বিবিএসের জরিপ : ১০ শতাংশ শীর্ষ ধনীর দখলে দেশের ৩৮% আয়

| October 24, 2017

নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশে আয়বৈষম্য কতটা প্রকট তার প্রমাণ উঠে এসেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ খানা আয়-ব্যয় জরিপে। তাতে দেখা গেছে, ১০ শতাংশ শীর্ষ ধনীর কাছে দেশের ৩৮ শতাংশ আয় কুক্ষিগত। এর আগে ২০১০ সালের খানা আয়-ব্যয় জরিপে ১০ শতাংশ শীর্ষ ধনীর হাতে ৩৫ শতাংশ আয় জমা ছিল। ৬ বছরের ব্যবধানে সেটি ৩ শতাংশ বেড়েছে। উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, ২০১০ সালে দেশে মোট ১০০ টাকা আয় হলে তার মধ্যে শীর্ষ ১০ শতাংশ ধনীর দখলে যেত ৩৫ টাকা। এখন ১০০ টাকায় ধনীদের দখলে যায় ৩৮ টাকা।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংস্থা অক্সফামের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বিশ্বে যত সম্পদ আছে, তার প্রায় অর্ধেক কুক্ষিগত করে রেখেছে ১ শতাংশ ধনকুবের। অবশিষ্ট প্রায় অর্ধেক সম্পদের মালিক ৯৯ শতাংশ মানুষ। অক্সফাম বলেছিল, বিশ্বের ৬২ জনের সম্পদ হচ্ছে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের সম্পদের সমান। অর্থাৎ ৬২ জনের মোট সম্পদ সমান ৩৬০ কোটি মানুষের সম্পদ। বিশ্বের মোট জনসংখ্যা এখন প্রায় ৭০০ কোটির ওপরে।
অক্সফামের ডাটায় উঠে এসেছে সারা বিশ্বের আয় বৈষম্যের প্রকট চিত্র। আর বিবিএসের ডাটায় উঠে এলো বাংলাদেশে আয় বৈষম্যের একই ধরনের চিত্র।
খানা আয়-ব্যয় জরিপে দেখা গেছে, গত ৬ বছরে দেশে দারিদ্র্যের হার কমেছে। তবে একই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে আয়বৈষম্য। ভোগব্যয়ও স্থিতিশীল আছে। দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার ব্যাপক উন্নতি হলেও বিবিএস বলছে, রংপুর বিভাগে এখনো দেশের ৪৭ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে কম মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। এই হার ১৬ শতাংশ। খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনজনিত কারণে দেশে ভাত খাওয়ার প্রবণতা কমছে বলেও দাবি করেছে বিবিএস।
১৮ অক্টোবর রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পরিসংখ্যান ভবন মিলনায়তনে খানা আয়-ব্যয় ‘এইচআইইএস ২০১৬’ জরিপের প্রাথমিক ফলাফল তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব মোজাম্মেল হক, ঢাকায় নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত আবাসিক প্রতিনিধি রাজশ্রী পালাকার, বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন, বিবিএস মহাপরিচালক আমির হোসেন। আর জরিপের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন প্রকল্প পরিচালক দীপঙ্কর রায়।
খানা আয়-ব্যয় জরিপে দেখা গেছে, ২০১০ সালে একজন ব্যক্তি দৈনিক ৪১৬ গ্রাম ভাত খেতেন। ২০১৬ সালে সেটি ৩৬৭ গ্রামে নেমে এসেছে। এ সময় সবজি খাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। একই সঙ্গে পিঁয়াজেরও। ২০১০ সালে একজন ব্যক্তি দৈনিক ২২ গ্রাম পিঁয়াজ গ্রহণ করতেন। এখন সেটি বেড়ে ৩১ গ্রামে দাঁড়িয়েছে। বেড়েছে গরুর মাংস খাওয়ার প্রবণতা। মাছ ও ডিম খাওয়ার হারও বেড়েছে।
