কলাম

কী আছে খান আতার এক নদী রক্ত পেরিয়ে গানে


মেজর তারিকুল ইসলাম মজুমদার, পিএসসি,জি (অব.) : খান আতা পরিচালিত ‘আবার তোরা মানুষ হ’ ছবিটি মুক্তি পায় ৭ ডিসেম্বর ১৯৭৩ সালে। কুমিল্লা শহরের দিপিকা, লিবার্টি, রূপালি, রূপকথা এই চারটি হলে প্রতি সপ্তাহে নতুন নতুন সিনেমা আসার খবর আমাদের ১৮ মাইল দূরে অবস্থিত গ্রামে পৌঁছে যাচ্ছিল। আমরা তখন হাই স্কুলের টগবগে তরুণ। কিন্তু সমস্যা হলো পকেটে পয়সা নেই। যাওয়া-আসার ভাড়া ও সিনেমার দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় শ্রেণির টিকিট কিনতে সব মিলে প্রায় ৬ থেকে ৮ টাকা দরকার। মানে তখনকার এক কেজি চালের দাম। সাধারণত শুক্রবার ছুটির দিন আমরা সিনেমা দেখা অভিযানে নামতাম। তার আগের দিন মায়ের অগোচরে মটকা থেকে চাল চুরির কাজটি যার যার মতো সেরে নিতাম।
প্রায় ৪৪ বছর আগের কথা। আমার স্মৃতিশক্তি যদি আমাকে ফাঁকি না দেয় তা হলে বলতে পারি আমরা কয়েক বন্ধু মিলে কুমিল্লার দিপিকা সিনেমা হলে নতুন মুক্তি পাওয়া যে সিনেমাটি দেখি তার নাম খান আতা পরিচালিত ‘আবার তোরা মানুষ হ’। ছবিটির কেন্দ্রীয় চরিত্রে ৭ জন তরুণ মুক্তিযোদ্ধা ও একজন অধ্য। একটি দৃশ্য আমার মনে চিরভাস্বর হয়ে আছে। দু’জন মুক্তিযোদ্ধা পয়সা ভাগাভাগি করে একটি টঙ দোকান থেকে সিগারেট কিনতে যায়। তখনই আর একজন শহুরে মুক্তিযোদ্ধা অস্ত্রহাতে গাড়ি থেকে নেমে বিদেশি ব্র্যান্ডের এক কার্টন সিগারেট কিনে নিয়ে যায়। হতবাক হয়ে চেয়ে থাকে দু’জন মুক্তিযোদ্ধা। খান আতা পরিচালিত ‘আবার তোরা মানুষ হ’ ছবির একটি বিখ্যাত গান ‘এক নদী রক্ত পেরিয়ে’। এই ছবিতে ববিতার গাওয়া ‘এক নদী রক্ত পেরিয়ে’ গানটি ছিল হিট গান। ছবির প্রোপটের সঙ্গে গানটি ছিল অপূর্ব মিল। কী এমন ছিল গানটিতে, আর কী কারণেই-বা খান আতা গানটিতে এমন সব শব্দ ও বাক্য ব্যবহার করেছিলেন, তা বলার আগে আমি সম্মানিত পাঠকদের ১৯৭১ এবং ১৯৭২ সালে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাই।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে পাকিস্তানের কারাগার থেকে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। ১২ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। দায়িত্ব গ্রহণ করার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে হাজারো সমস্যার মাঝে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যায় তিনি পতিত হন। তার একটি হলো ভারতীয় মিত্র বাহিনীকে স্বদেশে ফেরত পাঠানো, আর অন্যটি হলো মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র সমর্পণ করানো।
২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ সালে মুক্তিযোদ্ধারা বঙ্গবন্ধুর নিকট তাদের অস্ত্র সমর্পণ করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে কিছুসংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা অস্ত্র জমা না দিয়ে নিজের কাছে রেখে দেন।
১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধারা বীরের বেশে বাড়িতে ফিরে এসেছিলেন। আমরা তাদের ফুলেল শুভেচ্ছা দিয়ে বরণ করেছিলাম। তাদের ছিল মুখভর্তি দাড়ি আর লম্বা চুল। তারা শপথ করেছিলেন দেশ স্বাধীন হওয়ার আগ পর্যন্ত তারা চুল-দাড়ি কাটাবেন না। ১৯৭২ সালের মাঝামাঝি দৃশ্যপট পরিবর্তন হতে লাগল। এখানে সেখানে রাতে বাজার থেকে বাড়ি ফেরত দোকানিদের ডাকাতের কাছে সর্বস্ব হারানোর কথা শোনা যাচ্ছিল। এরই মধ্যে খবর পেলাম ৪ জন ডাকাত ধরা পড়েছে। আমরা গিয়ে দেখি ৪ জন মুক্তিযোদ্ধা হাত বাঁধা অবস্থায় বাজারের পুলিশ ফাঁড়িতে বসে আছেন। একি লজ্জা! আমরা ভাষা হারিয়ে ফেললাম। তাদের চালান দেয়া হলো। অন্য গ্রাম থেকে অন্য আর এক খবর। সেখানকার এক কুখ্যাত রাজাকার একজন মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে বিচারের আসর বসিয়েছে। আমাদের বাজারেও একদিন হঠাৎ করেই এক কুখ্যাত রাজাকার একজন মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে তার সাথে ভিড়ের মধ্যে ধাক্কা লাগার বিচার চেয়ে বসল। সেটা ছিল হাটবার। রাজাকারদের একি আস্ফালন! স¦াধীনতা যুদ্ধের এক বছরের মাথায় এমন বিপরীত দৃশ্যপট আমাদের কল্পনার বাইরে ছিল। মনে হলো মুক্তিযোদ্ধোদের দেখভাল করার কেউ নেই। এমনি একটি আর্থসামাজিক অবস্থার মাঝে ৭ ডিসেম্বর ১৯৭৩ সালে খান আতার ‘আবার তোরা মানুষ হ’ ছবিটি মুক্তি পায়।
ছবিটির ‘এক নদী রক্ত পেরিয়ে’ গানটি আসলে মুক্তিযোদ্ধাদের অভিমানের বহিঃপ্রকাশ। তারা মনে করছিলেন, কষ্ট করে দেশ স্বাধীন করার পর তাদের যথাযথ স¦ীকৃতি তারা পাননি। আর তখনই খান আতা রচনা করলেন, হে মুক্তিযোদ্ধারা এক নদী রক্ত পেরিয়ে তোমরা বাংলার আকাশে একটি রক্তিম সূর্য এনে দিয়েছ, তোমরা মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ৭ কোটি মানুষের জীবনের সন্ধান এনে দিয়েছ। আমরা কি তোমাদের এ ঋণ কখনো শোধ করতে পারব?
হে মুক্তিযোদ্ধারা, তোমরা জীবনের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন করে দিয়েছ, অথচ ইতিহাসে তোমাদের নাম লেখা হবে না। সেখানে তথাকথিত বড় বড় লোকদের নাম থাকবে। এমনকি তথাকথিত জ্ঞানী আর গুণীদের আসরেও তোমাদের কেউ স্মরণ করবে না। কিন্তু মনে রেখ, তারপরও তোমরাই সেই বিজয়ী বীর সেনা। মনে রেখ আমরা যারা সাধারণ মানুষ, আমরা তোমাদের এ অবদানের কথা কখনও ভুলব না। তোমাদের কথা থাকবে মাঠে মাঠে কিষাণির বুকে।
তখনকার এই প্রোপটে এটা ছিল অত্যন্ত পারফেক্ট একটা গান। গানটি মর্মস্পর্শী ও হৃদয়বিদারক। বস্তুতপইে মুক্তিযোদ্ধারা তখন হতাশার সাগরে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছিলেন। তারপর ধীরে ধীরে মুক্তিযোদ্ধারা তাদের সম্মান ফিরে পেতে লাগলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা প্রবর্তন করা হয়েছিল। কোটা নির্ধারণ করা হলো। মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা হলো। তবে স্বাধীনতাবিরোধীরা এক সময় মতায় গেল। তারাও তাদের গাড়িতে বাংলাদেশের পতাকা উড়াল। মুক্তিযোদ্ধারা কি আসলেই তাদের প্রকৃত গৌরব ফিরে পেয়েছে, তা ভাবনার বিষয় বৈকি!
লেখক : উপপরিচালক (অর্থ ও প্রশাসন)
আর্মি ইনস্টিটিউট অব
বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন
জালালাবাদ সেনানিবাস, সিলেট