প্রতিবেদন

বিএনপির সঙ্গে সংলাপে সিইসির মন্তব্যে দেশজুড়ে আলোচনার ঝড়

নিজস্ব প্রতিবেদক : জেনারেল জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেনÑ এই মন্তব্যের কারণে ১৬ আগস্ট থেকে রাজনৈতিক আলোচনায় সিইসি কে এম নুরুল হুদা। বিএনপি’র রাজনীতি সম্পর্কে সিইসির এমন ইতিবাচক মন্তব্য গণমাধ্যমে আসার পর এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। অফিস-আদালতসহ সর্বত্রই এ নিয়ে নানামুখী আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। পক্ষে-বিপক্ষে চলেছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাকে নিয়ে আলোচনা ছাপিয়ে সবার মুখে মুখে আলোচনা হয় সিইসি হুদাকে নিয়ে। কেউ কেউ এর সঙ্গে চলমান রাজনীতি, আগামী সংসদ নির্বাচন ও নানা গুজবের সমীকরণের সঙ্গেও অংক মেলানোর চেষ্টা করছেন। বিভিন্ন স্থানে আলোচনা-সমালোচনায় কাউকে কাউকে এমন প্রশ্ন তুলতেও দেখা গেছে যে, সিইসি তার এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে কী বোঝাতে চেয়েছেন? তার মানে কি জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার আগে দেশে একদলীয় গণতন্ত্র ছিল? সিইসি যদি সেরকম কিছু ইঙ্গিত করে থাকেন তাহলে কাদের সময়ে কিংবা কারা সেই একদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েম করেছিল? এমন ইঙ্গিতের মধ্য দিয়ে কী বার্তা ছড়িয়ে দিতে চাইলেন দেশের সিইসি? তাছাড়া তিনি কাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে কাকে মহৎ বানানোর ইঙ্গিত দিলেন? এরকম নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল বিভিন্ন মহলের আলোচনার টেবিলে।
শুধু সাধারণ মানুষ নয়, রাজনৈতিক দলগুলোরও কেউ কেউ সিইসির বক্তব্যকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এ সম্পর্কিত সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, জিয়াউর রহমানের গুণগান গাওয়া বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে সিইসির কৌশল হতে পারে। সঙ্গে সঙ্গে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এটিও বলেছেন, বিএনপির সঙ্গে সংলাপে কে এম নুরুল হুদা আসলে কী বলেছেন, সে বিষয়টি আগে নিশ্চিত হওয়া দরকার। তাছাড়া প্রধান নির্বাচন কমিশনার জিয়াকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা বলেছেন, তিনি এটি ভেতরে বলেছেন, তিনি কোনো প্রেস ব্রিফিং করেননি। এটি আগে আমাদের কনফার্ম হতে হবে।
প্রসঙ্গত, নির্বাচনি আইন সংস্কার বিষয়ে ১৫ অক্টোবর বিএনপির সঙ্গে সংলাপ করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সেই আলোচনার সূচনায় সিইসি বলেন, জিয়াউর রহমান এ দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৯৯১ সালে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার কাজে প্রকৃত নতুন ধারার প্রবর্তন করেছে। সিইসি আরও বলেন, বিএনপি সরকার প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করেছে, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় করেছে, দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষার সুযোগ দিয়েছে। র‌্যাব, দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, আইন কমিশন, সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়িয়ে ৩০ বছর করেছে।
বিএনপি নেতারা সিইসির বক্তব্য সম্পর্কে প্রকাশ্যে তেমন কিছু না বললেও দলটির দায়িত্বশীল নেতাদের কেউ কেউ এটিকে ভিন্নভাবেও ব্যাখ্যা করছেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্যের মতে, বর্তমান নির্বাচন কমিশনের ওপর বিএনপির আস্থা আনতে কৌশল হিসেবেও সিইসি এমনটি বলে থাকতে পারেন। স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্যের ধারণা, বর্তমান সরকারের অধীনে বিএনপিকে আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনে আনার ফাঁদ হিসেবেও সিইসি হুদা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান সম্পর্কে এমন ইতিবাচক মন্তব্য করে থাকতে পারেন।
