ছোট হয়ে আসছে অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন মিয়ানমার সামরিক সরকারের পৃথিবী!

| October 24, 2017

স্বদেশ খবর ডেস্ক : ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অং সান সু চি’র নেতৃত্বাধীন মিয়ানমার সামরিক সরকারের পৃথিবী। এবার রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর জাতিগত নিধনের দায়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও তার সদস্য রাষ্ট্রগুলো মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর প্রধান, জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তাদের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এছাড়াও দেশটির সঙ্গে সব ধরনের কার্যকর প্রতিরক্ষা সহযোগিতা পর্যালোচনা করে দেখা হবে বলেও জানানো হয়েছে। এদিকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক বিশ্বের চাপে মিয়ানমারকে উন্নয়ন সহায়তা হিসেবে দেয়া ২০০ কোটি ডলারের ঋণ সহায়তা স্থগিত করেছে বিশ্বব্যাংক।
লুক্সেমবার্গে ১৬ অক্টোবর ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বৈঠকে পাস হওয়া প্রস্তাবে বলা হয়, নিরাপত্তা বাহিনীর বল প্রয়োগের আলোকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও সদস্য রাষ্ট্রগুলো মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর প্রধান ও জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তাদের সব ধরনের আমন্ত্রণ স্থগিত রাখবে। বৈঠকে মোট ৮টি সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
অভ্যন্তরীণ নির্যাতন ও নিপীড়নে ব্যবহারের আশঙ্কায় ইইউ বর্তমানে মিয়ানমারে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানি বন্ধ রেখেছে। ২৭ দেশের সংস্থাটি মিয়ানমারকে সতর্ক করে বলেছে, তারা যদি পরিস্থিতির উন্নতি না ঘটায় তবে আরও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে। এছাড়া রাখাইনে অব্যাহত অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতায় উদ্বেগ জানিয়েছে ইইউ। তারা সকল পক্ষের কাছে সহিংসতার অবসান ও সমান গুরুত্ব দিয়ে মিয়ানমারের নাগরিক বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষার আহ্বান জানায়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর উদ্বেগ বিবেচনায় নিয়ে তাদের সঙ্গে সংলাপে বসতে মিয়ানমারকে উৎসাহিত করা হয়েছে। প্রতিবেশীসুলভ আচরণের মাধ্যমে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বসতবাড়িতে প্রত্যাবাসনেরও আহ্বান জানানো হয়। এই কঠিন পরিস্থিতেও মানবিক ও শান্তিপূর্ণ ভূমিকার জন্য বাংলাদেশের প্রশংসা করা হয়েছে।
ইইউর পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফেডেরিকা মগেরিনির সভাপতিত্বে বৈঠকে জার্মানির অর্থনীতি ও জ্বালানি বিষয়ক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও ভাইস চ্যান্সেলর সিগমার গ্যাব্রিয়েল, বেলজিয়ামের উপ-প্রধানমন্ত্রী দিদিয়ের রেনডার্স, বুলগেরিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী ইকাতেরিনা জাহারিয়েভা, ক্রোয়েশিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী মারিজা পেজচিনোভিচ বুরিক, চেক প্রজাতন্ত্রের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী আইভো স্রামেক, ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রেস স্যামুয়েলসেন, ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যাঁ ইভস দ্রিয়াঁ, এস্তোনিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ¯ে¢ন মাইকসের ছাড়াও স্পেন, ইতালি, সাইপ্রাস, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া, লুক্সেমবার্গ, হাঙ্গেরি ও নেদারল্যান্ডসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, মাল্টার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং আয়ারল্যান্ড ও গ্রিসের স্থায়ী প্রতিনিধিরা ছিলেন।
বৈঠকে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ, মানবাধিকার লঙ্ঘন, নির্বিচারে গুলিবর্ষণ, স্থলমাইনের ব্যবহার, যৌন নির্যাতন ও সহিংসতার ঘটনায় চরম উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রস্তাব গ্রহণ করেছে ইইউ। তাতে বলা হয়, এই সহিংসতা অগ্রহণযোগ্য এবং তা অবশ্যই অবিলম্বে থামাতে হবে।
