কলাম

গণহত্যামূলক জাতিগত নিধনযজ্ঞের শিকার একটি নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গা

ড. হাবিব খান : রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বসবাস করলেও দেশটিতে তাদের কোনো নাগরিকত্ব নেই। তারা রাজ্যটির একটি উল্লেখযোগ্য নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী। যাদের অধিকাংশেরই ধর্ম ইসলাম। এছাড়া অল্প কিছু সংখ্যক হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ রয়েছে। তাদের আলাদা ভাষা থাকলেও তা অলিখিত। মিয়ানমারের আকিয়াব, রেথেডাং, বুথিডাং, মংডু, কিয়তকাও, মাঞ্চা, পাত্তরকিল্লা, কাইডকপাইড, পুন্যাগুণ ও পাউকতাউ এলাকায় এদের নিরঙ্কুশ বাস। এছাড়া মিনবিয়া, সাইবন ও আন এলাকায় রোহিঙ্গারা মিশ্রভাবে বসবাস করে। জাতিসংঘের তথ্য মতে, জাতিগত নিধনযজ্ঞের শিকার হওয়া বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত জনগোষ্ঠী হলো রোহিঙ্গারা।
রোহিঙ্গা কারা
বর্তমান মিয়ানমারের ‘রোসাং’-এর অপভ্রংশ ‘রোহাং’ এলাকায় এ জনগোষ্ঠীর বসবাস। আরাকানের প্রাচীন নাম ‘রূহ্ম’ জনপদ। ইতিহাস ও ভূগোল বলছে, পূর্ব-ভারত হতে খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ বছর পূর্বে অস্ট্রিক জাতির একটি শাখা ‘কুরুখ’ নৃগোষ্ঠী রাখাইন প্রদেশে প্রথম বসতি স্থাপন করে। ক্রমান্বয়ে বাঙালি হিন্দু (পরবর্তীকালে ধর্মান্তরিত মুসলমান), পার্সিয়ান, তুর্কি, মোগল, আরবীয় ও পাঠানরা বঙ্গোপসাগরের উপকূল বরাবর বসতি স্থাপন করে। এসব নৃগোষ্ঠীর শঙ্করজাত জনগোষ্ঠী হলো এই রোহিঙ্গা। বস্তুত রোহিঙ্গারা হলো আরাকান বা রাখাইনের একমাত্র ভূমিপুত্র জাতি। তাদের কথ্য ভাষায় চট্টগ্রামের স্থানীয় উচ্চারণের প্রভাব রয়েছে। উর্দু, হিন্দি, আরবি শব্দও রয়েছে। পক্ষান্তরে ১০৪৪ খ্রিস্টাব্দে কট্টর বৌদ্ধ বর্মি রাজা আনাওহতা আরাকান থেকে রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করে সেখানে মগ সম্প্রদায়ের মাধ্যমে বৌদ্ধ বসতি স্থাপন করে। রাখাইনে দু’টি সম্প্রদায়ের বসবাস। দক্ষিণে ‘মগ’ এবং উত্তরে ‘রোহিঙ্গা’। মগরা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। রোহিঙ্গারা মুসলিম। মগদের প্রধান কাজ দস্যুবৃত্তি। এক সময় তাদের দৌরাত্ম্য ঢাকা পর্যন্ত পৌঁছেছিল। মোগলরা তাদের তাড়া করে পার্বত্য চট্টগ্রামের জঙ্গলে ফেরত পাঠায়। মগরা ঐতিহাসিকভাবেই বর্বর।
১৮২৪ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বর্তমান মিয়ানমার তথা তৎকালীন বার্মা দখল করার পর দীর্ঘ ১০০ বছর পর্যন্ত আরাকানের রোহিঙ্গারা অনেকটা স্বস্তিতে ছিল। কিন্তু ১৯৪২ সালে আরাকান জাপানিদের অধীনে যাওয়ার পর বর্মি মগরা আবার মুসলিম গণহত্যা ও ধর্ষণে মেতে ওঠে। ১৯৪৫ সালে ব্রিটিশরা আবার আরাকান দখল করে এবং ১৯৪৮ সালে মিয়ানমার স্বাধীনতা লাভ করে। কিন্তু স্বাধীনতার মাধ্যমে মিয়ানমার ব্রিটিশমুক্ত হওয়ার পর মগরা আরাকানি রোহিঙ্গাদের বহিরাগত আখ্যায়িত করে পুনরায় হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন ও উচ্ছেদে মেতে ওঠে। তাই মিয়ানমারের স্বাধীনতা আরাকানের রোহিঙ্গাদের জন্য বয়ে আনে অভিশাপ। নির্যাতন থেকে বাঁচার জন্য তৎকালেও প্রচুর রোহিঙ্গা চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার আসে। তাছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় ২টি জনগোষ্ঠী চাকমা এবং মারমারা (মগ) যে মিয়ানমারের আরাকান থেকে এসেছে তা অনেক গবেষণায় প্রমাণিত। লেউইন-১৮৬৯, খিশা-১৯৬৪, বার্নট-১৯৬০ এবং আহমদ-১৯৯০ সাল প্রমুখের গবেষণা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের সব জনগোষ্ঠী আগে বা পরে পার্শে¦র অথবা একটু দূরবর্তী পার্বত্য অঞ্চল বা সমতল ভূমি থেকে দেশান্তরিত হয়ে এসব অঞ্চলে আশ্রয় নেয় এবং নিবাস গড়ে তোলে। চাকমারা মিয়ানমারের অন্য রাজ্য এবং মারমা অর্থাৎ মগরা আরাকান থেকে এসেছে। লেউইনের মতে, ১৭৮৪ সালে মারমা বা মগ জনগোষ্ঠী দলে দলে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশ করে। অতএব দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ থেকে কেউই আরাকানে তথা মিয়ানমারে যায়নি। বরং ওই সব অঞ্চল থেকে বিভিন্ন সময় লোকজন বাংলাদেশে এসে বসতি স্থাপন করেছে এবং এখনো করছে।
মিয়ানমারের স্বাধীনতায় মুসলমানদের অবদান
১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি মিয়ানমার স্বাধীনতা অর্জন করে এবং বহু দলীয় গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করে। সে সময় পার্লামেন্টে রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিত্ব ছিল। এ জনগোষ্ঠীর কয়েকজন পদস্থ সরকারি কর্মকর্তার দায়িত্বও পালন করেন।
ব্রিটিশ অধীনতার সময় মিয়ানমারের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্রভূমি ছিল রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়। সে সময় রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতো ‘অল বর্মা স্টুডেন্ট ইউনিয়ন’ ও রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রছাত্রী সংসদ। এর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এম এ রাশিদ। রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ে অং সান সু চি’র বাবা অং সানের প্রধান রাজনৈতিক সহযোদ্ধা ছিলেন এম এ রাশিদ। তিনি তাকে রাশিদ ভাই বলে ডাকতেন। অং সান একবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন। আর সে বছর তাতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এম এ রাশিদ। মজার বিষয় হলো রাশিদ একজন রোহিঙ্গা; যাদের মিয়ানমারের বর্তমান সরকার এবং সরকারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি মিয়ানমারের নাগরিক বলে স্বীকার করতে চান না। ১৯৪৭ সালে মিয়ানমারের সংবিধানের খসড়া রচনাকারীও ছিলেন এম এ রাশিদ। পরবর্তীকালে তিনি দেশটির শ্রমমন্ত্রীও হন। সু চি’র বাবা জেনারেল অং সানের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক সহযোগীদের মধ্যে মিয়ানমার মুসলিম লিগের সভাপতি আবদুর রাজ্জাকও ছিলেন। তিনি পরে স্বাধীন মিয়ানমারের শিক্ষা ও পরিকল্পনা মন্ত্রী হয়েছিলেন। ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সুলতান মাহমুদ, আবুল বাশার, আবদুল গাফফার, জোহরা বেগম প্রমুখ আরাকানের মুসলিম প্রধান এলাকাগুলো থেকে এমপি নির্বাচিত হয়ে দেশটির পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্বের সঙ্গে মন্ত্রীও হয়েছিলেন।
মিয়ানমারে মুসলমান রোহিঙ্গাদের অস্তিত্ব অস্বীকার ও তাদের বাঙালি সন্ত্রাসী অভিহিত করে বিতাড়ন করছেন সু চি। অথচ মিয়ানমারের অন্যতম প্রধান সংবিধান বিশেষজ্ঞ ছিলেন মুসলিম আইনজীবী উ কো নি। উ কো নি ছিলেন সু চির আইন উপদেষ্টা। সেনাবাহিনী যখন নাগরিকত্ব আইনের ফ্যাঁকড়া বাধিয়ে নির্বাচনে জয়ী সু চি’র প্রেসিডেন্ট হওয়া ঠেকিয়ে দেয়, তখন উপায় বের করেন উ কো নি। তিনি সেনাবাহিনীর তৈরি সংবিধানের ফাঁক বের করে স্টেট কাউন্সেলর পদ সৃষ্টির পরামর্শ দেন। সু চি আজ যে সরকারের স্টেট কাউন্সেলর তার পেছনে বড় অবদান ছিল মুসলিম আইনজীবী উ কো নি’র। দুঃখের বিষয় এই আইনজীবীকে গত ২৯ জানুয়ারি হত্যা করা হয়। যেটাকে অবশ্য সু চি সন্ত্রাসী কাজ বলে বিবৃতি দিয়েছিলেন।
