প্রতিবেদন

কনভোকেশন বাণিজ্য : শিক্ষার্থীদের সনদ বিতরণের তারিখ নিজেই ঘোষণা করলেন এশিয়ান ইউনিভার্সিটির স্বঘোষিত ভিসি ড. সাদেক

ক্যাম্পাস প্রতিবেদক : উচ্চশিক্ষার বিপুল চাহিদার প্রতি লক্ষ্য রেখে ১৯৯২ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন প্রণয়নের মাধ্যমে এ দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়। দেশে বর্তমানে ৯৫টি বেসরকারি ও ৩৯টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মিলে মোট ১৩৪টি বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চশিক্ষা প্রদানে কাজ করে যাচ্ছে। সাংবিধানিক ক্ষমতাবলে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর মহামান্য রাষ্ট্রপতি। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে তাঁকে এসব প্রতিষ্ঠানের দেখভালের দায়িত্ব পালন করতে হয়। কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে যাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে কনভোকেশনের মাধ্যমে আইনানুগভাবে সনদ বিতরণের দায়িত্বও রাষ্ট্রপতির ওপর বর্তায়। সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনানুগ ভাইস চ্যান্সেলরের লিখিত আবেদনের প্রেক্ষিতে কোনো নির্দিষ্ট তারিখে কোনো নির্দিষ্ট স্থানে প্রতিষ্ঠানটির চ্যান্সেলর হিসেবে রাষ্ট্রপতি স্বয়ং উপস্থিত থেকে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে সনদ বিতরণের কাজটি করে থাকেন। অনেক সময় রাষ্ট্রপতি তাঁর কোনো প্রতিনিধির (সাধারণত শিক্ষামন্ত্রী) মাধ্যমেও সনদ বিতরণের ব্যবস্থা করেন।
গত ১৭ নভেম্বর ২০১৬ তারিখে ইউজিসি এক দাপ্তরিক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, মোট ১৮টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈধ কোনো ভাইস চ্যান্সেলর নেই। এর মধ্যে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ তার অবৈধ এবং স্বঘোষিত ভিসি ড. সাদেকের নেতৃত্বে ১ নম্বর স্থান দখল করার বিরল সম্মান অর্জন করেছে। ইউজিসি বলছে প্রতিষ্ঠানটিতে বৈধ কোনো ভিসি নেই ২০০৯ সালে থেকে। আরো অবাক করা বিষয় হলো এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈধ কোনো প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর নেই ২০০৪ সাল থেকে, বৈধ ট্রেজারার নেই ২০০০ সাল থেকে। ১৯৯৬ সালে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে সেই যে, ড. আবুল হাসান মোহাম্মদ সাদেক প্রতিষ্ঠানটির ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে বসেছেন, সেখান থেকে কেউ তাকে আর টলাতে পারেনি। ভিসি পদে থাকা ড. সাদেক শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি কাউকেই কোনো তোয়াক্কা না করে একাধারে ভিসি, প্রো-ভিসি এবং ট্রেজারারের পদ দখল করে আছেন। পুরোপুরি একনায়কতান্ত্রিকভাবে তিনি এশিয়ান ইউনিভার্সিটি চালাচ্ছেন। এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অফিসসূত্র, ফেসবুক এবং বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞাপন থেকে জানা যায়, ড. সাদেক তার প্রতিষ্ঠানের কনভোকেশন আগামী ১০ ডিসেম্বর ২০১৭ তারিখে আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছেন। প্রশ্ন হলো এ তারিখ তাকে কে দিল? এটা সবাই জানেন যে, এশিয়ান ইউনিভার্সিটির কোনো বৈধ ট্রাস্টি বোর্ড নেই, কোনো বৈধ ভিসি কিংবা প্রো-ভিসি কিংবা ট্রেজারারও নেই। তাহলে কনভোকেশনের অনুমতি এবং নির্দিষ্ট তারিখ ড. সাদেক মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে পেলেন কিভাবে?
