কলাম

বিশ্ব শিক্ষক দিবস ও শিক্ষকের কথা

শ্যামল কুমার সরকার : ‘স্বাধীনভাবে পাঠদান, শিক্ষক হবেন ক্ষমতাবান’ ইউনেস্কো নির্ধারিত এ প্রতিপাদ্যে গত ৫ অক্টোবর পালিত হলো বিশ্ব শিক্ষক দিবস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার পর বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শিক্ষক সংগঠনের ক্রমাগত প্রচেষ্টা, ইউনেস্কো ও আইএলও’র সদস্যভুক্ত রাষ্ট্রসমূহের সদিচ্ছায় ১৯৬৬ সালের ৫ অক্টোবর অর্জিত হয় আন্তর্জাতিক শিক্ষক সনদ। ১৪৬ ধারা-উপধারা বিশিষ্ট এই সনদে শিক্ষাকে জাতি গঠন ও উন্নয়নের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
পশ্চিমা বিশ্ব এবং এশিয়ার উন্নত দেশসমূহে বিশ্ব শিক্ষক দিবস আড়ম্বরে পালিত হয়ে থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে এ দিবস পালনে সরকারি কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না। অথচ খোদ সরকারের পক্ষ থেকেই বলা হয় শিক্ষকরা মহান, শিক্ষকরা মানুষ গড়ার কারিগর! সরকারের এই দ্বৈত ভূমিকা রহস্যজনক। শিক্ষকরা মানুষ গড়ার কারখানায় কাজ করেন। সে কারখানার সব উৎপাদিত পণ্য সব সময় মানসম্পন্ন হয় না। এটা বেদনাদায়ক। এজন্য শিক্ষকদের অবশ্যই দায় আছে। তবে রাষ্ট্রীয় নীতিমালাও এক্ষেত্রে কম দায়ী নয়।
স্বাধীনতার পরপরই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশের প্রাথমিক শিক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের কাঁধে তুলে দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালে একই সাথে ৩৬ হাজার ১৬৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সরকারি করেছিলেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সরকারি করে প্রাথমিক শিক্ষাকে গণমুখী ও নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা স্তরে কোনো রকম নীতিমালা ছাড়াই বেশকিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সরকারি করা হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারীকরণের এ ধারা এখনো বিদ্যমান। বর্তমানে ২৮৫টি কলেজ ও ১৪৮টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় সরকারীকরণের প্রক্রিয়া চলমান আছে। অথচ এর কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নেই। অবশ্য জেলা সদরের ১৮টি মহিলা কলেজ এবং তৎকালীন মহকুমা সদরের কলেজ ও স্কুল সরকারীকরণের ক্ষেত্রে কিছুটা নীতির আশ্রয় নেয়া হয়েছে। দেশের হাজার হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ৬০০ প্রতিষ্ঠান সরকারি। এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যবস্থাপনার দায় পুরোপুরি সরকারের ওপর বর্তায়। অন্যদিকে রয়েছে এমপিওভুক্ত ২৭ হাজার ৬৪৩টি মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও ডিগ্রি প্রতিষ্ঠান এবং শতভাগ প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শোচনীয়। স্বাধীনতা লাভের এত বছর পরেও সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যকার বৈষম্য দূরীকরণের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়নি। বৈষম্যহীন শিক্ষার কথা যুগের পর যুগ ধরে সংবিধানের পাতাতেই থেকে যাচ্ছে। শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণের আন্দোলন ও সংগ্রাম দীর্ঘদিন ধরেই নীরবে-নিভৃতে কাঁদছে।
ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান ও একাত্তরের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে এদেশের শিক্ষক সমাজের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে গণ-অভ্যুত্থানে ড. সামছুজ্জোহা এবং মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন আমাদের বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র ভারতে আশ্রয়গ্রহণকারী শরণার্থী শিক্ষকবৃন্দের মধ্যে ড. এ আর মল্লিক, ড. আনিসুজ্জামান, প্রফেসর আলী আনোয়ার ও ড. অজয় রায়ের নাম উল্লেখ না করলেই নয়। সেই শিক্ষক সমাজের আজ স্বাধীন বাংলাদেশে আরো ভালো থাকার কথা, সম্মান নিয়ে বাঁচার কথা। কিন্তু বাস্তবতা