প্রতিবেদন

২০১৭ সালের নোবেল পুরস্কার পেলেন যেসব বরেণ্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান

স্বদেশ খবর ডেস্ক : চলতি বছরের নোবেল পুরস্কার দেয়া শেষ হয়েছে। প্রতি বছর সবার আগে চিকিৎসায় নোবেল বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়। এর পর পর্যায়ক্রমে রসায়ন, পদার্থবিদ্যা, সাহিত্য, শান্তি ও অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়। ৭ অক্টোবর এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত অর্থনীতি ছাড়া বাকি সকল বিষয়েই পুরস্কার প্রাপ্তদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে ৯ অক্টোবর। স্বদেশ খবর পাঠকদের জন্য তাই অর্থনীতি ছাড়া বাকি বিষয়ে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্ত বরেণ্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম প্রদান করা হলো।
চিকিৎসা
গাছপালা, প্রাণী এবং মানবদেহের শরীরবৃত্তীয় শৃঙ্খল কিভাবে পৃথিবীর আবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে এই রহস্যের উদ্ঘাটন করার স্বীকৃতি হিসেবে এ বছর চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল পেয়েছেন তিন আমেরিকান বিজ্ঞানী জেফরি সি হল, মাইকেল রোসব্যাশ এবং মাইকেল ডব্লিউ ইয়াং।
তারা দেখিয়েছেন জীবদেহের আণবিক ক্রিয়াকলাপ পদ্ধতি সার্কাডিয়ান ছন্দ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। তাদের এই আবিষ্কারকে চব্বিশ ঘণ্টার দেহঘড়ি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
নোবেল কমিটির এক ঘোষণায় বলা হয়, প্রাণিদেহে একটি সাইকেল ক্লক বা ঘড়ি চালু রয়েছে, যা পৃথিবীর আহ্নিক গতি ও সৌর জগতের বিবর্তনের সঙ্গে প্রাণিদেহকে মানিয়ে নিতে সহায়তা করে। এমন ধারণা অনেক আগের হলেও এতদিন পর্যন্ত এ বিষয়ে তেমন কোনো অকাট্য দলিল কেউ দেখাতে পারেননি। জেফরি সি হল, মাইকেল রোসব্যাশ ও মাইকেল ডব্লিউ ইয়ং এই প্রমাণটিই করে দেখিয়েছেন। একই সঙ্গে শরীরবৃত্তীয় বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই দেহঘড়ির প্রভাবের বিষয়টিও তারা বের করেছেন। নোবেল কমিটির পক্ষ থেকে এ আবিষ্কারকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে বড় ধরনের অগ্রগতির ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মাধ্যাকর্ষণ শক্তি এবং আহ্নিক গতি পৃথিবীর জীবজগতকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। প্রাণীর অভিযোজন থেকে শুরু করে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, হরমোন নিঃসরণ, খাদ্য পরিপাক, ঘুমসহ বিভিন্ন বিষয়ের নিয়ন্ত্রণ করে এই শক্তি। ঠিক একইভাবে প্রাণীর শরীরের অভ্যন্তরে রয়েছে একটি জৈবিক ছন্দ বা দেহঘড়ি যা সার্কাডিয়ান রিদম নামে পরিচিত। মূলত বহির্জগতের সঙ্গে প্রাণিদেহের সামঞ্জস্য তৈরি করার জটিল কাজটি করে থাকে এই সার্কাডিয়ান রিদম বা দেহঘড়ি।
মৌমাছির ওপর কাজ করে এই তিন বিজ্ঞানী দেখতে পান যে, এর শরীরে বিশেষ এক ধরনের জিন রয়েছে। যার কারণে দিনের বেলায় মৌমাছির শরীরে বিশেষ এক ধরনের প্রোটিন জমাট বাঁধে, রাতের বেলায় তা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে নিঃশেষ হয়ে যায়। এই ঘটনা প্রতিদিনই ঘটে, যা সময়ের ধারণার মতো একটি নিজস্ব সময়ের বৃত্ত তৈরি করে।
পুরস্কারের নগদ অর্থের ৯০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা বা ১১ লাখ মার্কিন ডলারের দুই ভাগের একভাগ পাবেন জেফরি সি হল এবং মাইকেল রোসব্যাশ। বাকি ভাগ যাবে মাইকেল ডব্লিউ ইয়াংয়ের পকেটে।