এশিয়ান ইউনিভার্সিটি এ পর্যন্ত নিয়ম মাফিক ৪ বার কনভোকেশন করতে পেরেছে। নিয়মনীতি অনুসরণ করার কারণে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মহোদয়গণ উক্ত অনুষ্ঠানসমূহে যথারীতি উপস্থিত থেকে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের মাঝে সনদ বিতরণ করে গেছেন। প্রথম ও দ্বিতীয় কনভোকেশন অনুষ্ঠিত হয় যথাক্রমে ৮ এপ্রিল ২০০২ এবং ৩০ জুলাই ২০০৩ সালে, যেখানে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী স্বয়ং উপস্থিত থেকে উত্তীর্ণ ছাত্রছাত্রীদের মাঝে সনদপত্র বিতরণ করেন। তৃতীয় ও চতুর্থ কনভোকেশন অনুষ্ঠিত হয় যথাক্রমে ১ জুন ২০০৪ এবং ৯ সেপ্টেম্বর ২০০৭ সালে, যেখানে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রফেসর ইয়াজুদ্দিন আহ্মেদ যথারীতি উপস্থিত থেকে উত্তীর্ণ ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে সনদ বিতরণ করেন।
এশিয়ান ইউনিভার্সিটির পঞ্চম কনভোকেশন ২৭ জুলাই ২০০৯ এবং ১৬ মার্চ ২০১১ সালে মোট ২ বার আয়োজনের চেষ্টা করেও আইনগত জটিলতার কারণে কনভোকেশন স্থগিত করতে বাধ্য হন ড. সাদেক। ওই কনভোকেশন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার জন্য প্রথম আয়োজনে ৯৩০ জন শিক্ষার্থী ২ হাজার টাকা হারে মোট ১৮ লাখ ৬০ হাজার টাকা এবং দ্বিতীয় আয়োজনে ১ হাজার ৫৯৫ জন শিক্ষার্থী ৩ হাজার টাকা হারে মোট ৪৭ লাখ ৮৫ হাজার টাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফান্ডে জমা দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করেন। যেহেতু ড. সাদেক কনভোকেশন আয়োজনে ২ বারই ব্যর্থ হন সেহেতু ছাত্রছাত্রীদের টাকাগুলো ফেরত দেয়ার কথা থাকলেও আজ পর্যন্ত তিনি এক টাকাও কাউকে ফেরত দেননি।
রাষ্ট্রপতি, শিক্ষামন্ত্রী এবং ইউজিসি’র চেয়ারম্যান কেন এশিয়ান ইউনিভার্সিটির পঞ্চম কনভোকেশনে হাজির হননি, তা নিয়ে বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকা যেমন ১. দৈনিক প্রথম আলো ২৭ জুলাই ২০০৯, ২. সাপ্তাহিক ১৩ আগস্ট ও ২০ আগস্ট ২০০৯ এবং ৩. দৈনিক আমাদের অর্থনীতি ৯ আগস্ট ২০১১ তারিখ বিস্তারিত রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল। রিপোর্টেগুলোর উল্লেখযোগ্য অংশজুড়ে ছিলÑ ১. ড. সাদেকের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ রয়েছে। ২. অননুমোদিত কোর্স/প্রোগ্রাম চালু রাখা। ৩. স্থায়ী ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম চালু করতে না পারা। ৪. বেশিরভাগ অনুপযুক্ত শিক্ষক। ৫. সনদ বাণিজ্য। ৬. অল্পসংখ্যক শিক্ষার্থী দেখিয়ে বহুগুণ বেশি শিক্ষার্থীকে সনদ প্রদানের ষড়যন্ত্র করা। ৭. বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ নিজ (সাদেকের) অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা এবং ৮. সরকার নির্ধারিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনকানুন মেনে না চলা।
