প্রতিবেদন

বাংলাদেশের প্রতি বিশ্ববাসীর পূর্ণ সমর্থন : অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের সাহায্যার্থে যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের সহায়তা অব্যাহত

স্বদেশ খবর ডেস্ক : রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের প্রতি বিশ্ববাসীর সমর্থন ক্রমেই বাড়ছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ যেমন রোহিঙ্গাদের সাহায্যার্থে এগিয়ে আসছে তেমনি বাংলাদেশকে জানাচ্ছে অভিনন্দন। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিলে সারা বিশ্ব তাঁর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়। বিশ্বের সেরা গণমাধ্যমগুলো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ মর্যাদায় ভূষিত করে। ইউনাইটেড আরব আমিরাতের প্রভাবশালী দৈনিক ‘খালিজ টাইমস’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘প্রাচ্যের নতুন তারকা’ বলে আখ্যায়িত করে।
অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় শুধু বাংলাদেশের প্রশংসা করেই তাদের দায়িত্ব শেষ করেনি। বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গারা কিভাবে জীবনধারণ করবে, সে ব্যবস্থাটিও তারা করছে একাগ্রচিত্তে। এরই অংশ হিসেবে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের সহায়তার জন্য আরো ২ হাজার কোটি টাকা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। ২৩ অক্টোবর সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় জাতিসংঘ আয়োজিত আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের প থেকে এই ঘোষণা দেয়া হয়।
এ নিয়ে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেল। এর মধ্য দিয়ে জাতিসংঘ ঘোষিত ‘প্রতিকার পরিকল্পনা’ তহবিলের পাঁচ-ষষ্ঠাংশ অজির্ত হলো। সংকট শুরুর পর প্রথম ছয় মাসের জন্য এই তহবিল সংগ্রহ করা হয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও কুয়েতের আহ্বান ও সহযোগিতায় আয়োজিত এই সম্মেলনে বাংলাদেশের প থেকে বলা হয়েছে প্রতিদিন হাজারো রোহিঙ্গা পালিয়ে আসায় ‘অগ্রহণযোগ্য’ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে জাতিসংঘ সংস্থাগুলো জানিয়েছে, ২২ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশে নতুন করে আসা রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ৬ লাখ অতিক্রম করেছে।
ঢাকায় জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারীর কার্যালয় থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জেনেভা সম্মেলনে পাওয়া আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিশ্রুতির কথা জানানো হয়। এতে বলা হয় রোহিঙ্গা সংকটের প্রোপটে জেনেভায় আয়োজিত এই সম্মেলনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মানবিক সহায়তার ব্যাপারে একতাবদ্ধ হয়েছে। তারা জরুরি মানবিক সংকট মোকাবিলায় মোট ৩৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (২ হাজার ৮১৬ কোটি ৫ লাখ বাংলাদেশি টাকা) সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গাদের পাশে থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। জাতিসংঘের ঢাকা অফিস আরো জানায়, অক্টোবরের শুরুতে বাংলাদেশে কর্মরত মানবিক সংস্থাগুলো ৪৩৪ মিলিয়ন ডলারের (৩ হাজার ৫৯৪ কোটি, ৬০ লাখ ৫০ হাজার টাকা) একটি ‘প্রতিকার পরিকল্পনা’ (রেসপন্স প্ল্যান) ঘোষণা করে।