প্রতি বছর ২ অক্টোবর সবার আগে চিকিৎসায় নোবেল বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়। ১৯০৫ সালে নোবেল পুরস্কার প্রদান শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত চিকিৎসা ক্ষেত্রে ১০৮বার নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়েছে। ২০১৬ সালে চিকিৎসায় নোবেল জিতেছিলেন জাপানের নাগরিক ইয়োশিনোরি ওহসুমি। জেফরি সি হলের জন্ম নিউইয়র্কে এবং রোসব্যাশের জন্ম কানসাস শহরে। তারা দুজনই ব্রানডেইজ বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করেন। মাইকেল ইয়াংয়ের জন্ম হয়েছে মায়ামিতে এবং তিনি রকফেলার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান।
রসায়ন
চলতি বছর রসায়নে যৌথভাবে নোবেল পেয়েছেন তিন বিজ্ঞানী ও গবেষক। তিনজন তিন দেশের নাগরিক। তারা হলেন জ্যুকেয়েস ডোবেশেট, জোয়াকিম ফ্রাংক ও রিচার্ড হ্যান্ডারসন।
৪ অক্টোবর সুইডেনের স্টকহোমে দ্য রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস এ পুরস্কারের ঘোষণা দেয়। নোবেল কমিটি এক বিবৃতিতে জানায়, ক্রিয়ো-ইলেকট্রন মাইক্রোস্কপি উদ্ভাবনের জন্য এই তিন বিজ্ঞানীকে নোবেল পুরস্কার দেয়া হলো।
দ্রবণে জৈব অণুর গঠন সুস্পষ্টভাবে (উচ্চ-রেজ্যুলেশনে) চিহ্নিত করা যায় এই প্রযুক্তির মাধ্যমে। সুইডেনের নোবেল অ্যাসেম্বলির পুরস্কার প্রদানকারী কারোলিনসকা ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, চলতি বছর নোবেল পুরস্কারের অর্থমূল্য প্রায় ৯০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা বা ১১ লাখ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি টাকায় যা প্রায় ৯ কোটি টাকা। পুরস্কারপ্রাপ্ত তিন বিজ্ঞানীর মাঝে এই অর্থ সমান ভাগে ভাগ করে দেয়া হবে।
পুরস্কারপ্রাপ্ত তিন বিজ্ঞানীর মধ্যে সুইজারল্যান্ডের নাগরিক জ্যুকেয়েস ডোবেশেট ল্যুটন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। জার্মানিতে জন্মগ্রহণকারী জোয়াকিম ফ্রাংক অধ্যাপনা করেন নিউইয়র্কের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। আর রিচার্ড হ্যান্ডারসন যুক্তরাজ্যের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।
পদার্থবিদ্যা
রেইনার ওয়াইস, ব্যারি সি ব্যারিশ ও কিপ এস থর্ন অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের ভবিষ্যদ্বাণীকৃত মাধ্যাকর্ষণ তরঙ্গ পর্যবেক্ষণ করার জন্য পদার্থবিদ্যায় ২০১৭ সালের নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন।
ব্যারি ব্যারিশ, কিপ থর্ন ও রেইনার ওয়াইসের এই আবিষ্কার বিশ্বকে চমৎকৃত করেছে বলে সুইডেনের রয়্যাল অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস-এর প্রধান গোরান কে হ্যানসন মন্তব্য করেছেন।
তিন বিজ্ঞানী লিগো বা লেজার ইন্টারফেরোমিটার গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ অবজারভেটরি প্রকল্পে বিশেষ অবদান রাখেন। ৪ অক্টোবর ঘোষণা করা পুরস্কারের অর্ধেক অর্থ পাবেন ওয়াইস; ব্যারিশ ও থর্ন মিলে পাবেন অবশিষ্ট অর্ধেক অর্থ।
১০০ বছর আগে আইনস্টাইন তার জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটির অঙ্গ হিসেবে মাধ্যাকর্ষণ তরঙ্গের অস্তিত্বের সম্ভাবনার কথা বলেন। সেই মাধ্যাকর্ষণ তরঙ্গের চূড়ান্ত হদিস পাওয়া যায় মাত্র দু’বছর আগে, ২০১৫ সালে। এই তিন বিজ্ঞানী প্রকল্পটি সম্পূর্ণ করার মাধ্যমে নিশ্চিত করেন যে, চার দশকের প্রচেষ্টার পর অবশেষে মাধ্যাকর্ষণ তরঙ্গ পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে।
সাহিত্য
২০১৭ সালে সাহিত্যে নোবেল পেয়েছেন ব্রিটিশ লেখক কাজুও ইশিগুরো। সুইডিশ কমিটির পক্ষ থেকে এই ব্রিটিশ লেখকের ব্যাপক প্রশংসা করে বলা হয় এই লেখক নিজের আদর্শ ঠিক রেখে, আবেগপ্রবণ শক্তি দিয়ে বিশ্বের সঙ্গে আমাদের সংযোগ ঘটিয়েছেন।
