প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ : সব প্রতিবেশী দেশের মধ্যে বাংলাদেশকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে ভারত

| October 30, 2017


মেজবাহউদ্দিন সাকিল : ভারত-বাংলাদেশ যৌথ পরামর্শক কমিশনের চতুর্থ সভায় অংশ নিতে ২ দিনের সফরে ২২ অক্টোবর ঢাকা এসে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে বলেছেন, প্রতিবেশীদের অগ্রাধিকার দেয়া ভারতের নীতি। এর মধ্যে বাংলাদেশ সবার ওপরে। কারণ প্রতিবেশীদের মধ্যে বাংলাদেশই ভারতের কাছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ভারত সব প্রতিবেশী দেশের মধ্যে বাংলাদেশকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ২৩ অক্টোবর বারিধারায় ভারতীয় হাইকমিশনে নতুন চ্যান্সারি ভবন ও ১৫টি উন্নয়ন প্রকল্প উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বক্তৃতাকালেও সুষমা স্বরাজ অনুরূপ বক্তব্য রাখেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে বৈঠকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বলেন, রাখাইন থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের অবশ্যই মিয়ানমারকে ফেরত নিতে হবে। এটা বাংলাদেশের জন্য বোঝা। বাংলাদেশ এই বোঝা কতদিন বইবে? এর একটি স্থায়ী সমাধান হওয়া উচিত।’ ২২ অক্টোবর গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠককালে সুষমা স্বরাজ এ কথা বলেন। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমারকে অবশ্যই তাদের নাগরিকদের স্বদেশে ফিরিয়ে নিতে হবে। এ প্রসঙ্গে মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গা সংকট সৃষ্টির প্রেেিত দেশটির স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চিকে উদ্দেশ করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যা বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাাৎকালে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজও সে তথ্য উল্লেখ করেন। নরেন্দ্র মোদি সু চি’র সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘আন্তর্জাতিকভাবে আপনার একটা উজ্জ্বল ভাবমূর্তি আছে, সেটা নষ্ট করবেন না।’
রোহিঙ্গা নাম উচ্চারণ না করে শরণার্থীদের ফেরত নেয়ার কথা বললেও সন্ত্রাসীদের শাস্তির কথাও বলেন সুষমা স্বরাজ। তিনি বলেন, রাখাইনে অস্থিতিশীলতার জন্য দায়ী সন্ত্রাসীদের শাস্তি হওয়া উচিত। কিন্তু এর জন্য নিরীহ লোকদের কেন শাস্তি পেতে হবে? নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ায় শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশের প্রশংসাও করেন সুষমা স্বরাজ।
গত ২৫ আগস্ট রাখাইনে সেনা ও পুলিশ ফাঁড়িতে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের হামলার পর সেখানে সেনা অভিযান শুরু হয়। এই অভিযানে রোহিঙ্গা মুসলিমদের নির্বিচারে হত্যা, ধর্ষণ, বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশাল সংখ্যার এই শরণার্থীদের বাংলাদেশের জন্য ‘বড় বোঝা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ। সংকটের স্থায়ী সমাধানে রাখাইনে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অবদান রাখা উচিত বলেও মন্তব্য করেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ।
সুষমা স্বরাজের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশের উদ্বাস্তুদের ভারতে আশ্রয় দেয়ার কথা স্মরণ করেন। স্মরণ করেন মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহযোগিতার কথাও। সেজন্য দেশটির নেতৃত্ব ও জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকা-ের পর ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে উদ্বাস্তু হিসেবে দেশের বাইরে দীর্ঘদিন থাকার কথাও তুলে ধরেন।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে অন্যান্যের মধ্যে ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী, ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী। অন্যদিকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন সেদেশের পররাষ্ট্র সচিব ড. সুব্রামানিয়াম জয়শঙ্কর এবং ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলা।
