প্রতিবেদন

বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬০২ ডলারে

নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশে মাথাপিছু আয় এবং মোট অভ্যন্তরীণ আয় (জিডিপি) বেড়েছে ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে। চলতি অর্থবছরে মোট দেশজ আয়ের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হবে ৭ দশমিক ২৪ শতাংশ। আর মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬০২ ডলারে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে। ২৩ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভা শেষে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির প্রাথমিক হিসাবটি সাংবাদিকদের কাছে প্রকাশ করেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এ সময়ে চলতি মূল্যে মাথাপিছু জাতীয় আয় ১ হাজার ৬০২ ডলারে উন্নীত হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ৯ মাসে অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক পর্যালোচনা করে জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রাথমিক প্রতিবেদন তৈরি করেছে বিবিএস।
পরিকল্পনামন্ত্রী জানান, প্রবৃদ্ধির হিসাব বের করতে অর্থবছরের শেষ কয়েক মাসের অর্থনৈতিক প্রবণতাও বিবেচনায় আনা হয়েছে। উল্লেখ্য, চলতি বছরের জাতীয় বাজেটে ৭ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির ল্যমাত্রা নির্ধারণ করে সরকার। বিবিএসের হিসাবে গত অর্থবছর জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৭ দশমিক ১১ শতাংশ। আর গত অর্থবছরে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ছিল ১ হাজার ৪৬৫ ডলার। এ হিসাবে এক বছরে মাথাপিছু আয় বেড়েছে ১৩৭ মার্কিন ডলার। মূলত কৃষি ও সেবাখাতে প্রবৃদ্ধি বেড়ে যাওয়ায় জাতীয় অর্থনীতিতেও প্রত্যাশার চেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি এসেছে বলে ধারণা দেয়া হয়েছে বিবিএসের প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, এবার কৃষিখাতে ৩ দশমিক ৪০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। আগের অর্থবছরে কৃষিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ২ দশমিক ৭৯ শতাংশ। অন্যদিকে সেবাখাতে এবার প্রবৃদ্ধি হয়েছে সাড়ে ৬ শতাংশ। আগের অর্থবছরে সেবাখাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ। সামান্য কমে এলেও এবারও শিল্পখাতে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি হয়েছে বলে জানিয়েছে বিবিএস। প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এবার শিল্পখাতে ১০ দশমিক ৯৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। আগের অর্থবছরে শিল্পখাতে প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। শিল্পখাতের ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে এবার ১০ দশমিক ৯৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে বলে জানিয়েছে বিবিএস। আগের অর্থবছর এ খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ৬৯ শতাংশ। প্রবৃদ্ধি বাড়লেও স্থিরমূল্যে জিডিপিতে কৃষিখাতের অবদান কমেছে। চলতি অর্থবছরের জিডিপিতে কৃষির অবদান দাঁড়িয়েছে ১৪ দশমিক ৭৯ শতাংশে। আগের অর্থবছরের জিডিপিতে কৃষির অবদান ছিল ১১ দশমিক ৩৫ শতাংশ। সামান্য বেড়ে স্থিরমূল্যে জিডিপিতে শিল্পের অবদান দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৪৮ শতাংশে। তবে আগের অর্থবছরের জিডিপিতে শিল্পখাতের অবদান ছিল ৩১ দশমিক ৫৪ শতাংশ। ২১ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ থেকে বেড়ে ম্যানুফ্যাকচারিং উপখাতের অবদান জিডিপির ২১ দশমিক ৭৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। আর ৫৩ দশমিক ১২ শতাংশ থেকে সেবাখাতের অবদান দাঁড়িয়েছে জিডিপির ৫২ দশমিক ৭৩ শতাংশে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, বাজারমূল্যে চলতি অর্থবছরের জিডিপির আকার দাঁড়িয়েছে ১৯ লাখ ৫৬ হাজার ৫৫ কোটি ৭০ লাখ টাকায়। আগের বছরে এর পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ৩২ হাজার ৮৬৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা। আর প্রবাসীদের আয় যোগ করে মোট জাতীয় আয় (জিএনআই) দাঁড়িয়েছে ২০ লাখ ৩৮ হাজার ৪০ কোটি ৬০ লাখ টাকা। একই সময়ে মাথাপিছু জিডিপি ১ হাজার ৫৩৮ ডলারে উন্নীত হয়েছে বলে জানিয়েছে বিবিএস। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ ১ লাখ ২০ হাজার ৯৩১ টাকা। একই সময়ে মাথাপিছু জাতীয় আয় (জিএনআই) ১ লাখ ২৫ হাজার ৯৯৯ টাকায় উন্নীত হয়েছে বলে জানিয়েছে বিবিএস। মার্কিন মুদ্রায় মাথাপিছু জিএনআই দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬০২ ডলারে। আগের বছর এর পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৪৬৫ ডলার। এক বছরে জাতীয় আয় বেড়েছে মাথাপিছু ১৩৭ ডলার। মোট দেশজ আয়ের হিসাবে ভোগব্যয়ের পরিমাণ কমে এসেছে বলে ধারণা দিয়েছে বিবিএস। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছর জিডিপির অনুপাতে ভোগব্যয় ৭৩ দশমিক ৯৪ শতাংশে নেমে এসেছে। গত অর্থবছর এর হার ছিল জিডিপির ৭৫ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। এ সময়ে সরকারি ভোগব্যয় জিডিপির ৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৩৯ শতাংশে। আর বেসরকারি ভোগব্যয় ৬৯ দশমিক ১৩ শতাংশ থেকে ৬৭ দশমিক ৫৫ শতাংশে নেমে এসেছে। এর ফলে মোট অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়ের পরিমাণ জিডিপির ২৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশে। কয়েক বছর ধরে বিনিয়োগের পরিমাণ কমে এলেও জিডিপির হিসাবে এবার তা সামান্য বেড়েছে। বিবিএসের হিসাবে চলতি অর্থবছর জিডিপির ৩০ দশমিক ২৭ শতাংশ অর্থ বিনিয়োগ হয়েছে। গত অর্থবছর বিনিয়োগ হয়েছিল জিডিপির ২৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ এ সময়ে ২২ দশমিক ৯৯ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে জিডিপির ২৩ দশমিক শূন্য ১ শতাংশে। আর সরকারি খাতের বিনিয়োগ ৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ২৬ শতাংশে।
পরিকল্পনামন্ত্রী জানান, বাংলাদেশসহ পৃথিবীর আরেকটি দেশের প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ হবে। সেটি হচ্ছে ভারত। তিনি আরও বলেন, প্রায় এক দশক ৬ শতাংশের বৃত্তে আটকে ছিল বাংলাদেশ। ওই সময় অর্থনীতিবিদ সুশীলসমাজের অনেকে বলেছিল এ বৃত্ত থেকে আর বের হতে পারবে না বাংলাদেশ। কিন্তু গত ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের বৃত্ত অতিক্রম
করে। চলতি অর্থবছরে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের আবারও প্রবৃদ্ধি ল্যমাত্রার চেয়ে বেশি হয়েছে। এটি একটি অসাধারণ সাফল্য।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, কাজের ক্ষেত্র বিস্তৃত হওয়ার কারণেই মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়েছে। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির পেছনে রেমিট্যান্সও বড় ভূমিকা রেখেছে। রেমিট্যান্স প্রেরণের গতি চলতি অর্থবছরের শুরুর দিকে কিছুটা শ্লথ থাকলেও সেপ্টেম্বর থেকে এ অবস্থার উন্নতি হতে শুরু করেছে। এ ধারা অক্টোবরেও অব্যাহত আছে। রেমিট্যান্সের পাশাপাশি রপ্তানি আয় বৃদ্ধির কারণেও মানুষের মাথাপিছু আয় ১৬০২ ডলারে উন্নীত হয়েছে বলে মনে করছেন অনেক অর্থনৈতিক বিশ্লেষক।