে ছিল এবার সর্বকালের সেরা লোক সমাগম। পূজার ৪টি দিনই বিশেষত সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী ও দশমীর দিনে ম-পে ছিল উপচেপড়া ভিড়। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ অনেক আগ্রহ আর উদ্দীপনা নিয়ে এবার পূজাম-পে এসে দুর্গাকে পূজা দিয়েছেন। নয়ন ভরে দুর্গাকে দর্শন করেছেন, চরণ ছুঁয়ে দুর্গার কাছে আশীর্বাদ চেয়েছেন, দুর্গা যেন তাদের সুখী রাখেন, দেশে যেন শান্তি বজায় থাকে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায়ই তার বিভিন্ন বক্তৃতায় বলে থাকেন, ধর্ম যার যার, উৎসব সবারÑ এবারের দুর্গাপূজাতে আবারও তা প্রমাণিত হয়েছে। কোনো ধর্মেরই উগ্রবাদ বা জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাসবাদ বাংলাদেশের উৎসবের আনন্দ ম্লান করে দিতে পারে না, বন্ধ করে দিতে পারে না যেকোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষের ইচ্ছাকে। তারই প্রমাণ এবারের সার্বজনীন দুর্গাপূজা।
দুর্গাপূজার মহাষষ্ঠীর দিন ছিল কুমারী পূজা। শ্রীরামকৃষ্ণদেব নিজ স্ত্রীকে ষোড়শীজ্ঞানে পূজা করে মাতৃসম্মানের এক অত্যুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। আর এরই ধারাবাহিকতায় রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন কুমারী পূজার মাধ্যমে নারী সমাজের তথা মাতৃশক্তি জাগরণের এক অত্যুজ্জ্বল ধারা বর্তমান সমাজে তুলে ধরেছেন। প্রতিবারের মতো এবার শ্রীরামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনে অনুষ্ঠিত হয়েছে সাড়ম্বরে কুমারী পূজা। বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে দেবী দুর্গা মায়ের রূপ নিয়ে আসেন। এর প্রতিফলন খুঁজে পায় মা, কন্যা বা স্ত্রীর মাঝে। এ পূজায় দেবীজ্ঞানে যেকোনো কুমারীই পূজনীয়। তাই এক কুমারী কন্যাকে পূজার আসনে প্রতিষ্ঠা করে তার মধ্য দিয়ে দুর্গার উদ্দেশে শ্রদ্ধা নিবেদন করল হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। কুমারী পূজায় সারা রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠ লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠেছে, তিলধারণের জায়গা ছিল না। সবাই নির্বিঘেœ কুমারী পূজা দর্শন করেছে। অঞ্জলি দিয়ে মহাপ্রসাদ নিয়ে নিশ্চিন্তে নিরাপদে সবাই বাড়ি ফিরেছে।
মানুষ পূজা দেখতে যেভাবে লাইন ধরে শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে পূজাম-পে গেছে সেটাও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে সবার। দুর্গার ভক্তরা এমন সুশৃঙ্খলভাবে পূজা দেখতে এসেছিলেন যেন, এই উৎসব তাদের সবার, তাই দায়িত্বও সবার। সবার লক্ষ্য ছিল যেন কোথাও কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয়। সেজন্য তারাও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পূজার আনন্দ উপভোগ করেছেন।
দুর্গা দুর্গতিনাশিনী হিসেবে প্রতি বছর হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের সামনে আবির্ভূত হন। হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষের বিশ্বাস মা দুর্গা তার দশ হাতে সব দুঃখ, দৈন্য, অভাব, অনাচার, অবিচার, হিংসা, বিদ্বেষ থেকে তাদের মুক্তি দেবেন।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, এবছর সারাদেশে ৩০ হাজার ৭৭ ম-পে শারদীয় দুর্গোৎসব হয়েছে। গত বছর ২৯ হাজার ৩৯৫ ম-পে দুর্গাপূজা হয়। গত বছর রাজধানীতে ৩২৬ ম-পে দুর্গাপূজা হয়েছে। এবছর এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৩১।