বৈঠকের শুরুতে মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর ব্যবহৃত কিছু সমরাস্ত্র প্রদানের অনুষ্ঠান হয়। বাংলাদেশকে শুভেচ্ছার স্মারক হিসেবে তখন ব্যবহৃত এমআই হেলিকপ্টার, দুটি ট্যাংক, ২৫টি বিভিন্ন অস্ত্র দিয়েছে ভারত। গণভবনের অনুষ্ঠানে ৩৮ ক্যালিবারের একটি সার্ভিস রিভলবার শেখ হাসিনার হাতে তুলে দেন সুষমা স্বরাজ।
ঝুলে থাকা ইস্যুর নিষ্পত্তিতে কাজ করে যাচ্ছি : সুষমা স্বরাজ
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফেরাতে মিয়ানমারের সঙ্গে কাজ করবে ভারত। ভারত চায় রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে কফি আনান কমিশনের সুপারিশের পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন। বাস্তুচ্যুত নাগরিকরা ফিরে গেলে রাখাইনে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে আসবে। সেখানে দ্রুত আর্থসামাজিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটালে সব সম্প্রদায়ের মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ২২ অক্টোবর পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলীর সঙ্গে যৌথ পরামর্শক কমিশনের (জেসিসি) বৈঠক শেষে এ কথা বলেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী তার বিবৃতিতে বলেন, আমরা দ্বিপাকি সম্পর্কের সকল বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি। দুই দেশের সম্পর্ক আজ এক ঐতিহাসিক নতুন উচ্চতায় উপনীত। বাণিজ্য, যোগাযোগ, নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, পানি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, উন্নয়ন সহযোগিতা, জনগণের মধ্যে সংযোগ এেেত্র উল্লেখযোগ্য। ভারত রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখবে। এজন্য ভারতকে ধন্যবাদ জানাই। রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়া ও এই সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান খুঁজে পেতে মিয়ানমারের ওপর অব্যাহত চাপ রাখতে হবে ভারতকে।
তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন ইস্যুতে এ এইচ মাহমুদ আলী বলেন, গত ৮ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়াদকালেই তিস্তা চুক্তি সই হবে বলে জানান।
সুষমা স্বরাজ তার বক্তব্যে ঝুলে থাকা অনিষ্পন্ন ইস্যুর নিষ্পত্তির কথা জানিয়ে বলেন, আমরা সেগুলো জানি। সেগুলোর সমাধানে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আজ আমরা সন্ত্রাসবাদ, উগ্রবাদের মতো অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে যাচ্ছি। আমরা যৌথ উদ্যোগ নিয়ে জিরো টলারেন্স নীতিতে ঘৃণা, সহিংসতা ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা করে সমাজকে রার পদপে নিয়েছি। নিরাপত্তা ছাড়াও যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ েেত্র সন্তোষজনক অগ্রগতি সাধন করেছি। বিদ্যুৎ েেত্র ব্যাপক সহযোগিতা চলছে। ভারত এখন ৬৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বাংলাদেশকে সরবরাহ করছে। শিলিগুঁড়ি থেকে পার্বতীপুর পর্যন্ত পাইপ লাইনের মাধ্যমে পেট্রোলিয়াম পণ্য নেয়া হবে। একটি এলএনজি টার্মিনালও স্থাপিত হবে।
সুষমা স্বরাজ বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায় ভারত। আমাদের অংশীদারিত্ব আজ মানবিক পর্যায়ের সব েেত্র ছড়িয়ে পড়েছে। আমাদের সম্পর্ক পুরনো সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে রচিত যার প্রমাণ পাওয়া যায় সার্বভৌমত্ব, সমতা, আস্থা এবং বোঝাপড়া, যা একটি কৌশলগত সম্পর্কের দিকে এগোচ্ছে। ভারত বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বন্ধু এবং উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে আছে। বাংলাদেশে ৮ বিলিয়ন ডলারের ঋণ দেয়া হয়েছে উল্লেখ করে সুষমা স্বরাজ বলেন, এটা বিশ্বের অন্যান্য দেশের মধ্যে ভারতের সবচেয়ে বড় ঋণ সহায়তা। আমি নিশ্চিত যে, এই ঋণ বাংলাদেশে উন্নয়ন খাতে বিশেষ করে অবকাঠামো খাতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখবে। ইতোমধ্যে ১১০ কোটি টাকার অনুদানে ২৪টি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। আগামী দুই বছরে ১১০ কোটি টাকার অনুদানে ৬০টি প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। ৭১ কোটি টাকার অনুদানে ১৫টি প্রকল্প ২০১৮ সালের মধ্যে শেষ হবে।