স্বাধীন মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের দুর্ভোগ
রোহিঙ্গাদের দুর্ভোগের বিষয় আলোচনা করতে গেলে বেশ পেছনের ইতিহাস টানতে হয়। ব্রিটিশ শাসনাধীনে থাকার সময় ব্রিটিশ সরকার মিয়ানমারের ১৩৯টি জাতিগোষ্ঠীর তালিকা প্রস্তুত করে। কিন্তু তার মধ্যে রোহিঙ্গাদের নাম তালিকাভুক্ত ছিল না। এ ধরনের বহু ভুল ব্রিটিশ শাসকরা করে গেছে, যার মাসুল দিতে হচ্ছে ফিলিস্তিন ও কাশ্মিরি মুসলমানদের মতো রোহিঙ্গাদেরও। ব্রিটিশ শাসকদের তৈরি তালিকার দোহাই দিয়ে মিয়ানমারের বিভিন্ন সরকার দেশটির জন্মলগ্ন থেকেই রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করতে চাচ্ছে না। ১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইন সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করলে রোহিঙ্গাদের জন্য শুরু হয় দুর্ভোগের নতুন অধ্যায়। সামরিক জান্তা তাদের বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে। তাদের নাগরিক অধিকার কেড়ে নিয়ে ভোটাধিকার বাতিল করে। ধর্মীয়ভাবেও তাদের ওপর অত্যাচার করতে থাকে। নামাজ আদায়ে বাধা দেয়া থেকে শুরু করে হত্যা, ধর্ষণ হয়ে পড়ে নিয়মিত ঘটনা। তাদের সম্পত্তি জোর করে কেড়ে নেয়া হয়। বাধ্যতামূলক শ্রমে নিয়োজিত করা হতে থাকে। তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ নেই। বিয়ে করার অনুমতি নেই। সন্তান হলে নিবন্ধন নেই। জাতিগত পরিচয় প্রকাশ করতে দেয়া হয় না। সংখ্যা যাতে না বাড়ে, সে জন্য আরোপিত হতে থাকে একের পর এক বিধি-নিষেধ। তবে রোহিঙ্গারা বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে প্রোডাক্টিভ জাতি।
এরপর থেকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অজুহাতে রোহিঙ্গা নিধন ও বিতাড়ন চলতে থাকে। ১৯৬৯ সাল থেকে শুরু করে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ৮৪ শতাংশ রোহিঙ্গাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। প্রায় ২০ লাখ জনসংখ্যার নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর অবশিষ্ট মাত্র ৩ লাখ আরাকানের বিভিন্ন অঞ্চলে মিয়ানমার সেনাবাহিনী এবং উগ্র বৌদ্ধ সন্ত্রাসীদের দ্বারা অবরুদ্ধ অবস্থায় এখন মানবেতর জীবনযাপন করছে। সংবাদ সংস্থা আনাদোলু’র হিসাব অনুযায়ী এ পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে আশ্রয় প্রার্থী রোহিঙ্গাদের সংখ্যা : ১. বাংলাদেশে ৯ লাখেরও বেশি। ২. পাকিস্তানে ৩ লাখ ৫০ হাজার। ৩. সৌদি আরবে ৩ লাখ। ৪. অন্যান্য উপসাগরীয় দেশে ৫৫ হাজার। ৫. এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোতে ১ লাখেরও বেশি। ৬. ভারতে ৪০ হাজার।
ইউরোপীয় কমিশনের একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের শুরুতে রাখাইন রাজ্যে মুসলমানের সংখ্যা ছিল ৮ লাখ। জাতিসংঘের সর্বশেষ রিপোর্টে বলা হয়েছে, গত ২৫ আগস্ট নতুন করে জাতিগত নিধনযজ্ঞ শুরু হওয়ার পর থেকে ৫ লাখ ১০ হাজার রোহিঙ্গা সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। মিয়ানমার ১৯৮২ সালে জাতীয়তা নিয়ে একটি আইন পাস করে যাতে রোহিঙ্গাদের দেশটির নাগরিক হিসেবে স্বীকার করা হয়নি। জাতিসংঘ বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত জনগোষ্ঠী হিসেবে রোহিঙ্গাদের উল্লেখ করেছে। ১৯৭৮, ১৯৯১-৯২, ২০১২, ২০১৬ এবং সর্বশেষ ২০১৭ সালে নির্যাতিত রোহিঙ্গারা বানের পানির মতো বাংলাদেশে ঢুকে পড়ে জীবন বাঁচানোর তাগিদে।