সবারই জানা। এ কথাও সত্য যে সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কয়েক হাজার শিক্ষক দিয়েছে, ২৬ হাজার ১৯৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ধাপে ধাপে সরকারি করেছে এবং সরকারি কলেজ পর্যায়ে কয়েক হাজার শিক্ষকের পদোন্নতির ব্যবস্থা করেছে। বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করেছে। পাশাপাশি এমপিওভুক্ত কলেজ শিক্ষকদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে কুখ্যাত অনুপাত প্রথা (৫ঃ২) প্রত্যাহার করা হয়নি। এমপিওভুক্ত ডিগ্রি কলেজ পর্যায়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক সহযোগী অধ্যাপক পদ সৃজনের নীতিমালা তৈরির কাজ ২০১০ সাল থেকেই চলছে। কবে এ সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট নীতিমালা হবে কলেজ পর্যায়ের শিক্ষকদের তা জানা নেই। কয়েক বছর আগে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এমপিওভুক্ত ডিগ্রি কলেজে সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক পদের জন্য নীতিমালা তৈরি করলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও একজন কলেজ শিক্ষক সারাজীবন প্রভাষক বা সহকারী অধ্যাপক থাকতে পারেন না। সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানেই বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের ব্যবস্থা থাকলেও এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট হাজারো টন ওজনের পাথরের মতো বরাবর স্থির থাকে। এর কোনো গতি নেই। সারা বিশ্ব এগিয়ে চলছে। বেশিরভাগ দেশই এনালগ থেকে ডিজিটালে রূপান্তরিত হয়েছে, হচ্ছে। আমাদের সরকারও এনালগ বাংলাদেশকে ডিজিটালে রূপান্তরের কাজ করে চলেছেন। শুধু ব্যতিক্রম শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশেষ করে এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে।
রাজনৈতিক বিবেচনায় দেশের যত্রতত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে এবং রাজনৈতিক বিবেচনাতেই বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হয়েছে। এ দায় কার? এমপিওভুক্ত অনেক প্রতিষ্ঠানেই শিক্ষার্থীর চেয়ে শিক্ষকের সংখ্যা বেশি। কোনো কোনো বিষয়ে কখনো কখনো একজন শিক্ষার্থীও থাকে না। তবুও বেতন চলে। এভাবে চলতে পারে না। সমন্বিত নীতিমালার মাধ্যমে কাম্য শিক্ষার্থীবিহীন প্রতিষ্ঠানকে কাম্য শিক্ষার্থীযুক্ত প্রতিষ্ঠানের সাথে একীভূত করে এ সমস্যার সমাধান করা যায়। এতে শিক্ষা বাজেটের ওপর চাপ কমবে এবং শিক্ষক সমাজের বেতন-ভাতার উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব হবে। ২০০৬ সালের ডাকার সম্মেলনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শিক্ষা খাতে সংশ্লিষ্ট দেশের জিডিপির ৬ শতাংশ বরাদ্দের কথা থাকলেও ২ দশমিক ৫ শতাংশের ওপরে বাংলাদেশ ৪৬ বছরে কখনোই যেতে পারেনি। সরকারের পক্ষ থেকে বরাবরই সীমিত সম্পদের কথা বলা হয়। তবে অন্যান্য বিভাগের ব্যয় সমন্বয়ের মাধ্যমে শিক্ষা খাতের বরাদ্দ বাড়ানো অবশ্যই সম্ভব।
দেশের মানব সম্পদের উন্নয়নের জন্য শিক্ষক সমাজের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে তাদের বেতন-ভাতা ও পেশাগত মর্যাদা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সে শিক্ষকদের মর্যাদার স্থান অগ্রগামী করা অতি আবশ্যক। বর্তমানে শিক্ষা আইন-২০১৭ চূড়ান্ত করার কাজ চলছে।
শিক্ষকদেরও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা আছে। শিক্ষকদের ভুলে গেলে চলবে না যে, তারা জনগণের করের টাকায় গড়া স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন। এখন তারা কর্মজীবী হিসেবে জনগণের করের টাকায় মাসিক বেতন-ভাতা নিচ্ছেন। তাই আমার মতো অনেকেই মনে করেন শিক্ষক সংগঠনসমূহকে ভেদাভেদ ভুলে এক কাতারে এসে শিক্ষক সমাজের ন্যায্য দাবি আদায়ে এক সুরে আওয়াজ তুলতে হবে।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক ও
বিভাগীয় প্রধান, ইংরেজি বিভাগ
ঝিট্কা খাজা রহমত আলী ডিগ্রি কলেজ
হরিরামপুর, মানিকগঞ্জ