সুষমা স্বরাজ আরো বলেন, ভারত বাংলাদেশে ছোট ছোট সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রকল্পে সহায়তা দিচ্ছে। গত তিন বছরে ২৪টি বড় ধরনের প্রকল্প যেমন ছাত্রদের হোস্টেল, টিউবওয়েল, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, এতিমখানাসহ প্রভৃতিতে অর্থ সহায়তা দিয়েছে ভারত। ভারতের ঋণ সহায়তায় বর্তমানে রাজশাহী, খুলনা ও সিলেটসহ বিভিন্ন এলকায় ৫৮টি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন আছে।
সুষমা স্বরাজ জানান, জনগণ টু জনগণ সংযোগ হচ্ছে আমাদের দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী দিক। তাদের মিথস্ক্রিয়া বাড়াতে আমাদের প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদপে নিতে হবে। আমি এটা জেনে আনন্দিত যে, ভারতে পর্যটকদের একটা বিরাট অংশ বাংলাদেশি। আমাদের মিশন এবং পোস্ট ২০১৬ সালে ৯ দশমিক ৭৬ লাখ ভিসা ইস্যু করেছে। আশা করি চলতি বছরে এই সংখ্যা ১৪ লাখে পৌঁছাবে। আমরা দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বাস এবং ট্রেন সার্ভিস বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছি।
প্রয়োজনের সময় বাংলাদেশকে ভারত সব ধরনের সহযোগিতা দিচ্ছে উল্লেখ করে সুষমা স্বরাজ বলেন, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ই আমাদের দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের দুই দেশের বাহিনীর মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গর্বের বিষয়। মুক্তিযোদ্ধাকে সম্মান জানিয়ে আমরা তাদের জন্য ৫ বছরের ভিসা চালু করেছি এবং তাদের চিকিৎসা েেত্রও সহযোগিতা দেয়ার বিষয়ে কাজ করছি।
রোহিঙ্গা ইস্যুতে সুষমা স্বরাজ বলেন, রাখাইন থেকে আসা লাখ লাখ মিয়ানমারের নাগরিককে মানবিক সহায়তার জন্য ভারত সরকার অপারেশন ইনসানিয়াত চালু করেছে। সেদ্ধ চাল, ডাল, লবণ, চিনি, তেল, চা, দুধ, সাবানসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গাকে দেয়া হয়েছে। রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা ব্যাপকতায় ভারত গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। জনগণের কল্যাণ আর সংযম বিবেচনা করে পরিস্থিতি মোকাবিলার আহ্বান জানিয়েছি। এটা পরিষ্কার যে, বাস্তুচ্যুত নাগরিকরা ফিরে গেলেই রাখাইনে স্বাভাবিকতা ফিরে আসবে।
জেসিসির বৈঠকে বাংলাদেশ পে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী ছাড়াও পররাষ্ট্র, নৌ পরিবহন, পানি সম্পদ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, ইআরডি সচিবসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যোগ দেন। অন্যদিকে সুষমা স্বরাজের সঙ্গে ছিলেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব এস জয়শঙ্কর, বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলাসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। বৈঠকের পর দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতিতে দুটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। সেগুলো হলো ুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের দতা বৃদ্ধি এবং পেট্রোলিয়াম করপোরেশন ও নুমালিগড় রিফাইনারির মধ্যে ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি।
মোদির আমলেই তিস্তা
চুক্তি চায় বাংলাদেশ
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমলেই তিস্তা চুক্তি চায় বাংলাদেশ। তিস্তা চুক্তি নিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দেয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে দিল্লির কাছে তাগাদাও দিয়েছে ঢাকা। এছাড়া রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে প্রতিবেশী ভারতের জোরালো সমর্থন আদায় করতেও সম হয়েছে বাংলাদেশ। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের ঢাকা সফরে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে বৈঠকে এসব আলোচনা হয়েছে।