রোহিঙ্গা নির্যাতনে নির্মমতার যেন শেষ নেই। ধর্ষণ, ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা, পেট কেটে হত্যা, পুড়িয়ে হত্যা, টুকরো টুকরো করে হত্যা, হত্যার পর মাংস রেঁধে খাওয়া, মাথার মগজ বের করে নেয়া, হার্ট বের করে ফেলা ইত্যাদি। রোহিঙ্গা নিধন, নির্যাতন ও বিতাড়নের লক্ষ্যে মিয়ানমার সরকার বিভিন্ন সময় ছলচাতুরীর আশ্রয় নিয়েছে। এ সংক্রান্ত ৩টি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে।
১. ২০১২ সালে এক বৌদ্ধ নারীকে ৩ জন রোহিঙ্গা ধর্ষণ করেছে মর্মে অভিযোগ উত্থাপন করা হয়। কিন্তু এর স্বপক্ষে কোনো তথ্য প্রমাণ তারা জনসমক্ষে কিংবা সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ করেনি। এমনকি ধর্ষিতা নারীর কিংবা ধর্ষকদের কোনো ছবি সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ করতে ব্যর্থ হয়।
২. ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর সশস্ত্র রোহিঙ্গা গ্রুপ কর্তৃক ৯ জন সেনা মেরে ফেলার অভিযোগ তোলা হয়। কিন্তু মৃত সেনাদের নাম, পরিচয় কিংবা ছবি প্রকাশে তারা ব্যর্থ হয়।
৩. সর্বশেষ গত ২৫ আগস্ট ২০১৭ সালে আরাকান রাজ্যের উত্তরে ঢেঁকিবুনিয়া থেকে দক্ষিণ কুয়ারবিল পর্যন্ত বিশাল এলাকায় ছোটবড় কমপক্ষে ২৪টি চৌকি-পোস্টে আরাকান স্যালভেশন আর্মি (আরসা) আক্রমণ করে সামরিক-বেসামরিক মিলে মোট ৭১ জনকে হত্যা করে বলে অভিযোগ তোলা হয়। বরাবরের মতো এবারও মিয়ানমার সরকার কোনো তথ্য প্রমাণ হাজির করতে ব্যর্থ হয়।
আরসা কারা
আরসা হলো রোহিঙ্গা বিদ্রোহী সশস্ত্র গ্রুপ, যারা আরাকানের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়। মিয়ানমারের সরকারি সূত্রে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কাছে আরসার সদস্য সংখ্যা ১ হাজার বলে জানানো হলেও আরসা বলে আসলে কিছু আছে কি না এ প্রশ্ন তুলেছে আন্তর্জাতিক গণআদালত (পার্মানেন্ট পিপলস ট্রাইব্যুনাল)। গত ১৯ সেপ্টেম্বর আদালতে উপস্থিত সাক্ষীরা জানান, আরসা আছে; তবে এর সদস্য সংখ্যা ৫০ জনেরও কম। তারা মনে করেন, মিয়ানমারের সেনা নির্যাতন থেকে রোহিঙ্গাদের রক্ষা করার মতো কোনো শক্তিই রাখে না আরসা। এদিকে আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের এক প্রতিবেদনে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) এবং আরসার মধ্যে ঘুষ লেনদেনসহ ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে বলে মতামত ব্যক্ত করা হয়েছে। বিজিপি ঘুষের বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশের সুযোগ দিচ্ছে মর্মে রিপোর্ট এসেছে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে।
বিশ্বব্যাপী ধিক্কার
গত ৫ সেপ্টেম্বর ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেতনো মারসুদি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎকালে বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে তার দেশ ভূমিকা রাখতে চায়। এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাখাইন রাজ্যের জনগণের ওপর সহিংসতা বন্ধে মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। একই দিন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগান সু চি’কে ফোন করে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর মিয়ানমার সরকারের ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’ নিয়ে উদ্বেগ এবং নিন্দা জানান। তুরস্কের ফার্স্ট লেডি গত ৭ সেপ্টেম্বর রোহিঙ্গা সংকট সরেজমিন পর্যবেক্ষণ ও উদ্বাস্তুদের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণের জন্য কক্সবাজার যান। পরবর্তীতে উখিয়া কুতুপালং ক্যাম্পে এক রোহিঙ্গাকে জড়িয়ে ধরে তার কান্নার ছবি বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করে।