এদিকে, জিয়াউর রহমানকে এ দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠাতা বলায় সিইসি কে এম নুরুল হুদার পদত্যাগ দাবি করেছেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি কাদের সিদ্দিকী। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংলাপে অংশ নেয়ার পর সংলাপ থেকে বের হয়ে এই দাবি জানিয়ে কাদের সিদ্দিকী সাংবাদিকদের বলেন, সিইসি বলেছেন, জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছেন। যদি জিয়াউর রহমান এটা করে থাকেন, তাহলে কেউ না কেউ বহুদলীয় গণতন্ত্র হত্যা করেছে। তার এই বক্তব্যের সঙ্গে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ একমত নয়।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্য পর্যালোচনা করলে যে বার্তাটি মেলে তা হলো সিইসির এ বক্তব্যের পর প্রতিক্রিয়া দেখানোর ব্যাপারে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে ক্ষমতাসীন দল। যার কারণে সিইসির বক্তব্য নিয়ে দলের মধ্যে আলোচনা থাকলেও নির্বাচন কমিশনকে বিতর্কিত না করার পক্ষেই দলটি বেশিরভাগ নেতা। দলটির কেউ কেউ বিষয়টি উড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করছেন। আবার কেউ বলছেন, এ ব্যাপারে দলীয় বক্তব্য থাকা উচিত। তবে এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের দলীয় বক্তব্য না পাওয়া গেলেও দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, সিইসির ওই মন্তব্য বিএনপিকে নির্বাচনে নিয়ে আসার কৌশল হতে পারে। এতে বিএনপিও খুব আশাবাদী হয়ে গেছে। খুব খুশি খুশি ভাব। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুলের মুখে হাসি ফুটে উঠেছে। এই হাসিহাসি ভাব যেন নির্বাচনের আগ পর্যন্ত থাকে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ নির্বাচন কমিশনারের কাছে কোনো আনুকূল্য (ফেভার) প্রত্যাশা করে না।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এমন মন্তব্য করলেও রাজনীতি সচেতন সাধারণ মানুষ বলছেন ভিন্ন কথা। রাজনৈতিক সমালোচকদের অধিকাংশের মতেই সিইসি কে এম নুরুল হুদা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়েই জিয়াউর রহমানকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠাকারী হিসেবে মন্তব্য করেছেন। তাদের কথা হলো কে এম নুরুল হুদা বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে দীর্ঘদিন ওএসডি হয়ে থাকলেও ওই সরকারই তাকে সচিব হিসেবে প্রমোশন দিয়ে অবসরে পাঠিয়েছে। না হয় নুরুল হুদাকে অতিরিক্ত সচিব হয়েই অবসরে যেতে হতো। আর অতিরিক্ত সচিব থাকা অবস্থায় অবসরে গেলে ২০১৭ সালে এসে তার পক্ষে কিছুতেই সিইসি হওয়া সম্ভব হতো না। ফলে সিইসি নুরুল হুদা বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতাস্বরূপ জেনারেল জিয়াউর রহমান সম্পর্কে এমন ইতিবাচক মন্তব্য করে থাকতে পারেন।
আবার অনেকের মতে, সিইসি কে এম নুরুল হুদা একজন সরকারি আমলা। আমলাদের বৈশিষ্ট্যই হলো তারা সব দলের সঙ্গেই সদ্ভাব রেখে চলেন। সিইসি মনে করতে পারেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় চলেও আসতে পারে। বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় এলে তখনও তিনিই থাকবেন সিইসি। সেক্ষেত্রে সিইসি হিসেবে তার চলার পথ কুসুমাস্তীর্ণ রাখার জন্য তিনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমানকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠাকারী বলে থাকতে পারেন। আর আওয়ামী লীগ খুশি এ ভেবে যে, বিএনপিকে শেখ হাসিনা সরকারের অধীনে নির্বাচনে আনার কৌশল হিসেবে সিইসি এমন মন্তব্য করেছেন।