সুষমা স্বরাজের ঢাকা সফরের আগেই বাংলাদেশের প থেকে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা তোলার প্রস্তুতি নেয়া হয়। সফরের প্রথম দিন ২২ অক্টোবর দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। এ সময় বাংলাদেশের প থেকে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগের জন্য ভারতের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। বৈঠকে ভারতের প থেকে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। একই সঙ্গে এ বিষয়ে ভারতের সমর্থন থাকবে বলেও জানানো হয়।
গত ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাবিরোধী দমন-পীড়ন শুরুর পর ৫ সেপ্টেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মিয়ানমার সফর করেন। তখন দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে কোনো মন্তব্য না থাকলেও পরে ভারত একটি বিবৃতি দেয়। একই সঙ্গে গত ২৯ সেপ্টেম্বর ভারত জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনে একটি বিবৃতি পেশ করে। সেখানে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ভারত। তবে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকা সফরের সময় রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়া ও কফি আনান কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন চেয়েছে ভারত।
এদিকে সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের পর দীর্ঘদিন ধরেই তিস্তা চুক্তির দাবি জানিয়ে আসছিল বাংলাদেশ। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে এখন ব্যস্ত থাকলেও তিস্তা চুক্তির কথা স্মরণ করিয়ে দিতেও ভুল করেনি বাংলাদেশ। দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী সুষমা স্বরাজকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দেয়া প্রতিশ্রুতি স্মরণ করিয়ে দেন। উভয় দেশের মধ্যে অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনের পাশাপাশি তিস্তা চুক্তির বিষয়টি তুলে ধরা হয়। তিস্তা চুক্তি নিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির গত ৮ এপ্রিলে দেয়া বক্তব্য স্মরণ করিয়ে দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এছাড়া গঙ্গার পানির সুষ্ঠু ব্যবহারের ল্েয ভারতের কাছ থেকে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ। চলতি বছরের এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফরে গেলে নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন, মোদি-হাসিনার আমলেই তিস্তা চুক্তি হবে। মোদির দেয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তার আমলেই তিস্তা চুক্তি চায় বাংলাদেশ। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনের বিষয়েও আলোচনা করেন তারা।
দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকে বাংলাদেশের প থেকে ভারতে পাটপণ্য প্রবেশের েেত্র এন্টি ডাম্পিং শুল্ক প্রত্যাহারের জন্য অনুরোধ করা হয়। এছাড়া আরও বেশ কয়েকটি সীমান্ত হাট স্থাপনে আলোচনা হয়েছে। এছাড়া আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটান (বিবিআইএন) সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়নে এ মুহূর্তে ভুটানকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশ, ভারত ও নেপাল (বিআইএন) বাস্তবায়নে জোর দেয়া হয়েছে। তবে ভুটান ইচ্ছা করলে পরবর্তীতে এ প্রক্রিয়ায় যোগ দিতে পারবে। এছাড়া ভারতীয় ক্রেডিট লাইনের আওতায় বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলোর অবস্থা নিয়ে আলোচনা করা হয়।
বৈঠকে ভারতের প থেকে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে জোর দেয়া হয়। তবে বাংলাদেশের প থেকে ভারতকে আবারও আশ্বাস দেয়া হয় ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মাটি কোনো সন্ত্রাসী ও জঙ্গিগোষ্ঠীকে ব্যবহার করতে দেয়া হবে না। এছাড়া বাংলাদেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ভারত বর্তমানে বাংলাদেশে ৬৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিমাণ ভবিষ্যতে আরও বাড়াবে বলে জানিয়েছে দেশটি।
সম্পর্ক আরো মজবুতের
বার্তা সুষমার সফরে
