কলাম

একটি বুলেট ও ইরাকের দরিদ্র জনগণের সাথে একাত্মতা ঘোষণা

মেজর তারিকুল ইসলাম মজুমদার, পিএসসি, জি (অব.) : ইরাকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা গার্ড বাহিনীতে থাকাকালীন আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল তেলের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচিতে আগত খাদ্যবাহী ট্রাকগুলোকে ইরাকের বিভিন্ন শহরে পৌঁছে দেয়া। খাদ্যবাহী এসব ট্রাক তুরস্ক থেকে আসত। তুরস্ক ও কুর্দিস্তানের সীমান্তে যোগাযোগের জন্য খাবুর নদীর উপরে দু’টি ঝুলন্ত সড়ক সেতু ছিল। উপসাগরীয় যুদ্ধে আমেরিকানরা এর একটা হাওয়াই বোমা মেরে ভেঙে দিয়েছিল। আপৎকালীন সময়ে ঝুলন্ত সেতুগুলো প্রায়ই বন্ধ করে দেয়া হয়।
তুরস্কের সিলোপি শহর থেকে উল্লেখিত ঝুলন্ত সড়ক সেতু দিয়ে ট্রাকের বহর প্রথমে আসে উত্তর ইরাকের জাকো শহরের ইব্রাহীম খলিল স্থলবন্দরে। সেখানে দ্রব্য-সামগ্রীর মান পরীক্ষা করেন বিদেশি পরিদর্শকরা। তারপর হস্তান্তর করা হয় জাতিসংঘ নিরাপত্তা গার্ডদের হাতে। গার্ডরা সেগুলো এসকর্ট করে পৌঁছে দেয় ইরাকের বিভিন্ন শহরে।
ট্রাক চালকরা সবাই তুর্কি। তাদের প্রধান সমস্যা হল ভাষা। ইরাকি সৈন্যদের সঙ্গে প্রায়শই তাদের বিবাদ বেধে যেত। বিশেষত পাসপোর্ট ও ভিসা নিয়ে এ বিরোধ বাধতো। জাতিসংঘের গার্ড সে বিরোধ মেটাত। তবে ইরাকি সৈন্যরা জাতিসংঘ গার্ডদের খুবই সম্মানের চোখে দেখত।
ইরাকি সৈন্যরা সব চেকপোস্টে প্রহরায় নিয়োজিত থাকত। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় তারা সীমান্তে মোতায়েন হওয়ার পর আর বাড়িতে ফিরে যায়নি। এখানেই তারা আকাশের দিকে তাক করে রেখেছে বিমান-বিধ্বংসী কামানগুলো। এটা অবশ্য নো ফ্লাই জোন এর ভিতরে। উত্তর ইরাকের অভ্যন্তরে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানগুলো প্রায় প্রতিদিন টহল দেয়। বিমানের বিকট শব্দে আমরা প্রায়শই ভোরে ঘুম থেকে জেগে উঠতাম।
বাগদাদে পৌঁছার পর জাতিসংঘের নিরাপত্তা গার্ড হওয়ার কারণে নিজস্ব হাতিয়ার হিসাবে আমাদের দেয়া হলো একটি করে ৯ মি: মি: পিস্তল। সঙ্গে দেয়া হয়েছিল দু’টি লোডেড ম্যাগজিন। প্রতিটিতে থাকত ৮টি করে বুলেট। বাগদাদের ক্যানাল হোটেলে এগুলো ইস্যু করার সময় ভিনদেশি ইনচার্জ বলেছিলেন, ‘পিস্তল হারালে ৫০০ ডলার জরিমানা’। ভাবলাম, হারানোর সম্ভাবনাটা কোথায়? পরে জেনেছিলাম উত্তর ইরাকের পি কে কে গেরিলারা অনেক সময় বখশিশ হিসাবে পিস্তল কিংবা ওয়াকিটকি সেট চেয়ে বসে। অনেকেই এইসব বখশিশ দিয়ে প্রাণে বেঁচেছেন। ৫০০ ডলারের বিনিময়ে প্রাণ অনেক সস্তা বটে। ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সময়ের কোনো এক সকালে এসকর্টে বের হলাম। ইরাকি সৈন্যরা তখন ট্রাক পরীক্ষায় ব্যস্ত। আমার কোমরের পিস্তলটিতে আমি ম্যাগজিন লোড করতে ভুলে গিয়েছিলাম। তবে রিজার্ভ ম্যাগজিনটি তার খাপেই ছিল। একজন ইরাকি অফিসার আমার সম্মুখে এগিয়ে এলেন। তার কোমরেও ছিল তারিক পিস্তল। আমার পিস্তলের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করলেন অফিসার। বোঝাতে চাইলেন তোমার পিস্তলটি আনলোডেড। বুঝতে পেরে মুখে বললাম, ভুলে গিয়েছি।