গত ৫ সেপ্টেম্বর রাখাইন প্রদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীকে নাগরিকত্ব প্রদানের জন্য মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানান জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিয়ো গুটেরেজ। গত ৭ সেপ্টেম্বর ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতারা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ায় বাংলাদেশের ভূমিকার প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করে বলেন, রাখাইন রাজ্যে সব পক্ষের উত্তেজনা প্রশমন খুবই জরুরি, যাতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা যায়।
গত ৬ সেপ্টেম্বর রোহিঙ্গা নিপীড়নের বিরুদ্ধে নিন্দা জানিয়ে আরব লিগ রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর চলমান সহিংস কর্মকা-ের তদন্ত করার জন্য মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানায়। মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন দলের প্রধান অং সান সু চি’কে দেয়া প্রেসিডেন্ট পদক প্রত্যাহারের জন্য পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কাছে আহ্বান জানায় সে দেশের পার্লামেন্ট সদস্যরা। তারা রোহিঙ্গাদের সহায়তার জন্য বাংলাদেশকে বিশেষ তহবিল প্রদানেরও আহ্বান জানায়। গত ৮ সেপ্টেম্বর রোহিঙ্গা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র সরকার নিন্দা ও উদ্বেগ প্রকাশ করে রাখাইনে মানবাধিকার কর্মী ও সাংবাদিকদের প্রবেশের অনুমতি প্রদানের আহ্বান জানায়। নোবেল বিজয়ী দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী নেতা ডেসমন্ড টুটু এক চিঠিতে সু চি’র ভূমিকার নিন্দা জানান। তেহরান, কুয়ালালামপুর, সিডনিসহ বিশ্বের বড় শহরগুলোতে রোহিঙ্গা নির্যাতন বন্ধের দাবিতে ব্যাপক বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। তিব্বতের আধ্যাত্মিক ধর্মগুরু দালাই লামা (১৯৮৯ সালে নোবেল বিজয়ী) রোহিঙ্গা নির্যাতনে উদ্বেগ জানিয়ে বলেন, বুদ্ধ ফের আবির্ভূত হলে রোহিঙ্গাদের রক্ষা করতেন।
গত ৮ সেপ্টেম্বর নোবেলজয়ী জোডি উইলিয়ামস, শিরিন এবাদি, লেইমাহ বোয়ি, মালালা ইউসুফজাই, অমর্ত্য সেনসহ বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন ও নির্যাতনের জন্য মিয়ানমারের ডি ফ্যাক্টো নেতা সু চি’র নিন্দা জানিয়ে বলেন, তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কারের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন।
শুধু মুসলিম হওয়ার কারণে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন ও হত্যা করা হচ্ছে। তারা ভালো মানুষ, তারা শান্তিপ্রিয়। খ্রিস্টান না হলেও তারা আমাদের ভাই বলে সম্বোধন করেছেন পোপ ফ্রান্সিস। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ১৫৭ জন সদস্যের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ব্রিটিশ সরকার মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে প্রশিক্ষণ দান স্থগিত করে। ব্রিটিশ অল পার্টি পার্লামেন্টারি গ্রুপটি বলছে, মিয়ানমার সেনারা ৩ হাজার রোহিঙ্গাকে হত্যা করেছে। মিয়ানমার থেকে উৎখাত হওয়া যেসব রোহিঙ্গা মুসলিম ভারতে ঢুকেছেন তাদের ‘পুশব্যাক’ না করার জন্য মোদি সরকারকে আহ্বান জানান পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী।