উপরোক্ত অভিযোগগুলো ড. সাদেকের বিরুদ্ধে এখনও বহাল আছে। তারপরও তিনি স্থগিত হয়ে যাওয়া অনুষ্ঠান পুনরায় আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছেন। কনভোকেশনটি কততম তা নিয়ে এক ধূম্রজালের সৃষ্টি করেছেন ফেসবুক অ্যাক্টিভিস্ট ড. সাদেক। পঞ্চম কনভোকেশন অনুষ্ঠিত হতে পারেনি, অথচ তার ঘোষিত ১০ ডিসেম্বর ২০১৭ তারিখে অনুষ্ঠিতব্য কনভোকেশনকে তিনি ফেসবুকে বলে চলেছেন ৬ষ্ঠতম। কিন্তু পত্রপত্রিকার বিজ্ঞাপনে শুধু ‘কনভোকেশন ২০১৭’ বলে উল্লেখ করেছেন। এ থেকে প্রতীয়মান হয়, এশিয়ান ইউনিভার্সিটির স্বঘোষিত ভিসি ড. সাদেক এবার কনভোকেশন বাণিজ্যে নেমেছেন। এই বাণিজ্যে তিনি সাড়ে ৩ কোটি টাকা উপার্জনের ধান্দায় আছেন। পঞ্চম কনভোকেশন আয়োজন করতে গিয়ে তিনি শিক্ষার্থীদের পকেট থেকে দুই দফায় মোট ৬৬ লাখ ৪৫ হাজার টাকা লোপাট করেছিলেন। এবার স্থগিত হয়ে যাওয়া কনভোকেশন পুনরায় করার ক্ষেত্রে তিনি শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন ফি ধার্য করেছেন জনপ্রতি ৭ হাজার টাকা। গত ১০ বছরে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি কোনো কনভোকেশন আয়োজন করতে পারেনি। ধারণা করা হয়, ১০ ডিসেম্বর ২০১৭ তারিখে অনুষ্ঠিতব্য কনভোকেশনে এশিয়ান ইউনিভার্সিটির স্বঘোষিত ভিসি ড. সাদেক অন্তত ৫ হাজার শিক্ষার্থীর মাঝে সনদ বিতরণ করবেন। সনদ বিতরণ করে ড. সাদেক অবৈধ উপায়ে উপার্জন করবেন সাড়ে ৩ কোটি টাকা। আর এশিয়ান ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা অর্জন করবেন ভুয়া সনদ। ভুয়া সনদ বলার কারণ হচ্ছে শিক্ষার্থীরা যে সনদ অর্জন করবেন, তাতে স্বাক্ষর থাকবে ড. সাদেকের। অথচ ড. সাদেক মহামান্য রাষ্ট্রপতির মনোনীত এশিয়ান ইউনিভার্সিটির কোনো বৈধ ভিসি নন। ২০০৯ সাল থেকেই এশিয়ান ইউনিভার্সিটিতে বৈধ কোনো ভিসি নেই। অবৈধ ভিসি ড. সাদেক একতরফাই চালিয়ে যাচ্ছেন তার সার্টিফিকেট বাণিজ্য।
এশিয়ান ইউনিভার্সিটির এই অনাচার বাণিজ্যের বিরুদ্ধে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি কিছুই করতে পারছে না। এর মধ্যে ইউজিসি অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে মাঝে মাঝে কিছু পরামর্শ প্রদান করে, অবৈধ বা অননুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা প্রকাশ করে। অননুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিযান পরিচালনা করে, কারণ দর্শাও নোটিশ প্রেরণ করে, অননুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয়টি বন্ধ করে দেয়ার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করে ইউজিসি। ইউজিসি’র সুপারিশ মোতাবেক শিক্ষা মন্ত্রণালয় ওই অননুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয়টি বন্ধও করে দেয়; কিন্তু অভিভাবকদের রক্তশোষণকারী ড. সাদেকের মতো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্ণধাররা এতটাই ক্ষমতাশালী যে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ উপেক্ষা করার জন্য তারা সোজা চলে যান উচ্চ আদালতে। সেখান থেকে নিয়ে আসেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশের ওপর স্থগিতাদেশ। তারপর আবার আগের মতোই চলতে থাকে সার্টিফিকেট বাণিজ্য। আদালতের এই স্থগিতাদেশের বিপক্ষে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি’র কিছুই করার থাকে না; অসহায় চেয়ে থাকা ছাড়া।