ইরাকি অফিসারটি আস্তে আস্তে অনেকটা নাটকীয়ভাবে তার পিস্তলটি বের করলেন। ক্লিপ-এ চাপ দিতেই ক্লিক করে পিস্তলের ম্যাগজিনটি বের হয়ে এল। তারপর তিনি বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে চাপ দিলেন উপরের বুলেটটাতে। বের হয়ে গেল তাজা চকচকে বুলেটটি। আমাকে বুলেটটি দিয়ে বললেন, তোমার জন্য আজকের দিনের উপহার। কিছুটা ঘাবড়ে গেলাম। তারপরও ধন্যবাদ জানিয়ে বুলেটটি সাদরে গ্রহণ করলাম।
নিজের অজান্তে আমি বুলেটটিকে চুম্বন দিলাম। অর্থনৈতিক অবরোধের ফলে ইরাকি অফিসারটির সামরিক পোশাকে ছিল দারিদ্র্যের ছাপ। কিন্তু মুখে ছিল দৃঢ়তা এবং বিজয়ের হাসি।
সাত দিন পর। সূর্য ডুবে গিয়ে রাতের অন্ধকার নেমে আসছিল। এই সময়টায় প্রায় বিদ্যুৎ চলে যায়। উত্তর ইরাকের বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় ইরাকের মসুল শহর থেকে। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ বিভ্রাটও হয়। এ সময় মেজাজ বিগড়ে যায়। হঠাৎ করেই প্রচ- গোলাগুলির শব্দ। বের হয়েই দেখি ট্রেসার বুলেটে রাতের আকাশ আলোকিত হয়ে গেছে। হাউজ কিপারকে জিজ্ঞেস করতেই সে উত্তর দিল, তেলের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি পুনরায় চালু হয়েছে। মাঝখানে কিছুদিন বন্ধ ছিল। যেকোনো উৎসবে কুর্দিরা গোলাগুলি করে এমনিভাবে তা উদযাপন করে থাকে। এমনকি বিয়েতেও। ধনী হোক, গরিব হোক সবার নিকট আছে একটি কালাসনিকভ বন্দুক। এখানে পানির দরে বিক্রি হয় এসব। বাজারে কিনতে পাওয়া যায় বুলেট।
নিজের ড্রয়ারে সযতেœ রক্ষিত ইরাকি অফিসারের দেয়া উপহারের বুলেটটি বের করলাম। নিজের পিস্তলের ম্যাগজিনের সবকটি বুলেট বের করে তাতে পুরে দিলাম উপহারের বুলেটটি। সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠে গেলাম। তারপর দিলাম পিস্তলের ট্রিগারে চাপ। একটি শব্দ, বুলেটটি হারিয়ে গেল আকাশে। একাকার হয়ে গেল হাজার হাজার ট্রেসার বুলেটের মাঝে। একাত্মতা ঘোষণা করলাম ইরাকের দরিদ্র জনগণের সাথে।
মিশন শেষে ইরাক থেকে ফেরার পথে বুলেটের খোসাটি নিয়ে আসার জন্য মনটা ব্যাকুল হয়ে গেল। কিন্তু না, এয়ারপোর্টে অনেক ঝামেলা হবে। তাও আবার বাড়ি যেতে হবে কুয়েত এয়ারপোর্ট হয়ে। ইরাক থেকে ফিরলেই কুয়েতিরা অনেক সন্দেহ করে, এমনকি তাদের দেশের ভিতরে ঢুকতে দেয় না। একদিন এলাকা পরিদর্শনে বের হলাম। গেলাম জাকো শহরের পশ্চিমে ইউফ্রেটিস নদীর তীরে। তুরস্ক থেকে ইরাকে প্রবহমান নদীটি ধীরে ধীরে প্রবাহিত হচ্ছিল। তখন পকেট থেকে বুলেটের খোসাটি বের করলাম এবং সজোরে নিক্ষেপ করলাম ঠিক নদীর মাঝখানে। মনে মনে বললাম তোমাদের নামে উৎসর্গ করলাম, হে দরিদ্র ইরাকিরা, তোমাদের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে একটি অনর্থক অর্থনৈতিক অবরোধ।
লেখক : উপপরিচালক (অর্থ ও প্রশাসন)
আর্মি ইনস্টিটিউট অব
বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন
জালালাবাদ সেনানিবাস, সিলেট