প্রতিবেদন

অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গা ইস্যুতে সমাজে নেতিবাচক প্রভাব : অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে রোহিঙ্গারা

নিজস্ব প্রতিবেদক : কক্সবাজার জেলার উখিয়া ও টেকনাফে আশ্রিত রোহিঙ্গারা দিন দিন অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠছে। পাশাপাশি তারা ক্রমেই নিরীহ থেকে মারমুখী হয়ে উঠছে। ইদানীং রোহিঙ্গাদের হামলার শিকার হচ্ছেন স্থানীয় সাধারণ মানুষ থেকে পুলিশ, এনজিও কর্মকর্তা ও ত্রাণ সহায়তা দিতে আসা লোকজনও। আবার রোহিঙ্গাদের একটি অংশ জড়িয়ে পড়েছে ইয়াবা, মানব পাচারের মতো জঘন্য অপরাধমূলক কর্মকা-ের সঙ্গেও। ক্যাম্পে তাদের নিজেদের মধ্যেও বাড়ছে ঝগড়া-বিবাদ। এ পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের হামলার শিকারে প্রাণ হারিয়েছেন দুজন। আর বিভিন্ন সময় আহত হয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তাসহ বেশ কয়েকজন।
পুলিশ ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ১৯ অক্টোবর রোহিঙ্গা দুই সহোদরের ছুরিকাঘাতে আহত হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের আবু ছিদ্দিক। দুই দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে ২১ অক্টোবর ভোরে তিনি মারা যান। মহিষ বিক্রিকে কেন্দ্র করে রোহিঙ্গা মোহাম্মদ হোছেনের ছেলে কালা মিয়া ও ধলা মিয়ার সঙ্গে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে আবু ছিদ্দিককে মারধর ও ছুরিকাঘাত করে। ২১ অক্টোবর টেকনাফের নয়াপাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি-ব্লকে রোহিঙ্গা নারী দিল বাহার ও তার স্বামী সৈয়দ আহমদ অবৈধভাবে একটি মুদির দোকান বসানোর চেষ্টা করছিল। এতে নয়াপাড়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ (এসআই) কবির আহমদ বাধা দিলে রোহিঙ্গা দম্পতি তার ওপর চড়াও হয়। এ ঘটনায় এসআই কবিরের মাথা ফেটে গেলে তাকে স্থানীয়রা উদ্ধার করে টেকনাফ হাসপাতালে ভর্তি করান। এর আগে গত এক মাসে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে রোহিঙ্গার বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার, কক্সবাজার, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ইয়াবাসহ রোহিঙ্গা আটক, ত্রাণ দিতে গিয়ে স্থানীয় এনজিও মুক্তির কর্মকর্তা লাঞ্ছিত, রোহিঙ্গার হাতে উখিয়ায় মুরগি ব্যবসায়ী আহত হওয়ার মতো অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। জানা গেছে, গত ১৬ সেপ্টেম্বর উখিয়ার কুতুপালং এলাকায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে একে অপরের হামলায় এক রোহিঙ্গা খুন হয়। ৭ অক্টোবর কুতুপালংয়ের একটি রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকার পার্শ্ববর্তী তেলপাড়া খাল থেকে এক অজ্ঞাত রোহিঙ্গার বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এর বাইরে প্রায় প্রতিদিন উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ লেগে থাকে বলে জানান স্থানীয়রা।
পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের একটি সিন্ডিকেট ইয়াবা ও মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত রয়েছে বলে জানান স্থানীয় পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীর সদস্যরা। ইতোমধ্যে তারা কয়েকজনকে চিহ্নিত ও আটক করতে সম হলেও মূল হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। তবে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করে অপরাধীদের চিহ্নিত করে ধরার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে রোহিঙ্গাদের পুরোপুরি নিবন্ধনের আওতায় আনা হলে অপরাধীদের চিহ্নিত করা আরও সহজ হবে বলে মনে করছে পুলিশ প্রশাসন।
উখিয়া-টেকনাফের দায়িত্বপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার চাইলাউ মারমা বলেন, ‘লাখ লাখ রোহিঙ্গার মাঝে কিছুসংখ্যক উচ্ছৃঙ্খল ও অপরাধপ্রবণ লোক থাকবেÑ এটাই স্বাভাবিক। তবে এরা যেন সামাজিক পরিবেশ অস্বাভাবিক করতে না পারে সেদিকে আমাদের নজরদারি রয়েছে। অপরাধের মাত্রা যেন আর না বাড়ে সেদিকেও গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে।’
বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের অপরাধ কর্মকা- নিয়ে উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের কারণে আজ উখিয়া-টেকনাফের মানুষ সংখ্যালঘু হয়ে পড়েছে। এতে স্থানীয়দের নিরাপত্তা দিন দিন ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। আজকে একজন খুন হয়েছে, কাল ১০ জন খুন হতে পারে। কারণ কমিউনিটি পাওয়ার মানুষকে হিংস্র ও অপরাধী করে তোলে। এসব বিষয়ে এখনই ভাবার সময় এসেছে।’
রোহিঙ্গা ঢল সামলাতে যখন পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যস্ত তখন ইয়াবা পাচারকারী সিন্ডিকেট বেশ সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এ কাজে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের একটি চক্র জড়িত বলে অভিযোগ করেছেন উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয় লোকজন। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে টেকনাফ শাহপরীর দ্বীপসহ বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে গত দুই মাসে বড় বড় ইয়াবার চালান খালাস হয়েছে। সম্প্রতি শাহপরীর দ্বীপ হাইওয়ে পুলিশের হাতে ৮০ হাজার ও ২ লাখ ৫৫ হাজার পিস ইয়াবার দুটি চালান ধরা পড়েছে। এছাড়া বিজিবি, কোস্টগার্ড ও র‌্যাবের অভিযানেও কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধার হয়েছে। এদিকে বাস্তুহারা রোহিঙ্গাদের আড়ালে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে উগ্রবাদী জঙ্গি নেটওয়ার্কের সদস্যদের অনুপ্রবেশ ঘটার যথেষ্ট আশঙ্কা আছে বলেও মনে করছেন কেউ কেউ। বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল ও অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করার ল্েয বাংলাদেশের অখ-তা তথা স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বে অবিশ্বাসী দেশি-বিদেশি বিভিন্ন চক্র নানা কৌশলের আশ্রয় নিয়ে ত্রাণ বিতরণের নামে রোহিঙ্গাদের সংস্পর্শে যাচ্ছে এবং তাদের সংগঠিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলতে অশুভ মহল বাস্তুহারা রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করতে পারে। বাংলাদেশের মাটিতে রোহিঙ্গাদের অবস্থান পাকাপোক্ত করার পাঁয়তারা চলছে। বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহল নেপথ্যে থেকে তাদের মিয়ানমারে ফিরে না যাওয়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করছে। এ ব্যাপারে সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে আরো তৎপর হতে হবে। এরই মধ্যে কিছু আলামত ল্য করা গেছে। ‘ঠিকানাবিহীন রোহিঙ্গা অধিকার প্রতিষ্ঠা কমিটি’র নামে ২১ দফা দাবিসংবলিত ব্যানারে ছেয়ে গেছে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর চারপাশের এলাকা।
রোহিঙ্গারা দাবি করছে ২১ দফা নিঃশর্ত বাস্তবায়িত হলে তবেই তারা মিয়ানমারে ফিরে যেতে আগ্রহী, অন্যথায় নয়। যেখানে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবেই স্বীকার করে না, সেখানে ২১ দফা দাবির নিঃশর্ত বাস্তবায়নÑ এটা কিসের ইঙ্গিত বহন করে। অনেকে মনে করেন, বাস্তুহারা রোহিঙ্গারা হয়ত এ দেশেই স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে। এজন্যই হয়ত তাদের একটি বিরাট অংশ নিবন্ধনে অনাগ্রহ দেখাচ্ছে। আশ্রয়কেন্দ্রে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ত্রাণসামগ্রী বিতরণে সরকারকে আরো কঠোর হতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব সীমান্ত বন্ধ করে দিয়ে রোহিঙ্গাদের নিবন্ধনের সময়সীমা বেঁধে দেয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মাঝে এ মর্মে প্রচারণা চালাতে হবে যে নিবন্ধিত হলেই সরকার নির্ধারিত সব ধরনের সহযোগিতা মিলবে, অন্যথায় নয়।