কাজুও ইশিগুরোর উপন্যাসগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো দ্য রিমেইন্স অব দ্য ডে এবং নেভার লেট মি গো। এ দুটো উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্রও তৈরি করা হয়েছে। সাহিত্যে নোবেল জয়ের পর কাজুও ইশিগুরো তার প্রতিক্রিয়ায় জানান, তিনি অবাক হয়েছেন, হতবিহ্বল হয়ে পড়েছেন। তিনি বলেন, এটা অবশ্যই দারুণ সম্মানের বিষয়। এমন পুরস্কার জয় করা মানে বড় বড় লেখকের পাশে নিজেকে দাঁড় করানো।
মূলত ঔপন্যাসিক হলেও ছোট গল্পকার, চিত্রনাট্যকার, গীতিকার ও কলাম লেখক হিসেবেও খ্যাতি রয়েছে ইশিগুরোর। ৮টি বই লিখেছেন তিনি, আর এই ৮টি বই মোট ৪০টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ইশিগুরোর লেখার চরিত্ররা অতীতের সমস্যা-সংঘাতেই থেকে যায়, অমীমাংসিত থেকে যায় তাদের জীবনের ঘটনাগুলো। বিষণœতায় সমাপ্তি ঘটে তার লেখার কাহিনির। রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমির ভাষায়, কাহিনি যা-ই হোক, লেখকের ভাষা থাকে নির্বিকার।
১৯৫৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন ইশিগুরো। তার বাবা সমুদ্রবিজ্ঞানী হিসেবে ইংল্যান্ডে চাকরি পেলে ৫ বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে জাপান থেকে ব্রিটেনে চলে যান তিনি। ইউনিভার্সিটি অব কেন্টে ইংরেজি ও দর্শনে পড়াশুনার পর তিনি ইউনিভার্সিটি অব ইস্ট অ্যাংলিয়া থেকে সৃজনশীল লেখালেখির ওপর স্নাতকোত্তর করেন।
শান্তি
শান্তিতে এ বছরের নোবেল পুরস্কার বিজয়ী হিসেবে পরমাণু অস্ত্রের বিস্তার রোধে কাজ করছে এমন একটি সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইন টু অ্যাবোলিশ নিউক্লিয়ার উইপন্স বা আই ক্যান-এর নাম ঘোষণা করা হয়েছে। ৬ অক্টোবর এই ঘোষণা দেয়া হয়।
নরওয়েতে নোবেল কমিটি জানিয়েছে, পরমাণু অস্ত্রের ভয়াবহ পরিণতির বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা এবং এই অস্ত্রকে নিষিদ্ধ করার লক্ষ্যে চুক্তি সম্পাদনের চেষ্টার জন্য এই সংগঠনটিকে এবার নোবেল শান্তি পুরস্কার দেয়া হলো।
নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী হিসেবে আইকানের নাম এমন এক সময়ে ঘোষণা করা হলো যখন পরমাণু শক্তিধর উত্তর কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের তরফে পরস্পরকে আক্রমণের হুমকি দেয়া হচ্ছে। নোবেল কমিটি থেকেও সতর্ক করে দেয়া হয়েছে যে, পরমাণু যুদ্ধের ঝুঁকি বর্তমানে গত বহু বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি।
আই ক্যানের চাপে চলতি বছরেরই জুলাই মাসে পরমাণু অস্ত্র নিষিদ্ধ করার উদ্দেশ্যে জাতিসংঘে ১২২টি দেশ এক প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। কিন্তু যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রসহ পরমাণু শক্তিধর ৯টি দেশ এই প্রস্তাবে সই করেনি।
ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইন টু অ্যাবোলিশ নিউক্লিয়ার উইপন্স নিজেদেরকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বেসরকারি সংস্থার একটি জোট বলে বর্ণনা করে। ১০ বছরেরও বেশি পুরনো জেনেভাভিত্তিক এই সংগঠনটি জানিয়েছে, একশোটিরও বেশি দেশের বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা এই জোটের সদস্য।
পুরস্কার হিসেবে আই ক্যান নামের প্রতিষ্ঠানটি পাবে ১১ লাখ ডলার ও একটি নোবেল পদক। আগামী ডিসেম্বর মাসে এক অনুষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানটির হাতে নোবেল শান্তি পুরস্কার তুলে দেয়া হবে।