এই প্রতিশ্রুতি সম্মেলনের আগে প্রতিকার পরিকল্পনা অনুযায়ী ২৭ শতাংশ তহবিল অর্জিত হয়েছিল। ২৩ অক্টোবর অনুষ্ঠিত সম্মেলনে নতুন করে তহবিল বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতিতে রোহিঙ্গাদের জীবনরাকারী সহায়তা কার্যক্রম সম্মিলিতভাবে এগিয়ে নেয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সম্মেলনে অংশ নিয়ে বাংলাদেশে জাতিসংঘ আবাসিক সমন্বয়কারী রবার্ট ডি উইটকিনস বলেন, ‘এটি এই মুহূর্তের বিশ্বের দ্রুততম অবনতিশীল শরণার্থী সংকট। তাই আমাদের মানবিক কার্যক্রমের গতি বাড়াতে আরো তহবিলের জন্য জরুরি সহায়তা প্রয়োজন। সীমান্ত খোলা রাখায় আমরা বাংলাদেশ সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ। আমরা বাংলাদেশের মানুষের প্রতিও কৃতজ্ঞ। তারা নতুন করে আসা ব্যক্তিদের সহায়তায় আন্তরিক। এই শরণার্থীদের প্রতি সংহতি প্রদর্শনের জন্য আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও ধন্যবাদ দিচ্ছি। শরণার্থীদের সহায়তায় অতি জরুরি প্রয়োজনে তারা ইচ্ছাকৃতভাবে এগিয়ে এসেছে।’
রবার্ট উইটকিনস বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ২৩ অক্টোবর আরো ২৩৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিরিক্ত সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মাধ্যমে সংকট মোকাবিলায় ৩৪০ মিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেল। এই সুবাদে এখন সহায়তা সংস্থাগুলো জীবনরাকারী কার্যক্রমকে অর্থাৎ আশ্রয়, খাদ্য, বস্ত্র, পানি, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও সুরা সেবা দিয়ে যেতে পারবে এবং আরো সম্ভাব্য কোনো সংকট মোকাবিলা করতে পারবে।’
জানা গেছে, প্রথম ৬ মাসের জন্য এই সহায়তা তহবিল সংগ্রহ করা হয়েছে। আগামী ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সম্ভাব্য মানবিক কার্যক্রমের বিপরীতে এই তহবিল খরচ হবে। সম্মেলনে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ৩ কোটি মার্কিন ডলার সহায়তা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এছাড়া তুরস্ক ৫ কোটি, কুয়েত দেড় কোটি ডলার, যুক্তরাজ্য ১২ মিলিয়ন পাউন্ড, অস্ট্রেলিয়া ১০ মিলিয়ন অস্ট্রেলীয় ডলার ও ডেনমার্ক ১০ মিলিয়ন ডলার দেবে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে আরো ৩৩১ কোটি টাকা বরাদ্দের ঘোষণা দেয়। এই তহবিলের সুবিধা পাবে ৯ লাখ রোহিঙ্গা ও ৩ লাখ স্থানীয় মানুষ, যারা কক্সবাজারে মিয়ানমার সীমান্তে বসবাস করছে।
সম্মেলনে অংশ নিয়ে জেনেভায় জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের দূত শামীম আহসান বলেন, মিয়ানমারের সহিংসতায় ১০ লাখ রোহিঙ্গার বাংলাদেশে পালিয়ে আসা একটি ‘অগ্রহণযোগ্য’ পরিস্থিতি। তিনি এসব মানুষকে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডার গণহত্যার পর কোনো একটি দেশ থেকে সবচেয়ে বেশি মানুষ বিতাড়িত হওয়ার ঘটনা এটি। তিনি বলেন, দেশটি দাবি করলেও রাখাইনে সহিংসতা বন্ধ হয়নি। এখনো প্রতিদিন হাজারো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আসছে।
এদিকে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক জানায়, জেনেভায় অনুষ্ঠিত ২৩ অক্টোবরের সম্মলনে ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক ডা. মুহাম্মাদ মুসা অংশ নিয়েছেন। বৈঠকে তিনি ব্র্যাকের প থেকে সম্ভাব্য সব রকম সহায়তার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। বাংলাদেশের বেসরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে একমাত্র ব্র্যাকই এই বৈঠকে অংশ নেয়ার আমন্ত্রণ পেয়েছে।
জেনেভা বৈঠকে স্বাগত বক্তব্য দেন জাতিসংঘের জরুরি ত্রাণ সমন্বয়ক ও মানবিক কার্যক্রমবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল মার্ক লোকক। মার্ক স্পষ্টভাবে বলেন, নির্যাতনের মুখে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ভার বাংলাদেশের একার পক্ষে বহন কিছুতেই সম্ভব নয়। এজন্য রোহিঙ্গাদের সহায়তা দিতে এবং বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াতে মার্ক লোকক বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান।