জর্ডানের রানি রানিয়া আল আবদুল্লাহ’র বাংলাদেশ সফর : ন্যায়বিচারের স্বার্থে বিশ্ববাসীর উচিত নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানো

| October 30, 2017

নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মুখে রাখাইনে তাদের ওপর নির্মম নির্যাতনের যে বর্ণনা শুনতে পেয়েছি, তাতে মনে হয়েছে এই ঘটনা ‘আইয়ামে জাহেলিয়াতকেও’ হার মানিয়েছে। নিজ দেশ মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে যা ঘটেছে তা অমানবিক। তাই ন্যায়বিচারের স্বার্থে বিশ্ববাসীর উচিত নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানো। জর্ডান নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের পাশে রয়েছে এটি জানাতে আমি এখানে এসেছি। ২৩ অক্টোবর, রাখাইনে সে দেশের সেনাদের চালানো পাশবিকতায় বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের অবস্থা পর্যবেণ শেষে বক্তব্য দিতে গিয়ে জর্ডানের রানি রানিয়া আল আবদুল্লাহ এসব কথা বলেন।
রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার জন্য বাংলাদেশের ভূয়সী প্রশংসা করে জর্ডানের রানি বলেন, শুধু মানবিক কারণে নয়, ন্যায়বিচারের স্বার্থে বিশ্ববাসীকে রোহিঙ্গাদের পাশে থাকতে হবে। এখানে ৯৫ শতাংশ রোহিঙ্গা মৌলিক চাহিদার সংকটে রয়েছেÑ মিয়ানমারে যে পরিকল্পিত হত্যাকা- চলছে তা বিশ্বে নজিরবিহীন।
প্রাপ্ত তথ্য মতে, কক্সবাজারের এ এলাকায় এখন স্থানীয়দের চেয়ে আশ্রিত লোকের সংখ্যা দ্বিগুণ। নিজেদের নানা দিকে তির পরও নির্যাতিত রোহিঙ্গদের আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ। এতে বিশ্ব দরবারে প্রশংসা কুড়িয়েছে বাংলাদেশ। জর্ডানের রানি রানিয়া আল আবদুল্লাহ নিপীড়িত মানবতা রায় বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াতে সবার প্রতি অনুরোধ করে বলেন, আশ্রিতদের অধিকাংশই নারী-শিশু ও বৃদ্ধ। জাতিসংঘের উচিত এদের বিশেষ যতœ নেয়া। পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে নিরলস কাজ চালাতে জাতিসংঘের প্রতি অনুরোধ জানান তিনি। ইউনিসেফসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার কর্মকা- পরিদর্শন করতে ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটির বোর্ড সদস্য রানি রানিয়া আল আবদুল্লাহ’র নেতৃত্বে ১৬ সদস্যের প্রতিনিধি দল জর্ডানের রাজধানী আম্মান থেকে সরাসরি ২৩ অক্টোবর কক্সবাজার বিমানবন্দরে এসে পৌঁছান। এরপর তার গাড়িবহর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের উদ্দেশে রওনা দিয়ে সরাসরি সেখানে পৌঁছে।
বাংলাদেশের মাটিতে পা দিয়েই জর্ডানের রানি উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যান। কুতুপালং ক্যাম্পে পৌঁছে আশ্রয় নেয়া মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশুদের অবস্থা দেখেন। সেখানে জাতিসংঘের একাধিক সংস্থাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ত্রাণ কার্যক্রম পর্যবেণ, রোহিঙ্গা বস্তি ও স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক এনজিও পরিচালিত স্কুলগুলো পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি রোহিঙ্গা শিশুদের সঙ্গে খেলা করে তাদের আনন্দ দেন। এরপর তিনি ক্যাম্পে তৈরি মঞ্চে উঠে উপস্থিত সবার উদ্দেশে বক্তব্য রাখেন। বক্তব্য শেষে মঞ্চ থেকে নামার পরই কক্সবাজারের দিকে রওনা হয় তার গাড়িবহর। তার আগমন উপলে ব্যাপক নিরাপত্তা জোরদার করে প্রশাসন। প্রশাসন সূত্র জানায়, জর্ডানের রানির কক্সবাজার আগমন উপলে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবির পাশাপাশি সাদা পোশাকেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল।
জর্ডানের রানি রানিয়া আল আবদুল্লাহ ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটির (আইআরসি) একজন বোর্ড সদস্য। একই সঙ্গে তিনি জাতিসংঘের মানবিক সংস্থাগুলোর পরার্মশক। রানি রানিয়া আল আবদুল্লাহ কুতুপালং ক্যাম্পে পৌঁছে রোহিঙ্গাদের অবস্থা পর্যবেণের পাশাপাশি ইউএনএইচসিআর পরিচালনাধীন রোহিঙ্গা শিশুদের স্কুল পরিদর্শনের সময় ছোট ছোট শিশুদের সঙ্গে কথা বলেন। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ত্রাণ কার্যক্রম পরিদর্শন শেষে তিনি সাংবাদিকদের প্রেস ব্রিফিংকালে বলেন, বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশ সরকার ও জনগণ যে মানবিকতা দেখিয়েছে তার জন্য বাংলাদেশকে ধন্যবাদ। রোহিঙ্গা ইস্যুতে জর্ডান সরকার ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করবে। জর্ডান সরকার মিয়ানমারের এমন হত্যাকা-ের তীব্র নিন্দা জানায়। রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে যেটা হয়েছে সেটা জাতিগত নিধন।
এসময় প্রতিনিধি দলের সঙ্গে ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি, কক্সবাজার-রামু আসনের সংসদ সদস্য সাইমুম সরোয়ার কমল, মহেশখালী-কুতুবদিয়া আসনের সংসদ সদস্য আশেকউল্লাহ, কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন, পুলিশ সুপার ড. ইকবাল হোসেন, উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিকারুজ্জামানসহ বিভিন্ন এনজিও সংস্থার পরিচালকবৃন্দ।
উল্লেখ্য, গত ২৫ আগস্ট মিয়ানমারে সেনা অভিযান শুরুর পর ৬ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। তাদের দুরবস্থা দেখতে এর আগে বাংলাদেশে এসেছিলেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানের স্ত্রী এমিনে এরদোগান। তিনিও রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনকে বিশ্বের সবচেয়ে বর্বরতম ঘটনা বলে আখ্যায়িত করেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মানবতার কল্যাণে বৈশ্বিকভাবে সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনাকারী রানি রানিয়ার কক্সবাজার সফর রোহিঙ্গা ইস্যুতে জনমত সৃষ্টি, বিশেষ করে ইস্যুটির সংবেদনশীলতা বাড়বে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিশ্বাঙ্গনে এখন প্রতিনিয়ত সরব রয়েছে বাংলাদেশ। এ নিয়ে সরকারের তরফে ঢাকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এক্সকুসিভ ব্রিফিং হয়েছে। সেখানে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বর্বরতা বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের জাতিগতভাবে নির্মূলে দেশটির সেনাবাহিনীর পরিকল্পিত আগ্রাসনের ফিরিস্তি তুলে ধরা হয়েছে। আর এ সবেরই ফলশ্রুতিতে জর্ডানের রানি রানিয়া আল আবদুল্লাহ বাংলাদেশ সফরে এলেন। তিনি বাংলাদেশ সরকারের সামগ্রিক আয়োজনে সন্তোষ প্রকাশ করে বিশ্ব সম্প্রদায়কে এক্ষেত্রে কার্যকর হস্তক্ষেপ করার আহ্বান জানান।

Category: প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

About admin: View author profile.

Comments are closed.