গত ১১ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের প্রধান জেইদ আল রাইদ বলেন, রোহিঙ্গাদের জাতিগতভাবে নিধন করা হচ্ছে। চেঞ্জ ডট ওআরজি নামের একটি সংগঠন সু চি’র নোবেল পুরস্কার বাতিলের দাবিতে ৪ লাখ ৫ হাজারের বেশি লোকের স্বাক্ষর গ্রহণ করেছে। অবশ্য নোবেল কমিটি বলেছে যে তারা এই পুরস্কারটি প্রত্যাহার করবে না। তবে নোবেলজয়ী ভারতের নাগরিক কৈলাস সত্যার্থী মনে করেন অং সান সু চি’র নিজ উদ্যোগে নোবেল পুরস্কার ফিরিয়ে দেয়া উচিত।
গত ২২ সেপ্টেম্বর কক্সবাজার জেলার উখিয়া কুতুপালং শরণার্থী শিবির পরিদর্শন ও ত্রাণসামগ্রী বিতরণকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমরা মিয়ানমারের শরণার্থীদের পাশে রয়েছি এবং তাদের সব ধরনের সহযোগিতা দিয়ে যাবো, যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা দেশে ফিরছে আমরা তাদের পাশে রয়েছি। এ সময় তিনি বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তাঁর বোন শেখ রেহানা এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন। এদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনি সু চি’কে একজন নিষ্ঠুর নারী হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, গণহত্যা বন্ধে মিয়ানমার সরকারকে বাধ্য করার জন্য মুসলিম দেশগুলোর উচিত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা। তিনি আরো বলেন, এই বর্বর ঘটনার মধ্য দিয়ে নোবেল শান্তি পুরস্কারেরও মৃত্যু ঘটেছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক পার্লামেন্ট সদস্য এবং শান্তিকর্মী ভারতের মহাত্মা গান্ধীর নাতনি ইলা গান্ধী সু চি’কে লেখা এক চিঠিতে রোহিঙ্গা নির্যাতন বন্ধের আহ্বান জানান। বসনিয়ার সেব্রেনিসা গণহত্যা থেকে বেঁচে যাওয়া নাগরিক পা হারানো ইদ্রিস ইসমাজিক বলেন, রোহিঙ্গারা এখন যে ভয়াবহতার শিকার, ২২ বছর আগে আমরাও একই ঘটনার মুখোমুখি হয়েছিলাম।
১৪ সেপ্টেম্বর ইউরোপীয় পার্লামেন্ট এক বিবৃতিতে রোহিঙ্গাদের হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ ও বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া অবিলম্বে বন্ধ করার জন্য মিয়ানমার সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনীকে আহ্বান জানায়। একই সাথে অং সান সু চি’কে দেয়া শাখারভ পুরস্কার বাতিলেরও প্রস্তাব করা হয়। হলিউডের জনপ্রিয় অভিনেত্রী অ্যাঞ্জেলিনা জোলি এবং বলিউডের অভিনেতা আমির খান মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে তা বন্ধের আহ্বান জানান।
১৭ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ নিরাপত্তা পরিষদকে মিয়ানমারের গণহত্যা বন্ধে অবরোধ ও অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার আহ্বান জানায়। ২৫ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এক রিপোর্টে বলেছে, রাখাইন রাজ্যের উত্তরাঞ্চলে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে।