২০১৪ সালে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের ঢাকা সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক এগিয়ে নেয়ার বার্তা পেয়েছিল ঢাকা। সেই সফরে আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির বাইরে সুষমা স্বরাজের সঙ্গে সাাৎ করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানা ও প্রধানমন্ত্রীকন্যা সায়মা ওয়াজেদ হোসেন পুতুল। ওই সাাৎকে দুই দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক পরিবারগুলোর মধ্যে যোগাযোগ সৃষ্টির চেষ্টা হিসেবে দেখেছিলেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। গত তিন বছরে বিভিন্ন পর্যায় থেকে সেই চেষ্টার ফল যে এসেছে এর প্রমাণ মিলল ২৩ অক্টোবর সুষমা স্বরাজের বক্তব্যে। ভারতীয় হাইকমিশনের অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলীর সঙ্গে সম্পর্ক প্রসঙ্গে সুষমা স্বরাজ বলেন, ‘পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে আমরা পরস্পরকে ‘এক্সিলেন্সি’ সম্বোধন বাদ দিয়েছি। আমরা আমাদের সম্পর্ককে পারিবারিক বানিয়েছি, আত্মীয় হয়েছি। প্রথমবারের মতো এ সম্পর্ক বদলে গেছে।’
বিশ্লেষকদের মতে, এমন সম্পর্ক এখন কেবল বাংলাদেশ ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যেই নয়, দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যেও। সম্পর্কটা সত্যিই এমন বদলে গেছে যে তিন বছর আগে ভারতে মতার পালাবদলের পরিপ্রেেিত নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে ঢাকার মধ্যে যে কিছুটা হলেও শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছিল তা এখন বিশ্বাস করাই মুশকিল। তবে রাজনীতি নয়, দ্বিপীয় সম্পর্ক পর্যালোচনা এবং একে আরো এগিয়ে নেয়াই গুরুত্ব পেয়েছে সুষমা স্বরাজের বাংলাদেশ সফরে। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাাৎ করেছেন। সুষমার বৈঠক হয়েছে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ এবং বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে। এসব বৈঠকে দ্বিপীয় সম্পর্ক নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ও এসেছে। তবে তা কোনোভাবেই এ সফরের মুখ্য বিষয় ছিল না।
জানা যায়, ভারতের কাছে বাংলাদেশের সঙ্গে তার সম্পর্কের েেত্র জনগণই মুখ্য। দুই দেশের মানুষে মানুষে সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়ে ভিসা ও কনস্যুলার সেবা জোরদার করেছে ভারত। দুই দেশের মানুষে মানুষে সম্পর্ক ও কানেক্টিভিটি জোরদার করার ল্েয কাজ করছে ঢাকা ও নয়াদিল্লি। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফরের মূল বিষয় ছিল দ্বিপীয় সম্পর্ক পর্যালোচনা করা। ২৩ অক্টোবর ঢাকা ছাড়ার আগে ভারতীয় হাইকমিশনে এক অনুষ্ঠানে ভারতের বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতি ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’ (প্রতিবেশীই প্রথম) প্রসঙ্গে তিনি হিন্দিতে বলেন, ‘পরসি পেহলে মে, বাংলাদেশ সবচে পেহলে’।
ভারতীয় হাইকমিশনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত দর্শক শ্রোতাদের উদ্দেশে সুষমা বলেন, ‘ঐতিহাসিক এ শহরে আপনাদের মাঝে আসতে পারা আমার জন্য অত্যন্ত আনন্দের। ২০১৪ সালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর আমার প্রথম একক সফর ছিল বাংলাদেশে। আজ আমি সন্তুষ্টি ও গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, দুই দেশ ও জনগণের মধ্যে সম্পর্ক এত ভালো কখনো ছিল না।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সুষমা স্বরাজের সাাতের পর ভারতের অবস্থান আরো স্পষ্ট হয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর আমন্ত্রণে বাংলাদেশ-ভারত জেসিসি সভায় অংশ নিতে সুষমা স্বরাজ ঢাকায় এসে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক উন্নয়নের বার্তা দিয়ে গেলেন। পাশাপাশি তার এ সফরের মধ্য দিয়ে ‘রোহিঙ্গা’ প্রশ্নে ভারতের অবস্থান পরিষ্কার করে গেলেন। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, রোহিঙ্গা প্রশ্নে ভারতকে নিয়ে বাংলাদেশের যে দোলাচল ছিল, সুষমা স্বরাজের ঢাকা সফরের মধ্য দিয়ে তার অনেকখানিই নিরসন হলো।

Tags:

Category: প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

About admin: View author profile.

Comments are closed.