বেসরকারি বিশ্বাবিদ্যালয় আইন (সংশোধিত) ২০১০-এর ধারা ২১-এর উপধারা ১-এ বলা হয়েছে ‘চ্যান্সেলর কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজ কর্তৃক প্রস্তাবিত কোনো ব্যক্তিকে ৪ বছর মেয়াদের জন্য উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর নিযুক্ত করবেন’। আবেদনের নিয়ম হলো সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ট্রাস্টি বোর্ড থাকবে, যা জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মস-এর মাধ্যমে নিবন্ধিত হতে হবে। সেই ট্রাস্টি বোর্ড ৩ জন যোগ্য শিক্ষাবিদের নাম নিয়ম মোতাবেক ক্রমান্বয়ে সাজিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে মহামান্য রাষ্ট্রপতি তথা চ্যান্সেলরের বরাবরে পাঠাবে। চ্যান্সেলর যোগ্যতম ব্যক্তিকে ৪ বছর মেয়াদের জন্য ভাইস চ্যান্সেলর পদে নিয়োগ দেবেন। একইভাবে তিনি আইনটির অন্যান্য সুনির্দিষ্ট ধারার ক্ষমতাবলে ৪ বছর মেয়াদের জন্য প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর এবং ট্রেজারার নিয়োগ দেবেন। আইনটির ধারা ৩১-এর উপধারা ৬-এ বলা হয়েছে, যদি ভাইস চ্যান্সেলর না থাকেন কিংবা দায়িত্ব পালনে যদি অপারগ হন তাহলে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈধ প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর নিয়ম মোতাবেক সাময়িকভাবে ভাইস চ্যান্সেলরের দায়িত্ব পালন করবেন। তিনিও কোনো কারণে দায়িত্ব পালনে অপারগ হলে বৈধ ট্রেজারারকে সাময়িক সময়ের মধ্যে ভাইস চ্যান্সেলর নিয়োগের যাবতীয় কার্যাদি সম্পন্ন করতে হবে। ভারপ্রাপ্ত ভাইস চ্যান্সেলরের কোনো সুযোগ আইনটিতে নেই।
সাপ্তাহিক স্বদেশ খবর পত্রিকার অনুসন্ধানে জানা যায়, জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মস এ নিবন্ধিত বৈধ কোনো ট্রাস্টি বোর্ড এশিয়ান ইউনিভার্সিটিতে নেই। ড. সাদেক যখন খুশি যেমন খুশি নিজে নিজেই ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করেন। আবার ভেঙেও দেন। ১৯৯৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত তিনি ৪ বার ট্রাস্টিবোর্ড নিজের মতো করে পরিবর্তন করে আবার সাজিয়েছেন। নিয়ম মোতাবেক জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মস’কে জানানো বা নিবন্ধন নেয়ার কোনো প্রয়োজন বোধ করেননি। এটাকে তুঘলকি কা–কারখানার সঙ্গে তুলনা করছেন অনেকে। বাস্তবতা হলো ড. সাদেক শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউজিসিসহ কাউকেই পাত্তা দেন না। বর্তমানে এশিয়ান ইউনিভার্সিটির ১২ সদস্য বিশিষ্ট যে ট্রাস্টি বোর্ড তিনি দেখাচ্ছেন তার চেয়ারম্যান হলেন তার পুত্র জাফর সাদেক এবং ভাইস চেয়ারম্যান তিনি নিজে। যিনি ভিসি তিনিই আবার ট্রাস্টি বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান! এশিয়ান ইউনিভার্সিটির স্বঘোষিত ভিসি ড. সাদেকের এ এক ভানুমতির খেল। এই খেলা তিনি খেলে যাচ্ছেন দীর্ঘ ৩ দশক ধরে। অথচ তাকে ধরার যেন কেউই নেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় কিংবা ইউজিসিতে।
স্পষ্টতই প্রতীয়মান, এশিয়ান ইউনিভার্সিটির বৈধ ট্রাস্টি বোর্ড নেই, বৈধ ট্রাস্টি বোর্ডের আবেদনের মাধ্যমে নিয়ম মোতাবেক মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও চ্যান্সেলর কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত বৈধ কোনো ভাইস চ্যান্সেলরও নেই। অথচ ড. সাদেক রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক প্রোগ্রাম কনভোকেশনের তারিখ নিজেই ঘোষণা করে দিয়েছেন। কনভোকেশনের তারিখ অনুমোদন করার কথা পদাধিকারবলে এশিয়ান ইউনিভার্সিটির চ্যান্সেলর রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের। অথচ সে তারিখ অনুমোদন ও ঘোষণা করেন ড. সাদেক। অনেকে বলছেন, ড. আবুল হাসান মোহাম্মদ সাদেক ইতোমধ্যে নিজেকে এশিয়ান ইউনিভার্সিটির চ্যান্সেলর ভাবতে শুরু করেছেন। আর এ জন্যই তিনি রাষ্ট্রপতির অনুমতির তোয়াক্কা না করে ১০ ডিসেম্বর ২০১৭ তারিখে এশিয়ান ইউনিভার্সিটির কনভোকেশন ঘোষণা করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ড. সাদেক ২০১৬ সালের ১২ ডিসেম্বর এশিয়ান ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর পদে নিয়োগ পাওয়ার জন্য ৩ জনের নাম সংবলিত প্যানেলের শীর্ষে নিজের নাম প্রস্তাব করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে চ্যান্সেলর তথা মহামান্য রাষ্ট্রপতি বরাবর পেশ করেন। কিন্তু মহামান্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক ড. সাদেককে ভিসি হিসেবে কোনো নিয়োগপত্র দেয়া হয়নি। অথচ ড. সাদেক বলে বেড়াচ্ছেন, রাষ্ট্রপতি কর্তৃক এশিয়ান ইউনিভার্সিটির নিয়োগপ্রাপ্ত ভিসি তিনি। ড. সাদেক মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছেন ১০ ডিসেম্বর কনভোকেশন আয়োজনের কথা বলে। এশিয়ান ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের হাতে ভুয়া সনদপত্র তুলে দেয়ার জন্য এবং এক দানে তিন-সাড়ে তিন কোটি টাকা অবৈধ উপার্জনের জন্য।
তবে ইউজিসি সূত্র বলছে, শেষ মুহূর্তে ড. সাদেক অথবা তার মনোনীত কোনো ব্যক্তি যদি ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে নিয়োগ পেয়েও যান তাহলেও বিদ্যমান সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি নিয়োগের তারিখ থেকে পরবর্তী ৪ বছরের জন্য দাপ্তরিক কার্য সম্পাদনের বৈধতা পাবেন। মহামান্য রাষ্ট্রপতি ব্যাক ডেটে কাউকে নিয়োগ নিশ্চয়ই দেবেন না, তাও আবার কমপক্ষে ৩ টার্মের জন্য। সেক্ষেত্রে সেপ্টেম্বর ২০০৭ সাল থেকে সেপ্টেম্বর ২০১৭ সাল পর্যন্ত যে লক্ষাধিক শিক্ষার্থী পাস করে গেল তাদের সনদ নিয়ে জটিলতা থেকেই যাবে। আর এই জটিলতাকেই পুঁজি করে ড. সাদেক এশিয়ান ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দিনের পর দিন প্রতারণা করে চলেছেন।
এশিয়ান ইউনিভার্সিটির একটি সূত্র বলছে, যেহেতু তিনি বৈধ ভিসি নন সেহেতু ড. সাদেক ভালো করেই জানেন তিনি কানভোকেশন আয়োজন করতে পারবেন না। তিনি আসলে ১০ ডিসেম্বর আয়োজন করতে যাচ্ছেন একটি ‘গ্র্যাজুয়েশন সেরিমনি’। যেখানে তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তা, ইউজিসি’র একজন ওই পর্যায়ের কর্মকর্তা, নিরাপত্তা বাহিনীর একজন কর্মকর্তা, রোটারি ক্লাবের কয়েকজন হোমড়া-চোমড়া, নিজ পরিবারের কিছু সদস্য এবং যদি সম্ভব হয় স্থানীয় এমপিকে হাজির করে অনেকটা পিকনিকের মতো করে তথাকথিত কনভোকেশন কার্যক্রম নামক নাটক সম্পন্ন করার চেষ্টা করবেন। এতে দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা হবে কলঙ্কিত, এশিয়ান ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা পাবেন ভুয়া সনদ আর ড. আবুল হাসান মোহাম্মদ সাদেক রাতারাতি ৩-৪ কোটি টাকা কামিয়ে নিবেন। আর রিপোর্ট সংক্রান্ত বিষয়ে মতামত জানতে চাইলে এ বিষয়ে কোনোরূপ মন্তব্য করতে রাজি হননি এশিয়ান ইউনিভার্সিটির স্বঘোষিত ও অবৈধ ভিসি ড. আবুল হাসান মোহাম্মদ সাদেক।