ইসি সংলাপ : সুপারিশ বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জে নির্বাচন কমিশন

| October 30, 2017

নিজস্ব প্রতিবেদক : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তিন মাসব্যাপী ধারাবাহিক সংলাপ শেষ হয়েছে। এখন সবার দৃষ্টি ইসির দিকে। আগামীতে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপে ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য কমিশন কী কী পদপে নিতে যাচ্ছে তা জানার অপোয় সবাই। যদিও নির্বাচন কমিশন এখনো তাদের করণীয় বিষয়গুলো সুনির্দিষ্ট করেনি। সংলাপ থেকে পাওয়া সুপারিশগুলোর সারসংপে প্রস্তুত এবং এসবের গ্রহণযোগ্যতা যাচাই-বাছাইয়ের কাজ এখনও চলমান রয়েছে।
জানা গেছে, সংলাপের সবগুলো প্রস্তাব একত্রিত করে শিগগিরই বই আকারে প্রকাশ করা হবে। প্রস্তাবগুলো সমন্বয় করে সব দলের কাছে পাঠানো হবে। যেসব প্রস্তাব এসেছে কমিশন সভায় উত্থাপনের পর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে। নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যেই সংলাপে উত্থাপিত কয়েকটি প্রস্তাব নিয়ে কাজ শুরু করেছে। গত ২৩ অক্টোবরের সংলাপে নারী নেত্রীরা যেসব দল সর্বস্তরের কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব রাখার বিধান বাতিলের প্রস্তাব দিয়েছে তাদের নিবন্ধন বাতিলের দাবি জানায়। একই সাথে সংবিধানবিরোধী নীতি দলগুলোর গঠনতন্ত্রেও রয়েছে কি না তা কমিশনকে যাচাই করতে বলেন। গত ২৪ অক্টোবরের সংলাপে সাবেক নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক নির্বাচনি আইন সংস্কারের জন্য লিখিতভাবে বেশকিছু প্রস্তাব রাখেন। এসব প্রস্তাবের মধ্যে নির্বাচনে সেনা নিয়োগের বিষয়টিও রয়েছে। মোহাম্মদ আবদুল মোবারকের যুক্তি-গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় প্রতিরা বাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত না করেও কার্যকরভাবে সেনা সহযোগিতা পাওয়া সম্ভব। এেেত্র তিনি সিআরপিসির ১৩১ ধারা উল্লেখ করে বলেন, এই বিধানের বলে প্রয়োজনে ম্যাজিস্ট্রেটের অনুপস্থিতিতেও সেনাবাহিনীর একজন কমিশন্ড অফিসারও জননিরাপত্তার জন্য তিকর অবৈধ সমাবেশ ভঙ্গের নির্দেশ দেয়ার ও অপরাধীদের গ্রেপ্তারের অধিকার রাখেন। এ প্রস্তাবটি কমিশনারদের মধ্যে আলোচনায় রয়েছে। সংলাপে নির্বাচন কমিশনের কাছে অন্তত ৫৫০টি সুপারিশ এলেও প্রধান ইস্যুগুলোতে ঐকমত্য হতে পারেনি ৪০টি রাজনৈতিক দল। নির্বাচনে সেনা মোতায়েন, নির্বাচনকালীন সরকার, না ভোট চালু, ইভিএম ব্যবহার ও সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণের বিষয়ে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে দলগুলো। মতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পাল্টা-পাল্টি সুপারিশ তুলে ধরেছে ইসির কাছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল বা সহায়ক সরকারের নামে নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা নিয়ে কয়েকটি দল প্রস্তাব রাখলেও অধিকাংশ দলের একডজন করে প্রস্তাব অভিন্ন। এেেত্র ইসির আওতাধীন প্রস্তাবগুলো বিবেচনার আশ্বাস দেয়া হয়েছে। এখতিয়ারে নেই এমন প্রস্তাব সরকারের কাছে প্রতিবেদন আকারে পাঠাবে তারা। তবে সংলাপে পাওয়া মতামত বাস্তবায়ন বর্তমান নির্বাচন কমিশনের জন্য চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দলগুলোর সুপারিশ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ৪০টি দলের মধ্যে প্রায় ২০টি দল সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি জানিয়েছে। এর মধ্যে অনেকে বিচারিক মতা দিয়ে বা স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে রাখার সুপারিশ করেছে। অন্তত ১২টি দল সংসদ ভেঙে ভোটের সুপারিশ করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নির্বাচনকালীন সরকারের অধীনে ভোটের প্রস্তাবও অন্তত ১০টি দলের। ইভিএম চালুর পে মত দিয়েছে আওয়ামী লীগসহ ৮টি দল। আর ইভিএম চালুর বিপে মত দিয়েছে বিএনপিসহ ১০টি দল। ৩টি দল সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দল নিয়েও সরকার গঠনের কথা বলেছে। আবার নবম সংসদের প্রতিনিধিও রাখার প্রস্তাব তুলছে কেউ কেউ।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) চালুর পে মত দিয়েছে মতাসীন আওয়ামী লীগ। সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের বিরোধিতা করে ইসির কাছে ১১ দফা পেশ করেছে মতাসীন আওয়ামী লীগ। ভোটের সময় আইনশৃঙ্খলা রায় পুলিশসহ অন্যান্য বাহিনীর ওপর আস্থা রাখতে চায় দলটি। আইনশৃঙ্খলা রার েেত্র কোন পরিস্থিতিতে প্রতিরা বাহিনীর সদস্যদের নিয়োগ করা যাবে ১৮৯৮ সালের প্রণীত ফৌজদারি কার্যবিধির ১২৯ থেকে ১৩১ ধারায় এবং সেনাবিধিমালা ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার শিরোনামে সুস্পষ্টভাবে তার উল্লেখ রয়েছে। নতুন করে সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা নিয়ে জটিলতার শঙ্কাও করছে মতাসীন দলটি। প্রস্তাবনায় বলা হয়েছেÑ ৩০০ আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের মতো জটিল কাজ শেষ করতে সময় স্বল্পতার কারণে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে কি না বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া অত্যাবশ্যক। ২০১৮ সালের শেষ দিকে একাদশ সংসদ নির্বাচন ছাড়াও স্থানীয় সরকারের অনেকগুলো নির্বাচনের কথা বিবেচনায় নিয়ে ‘সব দিক ভেবে’ সিদ্ধান্ত নেয়ার অনুরোধ জানায় আওয়ামী লীগ। একাদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে সংসদ ভেঙে ‘সহায়ক সরকার’ এর অধীনে ভোটের প্রস্তাব বিএনপির। ভোটের সময় ম্যাজিস্ট্রেসি মতা দিয়ে সেনা মোতায়েন, ২০০৮ সালের আগের সংসদীয় আসন সীমানা ফিরিয়ে আনা, ইভিএম চালু না করা, জরুরি অবস্থার সময় থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত দলীয় চেয়ারপারসনসহ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারসহ ২০টি সুপারিশ দিয়েছে দলটি।
গত ৩১ জুলাই থেকে স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে সংলাপ শুরু করে জাতীয় নির্বাচনের কর্মপরিকল্পনা নিয়ে মত বিনিময় শেষ হয়েছে ইসির। এ বিষয়ে ইসির ভারপ্রাপ্ত সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, সফলভাবে এ সংলাপ শেষ করায় ইসির বড় প্রাপ্তি হলো নিবন্ধিত ৪০টি দলের সংলাপে অংশগ্রহণ। রাজনৈতিক দলসহ সবার সঙ্গে মত বিনিময় করে ইসির আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যে সুপারিশগুলো গুছিয়ে পর্যালোচনা করে কমিশনের কাছে উপস্থাপন করা সম্ভব হবে। নভেম্বরের মধ্যে সংলাপের প্রতিবেদন চূড়ান্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন ইসি সচিব।
এবার সংলাপ থেকে তিনটি বিষয় লণীয় উল্লেখ করে ইসি সচিব হেলালুদ্দীন জানান, ইতিবাচক প্রথম দিক হচ্ছেÑ সংলাপে যাদেরই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে সবার কাছ থেকে সাড়া এসেছে। দ্বিতীয়ত, আমরা জানতে পেরেছি অংশীজনরা কী চিন্তা করছে, তাদের তথ্যগুলো পেয়েছি। তৃতীয়ত, সব দলের অংশগ্রহণের নির্বাচনি পরিবেশের আবহ সৃষ্টি হলো। এ ধারা আমরা এগিয়ে নিয়ে যাব। তিনি জানান, সংলাপ শেষে সুপারিশ অনুযায়ী পরবর্তী করণীয় নিয়ে পুরো কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে। ইসির এখতিয়ারের মধ্যে ও এখতিয়ারের বাইরে বিষয়গুলো চিহ্নিত করা হবে। সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলেই কোনো বিষয়ই ইসির সামনে চ্যালেঞ্জ থাকবে না। বরং নির্বাচন হবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও প্রতিযোগিতামূলক।

Category: রাজনীতি

About admin: View author profile.

Comments are closed.