২০১০ থেকে ২০১৬ এই ৬ বছরে দেশে আয়বৈষম্য বেড়েছে উল্লেখ করে প্রকল্প পরিচালক দীপঙ্কর রায় তার প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, আয়বৈষম্য পরিমাপক গিনি কো-ইফিশিয়েন্ট মানদ-ে এটা বেড়ে শূন্য দশমিক ৪৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ২০১০ সালে এটি ছিল শূন্য দশমিক ৪৫ শতাংশ। গিনি কো-ইফিশিয়েন্ট ১ শতাংশ হলে সেটিকে বলা হয় সর্বোচ্চ আয়বৈষম্য। আর শূন্য শতাংশ হলে সেটিকে বলা হয় সবার মধ্যে সাম্য, যা বিশ্বের কোথাও নেই। সেই হিসাবে বাংলাদেশে এখনো আয়বৈষম্য চরম অবস্থায় যায়নি ঠিকই, কিন্তু প্রতি বছর বাড়ছে।
প্রকল্প পরিচালক দীপঙ্কর রায় বলেন, ১৯৭৩-৭৪ সালে প্রথমবারের মতো দেশে খানা আয়-ব্যয় জরিপের কাজ শুরু হয়। ওই সময় দুই বছর পর পর এই জরিপ হতো। কিন্তু ১৯৯৫ সাল থেকে খানা আয়-ব্যয় জরিপটি ৫ বছর পরপর করা হয়। ২০১০ সালের জরিপে ১২ হাজার ২৪০টি খানা থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল। ২০১৬ সালের জরিপে নমুনা এলাকার খানা নেয়া হয়েছে ৪৬ হাজার ৮০টি। তাই অতীতের তুলনায় এখন এ জরিপের ফলাফল আরো স্বচ্ছ ও সমৃদ্ধ।
২০১৬ সালের খানা আয়-ব্যয় জরিপ অনুযায়ী, জাতীয় পর্যায়ে খানার মাসিক আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৯৪৫ টাকা। ২০১০ সালে তা ছিল ১১ হাজার ৪৭৯ টাকা। শহরে প্রতি খানার মাসিক আয় এখন ২২ হাজার ৫৬৫ টাকা। ২০১০ সালে ছিল ১৬ হাজার ৪৭৫ টাকা। আর গ্রামে এখন মাসিক আয় ১৩ হাজার ৩৫৩ টাকা, ২০১০ সালে যা ছিল ৯ হাজার ৬৪৮ টাকা।
বিবিএসের জরিপ বলছে, গত ৬ বছরে দেশের আর্থসামাজিক অনেক সূচকের উন্নতি হয়েছে। একটি খানার বাসস্থানের রড, ইট, বালু, সিমেন্টের উপকরণ ২০১০ সালে ছিল ২৫ শতাংশ। ২০১৬ সালে সেটি ৩০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। টিন ও কাঠের দেয়ালের হার এখন ৪৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ২০১০ সালে তা ছিল ৩৮ শতাংশ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, ‘আয়বৈষম্য বাড়ছে; সেটি আমরা কমানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। আমরা ধনিক শ্রেণির আয়কর বাড়াচ্ছি। তাদের কাছ থেকে কর নেয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।’ গত ৬ বছরে দারিদ্র্যের হার কমা প্রসঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ‘বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করলে আমরা অনেক ভালো করেছি। সারা বিশ্বে যেখানে গড় হতদরিদ্রের হার ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ, সেখানে আমাদের হতদরিদ্র্যের হার ১২ দশমিক ৯ শতাংশ।’
বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, দারিদ্র্যের হার কমেছে, এটা সুখবর। কিন্তু কমার হার শ্লথ। এটা কেন, দেখা উচিত। পাশাপাশি ধনী-দরিদ্রের আয় বৈষম্যের ব্যবধান বাড়ার পরিবর্তে কমানোর কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

Category: অর্থনীতি

About admin: View author profile.

Comments are closed.