২০ সেপ্টেম্বর ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেছেন, মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা গণহত্যার শিকার হয়ে পালাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংকট অবসানে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে ‘বলিষ্ঠ ও দ্রুত’ পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান। গত ১৯ সেপ্টেম্বর এক বিবৃতিতে সৌদি আরব রোহিঙ্গা মুসলিমদের গণহত্যা বন্ধ করতে মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানায়। এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, কাজাখস্তান ও তিউনিশিয়ার রাষ্ট্র প্রধানগণ রোহিঙ্গা গণহত্যার তীব্র নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে তা বন্ধ করার আহ্বান জানান।
২১ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ৭২তম সাধারণ পরিষদের আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আমার দেশে আশ্রয় নেয়া কয়েক লাখ রোহিঙ্গার সাথে আমি দেখা করে এসেছি; যারা ‘জাতিগত নিধন’-এর শিকার। প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে ৫ দফা প্রস্তাব দেন। এদিকে গত ১৯ সেপ্টেম্বর ওআইসি কনট্যাক্ট গ্রুপের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, মুসলিম বিশ্বের মানুষকে কেন উদ্বাস্তু হয়ে দেশে দেশে ঘুরতে হবে তার কারণ অনুসন্ধানে মনোনিবেশ করতে হবে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সংকট মোকাবিলায় ওআইসিভুক্ত দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান শেখ হাসিনা।
বিশ্বব্যাপী তীব্র নিন্দা ও সমালোচনার মুখে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি গত ১৯ সেপ্টেম্বর এক ভাষণে বলেন, তিনি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণকে ভয় করেন না। মুসলমানরা কেন দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে তা তিনি জানেন না।
গত ২ অক্টোবর মিয়ানমারে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের ২০ জন কূটনীতিক দেশটির সরকারের তত্ত্বাবধানে সংঘাত কবলিত রাখাইন রাজ্য পরিদর্শন করেন। তারা সেখানকার পরিস্থিতিকে মানবিক বিপর্যয়ের শামিল বলে অভিহিত করেন।
অক্টোবরের শুরু থেকে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যার দায়ে মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন দলের নেত্রী অং সান সু চি’কে আন্তর্জাতিক আইনের মুখোমুখি করতে জনমত সংগ্রহের লক্ষ্যে প্রচারণা শুরু করে একটি গ্রুপ। এরই মধ্যে তারা ৪ লাখ স্বাক্ষর সংগ্রহ করেছে। গ্রুপটির নেতৃত্বে আছেন হুসেইন মোহাম্মদ ও নাজমা মোহাম্মদ নামের ২ ব্রিটিশ নাগরিক।
আন্তর্জাতিক গণ-আদালতের রায়
গত ১৮ সেপ্টেম্বর মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে পার্মানেন্ট পিপলস ট্রাইব্যুনাল (পিপিটি) নামের গণ-আদালতে রোহিঙ্গাসহ অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর গণহত্যা চালানো ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে এক বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয়। এতে রোহিঙ্গাসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ২০০ মানুষের জবানবন্দি, বিভিন্ন তথ্যচিত্র ও বিশ্লেষক মতামত পর্যালোচনা করা হয়। গত ২২ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ তদন্তে যুক্ত বিশিষ্ট ব্যক্তি ও আইনজীবীদের সমন্বয়ে গঠিত ৭ সদস্যের প্যানেল মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি এবং সেনাপ্রধান মিন অং লাইংসহ কয়েকজন কর্মকর্তাকে দোষী সাব্যস্ত করে রায় প্রদান করে।