হত্যাসহ নির্বিচারে হামলা ও ভয়-ভীতি প্রদর্শনের কারণে ২৫ আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত ৬ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। প্রস্তাবে বলা হয়, যখন এত বেশি লোক পালিয়ে আসে, তখন বুঝতে হবে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের নিজেদের জায়গা-জমি থেকে উচ্ছেদ করে তাড়িয়ে দেয়ার জন্য এটি একটি পরিকল্পিত কর্মসূচি।
প্রস্তাবে আরও বলা হয়, যেহেতু মানবিক সহায়তা সেখানে দেয়া যাচ্ছে না এবং গণমাধ্যমের কোনো প্রবেশাধিকার নেই, তাই সেখানে সত্যিকারের প্রয়োজন কী তা সঠিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া সমস্যা সমাধানের জন্য বাংলাদেশসহ সব প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে আলোচনার জন্য মিয়ানমারকে আহ্বান জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
আগামী নভেম্বর মাসে মিয়ানমারে অনুষ্ঠেয় আসেম পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনের পাশাপাশি রোহিঙ্গা বিষয়ে গঠনমূলক আলোচনার ওপর জোর দিয়ে বলা হয়, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এশিয়ার অন্য দেশগুলোর সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগ রাখবে। এছাড়া আসিয়ান জোটভুক্ত ১০টি দেশের মধ্যে যারা ইউরোপীয় ইউনিয়নের অংশীদার তাদেরও এ বিষয়ে যুক্ত হওয়ার জন্য আহ্বান জানানো হয় প্রস্তাবে। এতে বলা হয়েছে রাখাইন রাজ্যে মানবিক ও মানবাধিকার পরিস্থিতির অবস্থা শোচনীয়। সেখানে ধারাবাহিকভাবে গোলাগুলি, মানবাধিকার লঙ্ঘন, সহিংসতা ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। এ পরিস্থিতি পুরোপুরি অগ্রহণযোগ্য এবং এর তাৎক্ষণিক অবসান হওয়া দরকার।
প্রস্তাবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন মেনে চলার জন্য মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে অনুরোধ করেছে ইইউ। এছাড়া বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনে দরকারি পদক্ষেপ নিতে মিয়ানমারের সরকারের প্রতি আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। এতে জানানো হয়, জাতিসংঘ, আইসিআরসিসহ সব আন্তর্জাতিক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাকে শর্তহীন পূর্ণ প্রবেশাধিকার দিতে হবে। যারা বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেছে, তাদের নিরাপদে, স্বেচ্ছায়, টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণভাবে ফিরিয়ে আনতে বিশ্বাসযোগ্য ও বাস্তবিক প্রক্রিয়া চালু করতে হবে। এরই মধ্যে ধাপে ধাপে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মধ্যে মানবিক সহায়তা দেয়ার কাজ করছে ইইউ এবং এর পরিধি রাখাইন রাজ্যেও বিস্তৃত করার জন্যও সংস্থাটি প্রস্তুত রয়েছে।
প্রস্তাবে বলা হয়, আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানী মিশনকে অবিলম্বে দেশটিতে নিরাপদে প্রবেশ করতে দিতে হবে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল সম্প্রতি অনুসন্ধানী মিশনের ক্ষমতা বাড়ানোর নির্দেশ দেয়ার ঘোষণাকে স্বাগত জানায় ইইউ। ইইউ বলেছে, শিশুদের ওপর নিষ্ঠুর নির্যাতনসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের মারাত্মক অভিযোগগুলোর বিস্তারিত তদন্ত হওয়া উচিত। মিয়ানমারের কানি ও শান রাজ্যের মানবিক পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইইউ। সেখানেও মানবিক সহায়তা ও প্রবেশাধিকার দিতে মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
এদিকে মিয়ানমারকে উন্নয়ন সহায়তা হিসেবে দেয়া ২০০ কোটি ডলারের ঋণ সহায়তা স্থগিত করার কথা উল্লেখ করে বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, মিয়ানমারের সার্বিক পরিস্থিতির অগ্রগতি না হলে ঋণ সহায়তা স্থগিতের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হবে না।
মিয়ানমার সম্পর্কে ইইউ ও বিশ্বব্যাংকের সিদ্ধান্ত এবং জাতিসংঘ ও তার বিভিন্ন সংস্থার সিদ্ধান্তে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব সিদ্ধান্তে ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে অং সান সু চি’র নেতৃত্বাধীন মিয়ানমারের সামরিক সরকারের পৃথিবী। রোহিঙ্গাদের সসম্মানে মিয়ানমারে ফেরত না নিলে সু চি ও তার নেতৃত্বাধীন সামরিক সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ আরো বৃদ্ধি পাবে। এতে মিয়ানমার কার্যত আন্তর্জাতিক দুনিয়া থেকে ক্রমেই একঘরে হয়ে যাওয়ার দিকেই এগুচ্ছে।

Category: আন্তর্জাতিক

About admin: View author profile.

Comments are closed.